শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

অধ্যায়

যতিচিহ্নের ব্যবহার

বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত বিরাম বা যতি চিহ্নসমহলো : ১. দাঁড়ি (।), ২. জোড় দাঁড়ি (॥), ৩. কমা (,), ৪. সেমিকোলন (;). ৫. হাইফেন (-), ৬. ড্যাশ (Ñ), ৭. কোলন ড্যশ (ঃ-), ৮. প্রশ্নবোধক চিহ্ন (?), ৯. বিস্ময়চিহ্ন (!), ১০. ঊর্ধ্বকমা ( ’), ১১. বিকল্পচিহ্ন (/), ১২. বিন্দু (.), ১৩. ত্রিবিন্দু (…), ১৪. উদ্ধৃতিচিহ্ন (‘ ’) ১৫. জোড়উদ্ধৃতিচিহ্ন (“ ”), ১৬. প্রথমবন্ধনী ( ), ১৭. তৃতীয়বন্ধনী ( [ ])।

দাঁড়ি বা পূর্ণচ্ছেদ (।)

প্রশ্নসূচক ও বিস্ময়সূচক বাক্য ব্যতিরকে অন্যান্য বাক্যের সমাপ্তিসূচক চিহ্নটি দাঁড়ি বা পূর্ণচ্ছেদ। বিবৃতিমূলক, নির্দেশাত্বক ও অনুজ্ঞাসূচক বাক্য দাঁড়ি দিয়ে শেষ করা হয়। ছোট বাক্য কেবল দাঁড়ি দিয়ে সমাপ্ত করা যায়। তবে দীর্ঘ বাক্য, যেখানে পরিপূর্ণ উপলব্ধির জন্য অন্য কোনও চিহ্নের প্রয়োজন সেখানে উপযুক্ত স্থানে দাঁড়ি ছাড়াও অন্যান্য বিরামচিহ্ন ব্যবহার করা আবশ্যক। বাংলা বাক্যে পরোক্ষ প্রশ্ন কিংবা পরোক্ষ বিস্ময় প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রশ্নসূচক কিংবা বিস্ময়সূচক চিহ্নের পরিবর্তে দাঁড়ি ব্যবহার করা হয়। 

 

যেমন: তিনি কী করেছেন না করেছেন তা আমার জানা নেই। ব্যাপারটা কী তা বোঝা যাচ্ছে না। দাঁড়ির প্রাচুর্য বাক্যকে দীর্ঘ হতে দেয় না, নাতিদীর্ঘ বাক্য সর্বোত্তম বাক্য। তাই লেখায় যত বেশি দাঁড়ি ব্যবহার করা যায়, বাক্য তত চমৎকার হয়। তবে তা যেন বাক্যের আদর্শ, অর্থ এবং সৌন্দর্যকে ব্যাহত না করে সে দিকে বিশেষভাবে লক্ষ রাখা প্রয়োজন।

কমা

বাক্যে কমা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অবহেলিত। স্বল্পকালের বিরতিপ্রকাশক এ চিহ্নটির ব্যবহার বাক্যকে সুন্দর এবং অর্থকে সহজবোধ্য করে তুলে। বাক্যের অন্তঃস্থ বিরামচিহ্ন হিসেবে কমার গুরুত্ব অন্য যে কোন বিরামচিহ্নের চেয়ে অধিক। বাক্যে কমা ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো খেয়াল রাখা উচিত।

 

১. একটি বাক্যের একাধিক অংশের মধ্যে সামান্য সময়ের জন্য থামার দরকার হলে কমা ব্যবহার করা হয়। একাধিক বক্তব্য প্রকাশ করা হলে প্রতিটি বক্তব্যের সু¯পষ্ট প্রকাশের জন্য বাক্য থেমে থেমে পড়া প্রয়োজন হয়। কমা থামার স্থান নির্দেশ করে।  যেমন: সফিক, কামাল এবং ছাত্তার শুধু নয়, সঙ্গে জাফরও ছিল। তিনি থামলেন, পুরোপুরি থামা নয়, গতি কমানো, বললেন, কল্পনাকে যারা বাস্তবতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়, তারাই নাস্তিক।

 

২. বাক্যের অভ্যন্তরে উদ্ধৃতির মধ্যে সংলাপ থাকলে প্রথম উদ্ধৃতি চিহ্নের পূর্বে কমা বসাতে হয়।  যেমন : “হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন, ‘দেখুন, ধর্মের আড়ালে মানুষ কীভাবে মানুষ মারছে।” বাক্যে পরোক্ষ উক্তির পর প্রত্যক্ষ উক্তি থাকলে পরোক্ষ উক্তির পর কমা বসাতে হয়।  যেমন: আসামি বললেন, “আমি নির্দোষ, আমি খালাস প্রার্থনা করি।”

 

৩. নইলে, নচেৎ, না হলে, তা হলে, নতুবা, নয়তো, হয়তো ইত্যাদি ‘অন্যথাজ্ঞাপক’ অব্যয় ব্যবহৃত হলে বাক্যে অর্থের ¯পষ্টতার জন্য অব্যয়ের পূর্ববর্তী শব্দের শেষে কমা বসাতে হয়।  যেমন : খুব সাবধানে ধরো, নইলে ব্যথা পাবে। করো, নতুবা মরো।

 

৪. বাক্যে দুরান্বয় ব্যবহার করা হলে দুরান্বয়ঘটিত বাক্যাংশের পূর্বে ও  শেষে কমা দিতে হয়। ব্যাকরণগত সংযোগহীন অংশকে (প্যারেনথিসিস) পৃথক করার জন্য কমা বসাতে হয়। যেমন : রহিম যেমন ফর্সা তেমন বলিষ্ঠ, দেখলে মায়া হয়, ইচ্ছে করে কাছে ডাকতে। (২) রাজ দাঁড়িয়ে, সামনে মানুষ আর মানুষ, আরও আসছে, থামার কোনও লক্ষণ নেই।

 

৫. বড় কোনও অঙ্কের পঠন ও অনুধাবনের সুবিধার জন্য কমা বসানো হয়। সাধারণত সহস্র, লক্ষ, কোটি প্রভৃতির পরে কমা বসে। যথা : ৮৩,৬৫০ (তিরাশি হাজার ছয়শত পঞ্চাশ)।

 

৬. তারিখ লেখার সময় কমা বসান একটি বহুল প্রচলিত রীতি। উদাহরণ: ২০ মে, ২০০০ খ্রিস্টাব্দ, বৃহ¯পতিবার মীম বান্দরবান জেলায় জন্মগ্রহণ করে।

 

৭. বাক্যে একাধিক বিশেষ্য কিংবা বিশেষণ পদের বিবৃতি প্রকাশের ক্ষেত্রে কমা বসাতে হয়। যথা : জনি বুদ্ধিমান, সাহসী এবং জ্ঞানী। মীম, সানি, হারুন এবং রব কক্সবাজার গিয়েছে।

 

৮. বাক্যের বা বাক্যাংশের প্রারম্ভে ‘অবশ্য, পক্ষান্তরে, নতুবা’ ইত্যাদি সাপেক্ষবোধক বা শর্তজ্ঞাপক শব্দ থাকলে সাপেক্ষবোধক শব্দের পরে কমা বসে। যেমন : যা করার ভেবে চিন্তে করো নতুবা, আমার কিছুই করার থাকবে না।

 

৯. সম্বোধন পদের পরে সাধারণত কমা বসে। উদাহরণ : রব, এদিকে এসো।

 

সেমিকোলন (;)

কমা  ও সেমিকোলন ব্যবহারের উদ্দেশ্য প্রায় অভিন্ন। সেমিকোলনের স্থানে কমার চেয়ে বেশি কিন্তু দাঁড়ির চেয়ে কম থামতে হয়।  বাক্যের ভেতরে শুধু থামার জন্য কমা-সেমিকোলন ব্যবহার করা হয় না। অর্থ প্রকাশে কমা ও  সেমিকোলন  গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

১. পৃথক ও স্বাধীন দুটি বাক্যকে সংযোজক অব্যয় দিয়ে যুক্ত করা হয়। সেমিকোলন সংযোজক অব্যয়ের পরিবর্তে বাক্যদ্বয়কে সংযোজন করার জন্য ব্যবহৃত হয়। বাক্যে একাধিক বক্তব্য থাকলে এবং বক্তব্যসমূহ শুধু কমা দিয়ে ¯পষ্ট করা সম্ভব না হলে কিংবা কমার বহুল উপস্থিতি ‘কমা-বিভ্রাট’ সৃষ্টি করলে সেমিকোলন বসাতে হয়। যেমন : বললাম, থামুন, তিনি থামলেন না, থামতে চান না; আবার ডাকলাম, তিনি পেছনে না তাকিয়ে হনহন করে চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

 

২. কোনও বাক্যের বাক্যাংশগুলো ‘যদিও, নয়তো, নতুবা, কিংবা, তা ছাড়া, পক্ষান্তরে, উপরন্তু’ ইত্যাদি সংযোজক অব্যয় দিয়ে শুরু হলে মধ্যখানে সেমিকোলন বসে। যেমন : জাফর মোটেও অভদ্র নয়; বরং তুমিই তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছ।

 

৪. নাম, পদ, গুণ ইত্যাদির শ্রেণি বিন্যাসে সমপ্রকৃতির বিষয়গুলোকে সেমিকোলন দিয়ে একত্রে রাখা হয়। যেমন : আম, জাম, লিচ; গরু, ছাগল, ভেড়া; হাস, মুরগি, কোয়েল; বই, খাতা, কাগজ; সবকিছু কেনা হয়েছে।

 

৫. অভিধানে বিভিন্ন সমার্থক শব্দকে কিঞ্চিৎ ভিন্নার্থক শব্দ হতে কিংবা ভিন্নার্থের শব্দগুলোকে পর¯পর হতে পৃথক করার জন্য সেমিকোলন ব্যবহার করা হয়।

 

৬. বাক্যের এক অংশের বক্তব্য অ¯পষ্ট বা অসম্পূর্ণ থাকলে সেমিকোলন দিয়ে পরবর্তী বাক্যাংশে তা সম্পূর্ণ বা ¯পষ্ট করা হয়। যেমন : আমি শেষ; একমাত্র বাড়িটা ছিল, তাও নিলাম হয়ে গেল, আমি এখন কী করি।

 

২. আইনের কোনও ধারায় এক বা একাধিক উপধারা কিংবা শর্ত থাকলে তা পৃথককরণের জন্য সেমিকোলন ব্যবহার করা হয়।

 

৩. কোনও তালিকায় বিদ্যমান একাধিক ব্যক্তির নাম ও পদের তালিকা অনুধাবনের সুবিধার্থে সেমিকোলন ব্যবহার করা হয়। যথা: গঠিত কমিটিতে সভাপতি, মোহাম্মদ আজমল; সহ-সভাপতি, নুর উদ্দীন; সাধারণ স¤পাদক, হামদে আলী;..

হাইফেন

বাংলা ভাষায় বহুল ব্যবহৃত যতি চিহ্নের মধ্যে হাইফেন অন্যতম। বাক্যের সঙ্গে নয়, শব্দের সঙ্গে হাইফেনের স¤পর্ক। এটি দেখতে ড্যাশের মত হলেও দৈর্ঘ্যে ড্যাশের চেয়ে ছোট। এর ব্যবহার বিরামচিহ্নের ন্যয় নয়। শব্দের বর্ণসমষ্টির সংযোগ প্রকাশের জন্য হাইফেন ব্যবহার করা হয়। বিরমাচিহ্ন বলা হলেও হাইফেনে কোনও বিরাম দিতে হয় না।

 

১. বাক্যস্থিত সমাসবদ্ধ পদে হাইফেনের বহুল ব্যবহার লক্ষ করা যায়। হাইফেন দিয়ে সমাসবদ্ধ পদ চিহ্নিত করা হয়। যেমন : আম-জাম-কলা সবগুলো লাল-পাত্রে রাখা হয়েছে।

 

২. অনুগামী ও অনুকার শব্দে হাইফেন বসাতে হয়। যেমন : মাল-পত্র গাড়িতে তোল, ডর-ভয় বলতে তোমার কিছু নেই।

৩. দুই বা দুইয়ের বেশি পদের সমাসে সাধারণত হাইফেন বসে। যেমন : বাপে-পুতে লড়াই, কে কারে ডরায়। আমি-তুমি-সে। টাকা-পয়সা-ধন- দৌলত, যা আছে নে। উল্লেখ্য দ্বন্দ্ব সমাস ছাড়াও অন্যান্য সমাসবদ্ধ পদে হাইফেন বসানো যায়। যেমন : আল্লাহ-সৃষ্ট।

 

৪. দুইয়ের বেশি শব্দ মিলিত হয়ে একটি শব্দ গঠন করলে হাইফেন বসানো হয়। শব্দের দ্বিত্ব ঘটলে হাইফেন ব্যবহার করা হয়। যেমন: ঝগড়া-রত- বুড়ো-লোক, কেঁদে-কেঁদে দেখায় শোক।

 

৬. যেখানে সন্ধি সম্ভব নয় কিংবা সন্ধি করা উচিত নয় সেখানে হাইফেন বসে। যেমন : মহা-প্রলয়ে যেন শেষ হয়ে যাবে ধরা।

 

৭. যৌগিক ক্রিয়া বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হলে শব্দে হাইফেন বসে।  যেমন : দম-বন্ধ-হয়ে আসা রোগী।

 

৮. ক্রিয়া বিশেষণে শব্দের দ্বিত্ব হলে হাইফেন বসে। যেমন : যেতে-যেতে পথে, পূর্ণিমা রাতে-..।

 

৯. বহুবর্ণযুক্ত দুটি শব্দের মধ্যে সমাস হলে হাইফেন ব্যবহার করা হয়।  যেমন : পু¯পভারনত-বৃক্ষ, ক্ষত্রিয়সুলভ-আচরণ।

 

১০. দপ্তর, অধিদপ্তর, প্রতিষ্ঠান ও পদের মধ্যে হাইফেন বসে। যেমন : প্রধান-মন্ত্রী, কৃষি-মন্ত্রী, শিক্ষা-সচিব, উপ-সচিব, যুগ্ম-সচিব ইত্যাদি।

 

১১. সংখ্যা প্রকাশে অনেক সময় হাইফেন ব্যবহৃত হয়। জার্মানি ৮-০ গোলে সৌদি আরবকে হারিয়ে দিয়েছে।

 

১২. স্থান, অনুষ্ঠান এবং দিক নির্দেশের ক্ষেত্রে শব্দে হাইফেন বসে। যেমন : সিমলা-চুক্তি, কাশ্মীর-সমস্যা, পূর্ব-পশ্চিম ইত্যাদি।

 

কোলন

বাংলায় কোলন (:) চিহ্নের আগমন পঞ্চাশ-ষাট বছরের বেশি নয়। তাই অনেকের কাছে চিহ্নটির ব্যবহার পরিষ্কার নয়। তবে ইংরেজিতে চিহ্নটির ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। আগে যে সকল স্থান ও ক্ষেত্রে ড্যাশ (-) বা কোলন ড্যাশ (:Ñ) চিহ্ন দেওয়া হতো, বর্তমানে সে স্থান বা ক্ষেত্রসমূহে কোলন (:) ব্যবহার করা হয়। সুতরাং কোলন চিহ্নটি ড্যাশ বা কোলন ড্যাশের বিকল্প চিহ্নমাত্র। কেউ ইচ্ছে করলে কোলন চিহ্নের পরিবর্তে ড্যাশ বা কোলন দিতে পারেন।

 

কোলনের দায়িত্ব: বাক্যের অর্ন্তগত কোনও অংশকে বিশদ করাই কোলনের দায়িত্ব। বাক্যে কোলনের পূর্ববর্তী যে সকল বিশেষ্য, সর্বনাম বা বিশেষণপদ সরবরাহ করার কথা বলা হয়েছে, কোলনের পরবর্তী অংশে সেগুলো উপস্থাপন করা হয়। যেমন:- সার্ক সম্মেলনে যে সাতটি রাষ্ট্র যোগ দিয়েছে, সেগুলো হলো : শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপাল, মালদ্বীপ ভারত, ভুটান ও  বাংলাদেশ।

 

১. বাক্যেও কোনও অংশে বক্তা উদাহরণস্বরূপ ব্যক্তি বা বস্তু ইত্যাদির কথা ব্যক্ত করতে চাইলে সে ব্যক্তি বা বস্তুর নাম বিধৃত করার সুবিধার্থে কোলন ব্যবহার করা হয়। যেমন : বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে: আহমদ ছফা, ফররুখ আহমদ, আহমদ মুসা এবং আহমেদ হুমায়ুন, আহমদ কামাল, আহমদ শরীফ, আহমদ ইকবাল, আহমদ রেজা প্রমূখ আহমদ গোষ্ঠীর বুদ্ধিজীবী নামে পরিচিত।

 

২. উদ্ধৃতির আগে কোলন চিহ্নের ব্যবহার লক্ষণীয়।

যেমন : সিরাজ বললেন: মূর্খ মানুষ পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট।

 

৩. সময় প্রকাশে কোলন ব্যবহার করা হয়।

যেমন : ১০:০৬ মিনিটের সময় বজ্রপাত ঘটে। তাপাঙ্ক শূন্যের নিচে নেমে গেলে তা আমরা ড্যাশ দিয়ে প্রকাশ করি।

 

অনেকে কোলন (:) চিহ্নকে বিসর্গ (ঃ) অক্ষরের সঙ্গে অভিন্ন মনে করেন। এটি ঠিক নয়। বিসর্গ একটি অক্ষর কিন্তু কোলন একটি চিহ্ন।

ড্যশ (-)

১. বাক্যে বিধৃত কোনো বিবৃতি সম্পূর্ণ করতে কিংবা বিশদ করতে ড্যাশচিহ্নের ব্যবহার করা হয়। ড্যাশ এবং হাইফেন একই রকম হলেও ড্যাশ হাইফেনের দ্বিগুণ লম্বা। সাধারণত বাক্যে সংশ্লিষ্ট উদাহরণ বিস্তারিতভাবে উপস্থাপনের জন্য ড্যাশ ব্যবহার করা হয়।  যেমন: কাল তিন প্রকার, যথা— বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ।

২. প্যারেনথেসিসে কমা বা বন্ধনীর পরিবর্তে ড্যাশ ব্যবহৃত হয়। যেমন: অফিসে— না, ক্লাবে যাবার পূর্বে দেখলাম— লোকটি মরে আছে।

৩. বাক্য অসম্পূর্ণ রাখলে ড্যাশ ব্যবহার করতে হয়। যেমন: মোদের গরব, মোদের আশা— . . .।

৪. ড্যাশ দিয়ে হাইফেন-এর মতো একটি শব্দ বা পদকে দ্বিখণ্ডিত করে কিংবা বিভক্তিকে পৃথক দেখানো হয় না। এটি বাক্যের অর্থ ও পরিবেশনা নির্দেশ করে।  যেমন: কামাল—এর নয়, কামাল-এর। 

৫.  লেখার সুবিধার্থে  ড্যাশ-এর পূর্বে ফাঁক রাখা হবে না। ফাঁক রাখলে কম্পিউটারে লেখার সময় পঙৃৃক্তির শেষে স্বয়ক্রিয়ভাবে ড্যাশ ও পদ আলাদা হয়ে দুটি ভিন্ন পঙ্‌ক্তিতে চলে যায়।  তাই ড্যাশকে, পূর্বের শব্দের সঙ্গে সেঁটে বসানো সমীচীন। কিন্তু অব্যবহিত পরের শব্দের সঙ্গে ফাঁক রেখে বসবে। নইলে হাইফেন-এর নির্দেশনার মতো ড্যাশও সন্নিহিত দুটি শব্দ বা পদকে একীভূত নির্দেশক হয়ে যাবে।  যেমন— আম, জাম, কলা, লিচু। সেদিন দেখলাম— তুমি জানি কোথায় যাচ্ছ।

 ঊর্ধ্বকমা

ঊর্ধ্বকমার ব্যবহার ইদানীং নেই বললেই চলে। অসমাপিকা ক্রিয়ায় ঊর্ধ্বকমা দেওয়ার নজির থাকলেও বর্তমানে তা অনাব্যশক ও বাহুল্য বলে বিবেচিত। শতাব্দকে অঙ্কে প্রকাশের সময় সংক্ষেপণ চিহ্ন হিসেবে ঊর্ধ্বকমা ব্যবহার করা হয়। যেমন : ২১ ফ্রেব্রুয়ারি ‘৫২ খ্রিস্টাব্দ প্রভৃতি।

বিস্ময়চিহ্ন (!)

বিস্ময়সূচক বাক্যের শেষে ব্যবহার করা হয়। তাছাড়াকোনওবাক্যের গভীর আবেদন, অবিশ্বাস, জোরালো অনুভূতি, সাংঘাতিক কষ্ট, আবেগ, অনুভূতি প্রভৃতি প্রকাশের জন্য বিস্ময়চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। বিস্ময়চিহ্ন শুধু বাক্যের সমাপ্তি বুঝায় না, বরং বাক্যের উচ্চারণেও নির্দেশনা দেয়। যেমন: হায় আল্লাহ! এবং হায় আল্লাহ। এই দুটো বাক্যের উচ্চারণ একই রকম নয়। প্রথম বাক্যটি বিস্ময়তার সঙ্গে কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যটি সাধারণভাবে উচ্চারিত হবে।

প্রশ্নচিহ্ন (?)

প্রশ্নবোধক বাক্যে প্রশ্নচিহ্ন দিয়ে বাক্য শেষ করা হয়। প্রশ্নবোধক বাক্যে প্রশ্নচিহ্ন না দেওয়া হলে তা আর প্রশ্নবোধক বাক্য থাকে না। প্রশ্নচিহ্ন সাধারণত বাক্যের শেষে বসে। যথা: তুমি কোথায় যাচ্ছো?

তবে কোনও বক্তব্য কিংবা বক্তব্যের অংশবিশেষ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকলে সংশ্লিষ্ট অংশের পর প্রথমবন্ধনী দিয়ে প্রশ্নচিহ্ন বসানো হয়। যথা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৯২(?) খ্রিস্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

পরোক্ষ প্রশ্নযুক্ত বাক্যে প্রশ্নচিহ্ন ব্যবহার করা উচিত নয়। যেমন: সারা দিন এত শ্রম কী করে যে সম্ভব তা বুঝি না।

উদ্ধৃতিচিহ্ন

১. প্রত্যক্ষ উক্তি প্রকাশে উদ্ধৃতিচিহ্ন ব্যবহার করা হয়। যেমন: আকবর বললেন, ‘আমি দিল্লির সম্রাট’।

২.কোনও বাক্যে ব্যবহৃত গ্রন্থ, পত্রিকা ইত্যাদির উপর উদ্ধৃতিচিহ্ন দেওয়া হয়। যেমন : রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ একটি উপন্যাস। ‘সমাচার দর্পন’ একটি পত্রিকা।

৩. বাক্যে কোনও শব্দ বা বিষয়কে গুরুত্ব দিতে কিংবা গুরুত্ব প্রকাশ করতে উদ্ধৃতিচিহ্ন দেওয়া হয়। সাহিত্যিক ‘যাযাবরের’ ‘দৃষ্টিপাত’ গ্রন্থটি পড়লে তুমি বুঝতে পারবে ‘প্রেম’ কী।

৪. উদ্ধৃতির মধ্যে ‘উদ্ধৃতি’ বসানোর প্রয়োজন হতে পারে। সেক্ষেত্রে তিনটি উদ্ধৃতিচিহ্ন ব্যবহার করতে হয়। যেমন : “শিক্ষক বললেন, ‘তোমার নাম কী?’”

৫. অনেক সময় একাধিক অনুচ্ছেদকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখতে হয়। সেক্ষেত্রে উদ্ধৃতি শুরুর স্থানে উদ্ধৃতিচিহ্ন বসানো হয়। পরবর্তী অনুচ্ছেদের প্রারম্ভে আবার উদ্ধৃতিচিহ্ন বসে। এভাবে ক্রমান্বয়ে যেতে থাকে এবং উদ্ধৃতিভুক্ত সর্বশেষ অনুচ্ছেদের যেখানে উদ্ধৃতি শেষ হয় সেখানে সমাপ্তি উদ্ধৃতি দেওয়া হয়। 

যেমন: “আমার পক্ষে এখানে থাকা সম্ভব নয়। মানুষের জন্য মানুষের যে বোধটুকু থাকা আবশ্যক তা কারো নেই।

“না থাক, কিন্তু তা আয়ত্বে আনার প্রয়াসকে যারা খারাপ চোখে দেখে, নিরুৎসাহ দিয়ে মানবতাকে পদদলিত করে, তারা মানুষ নয়।

‘তো কী?

“পশ্বাধম পশু, আমি তাদের ঘৃণা করি।”

প্রথম বন্ধনী ( )

কোন বক্তব্যকে বিশদ করা প্রয়োজন হলে প্রথম বন্ধনী ব্যবহার করা হয়। যেমন:

১. জাফর ও রাজীব আমাকে কামালের সঙ্গে যেতে বলেছেন। সে (কামাল) আমার প্রতিবেশি।

 

২. প্রয়োজনে এক বা একাধিক শব্দ বা বাক্যকে প্রথম বন্ধনীর মধ্যে রেখে আরও বিশদ করা হয়। যেমন : ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বহুভাষাবিদ পণ্ডিত(ইংরেজি, ফারসি, হিন্দি; সম্ভবত জার্মানও জানতেন) ছিলেন।

৩. কোনও বক্তব্য কিংবা বক্তব্যের অংশবিশেষ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকলে সংশ্লিষ্ট অংশের পর প্রথমবন্ধনী দিয়ে প্রশ্নচিহ্ন বসান হয়। যথা:  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৪৩(?) খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

 

তৃতীয় বন্ধনী

বাংলা ভাষায় তৃতীয় বন্ধনীর ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ধৃতির ব্যাখ্যা বা জটিলতা এড়ানোর জন্য উদ্ধৃতিস্থ বাক্যেও কোনও শব্দ বা শব্দাবলীর শুদ্ধরূপ তৃতীয় বন্ধনীর মধ্যে দেওয়া হয়। উৎসমূলে যা লেখা আছে সেটি ভুলসহ উদ্ধৃত করে শুদ্ধটি তৃতীয় বন্ধনীর মধ্যে লিখে দিলে অনেক জটিলতা ও সংশয় এড়ানো যায়। তাহলে পাঠক মূল উদ্ধৃতি এবং শুদ্ধ দুটিই জানতে পারেন।

যেমন: কোনও গ্রন্থে লেখা আছে Ñ ‘মাইকেল মুধুসুদন দত্ত যশোড় জেলার সাঘরদাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।’ এ বাক্যটিকে উদ্ধৃতি দিয়ে লেখা হয়েছে-  “মাইকেল মুধুসুদন [মধুসূদন] দত্ত যশোড় [যশোর] জেলার সাঘড়দাড়ি [সাগরদাড়ি] গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন”।

একবিন্দুচিহ্ন ( .)

একবিন্দু বা ফুটকিচিহ্ন ইংরেজি হতে আগত। বর্তমানে চিহ্নটি সংক্ষেপণ চিহ্ন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইংরেজি ভাষায় একবিন্দু যেভাবে ব্যবহৃত হয় বাংলাভাষাতেও সেভাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন এম.এ, ড., ডি.লিট, মু. ইত্যাদি। ইংরেজি ভাষার মতো বাংলা ভাষাতেও শব্দকে সংক্ষেপ করার জন্য একবিন্দু চিহ্নের বহুল ব্যবহার লক্ষ করা যায়। যেমন: পশ্চিম জার্মানিকে প. জার্মানি।

ত্রিবিন্দুচিহ্ন বা এলিপসিস

১. বাক্যের বা উদ্ধৃতির কোনও অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে বুঝাতে ত্রিবিন্দু ব্যবহার করা হয়। কারও বক্তব্য বা কোনও রচনা সম্পূর্ণ উল্লেখ না করে কিয়দংশ বাদ দেওয়া হলে বর্জিত অংশগুলোর স্থানে ত্রিবিন্দুচিহ্ন ব্যবহার করা হয়। যথা : তিনি লিখেছেন, “আমি আর এদেশে থাকব না।… যে দেশে বিচার …  সে দেশে না থাকাই উত্তম।”

২. কথা/বাক্য অসমাপ্ত রেখে দেওয়া হয়েছে বুঝাতে ত্রিবিন্দু ব্যবহৃত হয়। যথা: ইন্নালিল্লাহে … রাজেউন। পরের কারণে… আপনার কথা…।

৩. কেউ যখন আমতা-আমতা করে বলেন, কিংবা বাক্য শুরু করেও শেষ করেন না কিংবা শেষ করার সুযোগ পান না তখন, তা বুঝানোর জন্য ত্রিবিন্দুচিহ্ন ব্যবহার করা হয়।

বিকল্পচিহ্ন (/)

দুই বা ততোধিক শব্দ বা বাক্যের মধ্যে যে কোনটি হতে পারে বুঝানোর জন্য বিকল্পচিহ্ন ব্যবহার করা হয়। উদাহরণ :

১. যন্ত্রটি ঢাকা/চট্টগ্রাম শহরে পাওয়া যাবে।

২. প্রশ্নে একাধিক বিকল্প উত্তর হতে ঠিক উত্তরটা বের করার কৌশলে বিকল্প চিহ্ন ব্যবহার করা হয়।

যেমন : আমাদের জাতীয় কবি কে? রবীন্দ্রনাথ/ মধুসূদন/নজরুল/ জীবনান্দ।

৩. কবিতার লাইনকে প্রকাশ করতে বিকল্পচিহ্ন দেওয়া হয়।

 যেমন: চিরসুখী জন/ভ্রমে কি কখন/ ব্যথিত বেদন…।

কোলন ড্যাশ (:-)

বাক্যেও কোনও অংশকে বিশদ করার জন্য কোলন ড্যাশ ব্যবহার করা হয়। উদাহরণ বা দৃষ্টান্ত দেওয়ার জন্য কোলন ড্যাশের বহুল ব্যবহার দেখা যায়। 

যেমন :  লিঙ্গ দুই প্রকার, যথা :- পুংলিঙ্গ এবং স্ত্রীলিঙ্গ।

সত্যবাদী ছড়ায় লেখা আছে:-

মিথ্যা বলা মহাপাপ,

চরমতর অভিশাপ।

মিথ্যা কথা যারা কয়

তারা কোন মানুষ নয়।

ইলেক বা লোপচিহ্ন বা উর্ধ্বকমা

ঊর্ধ্বকমার ব্যবহার আগে প্রবলভাবে দেখা যেত। কোনও শব্দে, বিশেষ করে কবিতায় যদি কোনও অক্ষর ইচ্ছে করে বাদ দেওয়া হতো তখন ঊর্ধ্বকমা দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হতো যে, এখানে একটি অক্ষর বাদ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কবিতায় এ ধরনের প্রয়োগ তেমন দেখা যায় না। দ্বিতীয়ত : ক্রিয়াপদের চলিত রূপ লেখার সময় ঊর্ধ্বকমা খুব বেশি ব্যবহার করা হতো।  যেমন: হ’ল (হইল)। আবার সংখ্যা লেখার সময়ও এর ব্যবহার দেখা যেত। যেমন : দু‘(দুই), শ‘(শত) ইত্যাদি। ইদানীং ঊর্ধ্বকমার ব্যবহার উভয় বাংলায় ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছে। প্রমিত বাংলায় ঊর্ধ্বকমার ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয়।

তবে ঊর্ধ্বকমা না দিলে যদি অর্থ বা উচ্চারণে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে  সেক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা উচিত। যেমন :

১. হাইফেনের বিকল্প হিসেবে: পা’টা সরাও [এখানে ঊর্ধ্বকমা না-দিলে পা কিন্তু পাটা হয়ে যেতে পারে]।

তুমি কা’কে ভালবাস? (এখানে উর্ধ্বকমা না-দিলে কাহাকে শব্দটি ‘কাকে’ বুঝাতে পারে।)

আমার মা’র অসুখ। (এখানে ঊর্ধ্বকমা না-দিলে মা কিন্তু মার বুঝানোর আশঙ্কা হেসে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।)

মুলা’র ক্ষেতে পানি দিতে হবে। (মুলা’র শব্দে ঊর্ধ্বকমা না-দিলে এটি মুলার নামের কোনও ব্যক্তিকে বুঝাতে পারে।)

২. সালের বর্জিত সংখ্যা প্রকাশে: ২১ ফেব্রুয়ারি, ’৫২।

উপসংহারে বলা যায়, বাক্যে এক বা একাধিক বর্ণকে বর্জন করা হলে, তা প্রকাশের জন্য বর্জিতস্থানে ইংরেজি ভাষায় অ্যাপসট্রফি বলে পরিচিত (’)  লোপচিহ্নটি ব্যবহৃত হয়। বাংলায় একে ‘ঊর্ধ্বকমা’ বলা হয়। আধুনিক-প্রমিত বানানে ‘ঊর্ধ্বকমা’ বর্জনীয়। তাই ঊর্ধ্বকমা ব্যবহার না করা বাঞ্ছনীয়।

বিভিন্ন যতিচিহ্নের বিরতিকাল

কমায় (,)  সাধারণভাবে ১ (এক) বলতে যে সময় প্রয়োজন  সে পরিমাণ সময় এবং সেমিকোলনে (;) কমার দ্বিগুণ সময় বিরতি দিতে হয়। দাঁড়ি (।), প্রশ্নচিহ্ন(?), বিস্ময়চিহ্ন (!), কোলন (:), কোলন-ড্যাশ (:-), ড্যাশ   (Ñ ) প্রভৃতি যতিচিহ্নের প্রত্যেকটিতে এক সেকেণ্ড করে থামতে হয়। প্রথম বন্ধনী, দ্বিতীয় বন্ধনী, তৃতীয় বন্ধনী, হাইফেন (-) ও ইলেক বা লোপচিহ্নে (’) থামার প্রয়োজন নেই।

error: Content is protected !!