শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

চতুর্থ অধ্যায়

বহুবচন পদের ব্যবহার

১.  বাক্যে বহুবচনের দ্বিত্ব হবে না। যেমন ছাত্রীরা সবাই সমস্বরে চিৎকার দিয়ে উঠল। এ বাক্যে একই বিশেষণের জন্য ‘ছাত্রীরা’ ও ‘সবাই’ দুটো বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। বাক্যটি ভুল। শুদ্ধ হবে ‘ছাত্রীরা সমস্বরে চিৎকার দিয়ে উঠল’ কিংবা ‘সব ছাত্রী সমস্বরে চিৎকার দিয়ে উঠল’।

অনেকে বাক্যের সৌন্দর্যের জন্য সীমিতমাত্রায় বহুবচনের দ্বিত্ব প্রয়োগ দূষণীয় নয় বলে থাকেন। তা কিন্তু বর্জনীয়, এ রীতি প্রচলিত হলে বাক্য ও ভাষায় সে¦চ্ছাচারিতা বেড়ে যাবে। মনে রাখবেন, সাজগোছ ভালো কিন্তু অতিরিক্ত কোনো কিছু ভালো নয়। শ্রুতিমাধুর্যের নামে বাক্যে স্বেচ্ছাচারিতার প্রশ্রয় সৌন্দর্যের নামে ক্রমশ পরিধেয় বস্ত্র ছোটো করে ফেলার নামান্তর।

 সখীরা সব এল ওই, ছেলেরা সব গেল কই। শুধু শ্রুতিমাধুর্যের জন্যই বাক্য দুটোয় বহুবচনের দ্বিত্ব ঘটানো হয়েছে। এমনটি করা উচিত নয়। এটি শুধু সৌন্দর্যের জন্য শালীনতা ত্যাগ করার মতো অগ্রহণীয়। কবিতা লেখার জন্য যাঁদের অহরহ ব্যাকরণের রীতিনীতি ভাঙতে হয় তাঁদের কবিতা লেখা উচিত নয়। গাড়ি চালাতে গিয়ে যে ড্রাইভার বার বার দুর্ঘটনা ঘটায় তার গাড়ি চালানো উচিত নয়।

২. বহুবচন রূপ দেওয়ার জন্য বহুল ব্যবহৃত বর্ণগুচ্ছ ‘রা, এরা, গুলি, গুলো, দের, দিগের, গণ, বৃন্দ, সমূহ, সব, সকল, সমুদয়, কুল, বর্গ, নিচয়, পাল, রাশি, রাজি, নিকর, মালা, আবলি, উচ্চয়, গুচ্ছ, গ্রাম, জাল, দাম, নিকর, ব্রজ, মালা, রাজি, সমুচ্চয়, সংঘ, কুল, পাল, ব্রাত, মহল, যূথ ইত্যাদি।

৩.   উন্নত প্রাণিবাচক শব্দের সঙ্গে সাধারণত ‘রা বা গণ’ ব্যবহার করা হয়। তবে কবিতায় ‘অ-প্রাণি’ কিংবা ইতরপ্রাণির সঙ্গেও ‘রা/গণ’ ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। অ-প্রাণিবাচক শব্দে সাধারণভাবে ব্যবহৃত বর্ণগুচ্ছ হচ্ছে : ‘আবলি/আবলী (পদাবলী), উচ্চয় (পু®েপাচ্চয়), গুচ্ছ (শব্দগুচ্ছ), জাল (শরজাল), দাম (শৈবালদাম), নিকর (পু®পনিকর), ব্রজ (ভূধরব্রজ), মালা (কথামালা), রাজি (বৃক্ষরাজি), সমুচ্চয় (বচনসমুচ্চয়), রাশি (ফুলরাশি), সংঘ (শিশুসংঘ)’ ইত্যাদি।

প্রাণিবাচক শব্দে ব্যবহৃত বহুবচনবাচক বর্ণগুচ্ছগুলো : ‘কুল (বিহঙ্গকুল), পাল (মৃগপাল), ব্রাত (মধুকরব্রাত), মহল (রমণীমহল), যূথ (মৃগযূথ), গণ (সখিগণ), বৃন্দ (অতিথিবৃন্দ), বর্গ (প্রজাবর্গ), মণ্ডলী (শিক্ষকমণ্ডলী)’। ‘চয়, দল, নিচয়, পুঞ্জ, মণ্ডল, শ্রেণি, সমূহ, কুল, সকল ও সব’ প্রত্যয়গুলোকে প্রাণিবাচক ও অপ্রাণিবাচক উভয়ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়।

৪.  বহুবচনবাচক বর্ণগুচ্ছ সাধারণত শব্দের পরে বসে। তবে ‘সারা, কিছু, বিভিন্ন, হরেক, অঢেল, অনেক, বিস্তর, বহু, নানা, ঢের, অগণিত, অন্যান্য, অসংখ্য, যাবতীয়, সমস্ত, সমুদয়’ বহুবচনবাচক প্রত্যয় শব্দের আগে বসে।

যেমন ‘সারা বছর, কিছু কলা, বিভিন্ন লোক, হরেক রকম, অঢেল টাকা, অনেক দিন, বিস্তর স¤পদ, বহু দিন, নানা কথা, যাবতীয় তথ্য, সমস্ত কৌশল, সমুদয় ভাবনা’ ইত্যাদি। মনে রাখা উচিত, বহুবচনবাচক এ শব্দাবলি বিশেষ্যের পূর্বে আলাদাভাবে বসে।

৫.   বিশেষ্য কিংবা বিশেষণ পদের দ্বিত্ব প্রয়োগের মাধ্যমে বহুবচন বুঝানো হয়। যেমন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, মণ মণ ধান, রাশি রাশি বই, হাজার হাজার মানুষ, লাখ লাখ পাখি, কোটি কোটি তারা ইত্যাদি।

৬.   শব্দের শেষে ও-যুক্ত করে বহুবচন প্রকাশ করা যায়। যেমন হাজারো কথা, লাখো শহিদের রক্ত-ভেজা স্বাধীনতা মোর। এখানে ‘হাজারো’ এবং ‘লাখো’ বহুবচনরূপে ব্যবহৃত হয়েছে।

৭.   বিদেশি প্রত্যয়যোগ করে বাংলা ভাষায় কিছু কিছু শব্দকে বহুবচনে পরিণত করা হয়। যেমন মুরিদ + আন = মুরিদান, কাগজ + আত = কাগজাত ইত্যাদি। এখানে বিদেশি ‘-আন’ ও ‘-আত’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে শব্দ দুটো বহুবচনে পরিণত হয়েছে।

৮. তৎসম তৃচ প্রত্যয়ান্ত শব্দের বহুবচনে তা স্থলে তৃ এবং র্তা স্থলে র্তৃ হয়। যেমন :  পিতা>পিতৃকুল, নেতা> নেতৃবৃন্দ এবং কর্মকর্তা> কর্মকর্তৃবৃন্দ। অনুরূপ মাতৃগণ, দাতৃগণ, ভ্রাতৃবৃন্দ, ক্রেতৃবৃন্দ, শ্রোতৃমণ্ডলী ইত্যাদি।

৯. ছদ্ম তৃচ প্রত্যয়ান্ত শব্দ: কিছু তৃচ প্রত্যয়ান্ত শব্দের শেষে টা অথবা ধা থাকে। এগুলোর বহুবচনে ‘টা’ এবং ‘ধা’ স্থলে যথাক্রমে ‘ট’ৃ ও ‘ধৃ’ হয়। যেমন স্রষ্টা>স্রষ্টৃগণ, দ্রষ্টা>দ্রষ্টৃমণ্ডলী, উপদেষ্টা>উপদেষ্টৃবৃন্দ, যোদ্ধা> যোদ্ধৃবর্গ, বোদ্ধা> বোদ্ধৃবৃন্দ।

১০. সংস্কৃত ণিনি-প্রত্যয়ান্ত শব্দের বহুবচনে ঈ-কার এর পরিবর্তে ই-কার হবে। নগরবাসী> নগরবাসিগণ, মধুপায়ী> মধুপায়িসমূহ, তৃণভোজী> তৃণভোজিসকল।

১১. সংস্কৃত ইন প্রত্যয়ান্ত শব্দের বহুবচনে ঈ-কার এর পরিবর্তে ই-কার হবে। যেমন হস্তিযূথ, করিযূথ, মন্ত্রিবর্গ, প্রাণিকুল, কর্মিবৃন্দ, গুণিগণ, প্রার্থিগণ, শিক্ষার্থিবৃন্দ প্রভৃতি।

১২. সংখ্যাবাচক পদের পর কোনো বহুবচনবাচক প্রত্যয় তথা রা, গুলো, গণ প্রভৃতি যুক্ত হবে না। যেমন দুটি গাড়ি, সাতটি পাখি। ‘দুটি গাড়িগুলো’ কিংবা ‘সাতটি পাখিরা’ বলা অশুদ্ধ।

১৩. দ্বিত্ব প্রয়োগজনিত কারণে বহুবচন বোঝালেও  সংশ্লিষ্ট পদের সঙ্গে কোনো বহুবচনবাচক প্রত্যয় যুক্ত হবে না। যেমন : বস্তা বস্তা  বেগুন, লাল লাল আম লিখতে হবে; বস্তা বস্তা বেগুনগুলো কিংবা লাল লাল আমগুলো লেখা অশুদ্ধ।

 

 পঞ্চম অধ্যায়

কিছু পরিবর্তিত বানান

আগে লেখা হতো ব্যবহারিক। অনেক বৈয়াকরণ বলেন, ব্যাকরণমতে এটি বিধেয় নয়, ব্যাকরণ বিধেয়ে। ব্যবহার শব্দের সঙ্গে ইক প্রত্যয় যুক্ত হলে শব্দটি হয় ব্যাবহারিক। যেমন : বর্ষ+ইক = বার্ষিক, অর্থ + ইক = আর্থিক,  নন্দন + ইক = নান্দনিক। তেমনি: ব্যবহার + ইক = ব্যাবহারিক।

হরদম লেখা হয় বিচারিক। ব্যাকরণমতে এটিও শুদ্ধ নয়। বিচার শব্দের সঙ্গে ইক প্রত্যয় যুক্ত হলে শব্দটি হয় বৈচারিক। যেমন: দিন+ইক = দৈনিক, বিদেশ + ইক = বৈদেশিক, বিশ্ব + ইক = বৈশ্বিক। তেমনি, বিচার+ ইক= বৈচারিক।

আগে লেখা হতো গরু ছোট, বড়ো, পটল কিন্তু  ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’ মতে আপনাকে লিখতে হবে যথাক্রমে গোরু,  ছোটো, বড়ো, পটোল। তেমিন লিখতে হবে, ছোটোগল্প।

ঘুষ অতৎসম শব্দ। তাই ঘুষ বানান অশুদ্ধ। লিখতে হবে ঘুস। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ঘুস বানানকে একমাত্র প্রমিত নির্দেশ করেছে।

খ্রিস্ট বা খ্রিস্টাব্দ লিখে এসেছি এতদিন।  এখন লিখতে হবে খ্রিষ্ট  খ্রিষ্টাব্দ, খ্রিষ্টান, খ্রিষ্টপূর্ব প্রভৃতি। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান অনুরূপ নির্দেশনা দিয়েছে। তাদের মতে,  এগুলো বিদেশি শব্দ নয়, আত্তীকৃত শব্দ।

লক্ষ শব্দের অর্থ খেয়াল করা বা লাখ কিন্তু লক্ষ্য শব্দের অর্থ উদ্দেশ্য। এই লক্ষ্য শব্দ থেকে উপলক্ষ্য। তাই লক্ষ্য না থাকলে উপলক্ষ্য আসতে পারে না। অতএব লিখতে হবে উপলক্ষ্য। উপলক্ষ বানান অশুদ্ধ।

রুগ্ন, রুগ্নতা, রুগ্না – সবই ভুল। রুগ্ণ, রুগ্ণতা, রুগ্ণা – একমাত্র শুদ্ধ বানান। কারণ: “রুগ্ণ শব্দটির বানান মূর্ধন্য-ণ দাবি করে। 

বিদেশি শব্দের বানানে দীর্ঘ-ঈকার হয় না। শহিদ বিদেশি শব্দ। তাই শব্দটির বানানে ই-কার। লিখুন : শহিদ। তেমনি, শহিদ মিনার।

দুর্নীতি’, ‘দুর্নাম’ কেন দন্ত্য্য ন দিয়ে। কারণ, সমাসের আগের পদে ঋ, র, ষ এবং পরের পদে দন্ত্য-ন থাকলে ওই দন্ত্য-ন মূর্ধন্য-ণ হয় না। যেমন: ত্রিনয়ন (ত্রি+নয়ন), দুর্নীতি (র্দু+নীতি), দুর্নাম, দুনিরীক্ষা, ত্রিনেত্র, সর্বনাম (কিন্তু নির্ণয়), করনীতি, পুরাঙ্গনা, পরমান্ন (পরম+অন্ন) ইত্যাদি।

পরিবহণ

শব্দটির বানানে সুস্পষ্ট কোনো সূত্র নেই। সংস্কৃতে পরিবহণ বলে কোনো শব্দ নেই। আছে পরিবহ। তাই নির্ণায়ক সূত্র থাকার কথা নয়। শব্দটি বাংলায় পরিভাষা হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। জ্ঞানেন্দ্রমোহন ও চলন্তিকায় ‘পরিবহন’ গৃহীত, ‘পরিবহণ’ নয়। কোনোরূপ ভিত্তি ও যুক্তি ছাড়া ‘সংসদ’ ব্যবহারিক শব্দকোষ ‘পরিবহণ’ লিখেছে। বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান উভয় দলকে খুশি করার জন্য লিখেছে পরিবহন, পরিবহণ। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ফ্রেবুয়ারি মাসে প্রকাশিত বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘পরিবহণ’ শব্দকে প্রমিত করা হয়েছে। অতএব এখন থেকে ‘পরিবহণ’ লিখুন।

error: Content is protected !!