শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

দ্বাদশ অধ্যায়

একাধিক বানান শুদ্ধ হলে যেটি লিখবেন

যে শব্দের একাধিক শুদ্ধ বানান ব্যাকরণসম্মত সে বানানগুলোকে ‘বিকল্প বানান সিদ্ধ’ শব্দ বলা হয়। বাংলা বানানের সমস্যা ও জটিলতা নিরসনে ‘বিকল্প বানান সিদ্ধ’ শব্দ যথাসম্ভব দ্রুত সময়ের মধ্যে কমিয়ে আনা আবশ্যক। বিকল্প বানানের সিদ্ধতা তুলে দিয়ে বাংলা বানান রীতিতে সমতা প্রতিষ্ঠা করা যায়। অন্যথায় বাংলা ভাষায় স্বেচ্ছাচারিতা আরও বেড়ে যাবে।

সাধারণত ‘ই-কার’, ‘ঈ-কার’, ‘উ-কার’ এবং ‘ঊ-কার’ যুক্ত শব্দে বিকল্প বানানের সংখ্যা বেশি দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ-সুনীতিকুমারের মতো খ্যাতিমান পণ্ডিতগণের নিজস্ব পছন্দ ছাড়াও তাঁদের অনুসারীবর্গও এজন্য কম দায়ী নন। উদাহরণস্বরূপ, পাটীগণিত ও পাটিগণিত দুটো বানানকে ‘বিকল্প বানান সিদ্ধ’ শব্দ হিসেবে শুদ্ধ গণ্য। কিন্তু প্রমিত বানান রীতি ও বাংলা বানানের সমতা বিধানের স্বার্থে বিকল্প বানান সর্বদা পরিত্যাজ্য। এক্ষেত্রে প্রমিত বানানে অবশ্যই ‘হ্রস্ব ই-কার’ ব্যবহার করা হবে, ‘দীর্ঘ ঈ-কার’ নয়।  তেমনি নিম্নের শব্দগুলোতে হ্রস্ব ই-কার ও দীর্ঘ ঈ-কার দুটোই সিদ্ধ হলেও সমতা বিধানের স্বার্থে শুধু হ্রস্ব ই-কার ব্যবহার করা হবে।

যেমন : অঙ্গুরি, অন্তরিক্ষ, লহরি, সরণি, রজনি, ভঙ্গি, বেণি, বিজলি, প্রতিকার, পুত্তলি, তরি, গ্রহণি, কিংবদন্তি, কুটির, ওষধি, অলি, শেফালি, মিতালি, মাহি, বেদি, ভ্রুকুটি, বাল্মীকি, প্রতিহার, পদবি, পেশি, দ¤পতি, চিৎকার, গণ্ডি, কুন্তি, কাকলি, করোটি, আবলি, অবনি, অটবি, সুরভি, শ্রেণি, রুচি, যুবতি, মঞ্জরি, ব্রততি, বিপণি, প্রণালি, পল্লি, নন্দি, ধমনি, তরণি, কুহেলি, কিংকণি, কলসি, অরণি ইত্যাদি শব্দে হ্রস্ব ই-কার এর স্থলে দীর্ঘ ঈ-কার বসালেও শব্দটি শুদ্ধ বলে গণ্য হবে। স্মর্তব্য, আধুনিক-প্রমিত বানানে সমতার স্বার্থে বিকল্পে দীর্ঘ ঈ-কার/ দীর্ঘ-ঊ-কার পরিত্যাজ্য।

২. কোনও শব্দে ‘হ্রস্ব উ-কার কিংবা দীর্ঘ ঊ-কার’ দুটো শুদ্ধ হিসেবে প্রচলিত থাকলে আধুনিক-প্রমিত বানানে কেবল ‘হ্রস্ব উ-কার’ হবে।

যেমন : উর্ণনাভ, উর্ণা, উর্বর, উযসী, উষা প্রভৃতি শব্দে ‘হ্রস্ব উ-কার’ এর স্থলে ‘দীর্ঘ-ঊ’ কার বসালেও অশুদ্ধ ধরা হয় না। কিন্তু আধুনিক-প্রমিত বানানে তা করা বিধেয় হবে না। আকুতি, জম্বুক, প্রত্যুষ, স্বয়ম্ভু, হনুমান, ভ্রু, কস্তুরী, পুরবী, শম্বুক ইত্যাদি শব্দে হ্রস্ব উ-কারের স্থলে দীর্ঘ ঊ-কার বসান প্রচলিত অর্থে শুদ্ধ হলেও প্রমিত বানানে সমতা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে তা বর্জনীয়।

৩. বিকল্প বানানের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সমস্যা ‘দন্ত্য-ন এবং মূর্ধন্য-ণ’। কোনও শব্দের বানানে ‘দন্ত্য-ন  কিংবা মূর্ধন্য-ণ’ দুটোর ব্যবহার শুদ্ধ প্রচলিত থাকলেও বানানের সমতা রক্ষার স্বার্থে প্রমিত বানানে সর্বদা ‘দন্ত্য-ন’ ব্যবহার করা হবে।

যেমন :  অঙ্গন, পুজারিনী, রানী, শিহরন ইত্যাদি শব্দে ‘দন্ত্য-ন’ এর স্থলে ‘মূর্ধন্য-ণ’ বসানো শুদ্ধ বলে বিবেচিত হলেও বানানে সমতা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সর্বদা ‘দন্ত্য-ন’ ব্যবহার করা হবে।

৪. ‘দন্ত্য-স এবং মূর্ধন্য-ষ’ এর ব্যবহার সংক্রান্ত বিকল্প বানানসিদ্ধ শব্দের জটিলতা নিরসনে আধুনিক-প্রমিত বানানে সর্বদা ‘মূর্ধন্য-ষ’ পরিত্যাগ করে ‘দন্ত্য-স’ লেখা হবে। 

যেমন: বা¯প শব্দটি অনেকে বা®প হিসেবে লিখে থাকেন। প্রচলিত অর্থে  দুটো ই শুদ্ধ, কিন্তু আধুনিক-প্রমিত রীতিতে ‘বা¯প’ লেখা হবে।

৫. কোনও শব্দের বানানে ‘তালব্য-শ এবং দন্ত্য-স’ উভয়ের ব্যবহার শুদ্ধ গণ্য হলে প্রমিত বানান রীতি অনুযায়ী এরূপ শব্দে ‘দন্ত্য-স না’ বসিয়ে ‘তালব্য-শ’ বসান হবে। কিশলয়, বিকশিত, কৌশল্য, বিকাশ, শরণি শব্দগুলোতে ‘তালব্য-শ’ এর স্থানে ‘দন্ত্য-স’ প্রচলিত রীতিতে অশুদ্ধ না হলেও সর্বজনীন বানানের স্বার্থে ‘তালব্য-শ’ ব্যবহার করা হবে।

৬. বাংলা বানানে কোনও শব্দের বানানে ‘তালব্য-শ এবং মূর্ধন্য-ষ’  দুটোই শুদ্ধ বলে প্রচলিত থাকলে প্রমিত বানান রীতি ও বাংলা বানানের জটিলতা নিরসনার্থে সর্বদা ‘তালব্য-শ’ ব্যবহার করা হবে, ‘মূর্ধন্য-ষ’ নয়।

যেমন : পরিবেশ, কৌশিক, উশীর প্রভৃতি শব্দে যদিও ‘তালব্য-শ’ এর স্থলে ‘মূর্ধন্য-ষ’ ব্যবহার প্রচলিত অর্থে শুদ্ধ বলে গণ্য; কিন্তু বানানের জটিলতা এড়ানোর স্বার্থে ‘তালব্য-শ’ ব্যবহার করা হবে, সচেতন অবস্থায় কোনভাবে ‘মূর্ধন্য-ষ’ নয়।

৭. কোনও শব্দের বানানে একাধিক যুুক্তব্যঞ্জনের ব্যবহার শুদ্ধ গণ্য হলে বিকল্প বানানসমূহের মধ্যে যেটি অপেক্ষকৃত সহজ কিংবা অধিক প্রচলিত সেটিই ব্যবহার করা হবে।

যেমন: পাশ্চাত্য এবং পাশ্চাত্ত্য  দুটো  বানানই শুদ্ধ, কিন্তু সহজ ও প্রচলন  বিবেচনায় প্রথমটি লেখা হবে, দ্বিতীয়টি নয়। 

৮. ‘বিকল্প বানানসিদ্ধ’ কয়েকটি শব্দের উদাহরণ বিকল্প বানানসহ নিচে দেওয়া হলো:

আবির- আবীর, ঈষিকা- ঈষীকা, উপলক্ষ- উপলক্ষ্য, কৃমি-ক্রিমি, নিস্রাব- নিঃস্রাব, পঞ্জি-পঞ্জী, পরিবেশন- পরিবেষণ, পাশ্চাত্য- পাশ্চাত্ত্য, মনস্থ- মনঃস্থ, মহার্ঘ-মহার্ঘ্য, মহৌষধি-মহৌষধী, মাঢ়ি-মাঢ়ী, মারি-মারী, কালকোশ- কালকোষ, রাখি-রাখী, খুর-ক্ষুর, গহিন- গহীন, গার্হস্থ-গার্হস্থ্য, গুলি-গুলী, চারিত্র-চারিত্র্য, ঝিলি¬-ঝিল¬ী, দারিদ্র-দারিদ্র্য, দুর্লঙ্ঘ-দুর্লঙ্ঘ্য, নিশ্বাস-নিঃশ্বাস, বৈচিত্র-বৈচিত্র্য, বৈদগ্ধ-বৈদগ্ধ্য, বৈশিষ্ট-বৈশিষ্ট্য, সৌহার্দ-  সৌহার্দ্য, শিহরন- শিহরণ, শিপ্রা-সিপ্রা, সতীর্থ-সতীর্থ্য, সরিসা-সরিষা, হরিত-হরিৎ, হার্দ-হার্দ্য প্রভৃতি।

 

error: Content is protected !!