শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) থেকে শুবাচির প্রশ্ন শুবাচির উত্তর: (৩১-৪৫)

ড. মোহাম্মদ আমীন

৩০. রয়ানি

রয়ানি দেশি শব্দ। মনসামঙ্গলের গানকে রয়ানি বলা হয়। একসময় রয়ানি বাংলাদেশের সর্বত্র বেশ জনপ্রিয় ছিল। মনসামঙ্গলের কবিগণ রয়ানির মূল রচয়িতা।
 
৩১. ন্যাড়া বেলতলায় একবার‌ই যায়: কথার উৎস ও ব্যাখ্যা
প্রবাদটি নিয়ে একটি গল্প আছে। ন্যাড়ার হাত দেখে একজন জ্যোতিষী বলেছিলেন তার অপঘাতে মৃত্যু হবে। এই মৃত্যুটা হবে তার মাথায় গাছ থেকে বেল পড়ার আঘাতে। ন্যাড়ার মা এটি নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলেন। কারণ ন্যাড়াদের এলাকাসহ আশেপাশের এলাকায় প্রচুর বেলগাছ। নিরাপত্তার জন্য মা, তার ন্যাড়া ছেলেকে  বোনের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। সে এলাকায় কোনো বেল গাছ নেই। ন্যাড়া বোনের বাড়ি যাওয়ার পর ভালোই দিন কাটছিল। হঠাৎ একদিন অন্য এলাকায় ঘুরতে গিয়ে সে একটি বেলগাছ তলায় চলে গেল। তখনই একটা পাকা বেল তার মাথার ওপর পড়ে। এই আঘাতেই ন্যাড়ার মৃত্যু হয়। একারণে বলা হয় ন্যাড়া বেল তলায় একবারই যায়। কেননা মারা যাওয়ার কারণে সে দ্বিতীয় বার বেল তলায় যাওয়ার সুযোগ পাবে না। এই প্রবাদটি দিয়ে  বোঝানো হয় একবার ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার পর দ্বিতীয়বার সেই ভুল কেউ করে না। ন্যাড়ামাথার কেউ যদি বেলতলায় একবার যায়, তাহলে তার মাথায় পাকা বেল পড়ে সে মারা যায। দ্বিতীয়বার আর যাওয়ার সুযোগ থাকে না। এজন্য বলা হয়ে থাকে, ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায়।
 
৩২. কে রে: দ্বিতীয়া বনাম চতুর্থী
 
কে, রে কেবল নিমিত্তার্থে ও সম্প্রদান কারকের ক্ষেত্রে চতুর্থী বিভক্তি হয়, অন্য সকল ক্ষেত্রে দ্বিতীয়া বিভক্তি হয়।
যেমন: ১. ভিক্ষুককে* ভিক্ষা দাও।— সম্প্রদান কারক, তাই চতুর্থী বিভক্তি।
২. বেলা যে পড়ে, এল জলকে* (জলের নিমিত্তে) চল।— নিমিত্তার্থে সম্প্রদান, তাই চতুর্থী বিভক্তি।
৩. ধোপাকে* কাপড় দাও।— কর্ম কারক, তাই দ্বিতীয়া বিভক্তি।
৪. আমারে* তুমি করিবে ত্রাণ, এ নহে মোর প্রার্থনা।— কর্ম কারক, তাই দ্বিতীয়া বিভক্তি।
৫.  মোহাম্মদ আলীকে* সব মুষ্টিযোদ্ধা ভয় পায়।— অপাদান কারক, তাই দ্বিতীয়া বিভক্তি। [সূত্র: তাহসিন ঐশী, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)]
 
 
৩৩. স্বচ্ছন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্য বানান মনে রাখার নিমোনিক
সংস্কৃত ‘স্বচ্ছন্দ(স্ব+ছন্দ)’ অর্থ— অবাধ, স্বাধীন, সুস্থ, অযত্নসম্ভূত, স্বীয় ইচ্ছা, স্বেচ্ছাচার প্রভৃতি। সংস্কৃত ‘স্বাচ্ছন্দ্য (স্বচ্ছন্দ+য)’ শব্দের অর্থ স্বচ্ছন্দতা, বাধাহীনতা, সুস্থতা, স্বাধীনতা প্রভৃতি। অনেকে শব্দটির বানান লিখেন ‘সাচ্ছন্দ’ কেউ লিখেন, ‘সাচ্ছন্দ্য’ আবার অনেকে লিখেন স্বাচ্ছন্দ। উচ্চারণ এবং যুক্তাক্ষরজনিত জটিলতার কারণে বানানে এমন সংশয় সৃষ্টি হয়। একটি নিমোনিক থাকলে বানান সংশয় কেটে যায়।
নিমোনিক:
‘স্বচ্ছন্দ’ এবং ‘স্বাচ্ছন্দ্য’ শব্দের অর্থের সঙ্গে ‘স্ব (নিজ)’ এবং স্বাধীনতা কথাটি জড়িত। তাই উভয়র শব্দের বানান ‘স্ব’ দিয়ে শুরু করুন, দন্ত্য-স দিয়ে নয়। জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনা যেমন জটিল তেমন কষ্টের। তাই বানানটিও জটিল। ‘স্বচ্ছ’ ও ‘স্বাধীন’ না থাকলে ‘অনিন্দ্য’ হওয়া যায় না।এজন্য ‘স্বচ্ছ’ ও ‘অনিন্দ্য’ মিলে‘ স্বাচ্ছন্দ্য’। ফলে ‘স্বাচ্ছন্দ্য’ বানান শেষ হয় ‘ন্দ্য’ দিয়ে।
আপনি আরও সুন্দর নিমোনিক তৈরি করে মন্তব্য কলামে দিতে পারেন। আমরা ঋদ্ধ হব।
 
৩৪. Sequoia (সিকুইয়া): দুর্লভ বানান
Sequoia শব্দটির সরল বাংলা উচ্চারণ সিকুইয়া। এটি বৃক্ষবিশেষ। সাধারণভাবে  ক্যালিফোর্নিয়া রেডউডকে সিকুইয়া বলা হয়। Sequoia একটি চমৎকার শব্দ। ইংরেজি ৭ বর্ণে গঠিত এই শব্দে খুব কম ব্যবহৃত q এবং ৫টি vowel রয়েছে। q-এর সঙ্গে vowel-এর এমন দুর্লভ মিলন আর কোনো শব্দে নেই।
 
৩৫. পরিচয় পরিচিতি এবং পরিচিত
পরিচয়: সংস্কৃত পরিচয় (পরি+√চি+অ) অর্থ— (বিশেষ্যে) নামধাম প্রভৃতি বিবরণ। জানাশোনা, আলাপ। অভিজ্ঞান, চিহ্ন, নিদর্শন (পরিচয়পত্র), প্রণয়।
 
প্রয়োগ: আমি তার পরিচয় সংগ্রহ করেছি। তার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। পরিচয় কোনো বিষয়কে জানার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়।
 
পরিচিতি: সংস্কৃত পরিচিতি (পরি+√চি+তি) অর্থ— (বিশেষ্যে) পরিচয়। সুতরাং, পরিচয় ও পরিচিত সমার্থক।
 
প্রয়োগ: আমি তার পরিচিতি সংগ্রহ করেছি। তার সঙ্গে আমার পরিচিতি আছে। পরিচতি কোনো বিষয়কে জানার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়।
পরিচিত: সংস্কৃত পরিচিত (পরি+√চি+ত) অর্থ— (বিশেষণে) পরিচায় জানা আছে এমন (পরিচিত ব্যক্তি)। অভ্যস্ত। জানাশোনা, জ্ঞাত (পরিচিত শহর)। আগে পরিচয় বা পরিচিতি। তারপর হয় পরিচিত। পরিচয় বা পরিচিতি আছে এমন বিষয়কে পরিচিত বিষয় বলা হয়।
 
প্রয়োগ: অক্সিজেনের গঠন সম্পর্কে আমি পরিচিত। লোকটি আমার পরিচিত। আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় হওয়ার দিন থেকে আমরা পরস্পর পরিচিত। এই পরিচয়/পরিচিতি আমাদের জীবনের একটি মাইল ফলক।
 
 
৩৬. পুকুর জলাশয়  ও জলাধার 
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত পুষ্কর থেকে উদ্ভূত পুকুর অর্থ— (বিশেষ্যে) পুষ্করিণী, ছোটো জলাশয়। এটি মূলত স্থির জলের ক্ষুদ্র জলাশয় যা হ্রদের চেয়ে ছোটো।পুকুর সাধারণত কৃত্রিমভাবে মানুষের প্রয়োজনে খনন করা হয়। পুকুর নামে পরিচিত জলাশয় সাধারণত আকারে দিঘি নামে পরিচিত জলাশয় থেকে ছোটো হয়। জল এবং আশয় মিলে জলাশয়। জল অর্থ— পানি এবং আশয় অর্থ— আধার, যা ধারণ করে, সংরক্ষণ করে যে। সুতরাং যেখানে  জল থাকে সে স্থানটি জলাশয়। অভিধানমতে, সংস্কৃত জলাশয় (জল+আশয়) অর্থ— (বিশেষ্যে) জলের আধার (পুকুর, নদী, হ্রদ, সমুদ্র প্রভৃতি)। সুতরাং,  যে-কোনো জলের আধারই জলাশয়। হোক সে পুকুর, দিঘি, গর্ত,  নদী, সাগর বা সমুদ্র। এ হিসেবে প্রশান্ত মহাসাগরও জলাশয়। সংস্কৃত জলাধার (জল+আধার) অর্থ— (বিশেষ্যে) জল রাখার পাত্র, জলাশয়, পুকুর। বাংলায় জলাশয় ও জলাধার প্রায় সমার্থক হলেও, সংস্কৃতে দুটির অর্থ সুনির্দিষ্ট। সংস্কৃতে মাটি দ্বারা বেষ্টিত স্থির ও চলমান জলপূর্ণ সবকিছুকেই জলাশয় বলে। তবে  জলাধার বলতে পানিপূর্ণ পাত্র, বাসন, কলস, ইত্যাদি; কিংবা পানিপূর্ণ দ্রব্য কিংবা রসালো ফল যেমন: আঁখ, লেবু ইত্যাদিকেও ব্যাপকার্থে জলাধার বলা হয়। অন্যদিকে ‘জলধি’ অর্থ সাগর। এই আলোচনা থেকে  দেখা যায়, বাংলায়  মাটি দ্বারা বেষ্টিত স্থির ও চলমান সকল স্থানই জলাশয় বা জলাধার। সুতরাং, সব পুকুর জলাশয় বা জলাধার কিন্তু সব  জলাশয় বা জলাধার পুকুর নয়।
 
৩৭. জটিল বনাম কঠিন 
জটিল: সংস্কৃত জটিল (জটা+ইল) অর্থ— (বিশেষণে) জট পাকিয়েছে এমন, গোলমেলে, দুর্বোধ্য; বুঝতে কষ্ট হয় এমন; সহজে বোধগম্য নয় এমন।
প্রয়োগ:  এমন জটিল সমস্যায় আর পড়িনি। রোগটা খুব জটিল। ডাক্তারি পেশায় এমন জটিল রোগ আর পাইনি। লোকটি খুব জটিল। এত জটিল হলে সংসার চলবে কীভাবে?
 
কঠিন: সংস্কৃত কঠিন (কঠ্+ইন) অর্থ— (বিশেষণে) শক্ত, দৃঢ়, অনমনীয়। গাঢ়, নিশ্ছিদ্র। দুর্বোধ্য, দূরধিগম্য। নির্দয়। ভয়ানক। দুরারোগ্য (কঠিন পীড়া) এবং (বিশেষ্যে) কঠিনতা।
 
প্রয়োগ:  কাষ্ঠ খণ্ডটি বেশ কঠিন। কঠিন সমস্যায় পড়লাম। খুব কঠিন রোগ। অধস্তনদের প্রতি এত কঠিন হওয়া উচিত নয়।
 
জটিল ও কঠিন: এখানে অভিজ্ঞ ডাক্তার দ্বারা জটিল (দুর্বোধ্য/গোলমেলে) ও কঠিন (দুরারোগ্য/ভয়ানক) রোগের  চিকিৎসা করা হয়।
 
৩৮.দরিদ্র দারিদ্র্য হতদরিদ্র
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত দরিদ্র (√দরিদ্রা+অ) অর্থ— (বিশেষণে) অভাবগ্রস্ত, দীন। সংস্কৃত দারিদ্র্য (দরিদ্র+য) অর্থ— (বিশেষ্যে) দীনতা, দরিদ্র অবস্থা, অভাব। অন্যদিকে, হতদরিদ্র (হত+দরিদ্র) অর্থ— (বিশেষণে) অতি দরিদ্র ও দুর্দশাগ্রস্ত। দরিদ্র যাদের হত করে দিয়েছে তারাই হতদরিদ্র। এ হচ্ছে আভিধানিক অর্থ।
 
সাধারণভাবে জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য সামগ্রী বা সেবা ক্রয়ের ন্যূনতম আয় যারা করতে পারে না তারা দরিদ্র। দরিদ্রের এ অবস্থার নাম দারিদ্র্য। আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত সংজ্ঞার্থ অনুযায়ী— দারিদ্র্য  এমন একটি আর্থনৈতিক অবস্থা, যখন ব্যক্তিবিশেষ জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান অর্জনে এবং নিম্ন আয়ের কারণে জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য দ্রব্যাদি ক্রয় করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
 
১৯৮০-র দশকে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সহায়তায় দারিদ্র্য পরিমাপের জন্য একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করে। সে মানদণ্ড বা সংজ্ঞার্থ অনুযায়ী দারিদ্র্য হচ্ছে খাদ্য গ্রহণের এমন একটি স্তর যা থেকে প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয়ের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ কিলো-ক্যালরি পাওয়া যায় না। কয়েকটি পদ্ধতিতে দারিদ্র্যপীড়িত জনসংখ্যা চিহ্নিত করা হয়।  প্রথমত: ভোগ-অভ্যাস এবং ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় করে  খাদ্য তালিকা চিহ্নিত করা হয় যা নির্দিষ্ট পরিমাণ পুষ্টি তথা প্রত্যেক ব্যক্তিকে প্রতিদিন ২,১১২ কিলো ক্যালরি এবং ৫৮ গ্রাম প্রোটিন সরবরাহ করতে পারে।
 
উপর্যুক্ত খাদ্যতালিকার ব্যয় অপেক্ষা ১.২৫ গুণ কম মাথাপিছু আয়সম্পন্ন পরিবারগুলোকে মধ্যম শ্রেণির দরিদ্র এবং নির্ধারিত প্রারম্ভিক আয়ের চেয়ে ৮৫% কম মাথাপিছু আয়সম্পন্ন পরিবারগুলিকে চরম দরিদ্র বা হতদরিদ্র পরিবার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যারা হতদরিদ্র পরিবারের সদস্য তারাই হতদরিদ্র।
 
তবে বিষয় ও শর্তগুলো আপেক্ষিক। সময় এবং স্থানভেদেও ভিন্ন হতে পারে। অধিকন্তু, দেশের জিডিপি অনুযায়ী মানদণ্ড পরিবর্তন করা হয়।। পৌর এলাকার দারিদ্র্য পরিমাপের ক্ষেত্রে ক্যালরি গ্রহণের প্রারম্ভিক মাত্রা পল্লি এলাকার জন্য নির্ধারিত মাত্রা অপেক্ষা কিছুটা উচ্চতর হয়। বাংলাদেশেও  বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং নীতিমালার কারণে জনপ্রতি কিলো ক্যালরির প্রারম্ভিক মাত্রা বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। এ পদ্ধতিতে দারিদ্র্যাবস্থা প্রাক্কলনের জন্য ব্যবহৃত তথ্য ও উপাত্ত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা-ব্যয় নির্ধারণ জরিপ থেকে নেওয়া হয়।
 
৩৯. লেখ লেখা লেখনী ও লেখসামগ্রী
সংস্কৃত এবং বাক্যে বিশেষ্য হিসাবে প্রযুক্ত ‘ লেখ 😊 √লিখ্+ অ)’ শব্দের অর্থ লিখন, লিপি, লিখিত বিষয় প্রভৃতি। যে লিখে বা লিপিবদ্ধ করে সে-ই লেখক (√লিখ্+ অক)। লেখক শব্দের আরো অর্থ রয়েছে। যেমন : গ্রন্থরচয়িতা, লিপিকর, সাহিত্যিক, গ্রন্থকার প্রভৃতি। যেমন : হায়াৎ মামুদ একজন লেখক।
 
লেখা [√লিখ্+ অ + আ (টাপ্)] শব্দটি সংস্কৃত এবং বাক্যে একাধিক পদ হিসেবে প্রযুক্ত হয়। ক্রিয়া বিশেষণে ‘লেখা’ শব্দের অর্থ : লিপিবদ্ধ করা, রচনা করা, লিখিতভাবে অবহিত করা, অাঁকা প্রভৃতি। বিশেষ্যে লেখা শব্দের অর্থ : রচনা, লিখন, হস্তলিপি, শ্রেণি, চিহ্ন, রেখা প্রভৃতি। বিশেষণে শব্দটির অর্থ লিখিত। অতএব, লেখা অর্থ লিপিবদ্ধ করার কাজও হতে পারে আবার লেখক যা লিপিবদ্ধ করেছে তা-ও হতে পারে। এটি নির্ভর করে শব্দটি বাক্যে, কোন পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে তার ওপর। যেমন: শুভাষ বাবুর লেখা, লেখাগুলো পড়ে মজা পেলাম।
 
লেখনী (√লিখ্+ অন+ ঈ) সংস্কৃত শব্দ এবং বাক্যে বিশেষ্য পদ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ কলম, পেন্সিল, ছবি আঁকার তুলি। এককথায় যা দিয়ে লেখা হয় সেটিই লেখনী। যেমন : শুধু দামি লেখনী দিয়ে লেখা হলে ওই লেখা দামি হয় না। দামি লেখা হতে হলে লেখায় মান থাকতে হয়।
 
তবে, লেখসামগ্রী এবং লেখনী এক নয়। লেখসামগ্রী বললে, লেখার কাগজ, কলম, পেন্সিল প্রভৃতি বোঝাবে। যাকে ইংরেজিতে Stationery বলা হয়। অর্থাৎ সকল ‘লেখনী’ লেখসামগ্রী কিন্তু সকল ‘লেখসামগ্রী’ লেখনী নয়।
 
৪০. প্রভাষক শব্দের আভিধানিক অর্থ
ভাষ থেকে ভাষক এবং ভাষক থেকে প্রভাষক। সংস্কৃত ভাষ (ভাষ্‌+অ) অর্থ—  (বিশেষ্যে) উক্তি,  বাক্য, ভাষা প্রভৃতি। ভাষা থেকে ভাষক। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত ভাষক (ভাষ্‌+অ) অর্থ— (বিশেষ্য ও বিশেষণে)  বক্তা, কথক, বক্তব্য প্রদান করে যে। এর স্ত্রীলিঙ্গ ভাষিকা।  ভাষক শব্দের সঙ্গে উত্তম বা উৎকৃষ্ট অর্থে প্র উপসর্গ যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে প্রভাষক। সে হিসাবে প্রভাষক অর্থ এমন একজন যিনি ভালো বলতে পারেন, যার উক্তি উত্তম, ভালো বাক্য যিনি গঠন করতে পারেন, ভালো শিক্ষা যিনি দিতে পারেন, ভালো কথা যিনি বলতে পারেন।  এককথায়, প্রভাষক অর্থ উৎকৃষ্ট বক্ত, ভালো শিক্ষক।
 
৪১. যাই যাই যা-ই
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে যাই শব্দের দুটি ভুক্তি পাওয়া যায়। প্রথমত: সংস্কৃত যদা থেকে উদ্ভূত যাই অর্থ— (অব্যয়ে) যা, যাহা (তুমি যাই বলো, তুমি যাই চাও, যাই হোক আমি আছি)। যা কিছু (যাই দাও তাই নেব)।
দ্বিতীয়ত: বাংলা যাই অর্থ— (ক্রিয়ায়) গমন করি (আমি এখন বাড়ি যাই)।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘যা-ই’ বানানের কোনো শব্দ নেই। কোন শব্দের কী অর্থ তা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। অতএব, যা-ই বানানটি অপ্রয়োজনীয়।
 
৪২. গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ৪ঠা ডিসেম্বর
১৭৯১:  ব্রিটেনে প্রথম দি অবজারভার পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ১৮২১: ১৮২১: ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তারাচরণ দত্তের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ‘সম্বাদ কৌমুদী’ প্রথম প্রকাশিত। সম্বাদ কৌমুদীর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন রাজা রামমোহন রায় এবং প্রকাশক ছিলেন তারাচাঁদ দত্ত। ১৮৩৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮২৯:  সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ আইন জারি করেন লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক। ১৮৯৯: টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধের টিকা মানব দেহে ব্যবহার। ১৯৫৩:  শেরে বাংলা, ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠন। ১৯৭০: পল্টনে বিশাল জনসমুদ্রে মওলানা ভাসানীর স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান দাবি উত্থাপন। ১৯৭৪:  শ্রীলংকায় বিমান দুর্ঘটনায় ১৯১ জন নিহত হয়। ১৯৯০:  নয় বছর প্রেসিডেন্ট থাকার পর গণআন্দোলনের মুখে প্রেসিডেন্ট এরশাদের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণা।
 
৪৩.থানা বনাম উপজেলা
থানারর আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান অফিসার ইনচার্জ (OC)। উপজেলার প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO)। একটি উপজেলায় একাধিক থানা থাকতে পারে। তবে একটি থানায় একাধিক উপজেলা থাকতে পারে না। উপজেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির প্রধান হলো উপজেলা নির্বাহী অফিসার।,উপজেলায় উপজেলা চেয়ারম্যান থাকে ও ভাইস চেয়ারম্যান থাকে। একটি উপজেলার অন্তর্ভুক্ত বিশেষ এলাকা।
 
৪৪. পাতিস নে শিলাতলে পদ্মপাতা
পদ্মপাতা অনেক কোমল একটি জিনিস। শিলা হচ্ছে কঠিন পাথর। অর্থগত দিক হচ্ছে শিলার নিচে পদ্মপাতা দিস নে। ভাবগত বিষয় হচ্ছে কোন পাষাণ মানুষের কাছে দু:খের কথা বলতে নেই। অথবা যার আপনার প্রতি মায়া বা অনুভূতি নেই তার কাছে আপনার আবেগ বা অনুভূতি প্রকাশ করতে নেই। সমান না হলে বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক করা সমীচীন নয়।  পাথরের নিচে চাপা পড়লে কোমল পদ্মপাতার যে করুণ দশা হয় তেমনি ধনীর সঙ্গে দরিদ্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই দশা হয়।
 
৪৫. অতিথি
যার অত্ গতি (ক্ষণকালের জন্য) থেমে গেছে- সে-ই অতিথি। যার তিথি নেই; স্থিতি নেই; যে যায়, থাকে না তিনিই অতিথি। অনিত্যাবস্থানের কারণে যার তিথি বা দিন বা সময়-অসময় নেই তিনিও অতিথি। আবার অভ্যাগত, গৃহাগত, আগন্তুক/একরাত্র পরগৃহবাসী ব্রাহ্মণ অর্থেও অতিথি বুঝানো হতো। মিতাক্ষরা মতে অতিথি তিন প্রকার। যথা : পথিক, শ্রোত্রিয় ও বেদপারগ। রামচন্দ্রের পৌত্র ও কুশের পুত্রকেও অতিথি বলা হতো। অতিথি শব্দটি এখন ‘আমন্ত্রিত-অভ্যাগত’ অর্থে বহুল প্রচলিত। তবে প্রারম্ভে এর অর্থ ছিল কিছুটা ভিন্ন।
 
প্রাচীনকালে ‘তিথি’ অর্থে তৎকালীন গোষ্ঠীর বা যৌথ পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে (যারা স্থিতি করে) এবং অতিথি অর্থে (যারা স্থিতি করে না) এমন সমাজের পরিদর্শক গোষ্ঠীর প্রত্যেক ব্যক্তিকে বোঝাত। অত্রি (পরিদর্শক) প্রজাপ্রতির কালে, যখন রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়নি, অথচ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছোটখাট বিভাজন ঘটে গেছে, তখন গৃহকর্তার দায়িত্ব ছিল অতিথি সৎকার। আর অতিথির দায়িত্ব ছিল ঘুরে ঘুরে পরবর্তী উৎপাদন কর্মযজ্ঞ কীভাবে চালাতে হবে, প্রত্যেকটি যৌথ পরিবার বা গোষ্ঠীকে পরমার্শ দেওয়া। এরা এক বাড়িতে তিনি রাত্রির বেশি কাটাতেন না।
 
আচারটি বহু পরেও ব্রাহ্মণদের মধ্যে কমবেশি প্রচলিত ছিল। মানুষ ছাড়া অন্য জীবও অতিথি হতে পারে। যেমন অতিথি পাখি। তবে মানুষ সুযোগ পেলে অতিথির ক্ষতি করতেও ছাড়ে না। কী সুন্দর অতিথি পাখিগুলো মানুষের লালসার শিকার হয়। আবার এমন অনেক অতিথি আছে, যারা সুযোগ পেলে আশ্রয়দাতার ক্ষতি করতে ছাড়ে না। পরজীবীদের কথা ভাবা যায়। মানুষের মধ্যেও এমন স্বভাব লক্ষণীয়।
 

 — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — —

বাকি অংশ এবং অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর দেখার জন্য নিচের লিংক
 
 
লিংক: https://draminbd.com/শুদ্ধ-বানান-চর্চা-শুবাচ-থ-6/
 
 
লিংক:  https://draminbd.com/শুদ্ধ-বানান-চর্চা-শুবাচ-থ-5/
 
 
লিংক: https://draminbd.com/শুদ্ধ-বানান-চর্চা-শুবাচ-থ-4/
 
 
 
 
 
শুবাচ -ওয়েবসাইট: www.draminbd.com
 
 
error: Content is protected !!