শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

৬১. কি বনাম কী

 ক. ‘কি’ প্রশ্নবোধক অব্যয়। যে সকল প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ শব্দের মাধ্যমেও কিংবা কেবল অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেও সন্তোষজনকভাবে দেওয়া যায় সে সকল প্রশ্নবোধক বাক্যে ‘কি’ লিখবেন। যেমন : আমি কি খাব? (Shall I eat?),  আমি কি আসতে পারি ? টাকা আছে কি? তুমি কি জান? (Do you know?)

খ. যে সকল প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ‘ বা ‘না‘ দিয়ে কিংবা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে সন্তোষজনকভাবে  দেওয়া সম্ভব নয় সে সকল প্রশ্নবোধক বাক্যে ‘কী’ লিখবেন। যেমন :  আমি কী খাবো? ( What will Ieat?), তুমি কী চাও? (Waht do you want?), কী করে এতদূর এলে? তোমার বাবা কী করেন? তুমি কী জানো? (What do you know?)

গ. ‘কী’ বিস্ময়সূচক পদ। তবে বিস্ময় ছাড়াও অনিশ্চয়তা, অবজ্ঞা, সম্মান গৌরব, প্রশংসা প্রভৃতি প্রকাশেও ‘কী’ ব্যবহার করা হয়। যেমন –  বিস্ময় : কী দারুণ! অনিশ্চয়তা : কী জানি কী হয় না হয়। অবজ্ঞা : সে আবার কীসের গরিব? প্রশংসা:  কী ধনী তিনি জান? ছেলেটি যে কী সাহসী জানলে তুমি হতবাক হয়ে যাবে।

ঘ.  কোনভাবে, কেন, কী কারণে, কার মধ্যে, কেমন করে, কী প্রকারের, কেমন প্রভৃতি বুঝালে প্রশ্নজ্ঞাপক মূল বাক্যটির আগে ‘কী’ লিখতে হয়। যেমন : কীভাবে যাবে? কীজন্য এসেছ? কীরকম লোক তুমি?  কীসে তোমার আগ্রহ? এত তাড়া কীসের? কীরূপ দেখতে সে?  কী উপায়ে তোমাকে সাহায্য করতে পারি?

প্রসঙ্গত, ‘কিভাবে’ বানানটি ভুল। কারণ  এই শব্দযুক্ত প্রশ্নসূচক বাক্যের উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ শব্দে কিংবা অঙ্গভঙ্গিতে দেওয়া যায় না। তাই লিখবেন ‘কীভাবে’। ‘কিভাবে’ লিখবেন না। তেমনি লিখবেন, কীজন্য, কীদৃশ্য, কীসে, কীসের, কীরূপ প্রভৃতি।

৬২. সংক্ষেপিত শব্দে ষষ্ঠী বিভক্তির (র/এর) ব্যবহার

 সংক্ষেপিত শব্দে ষষ্ঠী বিভক্তির (র/এর) ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন জটিলতা দেখা যায়। জটিলতার কারণ— প্রমিত বানান রীতিতে সংক্ষেপিত শব্দে ‘র/এর’ ব্যবহারের কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম নেই। একই অর্থে ডিসির, ডিসি-এর, ডিসি’র, ডিসি‘র প্রভৃতি লেখা হচ্ছে। যা ভাষায় জটিলতা সৃষ্টি ছাড়াও বাংলাভাষা শিখতে আগ্রহী বিদেশি শিক্ষার্থীদের সমস্যায় ফেলে দেয়।  এমন জটিলতা এড়ানোর জন্য নিচের তিনটি নিয়ম অনুসরণ করা যায়:

১. সংক্ষেপিত শব্দের অন্তে যদি ইংরেজি ঋ ঐ খ গ ঘ জ ঝ ঢ ত ইত্যাদি বর্ণ থাকে এবং বর্ণটি যদি পরিপূর্ণরূপে লেখা হয় তবে শব্দটিতে হাইফেনযুক্ত ‘এর’ ব্যবহার করুন।

যেমন: আইএমএফ+এর = আইএমএফ-এর (UNICEF) এর ক্ষেত্রে হবে ইউনিসেফের; কারণ এখানে সংক্ষেপিত শব্দটি বাংলায় পরিপূর্ণরূপে লেখা হয় না), তাস+এর = তাস-এর (TASS), বেনেলাক্স + এর = বেনেলাক্স-এর (BENELUX) ইত্যাদি।

২. সংক্ষেপিত শব্দটির অন্ত্য উচ্চারণ যদি ‘হস্’ বা ‘অ-কারন্ত’ হয় তাহলে শব্দটির  শেষ বর্ণের সঙ্গে ‘এ-কার’ যুক্ত করুন এবং তারপর ‘র’ বসান।

যেমন: ইউনিসেফ +এর = ইউনিসেফের, বার্ড+এর = বার্ডের (ইঅজউ), এইডস +এর = এইডসের (AIDS), এসকাপ+এর = এসকাপের (ESCAP) ইত্যাদি।

৩. অন্যান্য সংক্ষেপিত শব্দের ক্ষেত্রে শব্দের অন্তে শুধু ‘র’ দিন। যেমন: ডিসি+এর = ডিসির (DC), বিবিসি+ এর = বিবিসির(BBC), বিআরটিসি+ এর = বিআরটিসির (BRTC), এসপি+ এর = এসপির (SP), হু+এ = হুর (WHO) ইত্যাদি।

৪. তবে কোনো ক্ষেত্রে ঊর্ধ্ব-কমা ব্যবহার করা বিধেয় নয়। কারণ প্রমিত বানান রীতিতে ঊর্ধ্ব-কমার   ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করে।

৬৩. শ্রীমান ও আয়ুষ্মান্: মূর্ধন্য-ণ নেই কেন

শ্রবণ (শ+র+অ+ব+ন+অ), শ্রবণা, শ্রবণী, শ্রমণ, শ্রমণা, শ্রাবণ, শ্রাবণী প্রভৃতি শব্দের বানানে মূর্ধন্য-ণ;  কারণ, ণত্ববিধান অনুসারে, কোনো শব্দে র-ফলার পরে, অন্যান্যদের মধ্যে, প-বর্গের (প, ফ, ব, ভ, ম) এক বা একাধিক বর্ণ থাকলে, পরের দন্ত্য ন মূর্ধন্য-ণ হয়ে যায়। কিন্তু, এই শর্ত পূরণ হওয়া সত্ত্বেও, শ্রীমান্ বানানে দন্ত্য ন।  কারণটি বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণ (প্রথম প্রকাশ: মাঘ ১৪২০/জানুয়ারি ২০১৪) এর  ৩২৯ নম্বর পৃষ্ঠায় বিধৃত নিয়মের আলোকে ব্যাখ্যা করা যায়। ওখানে  বলা হয়েছে,  “তৎসম সংস্কৃত শব্দের একবারে শেষে যে দন্ত্য-ন থাকে, আগে ঋ, র, ষ থাকলেও তা মূর্ধন্য-ণ হয় না।” অর্থাৎ তৎসম/ সংস্কৃত শব্দের একবারে শেষে যদি দন্ত্য ন থাকে এবং তারপরে যদি কোনো স্বরচিহ্ন না থাকে তা হলে এর পূর্বে ঋ, র, ষ প্রভৃতি বর্ণ বা বর্ণচিহ্ন থাকলেও ওই দন্ত্য-ন মূর্ধন্য-ণ হয় না। (শ+র+ঈ+ম+আ+ন্)। এখানে দন্ত্য-ন বর্ণের পর কোনো স্বরচিহ্ন নেই। একইভাবে পূষন্, শর্মন্ ও আয়ুষ্মান্ শব্দেও মূর্ধন্য-ণ নেই। তবে অনেক বৈয়াকরণ শ্রীমান ও রঙ্গন শব্দকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখিয়েছেন।                               

তৎসম সংস্কৃত শব্দ শ্রীমান্ ও পূষন্ বাংলায় হসন্ত বর্জন করে শ্রীমান ও পূষন হয়েছে। তাই এগুলো সংস্কৃতস্বভাব হসন্ত বর্জন করায় পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। তাই এগুলোকে আর তৎসম শব্দ বলা যায় না। তাই শ্রীমান, পূষন, শর্মন ও আয়ুষ্মান শব্দের বানানে মূর্ধন্য-ণ নেই।

৬৪. সরণি  স্মরণী ও স্বরনি

সংস্কৃত সরণ (√সৃ+অন) শব্দের অর্থ চলন, গমন, পথ, রাস্তা প্রভৃতি। সরণ থেকে সরণি। প্রসঙ্গত, তৎসম সরণি (সৃ+অনি) শব্দের অর্থ পথ, রাস্তা, সড়ক প্রভৃতি। যেমন : বিজয় সরণি, প্রগতি সরণি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, তাজউদ্দীন আহমেদ সরণী প্রভৃতি। কিন্তু অনেকে ‘সরণি’ শব্দকে স্মরণী, স্বরণী, স্বরনি, স্মরনি প্রভৃতি ভুল বানানে লিখে থাকেন। জাতীয় জরিপ অধিদপ্তরে প্রবেশ-পথের সাইনবোর্ডে লেখা হয়েছে— ২৯ তাজউদ্দীন আহমেদ স্মরণী। পল্টন মোড়, বিজয়নগর, মগবাজার রোড, সাত রাস্তা, তেজগাঁও প্রভৃতি এলাকার অনেক প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডেও সরণি’ বানানের পরিবর্তে লেখা হয়েছে স্বরণী, স্বরণি, স্মরণী।

অনেকে মনে করেন, স্মরণ থেকে স্মরণী। এটি বানান ভুলের একটি কারণ। আর একটি কারণ হচ্ছে, শব্দগুলোর অভিন্ন উচ্চারণ। তবে সবচেয়ে বড়ো কারণ হচ্ছে অভিধান না- দেখা। এ ভুল হতে রক্ষা পাওয়ার একটা কৌশল আছে। দেখুন কৌশলটি কতটুকু কার্যকর:

প্রথমে মনে রাখবেন, রাস্তা নামের প্রাসঙ্গিকতায় লেখা সরণ শব্দটি স্মরণ থেকে নয় ‘সরা’ থেকে এসেছে। সরা শব্দের অর্থ স্থান বদলানো। রাস্তায় পথিককে সরে সরে এগুতে হয়। তাই রাস্তার নাম লেখায় সরণি। শব্দটি সংস্কৃত হওয়ায় ণত্ব বিধি অনুসারে মূর্ধন্য-ণ হয়েছে। যদি কষ্ট হয় তো, অতসব না-ভেবে শুধু মনে রাখুন ‘সরা’ থেকে ‘সরণি’।   

৬৫. বান বনাম মান

বিশেষ্য পদের সঙ্গে ‘বান/মান’ যুক্ত করে বিশেষণ তৈরি করা হয়। তবে কোথায় ‘বান’ বসবে এবং কোথায় ‘মান’ বসবে এটি অনেক সময় গোলমাল হয়ে যায়। সুতরাং সূত্র একটা প্রয়োজন। সহজ নিয়ম হলো, বিশেষ্য পদের শেষে ‘অ/আ’ থাকলে ‘-বান’ যুক্ত হবে কিন্তু ‘ই/ঈ, বা উ/ঊ’ থাকলে ‘-মান’ যুক্ত হবে।  যেমন:

অ/আ: অর্থ> অর্থবান, ক্ষমতা> ক্ষমতাবান, চরিত্র> চরিত্রবান, দয়া> দয়াবান, প্রজ্ঞা> প্রজ্ঞাবান, পূণ্য>পূণ্যবান, হৃদয়> হৃদয়বান। ই/ঈ, উ/ঊ: অগ্নি> অগ্নিমান, কৃষ্টি> কৃষ্টিমান, আয়ু> আয়ুষ্মান, দ্যুতি> দ্যুতিমান, ঋদ্ধি> ঋদ্ধিমান, অংশু> অংশুমান, শক্তি> শক্তিমান।

তারপরও যদি মনে না থাকে, তাহলে নিচের ইঙ্গিতটা মনে রাখুন।  স্বরবর্ণসজ্জায় ‘অ/আ’ বর্ণ ‘ই/ঈ’ এবং ‘উ/ঊ’ এর আগে। ব্যঞ্জনবর্ণসজ্জায় ‘ব’-এর পরে ‘ম’। তাই ‘অ/আ’-এর সঙ্গে ‘ব>বান’ এবং ‘ই/ঈ, উ/ঊ’ এর সঙ্গে ‘ম>মান’ যুক্ত হয়। 

লক্ষণীয়: অগ্নি + বাণ = অগ্নিবাণ, এর অর্থ পুরাণে বর্ণিত অগ্নিবর্ষণকারী তিরবিশেষে। ‘বান’ ও ‘মান’ এক নয়। ‘অগ্নিবাণ’ শব্দকে ‘অগ্নিবান’ মনে করবেন না।

৬৬. ঊ-কার যদি উ-কার হয়, তৎসমটি অতৎসম হয়

ঊ-কার দিয়ে গঠিত তৎসম শব্দ হতে সৃষ্ট তদ্ভব শব্দে উ-কার হবে।
যেমন:
চূড়া> চুড়ো
ধূলি> ধুলো
পূজা> পুজো
পূরা> পুরো
পূর্ব> পুব
মূলক> মুলা/মুলো
রূপ্য> রূপা
সূর্য> সুয্যি ইত্যাদি।
 
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.।
সব বিধি একসঙ্গে দেখার জন্য নিচের লিংকে ক্লিক করুন:

error: Content is protected !!