শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) থেকে শুবাচির প্রশ্ন শুবাচির উত্তর: (৭৬-৯০)

ড. মোহাম্মদ আমীন

৭৫. নাসিক্যধ্বনি ও নাসিক্যবর্ণ: নাসিক্য ব্যঞ্জন বা নাসিক্য বর্ণ:
যে ধ্বনি বা শব্দ উচ্চারণের সময় ধ্বনিতাড়িত বায়ু মুখ দিয়ে বের না হয়ে নাক দিয়ে কিংবা  নাক ও মুখ উভয় স্বরযন্ত্র দিয়ে একসঙ্গে বের হয়, তাকে নাসিক্য ধ্বনি বলে। ধ্বনিসমূহ উচ্চারণের জন্য নাসিকা  আবশ্যক। তাই এদের নাম নাসিক্য বর্ণ বা অনুনাসিক বর্ণ। বাংলায় নাসিক্য ব্যঞ্জনধ্বনি ৩টি। যথা— ঙ, ন, ম। তবে নাসিক্য বর্ণ বা অনুনাসিক বর্ণ ৭ টি। যথা: ঙ, ঞ, ণ, ন, ম, ং, ঁ।  ঙ, ঞ, ণ, ন, ম  এই ৫টি বর্ণ পৃথক পাঁচটি বর্গের অন্তর্ভুক্ত। তাই এই পাঁচটি বর্ণকে বর্গীয় নাসিক্য বর্ণ বলা হয়। সুুতরাং, বাংলায় নাসিক্য বা অনুনাসিক বর্ণ— ৭টি।  তবে, মুহম্মদ আবদুল হাই মনে করেন, বাংলায় নাসিক্য বর্ণ ৬টি। যথা— ঙ, ঞ, ণ, ন, ম, ং। তাঁর মতে, (চন্দ্রবিন্দু) ঁ  কেবল অনুনাসিক স্বরধ্বনির চিহ্ন। এটি স্বতন্ত্র ধ্বনি পরিজ্ঞাপক কোনো বর্ণ নয়। তাই তিনি চন্দ্রবিন্দুকে বর্ণ স্বীকৃতি দেননি। 
 
৭৬. ওষুধ না কি ঔষধ; ঔষধি কী
ওষুধ ও ঔষধ দুটোই শুদ্ধ। ঔষধ সংস্কৃত বা তৎসম এবং ওষুধ খাঁটি বাংলা শব্দ। তবে ঔষধালয়, ওষুধালয় নয়। সংস্কৃত ঔষধ (ওষধি+অ) অর্থ— (বিশেষ্যে) রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধের জন্য প্রযুক্ত দ্রব্যাদি।ওষুধ ও ঔষধ পরস্পর সমার্থক। ঔষধি বাংলা শব্দ। এর অর্থ— (বিশেষে) যে সকল গাছগাছড়া থেকে ওষুধ/ঔষধ তৈরি হয়।
 
৭৭. লবণ লাবণ লাবণি ও লাবণ্য
সংস্কৃত লবণ (√লু+অন) অর্থ— (বিশেষ্যে) সোডিয়াম ও  ক্লোরিন পরমাণুর রাসায়নিক বিক্রিয়াজাত কেলাসিত খনিজপদার্থ, সমুদ্রের জল শুকিয়ে প্রাপ্ত লবণাক্ত সাদা যৌগবিশেষ, নুন। ইংরেজিতে যাকে বলা হয়: salt. সংস্কৃত লবণাক্ত (লবণ+অক্ত) অর্থ—  (বিশেষণে) লবণমিশ্রিত, ক্ষারযুক্ত, লোনা স্বাদযুক্ত, লোনা, নোনা। লাবণ (লবণ+অ) অর্থ— (বিশেষণে) লবণাক্ত, লোনা, নোনা। অর্থাৎ, লবণাক্ত ও লাবণ সমার্থক। 
 
লাবণি ও লাবণ্য শব্দের উদ্ভব লবণ থেকে। তবে শব্দদুটোর সঙ্গে তাদের জন্মদাতা লবণের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। সংস্কৃত লাবণ্য থেকে উদ্ভূত লাবণি অর্থ— (বিশেষ্যে) সৌন্দর্য, কান্তি, শ্রী, শোভা, লাবণি। অর্থাৎ লাবণি ও লাবণ্য (লবণ+য) সমার্থক।
 
৭৮. প্রাক্তন ও সাবেক
সংস্কৃত শব্দ ‘প্রাক্তন’ এর অর্থ বিশেষণে ভূতপূর্ব, জন্মান্তরবিষয়ক এবং বিশেষ্যে পূর্বজন্মে কৃতকর্মের ফল, ভূতপূর্ব কর্মী প্রভৃতি। তবে সাধারণত শব্দটি ভূতপূর্ব অর্থে অধিক ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আরবি ‘সাবিক’ থেকে উদ্ভূত এবং বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত ‘সাবেক’ শব্দের অর্থ প্রাচীন, পুরাতন, পূর্বেকার প্রভৃতি। শব্দার্থ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘প্রাক্তন’ ও ‘সাবেক’ খুব ক্ষেত্রে সমার্থক।
 
জনাব খুরশেদ আহমেদ লিখেছেন, “ ‘অভিধানতত্ত্বে এমন কথা বলা হয় যে, কোনো শব্দেরই আর একটা হুবহু প্রতিশব্দ হয় না।’যেখানে সমার্থক, সেখানেও ওরা অভিন্ন নয়; কোনো-না-কোনো ভাবে এদের অনন্য দ্যোতনা থাকে। যেখানে ‘প্রাক্তন’ ও ‘সাবেক’ সমার্থক, সেখানে, সাধারণভাবে, তৎসম-প্রধান শৈলীতে ‘প্রাক্তন’-এর ব্যবহার ও অতৎসম-প্রধান শৈলীতে ‘সাবেক’ ‘সাবেকি’ ইত্যাদির ব্যবহার অধিকতর লাগসই হতে পারে। আবার, তৎসম-অতৎসম-নির্বিশেষে আলোচনার প্রসঙ্গ-প্রতিবেশ ও বাগ্বিধি ‘প্রাক্তন’ ও ‘সাবেক’ ইত্যাদির প্রয়োগের নির্ণায়ক হতে পারে।”
 
অতএব, আমরা বলতে পারি – ‘প্রাক্তন’ ও ‘সাবেক’ শব্দের প্রয়োগে কোনো কঠিন বিধি নেই। তবে, অনেকে মনে করেন, গত হওয়া সময় তুলনামূলকভাবে কম হলে ‘প্রাক্তন’ এবং অধিক হলে ‘সাবেক’ লেখা সমীচীন। যেমন : প্রাক্তন অধ্যক্ষ সাহেব মাঝে মাঝে কলেজে বেড়াতে আসেন। সাবেক অধ্যক্ষ মৃদুল বাবু তিন বছর আগে মারা যান। ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাধারণত প্রাক্তন শব্দটি বেশি লেখা হয়। যেমন : প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর শাসনামল, বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি; সাবেক সরকারের আমল প্রভৃতি।
 
৭৯. মহামান্য আগত, শুভেচ্ছা ও স্বাগত
যুক্তরাজ্যের রানিকে বলা হয় Her Majesty এবং রাজাকে বলা হয় His Majesty। ল্যাটিন maiestas শব্দ থেকে Majesty শব্দের উদ্ভব। যার অর্থ greatness, যা, জানামতে — খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ অব্দ থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্বাধীন রাষ্ট্রের শাসকবৃন্দের সম্বোধন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রে প্রধান শাসকের সম্বোধনে Imperial Majesty কথাটিও ব্যবহৃত হতো। খ্রিষ্টপূর্ব দশম অব্দ পর্যন্ত এই সম্বোধনটির ব্যবহার বেশ আকর্ষণীয় ছিল।
স্বাধীন ভূখণ্ডের শাসকদের সম্বোধন হিসেবে ইউরোপের অনেক দেশে Majesty ছাড়াও Imperial/Royal- Highness ব্যবহৃত হতো। এসব শব্দের ব্যবহার শুরু হয় রোমান সাম্রাজ্য থেকে।যা ক্রমশ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এসব রাজকীয় সম্বোধন কার জন্য এবং কীভাবে ব্যবহার করা হবে তার একটি নির্দিষ্ট বিধান ছিল। রোমান ও বাইজানটাইন সাম্রাজ্যে রাষ্ট্রদূত, সরকারের প্রতিনিধি, আদালতের বিচারক এবং উচ্চপদে নিয়োজিতদের Highness সম্বোধন করা হতো। রাজ পরিবারের সদস্যদেরও Highness (His/Her) বলা হয়। এখন পৃথিবীর সর্বত্র কুটনীতিকদের Highness সম্বোধন করা হয়।
হায়দ্রাবাদ (Hyderabad) এবং বেরার (Berar) নিজামকে ব্রিটিশরা Exalted Highness উপাধি দিয়েছিলেন। তাই তাঁদের Exalted Highness সম্বোধন করা হতো। মূলত এসব শব্দের অনুসরণে বাংলায় ‘মহামান্য’ ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে বলা হয়, “মহামান্য রাষ্ট্রপতি”। ‘মহামান্য’ শব্দটি কেবল রাষ্ট্রপতির জন্য ব্যবহার করা যাবে – এমন কোনো বিধান নেই। তাই যে-কেউ যে-কাউকে ‘মহামান্য’ বলতে পারে। স্মর্তব্য, ‘মহামান্য’ কথাটি অন্য কোনো ভাষার বাংলা অনুবাদ নয়, বরং একটি পারিভাষিক শব্দ।
 
৮০. শুভদৃষ্টি রুসুমাত
রুসুমাত আরবি হতে আগত। বাক্যে বিশেষ্যে হিসেবে ব্যবহৃত রুসুমাত শব্দের অর্থ (মুসলমানদের বিবাহ অনুষ্ঠানে) বর-কনের প্রথম পরস্পর মুখ দেখার সংস্কার; শুভদৃষ্টি।অর্থাৎ শুভদৃষ্টি ও রুসুমাত পরস্পর সমার্থক। 
 
৮১.-জি জি
 
বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত জি-জি আরবি উৎসের শব্দ। -জি হচ্ছে নামান্তে ব্যবহৃত সম্মানসূচক শব্দ। যেমন: মিয়াজি, লতাজি, প্রণবজি। -জি  সম্মানসূচক ও সম্বোধনবাচক শব্দ হিসেবেও নামের শেষে ব্যবহৃত হয়। যেমন: ওস্তাদজি, গুরুজি, নানাজি। জি মান্যব্যক্তির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। -জি বা জি আরবি উৎসের শব্দ। তাই বানানে ঈ-কার বিধেয় নয়।
 
৮২. গৎবাঁধা
গৎবাঁধা কথাটির আভিধানিক অর্থ নিয়ম বাঁধা, রুটিনমাফিক, একই প্রকার, অভিন্ন, গতানুগতিক প্রভৃতি। এটি একটি সংগীতসম্পৃক্ত শব্দ। ভারতীয় সংগীতে শব্দটির বহুল প্রচলন লক্ষণীয়। ‘গৎ’ শব্দের মূল অর্থ হলো বাজনার বোল। বোলের ওপর নির্ভর করে যন্ত্র বাজানোর উপযোগী ছন্দোবদ্ধ সংগীতই হলো ‘গৎ’। ‘গৎ’ মূলত খেয়াল গানের অনুকরণে রচিত একটি সংগীত কৌশল। ‘গৎ’-এর মাধ্যমে ধীরগতি ছন্দের খেয়াল চয়নের একটি সুনির্দিষ্ট অনড় নিয়ম আছে। এ নিয়ম সর্বত্র অভিন্ন এবং অপরিবর্তনীয়। এর মাধ্যমে পুরো সংগীত অভিন্নভাবে পরিচালিত হয়। কখনো কোনো হেরফের হয় না। গানের এ দৃঢ় রীতিটি মানুষের নিয়মবদ্ধ গতানুগতিক প্রাত্যহিক জীবনের একঘেয়েমি ও অভিন্নতা প্রকাশে ব্যবহার করা হয়।

৮২. উরু বনাম ঊরু

উরু: সংস্কৃত উরু (√ঊর্ণূ+উ) অর্থ— (বিশেষণে) প্রশস্ত, বিশাল, মহৎ।
প্রয়োগ: উরু বক্ষে তার অনন্ত দয়ার মহিমা। যেমন উরু তার বক্ষ তেমন উরু তার হৃদয়।
ঊরু: সংস্কৃত ঊরু (√ঊর্ণু+উ) অর্থ— (বিশেষ্যে) মানবদেহের কুঁচকি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ। এর সমার্থক শব্দ উরুত।
যেমন: দুর্ঘটনায় তার ঊরুর হাড় ভেঙে গেছে।
 
৮৩. স্পর্শ ধ্বনি: প্রাচীন বনাম আধুনিক
 প্রাচীন সংজ্ঞার্থ: যেসব ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণের সময়  জিভ বা জিব বা জিহ্বা  কণ্ঠ, তালু, মূর্ধা, দন্ত প্রভৃতি স্বরতন্ত্রীর কোনো না কোনো স্থান স্পর্শ করে তাদের স্পর্শধ্বনি বলে। ক থেকে ম পর্যন্ত মোট পঁচিশটি ধ্বনিকে স্পর্শধ্বনি বা স্পৃষ্টব্যঞ্জন। এসব ধ্বনির চিহ্নকে  স্পর্শবর্ণ বলে।  প্রাচীন সংজ্ঞার্থ  অনুযায়ী বাংলায় স্পর্শবর্ণের সংখ্যা ২৫ টি।
 
আধুনিক বা প্রমিত সংজ্ঞার্থ: যেসব ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণের সময় ফুসফুসতাড়িত বাতাস প্রথমে কিছুক্ষণের জন্য সম্পূর্ণ রূদ্ধ থেকে পরক্ষণে হঠাৎ  মুখ দিয়ে বেরিয়ে ধ্বনিটি উচ্চারিত হয়, তাদের স্পৃষ্টধ্বনি বা স্পর্শধ্বনি বলে। যেমন— ‘ট’  উচ্চারণের সময়  প্রথমে জিহ্বা ও তালু মিলে মুখের বাতাস বন্ধ করে দিচ্ছে। তারপর আবার হঠাৎ‌ বাতাস বের হয়ে ধ্বনিটি উচ্চারিত হচ্ছে। প্রমিত বা আধুনিক সংজ্ঞার্থ অনুযায়ী স্পর্শ বর্ণের সংখ্যা ১৬টি। যথা: ক, খ, গ, ঘ, ট, ঠ, ড, ঢ, ত, থ, দ, ধ, প, ফ, ব, ভ। প্রমিত বাংলায় “ঙ, ঞ, ণ, ন, ম, চ, ছ, জ, ঝ”  বর্ণ স্পর্শধ্বনির অন্তর্ভুক্ত নয়।
 
৮৪. শব্দার্থ ও বানান: অনতি যখন যুক্ত হয়
অনতি: সংস্কৃত অনতি (ন+অতি) অর্থ বেশি নয়, অল্প; তেমন বেশি নয় প্রভৃতি। অনতি অন্য শব্দের পূর্বে বসে অল্পতা প্রকাশ করে। যেমন:
অনতিকাল: অল্পসময়, বেশি সময় নয়।
অনতিক্রম: অতিক্রম না করে, লঙ্ঘন না করে।
অনতিদীর্ঘ: বেশি লম্বা নয় এমন, অল্প লম্ব।
অনতিদূর: খুব বেশি দূরে নয় এমন, অল্পদূরত্ববিশিষ্ট।
অনতিপক্ব: অল্প পাকা, বেশি পাকা নয়, ডাঁসা, অল্পবয়সি।
অনতিপূর্বে: ক্ষণকাল পূর্বে, অল্পকাল পূর্বে, একটু আগে।
অনতিবিলম্বে: খুব বেশি দেরি না করে, অল্প সময়ের মধ্যে।
অনতিব্যক্ত: প্রায় অপ্রকাশিত, খুব স্পষ্ট নয় এমন, অস্পষ্টভাবে ব্যক্ত।
অনতিমূল্যবান: তেমন মূল্যবান নয় এমন, সাধারণ।
অনতিস্ফুট: পুরোপুরি ফোটেনি এমন।
অনতীত: অতিক্রান্ত হয়নি এমন।
অনতীতবাল্য: বাল্যকাল অতিক্রম হয়নি এমন।
 
৮৫. ময়না ও ময়নাতদন্ত 
‘ময়না’‘তদন্ত’ শব্দের সমন্বয়ে ‘ময়নাতদন্ত’ শব্দ গঠিত।‘তদন্ত’ শব্দের অর্থ কোনো বিষয়ে তদন্ত করে সত্য নিরূপণ। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ‘ময়না’ শব্দের তিনটি অর্থ আছে। ‘ময়না’ যখন দেশি শব্দ তখন এর অর্থ, কালো পালকাবৃত শালিকজাতীয় পাখি। ‘ময়না’ যখন সংস্কৃত শব্দ তখন এর অর্থ, ডাকিনি বা খল স্বভাবের নারী। অভিধানে সংস্কৃত ‘ময়না’ শব্দ দ্বারা বাংলা লোকসংগীতের রাজা মানিকচন্দ্রের জাদুবিদ্যায় পারদর্শী পত্নীকেও চিহ্নিত করা হয়েছে। ‘ময়না’ যখন আরবি শব্দ তখন এর অর্থ অনুসন্ধান। আরবি ‘মু’আইনা’ শব্দের অর্থ, চক্ষু দিয়ে, চোখের সামনে, প্রত্যক্ষভাবে, পরিষ্কারভাবে । বাংলায় এসে শব্দটি তার আসল রূপ হারালেও অন্তর্নিহিত অর্থ পুরোপুরি হারায়নি। ‘মু’আইনা’ বাংলায় এসে ‘ময়না’ হয়ে গেলেও ‘অনুসন্ধান’ অর্থ নিয়ে সে তার মূল অর্থকে আরও ব্যাপকভাবে প্রসারিত করেছে। এভাবে শব্দার্থের নানা পরিবর্তন ঘটে।
‘ময়নাতদন্ত’ শব্দের ‘ময়না’ বাংলা ও সংস্কৃত ‘ময়না’ নয়। এটি হচ্ছে ‘আরবি’ ময়না। মূলত আরবি ‘মু’আয়িনা’ শব্দ থেকে বাংলায় অনুসন্ধান অর্থে ব্যবহৃত ‘ময়না’ শব্দের উদ্ভব। এই আরবি ‘ময়না’ শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত ‘তদন্ত’ শব্দ যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে ‘ময়নাতদন্ত’ শব্দ। যার অর্থ, অস্বাভাবিক বা আকস্মিক মৃত্যুর কারণ উদ্‌ঘাটনের উদ্দেশ্যে শবব্যবচ্ছেদ। বাংলায় ব্যবহৃত ‘ময়নাতদন্ত’ শব্দটির ইংরেজি অর্থ Post-mortem এবং এর অর্থ, An examination of a dead body to determine the cause of death.
 
শব্দ ও শব্দার্থ
৮৬. স্থূল বুদ্ধি বিকৃত বুদ্ধি ও বুলি
স্থুল বুদ্ধি : সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধিহীন। অগভীর জ্ঞানসম্পন্ন। বিকৃতবুদ্ধি: বুদ্ধির বিকার ঘটেছে এমন। যথাযথ চিন্তাচেতনাহীন। বুলি: যথাযথ অর্থ বহন করে না এমন কথা যা অভ্যাসের বশে বলা হয়ে থাকে। যে কথা পরবর্তীকালে আর খেয়াল থাকে না, মূল্য থাকে না।
 
৮৭: আর্থিক ও আত্মিক
আত্মিক: মনোজাগতিক। চিন্তাচেতনার ক্ষেত্রে।
আর্থিক: অর্থ-সম্পদবিষয়ক, টাকাপয়সা ও ধনদৌলতসংক্রান্ত।
 
৮৮. মনুষ্যত্ব, তপোবন, চর্মচক্ষু
মানুষ্যত্ব অর্থ মানবোচিত সদগুণাবলি। মানুষের বিশেষ গুণ বা বৈশিষ্ট্য। তপোবন: অরণ্যে ঋষির আশ্রম। মুনি ঋষিরা তপস্যা করে এমন বন। চর্মচক্ষু: দৈহিক চক্ষু। [মানসিক বা দিব্যদৃষ্টির বিপরীত]
 
৮৯. নতি, সাধনা মনুষ্যত্ব ও সৃজনশীল সৃষ্টিধর্ম
  নতি: অবনত ভাব। বিনয, নম্রতা। সাধনা: সাফল্য বা সিদ্ধি অর্জনের জন্য নিরন্তন প্রচেষ্টা। মনুষ্যত্ব: মানবোচিত সদগুণাবলি। মানুষের বিশেষ গুণ বা বৈশিষ্ট্য। সৃজনশীল: নির্মাণ ও সৃষ্টিতে তৎপর। সৃষ্টিধর্ম: সৃষ্টি বা সৃজনের বৈশিষ্ট্য।
 
 
৯০. কোন বানানগুলো সঠিক?
১। বট গাছ নাকি বটগাছ; ২। নারিকেল গাছ নাকি নারিকেলগাছ; ৩। তাল গাছ নাকি তালগাছ; ৪। পুঁটি মাছ নাকি পুঁটিমাছ; ৫। কৈ মাছ নাকি কৈমাছ;  ৬। গোলাপ ফুল নাকি গোলাপফুল; ৭। চাঁদ মামা নাকি চাঁদমামা; ৮। মন্ত্রী মশাই নাকি মন্ত্রীমশাই; ৯। ছোটো ভাই নাকি ছোটোভাই; ১০। মজিদ মিয়া নাকি মজিদমিয়া; ১১। রাতুল সোনা নাকি রাতুলসোনা; ১২। মৃদুল বাবু নাকি মৃদুলবাবু; ১৩। মন্ত্রী বাবু নাকি মন্ত্রীবাবু; ১৪। বাবু সোনা নাকি বাবুসোনা? (শুবাচি জনাব নাবিদ হাসানের প্রশ্ন)।
 
 
উপর্যুক্ত প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে শুবাচি জনাব মাহমুদ হাসান (Mahmudul Hasan)-এর মন্তবোত্তর দেখুন:
একসঙ্গে লেখা আর আলাদা লেখা নিয়ে ব্যাপক মতভেদ আছে। লেখকদের লেখার মাঝে এ ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়। ছোটোবেলায় ‘‘ঐ দেখা যায় তাল গাছ…পুঁটি মাছ পাই না” পড়েছি। কিন্তু সেসব বইয়ে বানানের প্রতি গুরুত্ব লেশমাত্রও ছিল বলে মনে হয় না। তাই এক্ষেত্রে অভিধানের উপর ভরসা করাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে আমি মনে করি।
 
নিম্নে আমি সর্বশেষ সংশোধিত এনসিটিবির উচ্চমাধ্যমিক ‘সাহিত্যপাঠ’-টি অনুসরণ করেছি। পাশাপাশি আগের যা কিছু পড়াশোনা ছিল, তার উপর ভিত্তি করে লিখেছি। কারো দৃষ্টিতে ভুল ধরা পড়লে যুক্তিসুন্দর সংশোধনী(সম্ভব হলে উৎস-সহ) আশা করছি।
 
১+২+৩। বটগাছ, নারিকেলগাছ, তালগাছ। [সমাসবদ্ধ পদ একসঙ্গে হয়। সহজে, সকল গাছের নাম একসঙ্গে লিখুন। তবে চারা গাছ, মরা গাছ বিশেষণ নির্দেশ করায় আলাদা হবে। তদ্রূপ ‘বাগান’, ‘ঝাঁড়’, ‘ক্ষেত’ প্রভৃতি যুক্ত শব্দগুলোও একসঙ্গে হবে। যেমন: আমবাগান, বাঁশঝাড়(তবে ‘মুলি বাঁশ’ আলাদা), মরিচক্ষেত ইত্যাদি।]
 
৪+৫। পুঁটি মাছ, কই মাছ। [❎কৈ ✅কই || সব মাছের নাম আলাদা লিখুন। আমরা ‘কই মাছের প্রাণ’ লিখি কিন্তু ‘কইমাছের প্রাণ’ লিখি না। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের একটি গবেষণাপত্রে ‘পুঁটি মাছ’ লেখা হয়েছে। উল্লেখ্য, ‘চারা গাছ’-এর মতো ‘পোনা মাছ’ না লেখাই ভালো। কারণ পোনা অর্থই ছোটো মাছ। তাই শুধু ‘পোনা’ ব্যবহার করুন। একইভাবে সরপুঁটি, রাজপুঁটি প্রভৃতি শব্দগুলোও একসঙ্গে হবে। ]
 
৬। গোলাপফুল [গাছের মতোই এক নিয়ম। “দশ ফ্রাঁ দিলে তুমি দুটি কি তিনটি অত্যন্ত চমৎকার গোলাপফুল পাবে।”—নেকলেস]
 
৭। চাঁদমামা [ছোটোবেলায় সবাই হয়তো পড়েছে আলাদাভাবে। তবে শব্দটি কর্মধারয় সমাস; আর সমাসবদ্ধ পদ বরাবরই একসঙ্গে হয়। ]
 
৮। মন্ত্রীমশাই [‘মশাই’ হলো ‘মহাশয়’-এর সংক্ষিপ্ত কথ্যরূপ। শব্দের সঙ্গে মিলিয়ে লেখা হয়। ষোলো আনার বৃথা জীবনের ‘বাবুমশাই’য়ের কবিতাটি নিশ্চয় মনে পড়ছে! “মন্ত্রীমশাই আসবেন আজ বিকেলবেলায়”—মন্ত্রীমশাই,শঙ্খ ঘোষ]
 
৯। ছোটো ভাই [ছোটো বা বড়ো এসব বিশেষণ নির্দেশ করে। তাই স্বভাবতই আলাদা হবে।]
 
১০।মজিদ মিয়া [সঠিক হবে ‘মিয়াঁ’ বা ‘মিঞা’। এটি ফার্সি শব্দ এবং বংশের নাম। তাই এ জাতীয় সকল শব্দই আলাদা হবে।] তবে নামের ক্ষেত্রে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। 
 
১১। রাতুল সোনা।[আদুরে ভাব নির্দেশ করলে আলাদা হবে। একই কথা ‘খোকা’-র ক্ষেত্রে।]
 
১২+১৩। মৃদুলবাবু, মন্ত্রীবাবু। [‘বাবু’ হিন্দু ভদ্রলোকের নামের শেষে উপাধি বা সম্মানার্থে যুক্তাবস্থায় ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। যেমন: হরিবাবু, রামবাবু, বড়োবাবু, ছোটোবাবু ইত্যাদি। “ইহার পরে শম্ভুনাথবাবুর ব্যবহারটাও ঠাণ্ডা। ”—অপরিচিতা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তদ্রূপ ‘দা’-ও একসঙ্গে হবে। যেমন: ঠাকুরদা। “মানার দরুন ওর ঠাকুরদাকে কাঁধের চাদর দিয়ে…”—মৌসুম, শামসুদ্দিন আবুল কালাম।]
 
১৪। বাবুসোনা [এটি একটি নাম। এখানে ‘সোনা’ কোনো স্নেহাস্পদ ভাব প্রকাশ করছে না। তাই একসঙ্গে হবে। “রংপুরের বাবুসোনা হত্যাকাণ্ড…”। অবশ্য কিছু প্রত্রিকা আলাদা করেও লিখেছে।]
 
বলা বহুল্য যে, উল্লিখিত উচ্চমাধ্যমিকের ‘সাহিত্যপাঠ’-এ লেখকদের লেখাকে অবিকৃত রাখা হয়েছে বলে মনে হয়। নয়তো একই বইয়ে ‘একটি তুলসী গাছের কাহিনি’, ‘নারিকেল গাছ’, ‘আম-জাম-কাঁঠাল গাছ’ কিংবা ‘জামাই বাবু’—এসব লেখা হতো না। তাই অভিধান ও উল্লেখযোগ্য লেখকদের লেখার সাহচর্য নেওয়াই বাঞ্ছনীয়।
 
বড়োলোক, বড়োমানুষ, বড়োবাবু, ছোটোলোক, ছোটোগল্প, ভালোমানুষ, ভালোকথা ইত্যাদি শব্দগুলো কি বিশেষণযোগে গঠিত হয়নি? একজন শুবাচির প্রশ্ন। জনাব মাহমুদুল হাসানের উত্তর, “বড়োলোক, বড়োমানুষ, বড়োবাবু, ছোটোলোক, ছোটোগল্প, ভালোমানুষ, ভালোকথা ইত্যাদি শব্দগুলো কর্মধারয় সমাসসাধিত শব্দ। যেমন: ভালো মনের মানুষ=ভালোমানুষ (মধ্যপদলোপী কর্মধারয়)। এসব শব্দে পরপদের অর্থই প্রধানরূপে প্রতীয়মান হয়। সুতরাং, সমাসসাধিত হওয়ায় শব্দগুলো একসঙ্গে লেখা হবে। “ভালোমানুষ হওয়ার কোনো ঝঞ্ঝাট নাই, তাই আমি নিতান্ত ভালোমানুষ।” — অপরিচিতা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।”
 
 
 
— — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — —
বাকি অংশ এবং অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর দেখার জন্য নিচের লিংক
 
 
লিংক: https://draminbd.com/শুদ্ধ-বানান-চর্চা-শুবাচ-থ-6/
 
 
লিংক:  https://draminbd.com/শুদ্ধ-বানান-চর্চা-শুবাচ-থ-5/
 
 
লিংক: https://draminbd.com/শুদ্ধ-বানান-চর্চা-শুবাচ-থ-4/
 
 
 
শুবাচ -ওয়েবসাইট: www.draminbd.com
 
 
সূত্র:
error: Content is protected !!