শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) থেকে শুবাচির প্রশ্ন শুবাচির উত্তর: (৪৫-৬০)

ড. মোহাম্মদ আমীন

৪৫. অতিথি
যার অত্ গতি (ক্ষণকালের জন্য) থেমে গেছে- সে-ই অতিথি। যার তিথি নেই; স্থিতি নেই; যে যায়, থাকে না তিনিই অতিথি। অনিত্যাবস্থানের কারণে যার তিথি বা দিন বা সময়-অসময় নেই তিনিও অতিথি। আবার অভ্যাগত, গৃহাগত, আগন্তুক/একরাত্র পরগৃহবাসী ব্রাহ্মণ অর্থেও অতিথি বুঝানো হতো। মিতাক্ষরা মতে অতিথি তিন প্রকার। যথা : পথিক, শ্রোত্রিয় ও বেদপারগ। রামচন্দ্রের পৌত্র ও কুশের পুত্রকেও অতিথি বলা হতো। অতিথি শব্দটি এখন ‘আমন্ত্রিত-অভ্যাগত’ অর্থে বহুল প্রচলিত। তবে প্রারম্ভে এর অর্থ ছিল কিছুটা ভিন্ন।
 
প্রাচীনকালে ‘তিথি’ অর্থে তৎকালীন গোষ্ঠীর বা যৌথ পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে (যারা স্থিতি করে) এবং অতিথি অর্থে (যারা স্থিতি করে না) এমন সমাজের পরিদর্শক গোষ্ঠীর প্রত্যেক ব্যক্তিকে বোঝাত। অত্রি (পরিদর্শক) প্রজাপ্রতির কালে, যখন রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়নি, অথচ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছোটখাট বিভাজন ঘটে গেছে, তখন গৃহকর্তার দায়িত্ব ছিল অতিথি সৎকার। আর অতিথির দায়িত্ব ছিল ঘুরে ঘুরে পরবর্তী উৎপাদন কর্মযজ্ঞ কীভাবে চালাতে হবে, প্রত্যেকটি যৌথ পরিবার বা গোষ্ঠীকে পরমার্শ দেওয়া। এরা এক বাড়িতে তিনি রাত্রির বেশি কাটাতেন না।
 
আচারটি বহু পরেও ব্রাহ্মণদের মধ্যে কমবেশি প্রচলিত ছিল। মানুষ ছাড়া অন্য জীবও অতিথি হতে পারে। যেমন অতিথি পাখি। তবে মানুষ সুযোগ পেলে অতিথির ক্ষতি করতেও ছাড়ে না। কী সুন্দর অতিথি পাখিগুলো মানুষের লালসার শিকার হয়। আবার এমন অনেক অতিথি আছে, যারা সুযোগ পেলে আশ্রয়দাতার ক্ষতি করতে ছাড়ে না। পরজীবীদের কথা ভাবা যায়। মানুষের মধ্যেও এমন স্বভাব লক্ষণীয়।
 
 
৪৬. লুডুম্যানিয়া
ইংরেজি Ludomania অর্থ জুয়াবাতিক, জুয়ার প্রতি প্রচণ্ড নেশা, gambling addiction, জুয়া খেলার অপ্রতিরোধ্য এবং অনিয়ন্ত্রিত নেশা। ক্যাসিনো, ঘোড়দৌড় কিংবা নানা অনিশ্চিত বিষয়ে বাজি প্রভৃতি জুয়ার অন্তর্ভুক্ত। যারা জুয়া না খেলে থাকতে পারে না এবং জুয়া খেলতে না পারলে উন্মাদের মতো আচরণ করে তাদের লুডুম্যানিয়াক বলে। জুয়ার প্রতি এরা এত আসক্ত হয় যে, নিজের সহায়সম্পদ এমনকি স্ত্রীপুত্র পর্যন্ত বিসর্জন দিতে দ্বিধা করে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি মারাত্মক মানসিক রোগ।
 
৪৭. বাংলা আচ্ছা এখন Accha রূপে ইংলিশ 
বাংলায় বহুল ব্যবহৃত আচ্ছা শব্দটি ইংরেজি বর্ণে accha বানানে ক্যামব্রিজ ডিকশনারি (Cambridge Dictionary) গ্রন্থে ঠাঁই পেয়েছে। ফলে আচ্ছা শব্দটি ইংরেজি নাগরিকত্ব পেয়ে  ইংরেজি শব্দ হয়ে বিশ্বব্যাপী পরিচিত শব্দে পরিণত হলো। ওই অভিধানে (ক্যামব্রিজ ডিকশনারি) বলা হয়েছে, ‍accha ভারতীয় ইংলিশ। তবে, বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, এটি খাঁটি বাংলা শব্দ। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধনমতে, সংস্কৃত অস্তু থেকে উদ্ভূত আচ্ছা অর্থ— (অব্যয়ে) হ্যাঁ, সম্মতিসূচক শব্দ। ধরা যাক এবং (বিশেষণে) বেশ, খাসা; ব্যঙ্গার্থে— বিলক্ষণ।
 
প্রতিবছর কিছু নতুন শব্দ ইংরেজি অভিধানে স্থান পায়।  এজন্য একটি কমিটি রয়েছে। কমিটির সদস্যগণ বলেছেন— ভারতীয় (বাংলা) আচ্ছা শব্দটি যুক্তরাজ্যে বহুল প্রচলিত। দীর্ঘকাল হতে শব্দটি ব্রিটেনের প্রায় সর্বত্র  সর্বভাষীর কাছে ভারতীয় অর্থে  ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তাই শব্দটিকে অভিধানভুক্ত করা যৌক্তিক। ক্যামব্রিজ অভিধানে  আচ্ছা শব্দকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা নিচে দেওয়া হলো:
accha
exclamation Indian English (also achha) UK /ˈætʃ.ɑː/ US /ˈætʃ.ɑː/
used for showing that you agree with something or understand something: Accha, that’s good. Go ahead!
 
used for showing surprise or happiness:
“I managed to buy it for half the price.” “Accha!”
 
৪৮. পি-পু-ফি-শু 
পি-পু-ফি-শু একটি ব্যতিক্রমী, কিন্তু বেশ অর্থবহ বাংলা শব্দ। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে এটি দেশি শব্দ। বিশেষ্যে শব্দটির অর্থ, পিঠ পুড়ছে ফিরে শুই, কিন্তু বিশেষণে শব্দটির অর্থ অত্যন্ত অলস, কুঁড়ের বাদশা প্রভৃতি। বাংলা ভাষায় একটি শব্দে তিনটি হাইফেন, চাট্টিখানি কথা নয়।
 
৪৯.মাইরি বলছি!
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, পোর্তুগিজ (maria) থেকে উদ্ভূত মাইরি অর্থ (অব্যয়ে) যিশু খ্রিষ্টের মা মেরির নামে দিব্যি; বিরক্তি বা ক্রোধসূচক উক্তি। পোতুর্গিজদের মুখে চড়ে maria কথাটি ভারতবর্ষ আসে। পরবর্তীকালে তা ভারতবাসীর মুখে মাইরি হয়ে যায়। এখন অনেকের মুখে শুনি ‘মাইরি’।
ছেলে বলছে: মাইরি বলছি মা, বাবার পকেট থেকে চুরি করে তোমার ভ্যানিটি ব্যাগে রাখা টাকাগুলো আমি চুরি করিনি।
মা বলছেন, মাইরি বলছি খোকা, ওই টাকাগুলো তোমার বাবার পকেট থেকে নয়, আমার বাবার বাড়ি থেকে এনেছি। আমার টাকা না নিলে তোমার পকেটে টাকা এল কোত্থেকে?
মাইরি বলছি মা, এগুলো আমার বাবার টাকা।
 
৫০. চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ সমক্ষ
 
চাক্ষুষ : সংস্কৃত ‘চাক্ষুষ (চক্ষুস্‌+অ)’ শব্দের অর্থ হচ্ছে, চোখে চোখে লব্ধ, চোখে দেখা, প্রত্যক্ষ (চাক্ষুষ প্রমাণ) ইত্যাদি। বাক্যে এটি বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
প্রত্যক্ষ : সংস্কৃত ‘প্রত্যক্ষ (প্রত্যক্ষ+অ)’ শব্দের অর্থ, দৃষ্ট, চাক্ষুষ (প্রত্যক্ষ প্রমাণ), ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, প্রত্যক্ষজ্ঞান প্রভৃতি। বাক্যে এটি বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সমক্ষ: সংস্কৃত, ‘সমক্ষ (সমক্ষ+অ)’ শব্দের অর্থ– প্রত্যক্ষ, অগ্রবর্তী প্রভৃতি।
শাব্দিক অর্থ পর্যালোচনায় দেখা যায়, শব্দ তিনটির (চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ সমক্ষ ) অর্থের মধ্যে মিল রয়েছে এবং আপাত-বিবেচনায় বাক্যে অভিন্ন অর্থ প্রকাশে ব্যবহার করা যায়। তবে অর্থের মিল থাকা আর অভিন্ন শব্দ হওয়া এক নয়। যমজ ভাইয়ের চেহারা অভিন্ন হতে পারে, দুজন মানুষের চেহারাও প্রায় অভিন্ন হতে পারে, কিন্তু অবয়ব আর আচরণে অবশ্যই ভিন্নতা থাকে। নইলে, ‘উভয়’ শব্দটির প্রয়োজন হতো না। কেউ বলতে পারেন, দুজনের চেহারা একই, কিন্তু কেউ বলতে পারেন না– দুজন অভিন্ন। ভাষার প্রতিটি শব্দের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। শব্দের এমন বৈচিত্র্যময়তা ভাষিক সৌন্দর্যের অন্যতম দিক।
বাক্যে শব্দত্রয় (চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ সমক্ষ ) অভিন্ন অর্থে প্রয়োগ করা গেলেও একই বিষয় প্রকাশে একই বাক্যে অভিন্ন শব্দে প্রয়োগ করা যায় না। তা করতে গেলে অর্থে, অনর্থ কিংবা বাক্যের সৌন্দর্যের হানি ঘটতে পারে, লাঞ্ছিত হতে পারে বাক্যের উদ্দেশ্য, দ্যোতনা এবং মোহনীয়তা। অভিন্নার্থের হলেও একাধিক শব্দের প্রয়োগের ধরণ বাক্যের প্রকৃতি ও গঠনের উপর নির্ভর করে। আলোচ্য তিনটি শব্দেরই সাধারণ অর্থ ‘প্রত্যক্ষ’, কিন্তু এই অর্থ প্রকাশে তিনটি শব্দ অভিন্ন ঘটনের বাক্যে প্রয়োগ করা হলে তা সুবুদ্ধির হবে না। যেমন :
একটি ঘটনা ঘটেছে, এটি কোনো ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে নয়, স্যাটেলাইটেও নয়; আপনি নিজ চোখে আপনার সামনে ঘটনাটি ঘটতে দেখেছেন, মানে প্রত্যক্ষ করেছেন। বিষয়টা আপনি সহজে কীভাবে বলবেন? আমি হলে বলতাম :
(১) ঘটনাটা আমি প্রত্যক্ষ করেছি।
(২) চাক্ষুষ ঘটনা।
চাক্ষুষ, প্রত্যক্ষ ও সমক্ষ- শব্দের সাধারণ একটি অর্থ ‘প্রত্যক্ষ’ বলে যদি লিখে বসি :
(২) ঘটনাটা আমি সমক্ষ করেছি।
(৩) ঘটনাটা আমি চাক্ষুষ করেছি।
তাহলে, আমার প্রকাশ আদর্শ হয়েছে এমন বলা যাবে না। আপনি প্রত্যক্ষ করে বলুন, শেষের দুটি বাক্য কেমন মনে হয়? মনে রাখতে হবে, সাধারণত বাক্যের গঠন আর বক্তার উদ্দেশ্যের উপর শব্দের প্রয়োগ নির্ভর, অর্থের উপর নয়। তা না হলে,
“বল, বুদ্ধিমানেরা বুদ্ধি দিয়ে বল খেলে, বল দিয়ে নয়” বাক্যের তিনটি ‘বল’ এর অর্থ ‘বলা, ফুটবল বা শক্তি’ হয়ে যেত।
এ বিষয়ে আপনারা আরও উদাহরণ ও ব্যাখ্যা দিয়ে নিবন্ধটিকে সমৃদ্ধ করতে পারেন।
 
৫১.  দীর্ঘপাদ
দীর্ঘ ও পাদ মিলে দীর্ঘপাদ শব্দের উদ্ভব। দীর্ঘপাদ শব্দের দীর্ঘ অর্থ— লম্বা এবং পাদ অর্থ— পা। সুতরাং, দীর্ঘপাদ অর্থ— লম্বা পা। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত দীর্ঘপাদ (দীর্ঘ+√ পদ্‌+অ) অর্থ— (বিশেষণে) লম্বা পা-বিশিষ্ট (উট বক সারস প্রভৃতি প্রাণী)।
 
৫২. অকাম ও অকাম
বাংলা ভাষায় দুটি অকাম আছে। একটি সংস্কৃত অকাম এবং আর একটি বাংলা অকাম। আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত অকাম (ন+√কম্‌+অ) অর্থ— (বিশেষণে) নিষ্কাম, জিতেন্দ্রিয়, ইন্দ্রিয়পরায়ণ নয়, যংযমী; অত্যন্ত চরিত্রবান এমন। অর্থাৎ অত্যন্ত চরিত্রবান এবং ভালো ও সংযমী মহৎ ব্যক্তি সংস্কৃত অকাম গুণের অধিকারী হয়। বাংলা অকাম অর্থ— (বিশেষ্যে) অকাজ, কুকাজ, চরিত্রহীনের কাজ। বাংলা অকাম খারাপ। সংস্কৃত অকাম ভালো।
 
৫৩. রাজাকার অর্থ কী
রাজাকার ফারসি শব্দ। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত রাজাকার অর্থ— বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে (১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে) নারীনির্যাতন ও গণহত্যা-সহ বলপূর্বক ধর্মান্তকরণ, অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক লুটতরাজের জন্য দায়ী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তাকারী ব্যক্তি; (২) ঘৃণ্য ব্যক্তি; (৩) গালিবিশেষ; (৪) স্বেচ্ছাসেবক। শব্দটির অর্থ একসময় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ইতিবাচক ছিল। তবে এখন এটি মারাত্মক নেতিবাচক একটি শব্দ। ব্যক্তির কাজ শুধু ব্যক্তিকে নয়, শব্দকেও দূষণীয় করে দেয়। যেমন: মীরজাফর, হিটলার, বয়কট প্রভৃতি।
 
৫৪. যুদ্ধপরাধী
সংস্কৃত যুদ্ধপরাধী (যুদ্ধ+অপরাধ+ইন্) অর্থ— যুদ্ধ চলাকালে যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জেনেভা কনভেনশনের নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে।  বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে যুদ্ধপরাধী শব্দের আর একটি অর্থ দেওয়া হয়েছে সেটি হচ্ছে— বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ব্যাপক নারী-নির্যাতন, গণহত্যা-সহ বলপূর্বক ধর্মান্তরণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দায়ী ব্যক্তিবর্গ।
 
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে,  রাজাকার কেবল তারাই যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে (১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে) নারীনির্যাতন ও গণহত্যা-সহ বলপূর্বক ধর্মান্তকরণ, অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক লুটতরাজের জন্য দায়ী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করছে। কিন্তু  অনুরূপ অপরাধকারী ও সহায়তাকারী উভয়ে যুদ্ধপরাধী। সুতরাং, সকল রাজাকার যুদ্ধপরাধী, কিন্তু সকল যুদ্ধপরাধী রাজাকার নয়।
৫৫. ঝোপ, ঝাড় ও ঝোপঝাড়
 
ঝোপ ও ঝাড় মিলে ঝোপঝাড় । সংস্কৃত ক্ষুপ থেকে উদ্ভূত ঝোপ অর্থ — (বিশেষ্যে) মাঝারি উচ্চতার বিভিন্ন উদ্ভিদের ঝাড় বা জঙ্গল। ঝোপঝাড় শব্দের সঙ্গে যুক্ত ঝাড় দেশি শব্দ। এর অর্থ— (বিশেষ্যে) ছোটো গাছের জঙ্গল, ঝোপ। এছাড়া দেশি ঝাড়-এর আরও কিছু অর্থ আছে। যেমন— স্তবক, গুচ্ছ; গোষ্ঠী, বংশ; শাখাপ্রশাখা দীপাধার। অভিধানে পৃথক ভুক্তিতে আর একটি ঝাড় রয়েছে। সেটি হিন্দি ঝাড়। এর অর্থ— পরিমার্জন, পরিষ্করণ; ভর্ৎসনা, প্রহার, অপহরণ। আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, ঝোপঝাড় অর্থ— (বিশেষ্যে) গুল্ম ও লতাপাতায় আচ্ছাদিত স্থান।
ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে আাছে কয়েকটি শিয়াল। গ্রামেও এখন ঝোপঝাড় তেমন দেখা যায় না। ৫৫.

৫৬. অধর্ম মিথ্যা দম্ভ মায়া লোভ ক্রোধ হিংসা কলি ভয় ও মৃত্যু-এর জন্মবৃত্তান্ত

ভারতীয় পুরাণমতে, দ্বাপরের অবসানে ব্রহ্মার পৃষ্ঠদেশ হতে অধর্মের সৃষ্টি হয়। অধর্মের স্ত্রীর নাম মিথ্যা। মিথ্যার গর্ভে ও অধর্মের ঔরসে দম্ভ নামের এক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। দম্ভ নিজ ভগিনী মায়াকে বিবাহ করেন এবং তাঁদের ‘লোভ’ নামের এক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। লোভ নিজের ভগিনী নিবৃতিকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের ক্রোধ নামের এক পুত্র ও হিংসা নামের এক কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। ক্রোধ নিজ ভগিনী হিংসাকে বিবাহ করেন। তাঁদের কলি নামের এক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। কলি নিজের ভগিনী দ্বিরুক্তিকে বিয়ে করেন। তাদের ‘ভয়’ নামের এক পুত্র এবং ‘মৃত্যু’ নামের এক কন্যার জন্ম হয়। এ কলিই ‘কলি’ যুগের প্রতিষ্ঠাতা।‘কলি’ যুগপ্রবর্তক দেবতা। তাঁর নামানুসারে বর্তমান যুগের নাম কলিযুগ। পৃথিবী ৪,৩২,০০০ বছর এ দেবতার অধিকারে থাকবে। এ যুগের শেষে ভগবান বিষ্ণু কল্কিরূপে আবির্ভূত হবেন।
 
৫৭.  বিপক্ষ বনাম বিরুদ্ধ
বিপক্ষ: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত বিপক্ষ (বি+পক্ষ) অর্থ— (বিশেষ্যে) বিরুদ্ধপক্ষ; অনিষ্টকারী পক্ষ; শত্রু। বিপক্ষপাতী অর্থ— বিরুদ্ধ মতাবলম্বী বা শত্রুর পক্ষ অবলম্বনকারী। কিন্তু বিপক্ষীয় অর্থ— বিরোধী দলভুক্ত; বিপক্ষসংক্রান্ত। বিপক্ষীয় ছাড়া বাকি দুটো শব্দের অর্থে  শত্রু রয়েছে।
 
বিরুদ্ধ:  সংস্কৃত বিরুদ্ধ (বি+√রুধ্+ত)  অর্থ— (বিশেষণে) ১. প্রতিকূল, পরিপন্থি (প্রথবিরুদ্ধ, মানবতাবিরুদ্ধ);  উল্টা, বিপরীত (বিরুদ্ধ কথা, বিরুদ্ধ মত); বিরোধী ( বিরুদ্ধ দলের খেলোয়াড়), বিপক্ষীয়।
 
বিপক্ষ শব্দটি বাক্যে সাধারণত বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু বিরুদ্ধ শব্দটি ব্যবহৃত হয় বিশেষণ রূপে। আভিধানিক অর্থ বিশ্লেষণে দেখা  যায়— বিরুদ্ধ শব্দে শত্রু ও অনিষ্টকারী পক্ষ  রয়েছে, কিন্তু বিপক্ষ শব্দে সরাসরি শত্রু বা শত্রুতা কিংবা অনিষ্টের কোনো ইঙ্গিত নেই। তাই, শত্রু বা শত্রুতা প্রকাশে বিপক্ষ শব্দটি অধিকতর যুক্তিযুক্ত। সুতরাং, বিরুদ্ধ শব্দের চেয়ে বিপক্ষ শব্দটি অধিক নেতিবাচক।  শত্রুতা বা অনিষ্টকারী বাদ দিলে উভয় শব্দ সমার্থক। যেমন: জার্মান-ইংল্যান্ড খেলায় রহিম
, কামালের বিপক্ষ দলের সমর্থক ছিল। জার্মান-ইংল্যান্ড খেলায় রহিম, কামালের বিরুদ্ধ দলের সমর্থক ছিল। অভিধানের অর্থ অনুযায়ী,  “সে আমার শত্রু” কথাটি “সে আমার বিপক্ষ” কথা দিয়ে প্রকাশ করা যায়; কিন্তু “সে আমার বিরুদ্ধ” বাক্য দিয়ে প্রকাশ করা সমীচীন হবে না।
অর্থাৎ, সকল বিপক্ষই বিরুদ্ধ; কিন্তু সকল বিরুদ্ধ, বিপক্ষ নয়।
 
৫৮. ক্ষেত্রজ, ক্ষেত্রজ পুত্র
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে,  সংস্কৃত ক্ষেত্রজ (ক্ষেত্র+√জন্‌+অ) অর্থ— (বিশেষণে) জমিতে উৎপন্ন, কৃষিজাত; খেত থেকে উৎপন্ন; নিজ পত্নীর গর্ভে, কিন্তু অন্য পুরুষের ঔরসজাত। কারও স্ত্রীর গর্ভে অন্য পুরুষের  শুক্রাণু থেকে জাত সন্তানকে বলা হয় ক্ষেত্রজ সন্তান বা ক্ষেত্রজ পুত্র। মহাভারতে যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুন ক্ষেত্রজ বা ক্ষেত্রজ পুত্র। 
পাণ্ডু  রাজাকে  কিমিন্দম মুনি  অভিশাপ দিলেন যে,  কোনো নারীর সঙ্গে সংগম করলে পাণ্ডু মারা যাবেন।। তাই তিনি স্ত্রী সংগম থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হন। ফলে তিনি তাঁর স্ত্রীদ্বয়ের গর্ভে সন্তান লাভ করতে পারলেন না। এ অবস্থায় পাণ্ডু তাঁর স্ত্রী কুন্তীকে ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপাদনের জন্য অন্য পুরুষকে গ্রহণ করার অনুরোধ করেন। কুন্তী সন্তান কামনায় তিনবার তিন দেবতাকে আহ্বান করেন। প্রথমে তিনি ধর্মকে এবং দ্বিতীয় বার পবনকে সন্তান প্রদানের জন্য আহ্ববান করেন।  ধর্মের ঔরসে যুধিষ্ঠির এবং পবনের ঔরসে ভীম জন্মগ্রহণ করেন। শেষবার কুন্তি দেবরাজ ইন্দ্রকে আহ্বান করেন। ইন্দ্রের ঔরসে  অর্জুনের জন্ম  হয়।  এজন্য অর্জুন তৃতীয় পাণ্ডব নামে পরিচিত। 
 
৫৯. বৎসর ও বছর
 বৎসর:  সংস্কৃত বৎসর (বৎ+সর) অর্থ— (বিশেষ্যে) বারো মাসকাল, বছর, বর্ষ; অব্দ, সন। বছর: সংস্কৃত বৎসর থেকে উদ্ভূত বছর অর্থ ১২ মাসব্যাপী কালপর্ব; বৎসর-এর চলিত রূপ। অর্থাৎ বছর হলো বৎসর শব্দের চলিত রূপ। দুটো সমার্থক।
 
৬০. ল্যাটা ও ল্যাঠা
ল্যাটা দেশি শব্দ।  এর অর্থ— (বিশেষ্যে) মাছবিশেষ, লইট্টা, লটে, লটিয়া। অন্যদিকে, দেশি ল্যাঠা অর্থ— (বিশেষ্যে) উৎপাত, ঝামেলা, বিপদ, বিঘ্ন, সংকট। ল্যাটা কোনো ল্যাঠা ঘটায় না। ল্যাটা খুব নরম প্রকৃতির মাছ।

 
— — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — —
বাকি অংশ এবং অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর দেখার জন্য নিচের লিংক
 
 
 
লিংক: https://draminbd.com/শুদ্ধ-বানান-চর্চা-শুবাচ-থ-4/
 
 
 
 
 
শুবাচ -ওয়েবসাইট: www.draminbd.com
 
 
সূত্র:
১, ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
২. বাংলা ভাষার মজা, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
৩. কোথায় কী লিখবেন বাংলা বানান প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
error: Content is protected !!