শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

একাদশ অধ্যায়

ষত্ববিধান

শব্দের বানানে ‘দন্ত্য-স’ ও ‘মূর্ধন্য-ষ’ বসানোর নিয়মকে ‘ষত্ববিধান’ বলে। খাঁটি বাংলা, দেশি, বিদেশি এবং তদ্ভব শব্দের বানানে ‘মূর্ধন্য-ষ’ ধ্বনির ব্যবহার নেই। যে সকল তৎসম শব্দের মূল বানানে ‘মূর্ধন্য-ষ’ রয়েছে সে সকল শব্দের বাংলা বানানে ‘মূর্ধন্য-ষ’ ব্যবহৃত হয়।

ষত্ববিধানের নিয়মগুলো নিচে উল্লেখ করা হল।

১. ‘ঋ’ কিংবা ‘ঋ-কার’ অর্থাৎ রেফ-এর পর সাধারণত ‘মূর্ধন্য-ষ’ বসে।

যেমন: ঋষভ, ঋষি, কৃষক, তৃষ্ণা, বৃষ্টি, কৃষি, বর্ষণ, বার্ষিক, বর্ষা, শীর্ষক, সংঘর্ষ, উৎকৃষ্ট, দৃষ্টি, কৃষ্টি, সৃষ্টি, হর্ষ, সপ্তর্ষি, সংঘর্ষ, শীর্ষক, মুমূর্ষু, মহর্ষি, মহাকর্ষ, বিকর্ষণ, বর্ষীয়াণ, বর্ষী, পার্ষদ, পর্ষদ।

ব্যতিক্রম: ‘কৃশ্’-ধাতু হতে জাত কৃশ, কৃশতা, কৃশকায়, কৃশাঙ্গ, কৃশাঙ্গী, কৃশানু, কৃশোদর এবং পরামর্শ, প¦ার্শ, ¯পর্শ, অর্শ, আদর্শ, দর্শন, দর্শী, পারদর্শিতা, পার্শ্ব, পার্শ্বিক, বহুদর্শী, বর্শা, সন্দর্শন শব্দসমূহে মূর্ধন্য-ষ বসে না।

২. তৎসম শব্দে ‘অ  আ  অ-কার’ ব্যতীত অন্য স্বরবর্ণ বা স্বরধ্বনির পরে স্থিত ‘দন্ত্য-স’ ‘মূর্ধণ্য-ষ’ হয়। যথা:

(ক) ‘ই-কার’ ও ‘ঈ-কার: ভবিষ্যৎ, বিষয়, বিষ, বিবিমিষা, মহিষ, বিষম, চিকীর্ষা, চিকির্ষু, জিগীষা, জিগীষু, জিজীবিষা, জিজীবিষু, ভীষণ, বিভীষণ, ঈষৎ।

(খ) ঊ-কার এবং ঊ-কার: উষ্ণ, উষ্ট্র, উষা, সুষমা, চক্ষুষ্মান, ভূষণ, দূষণ, ভূষণ, ঊষর, মুমূর্ষু, শুশ্রুষা, শুশ্রুষু ইত্যাদি।

(গ) ঋ-কার: বৃষ, তৃষ্ণা, বৃষভ, কৃষক, কৃষ্টি, দৃষ্টি, সৃষ্টি।

(ঙ) এ-কার, ঐ-কার: দ্বেষ, শেষ, বৈষ্ণব।

(চ) ও-কার, ঔ-কার: কোষ, ঘোষ, রোষ, ঘোষণা, শোষক, ঘোষক, পৌষ, ঔষধ।

৩. তৎসম শব্দে ‘ক’, ‘র’ এর পরে সাধারণত ‘দন্ত্য-স’ বসে না,  মূর্ধন্য-ষ’ বসে। যথা: ক-এর পর: চক্ষু(ক্ষ=ক+ষ), চক্ষুষ্মান, রুক্ষ, ভিক্ষুক, ভিক্ষা;

র-এর পর: মুমূর্ষু, চিকীর্ষা।

৪. তৎসম শব্দে ট-বর্গের অঘোষ ধ্বনি তথা ‘ট  ঠ’ এর পূর্বে শিস্ ধ্বনিরূপে ‘মূর্ধন্য-ষ’ বসে। উদাহরণ: ইষ্ট, তুষ্ট, নষ্ট, পিষ্ট, রুষ্ট, হৃষ্ট, মিষ্টি, কষ্ট, বৃষ্টি, সৃষ্টি, নষ্ট, দুষ্ট, নির্দিষ্ট, অনিষ্ট, বিশিষ্ট, দৃষ্টি, রাষ্ট্র, কুষ্ঠ, শ্রেষ্ঠ, বলিষ্ঠ, ঘনিষ্ঠ, কনিষ্ঠ, ওষ্ঠ, কাষ্ঠ, জ্যেষ্ঠ, গরিষ্ঠ, পৃষ্ঠ, ষষ্ঠ, পাপিষ্ঠ, বলিষ্ঠ, ভূমিষ্ঠ, গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠিত, অনুষ্ঠান, বিষ্ঠা, নিষ্ঠা।

৪. ই-কারান্ত এবং উ-কারান্ত উপসর্গের পর সাধারণত ‘স’-এর বদলে ‘ষ’ হয়। বাংলা ভাষায় দেশি-বিদেশি উপসর্গসমহের মধ্যে ই-কারান্ত- ‘অধি, অভি, প্রতি, পরি’ এবং উ-কারান্ত- ‘অনু, সু’ এর পরে ‘ষ’ বসে।

উদাহরণ: অভি+সেক> অভিষেক, অধি+স্থান> অধিষ্ঠান, প্রতি+স্থান> প্রতিষ্ঠান, প্রতি+স্থিত> প্রতিষ্ঠিত, সুপ্ত+সু> সুষুপ্ত, অনু+সঙ্গ> অনুষঙ্গ, প্রতি+সেধক> প্রতিষেধক, পরিষ্কার> পরি+কার।

ব্যতিক্রম: অনুসন্ধান, অভিসন্ধি, অনুস্বার, অভিসম্পাত, অভিসার, অভিসন্তাপ।

৫. সমাসবদ্ধ শব্দের প্রথম পদের শেষে ‘ ই  উ  ঋ’ বা তাদের ধ্বনি থাকলে পরবর্তী প্রথম ‘দন্ত্য-স’ পরিবর্তিত হয়ে ‘মূর্ধন্য-ষ’ হয়।

যথা: যুধিষ্ঠির, সুষমা, বিষম (বি+সম)। স্মর্তব্য, সংস্কৃত ‘সাৎ প্রত্যয়যুক্ত পদে ‘ষ’ হয় না, ‘স’ হয়।  যথা: অগ্নিসাৎ, ধূলিস্যাৎ, ভূমিস্যাৎ।

৬. সন্ধিতে বিসর্গযুক্ত ‘ই-কার’ কিংবা ‘উ-কার’ এর পর ‘ক  খ  প  ফ’ বর্ণগুলোর যে কোন একটি থাকলে বিসর্গের স্থানে ‘ষ’ হবে।

যথা: আবিঃ+কার= আবিষ্কার, নিঃ+ক্রমন= নিষ্ক্রমন, নিঃ+প্রান= নি®প্রাণ, চতুঃ+কোণ= চতুষ্কোণ, নিঃ+পাপ= নি®পাপ, বহিঃ+কৃত = বহিষ্কৃত, নিঃ +ক্রিয় = নিষ্ক্রিয়, পরিঃ+কার= পরিষ্কার, নিঃ+ফল= নি®ফল, নিঃ+পত্র= নি®পত্র, আয়ুঃ+ কাল= আয়ুষ্কাল, দুঃ+কর= দুষ্কর, চতুঃ+পদ = চতু®পদ।

‘অ’ কিংবা ‘আ-ধ্বনি’র পর বিসর্গ থাকলে ‘ষ’ হয় না।  যেমন: নমস্কার, পুরস্কার, আয়স্কান্ত।

৭.সন্ধিতে ‘নিঃ’ ধ্বনির পর ‘ক  খ  প  ফ’ থাকলে বিসর্গ-স্থলে ‘ষ’ হয়।

যেমন:  নিঃ+পাপ> নি®পাপ, নিঃ+প্রভ> নি®প্রভ,  নিঃ+ফল> নিষ্ফল, নিঃ+ কলঙ্ক> নিষ্কলঙ্ক। কিন্তু নিঃ ধ্বনির পর ‘শ স ষ’ থাকলে বিসর্গ (ঃ) বহাল থাকে।

যেমন: নিঃ+ শঙ্ক> নিঃশঙ্ক, নিঃ+ শব্দ> নিঃশব্দ,  নিঃ+ শর্ত> নিঃশর্ত, নিঃ+শেষ> নিঃশেষ তেমিন, নিঃসন্দেহে, নিঃস্ব, নিঃসঙ্গ।

৮. ‘ক  খ  প  ফ’ বর্ণের আগে (হ্রস্ব ই-কার+ বিসর্গ) কিংবা (হ্রস্ব উ-কার+ বিসর্গ) থাকলে সন্ধির ফলে বিসর্গের স্থানে সর্বদা ‘মূর্ধণ্য-ষ’ হয়।

৯. বিশেষ্যবাচক শব্দের পরে ‘তালব্য-শ’ থাকলে এবং ‘ত’ প্রত্যয় যোগে উক্ত বিশেষ্যবাচক শব্দ বিশেষণে পরিণত হলে ‘তালব্য-শ’ পরিবর্তিত হয়ে ‘মূর্ধন্য-ষ’ হয়। যেমন: আদেশ হতে আদিষ্ট, আবেশ হতে আবিষ্ট, নির্দেশ হতে নির্দিষ্ট, প্রবেশ হতে প্রবিষ্ট, বিনাশ হতে বিনষ্ট, ক্লেশ হতে ক্লিষ্ট, নিবেশ হতে নিবিষ্ট।

১০. আরবি, ফারসি, ইংরেজি, হিন্দি, ফরাসি প্রভৃতি বিদেশি শব্দে ‘মূর্ধন্য-ষ’ ব্যবহার হয় না। ‘দন্ত্য-স’ কিংবা ‘তালব্য-শ’ বসে।

যথা: আসমান, শয়তান, সফর, চশমা, আসর, সিলেবাস, মেশিন, ম্যাজিস্ট্রেট, পোশাক, ফটোস্ট্যাট, রেজিস্টার, খ্রিস্টাব্দ, স্টুডিও, নকশা, মজলিস, সনদ, সিলেবাস, স্কুল, স্টিমার, স্টুডিও, খানসামা, রসিদ ইত্যাদি।

১১.‘পরি’ উপসর্গের পর কৃ-ধাতুর সঙ্গে ‘মূর্ধন্য-ষ’ বসে।

যেমন: পরিষ্কার।

‘ভূমি’, শব্দের সাথে স্থা-ধাতু যুক্ত হলে ‘দন্ত-স’ ‘মূর্ধণ্য-ষ’ ধারণ করে।

যথা: ভূমিষ্ঠ।

‘যুধি’ শব্দের পর ‘স্থির’ শব্দ যুক্ত হলে ‘দন্ত্য-স’ ‘মূর্ধণ্য-ষ’ হয়।

উদাহরণ: যুধিষ্ঠির।

১২.সর্বদা মূর্ধন্য-ষ ব্যবহৃত হয় এমন কয়েকটি শব্দ: অভিলাষ, আভাষ, আষাঢ, ষড়যন্ত্র, ষোড়শ, ষাট, ষাঁড়, বিষয়, ভাষণ, ভাষা, ভূষা, মহিষ, মানুষ, মেষ, শোষণ, শ্লেষ, বিষ, বিশেষ্য, বিশেষণ, দোষ, দূষণ, পুরুষ, পাষণ্ড, পাষাণ, বা®প, পু®প, বিশেষ, তুষার, ঘুষ, ঘোষণা, গ্রীষ্ম, ঔষধি,ঈষৎ, ঈর্ষা, ঊষা, ঔষধ, কোষ, কর্ষণ, ঘর্ষণ, তুষার, পুরুষ, পরুষ, প্রত্যুষ, পাষাণ, পোষ, ভূষণ, ভাষা, ভীষণ, মহিষ, বৃষ, বিষাণ, মুষিক, মেষ, শোষণ, ষোড়শ, ষণ্ড, হর্ষ, শেষ, হ্রেষা, গণ্ডুষ, ষন্ত, হর্ষ।

error: Content is protected !!