শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) থেকে শুবাচির প্রশ্ন শুবাচির উত্তর: (১০৬—১২০)

ড. মোহাম্মদ আমীন

দেখুন এক মলাটে শুবাচির প্রশ্ন থেকে শুবাচির উত্তর সমগ্র

১০৫. হতশ্রী: হতভাগা হতাস্মি হত আছে যত
হতশ্রী যুক্ত হয়ে হতশ্রী। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, হত (√হন্‌+ত) অর্থ— (বিশেষণে) মৃত, নিহত। ব্যাহত,, বাধাপ্রাপ্ত। লুপ্ত (হতগৌরব)। অশুভ, মন্দ (হতভাগা) প্রভৃতি।
কোনো বিষয় হত, লুপ্ত, আহত, ব্যাহত বা বাধাপ্রাপ্ত, দুর্দশাগ্রস্ত, নষ্ট, ধ্বংস হয়েছে কিংবা হ্রাস পেয়েছে বা অপমানিত হয়েছে প্রভৃতি প্রকাশ করার জন্য শব্দের আগে হত যুক্ত করা হয়। যেমন:
 
হতগৌরব (গৌরব ধূলিসাৎ হয়েছে এমন), হতচকিত (হতভম্ব), হতচেতন (অচেতন, অজ্ঞান), হতচ্ছাড়া (দুর্দশাগ্রস্ত), হতজীব (প্রাণহীন, মৃত), হতজ্ঞান (অচেতন, হতচেতন), হতত্রপ (নির্লজ্জ, বেহায়া), হতদরিদ্র, হতধী (বুদ্ধিহীন, বুদ্ধিহারা), হতপ্রভ (নিষ্প্রভ, ম্লান), হতপ্রায় (মুমূর্ষু, মৃতপ্রায়), হতবল (দুর্বল), হতবাক (নির্বাক, বিস্মিত), হতবুদ্ধি (হতভম্ব), হতভাগা (মন্দভাগ্য), হতমান (অপমানিত, অপদস্থ), হতমূর্খ (মহামূর্খ), হতলক্ষ্মী (লক্ষ্মীছাড়া), হতশ্রদ্ধ (শ্রদ্ধাহীন, বীতশ্রদ্ধ), হতশ্রী (শ্রীহীন, হতভ্যাগ্য, লক্ষ্মীছাড়া, সম্পদহীন), হতাদর (অনাদৃত, অনাদর, অমর্যাদা), হতাশা (হত+আশা), হতাশ্বাস (আশা-প্রত্যাশা লুপ্ত হয়েছে এমন), হতাস্মি [(হত+অস্মি); অর্থ: আমি মরে গেলাম, আমি শেষ হয়ে গেলাম এরূপ খেদোক্তি] প্রভৃতি হত দিয়ে গঠিত কয়েকটি শব্দ।
 
এত হত থেকে হওয়া শব্দকে মুক্ত রাখার জন্য হওয়া অর্থ প্রকাশ করার জন্য ব্যবহৃত শব্দের বানানে ত-য়ে ও-কার দিতে হয়। যেমন:
তেমন যদি হতো
ইচ্ছে হলে আমি সবাই হতো  ধানের গোলার মতো।
 
১০৬. বুদ্ধিজীবি নয়, বুদ্ধিজীবী
গতকাল (১৪ই ডিসেম্বর) গেল শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস। অনেকে লিখেছেন— বুদ্ধিজীবি । শুদ্ধ হচ্ছে— বুদ্ধিজীবী। যে-কোনো জীবী দুটো ঈ-কার নিয়ে চলে। যেমন: মৎস্যজীবী, শ্রমজীবী, চিকিৎসাজীবী, কৃষিজীবী – – -। জীবি কখনো শুদ্ধ নয়। মনে রাখুন, √জীব+ইন্‌= জীবী। -জীবী ইন্‌-প্রত্যয়ন্ত শব্দ। ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দে ইন্‌-এর পরিবর্তে ঈ-কার হয়।
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 
১০৭. ন্যাংটা থেকে ন্যাংটাগোরা
ন্যাংটাগোরা মিলে ন্যাংটাগোরা। সংস্কৃত ন্যগ্রট থেকে উদ্ভূত ন্যাংটা অর্থ— বিবস্ত্র, দিগম্বর এবং গোরা অর্থ— শ্বেতাঙ্গ, ফরসা। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাংলা ন্যাংটাগোরা অর্থ (বিশেষ্যে)— ব্যঙ্গার্থে স্কটল্যান্ডের পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসী। খাটো প্যান্ট পরতে অভ্যস্ত বলে তাদের বাংলা ব্যঙ্গার্থে ন্যাংটাগোরা বা ন্যাংটোগোরা বলা হয়। ভারতবর্ষে এরূপ পোশাককে ন্যাংটার তুল্য মনে করে ব্যঙ্গার্থে যারা খাটো প্যান্ট পরিধান করত তাদের ন্যাংটাগোরা ডাকা হতো। সাধারণত স্কটল্যান্ডের পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসী এবং কিছু কিছু ইউরোপীয় এমন খাটো প্যান্ট পরিধান করত। তাই বাঙালিরা উহাস করে তাদের ন্যাংটাগোরা বলত।  ন্যাওটা ও ন্যাংটো হচ্ছে ন্যাংটা শব্দের সমার্থক। 
 
১০৮. লাল সালাম
লাল সালাম ( red salute ) বা লাল সেলাম কথাটি বিপ্লবী স্লোগান, দলীয় বিপ্লবী অভিবাদন, শ্রদ্ধা নিবেদনমূলক অভিব্যক্তি, সমর্থকদের প্রতি সমর্থন ও ভালোবাসা জ্ঞাপন প্রভৃতি কাজে ব্যবহার করা হয়। সাধারণত অভিবাদন হিসেবে কথাটির প্রয়োগ সর্বাধিক। অনেক সময় বিশেষ বার্তা, বাণী বা ইঙ্গিত প্রদান কিংবা বিশেষ নির্দেশ জ্ঞাপনের জন্যও ব্যাবহার করা হয়। রক্তের রং লাল। বিপ্লবে রক্তপাত হয়, প্রয়োজনে রক্ত বা জীবন দানের শপথ নিতে হয়। তাই লাল দ্বারা বিপ্লব বোঝানো হয়। এজন্য বিপ্লবীদের পতাকার রঙও  লাল। কোনো কমিউনিস্ট নেতা মারা গেল তাঁর সম্মানার্থে surkh salam শব্দটিও ব্যাবহার করা হয়। ফারসি surkh শব্দের অর্থ লাল। এটা দক্ষিণ এশিয়া  বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কমরেড বা কমিউনিস্টগণ বলে থাকেন। কমিউনিস্টদের মধ্যে পরস্পর প্রাত্যহিক অভিবাদন হিসেবেও কথাটি ব্যবহৃত হয়। এখন কমিউনিস্ট ছাড়াও উদারপন্থি অনেক  রাজনীতিক দলের সমাবেশে কথাটি শোনা যায়।
 
১০৯. নোড়া এবং পাটাপুতা
সংস্কৃত লোষ্ট্র থেকে উদ্ভূত নোড়া অর্থ— (বিশেষ্য) মসলা পেষণের উপযোগী প্রস্তরখণ্ড, শিলের ওপর রেখে বাটনা পেষণের প্রস্তরখণ্ড, পুতা (শিলনোড়া), পাটাপুতা।  বাংলা পাটা অর্থ  (বিশেষ্যে) বাটনা পেষণের শিল। তবে পাটা শব্দের আরও অর্থ রয়েছে। যেমন: তক্তা, ভূমি ক্রয়ের দলিল, পাট্টা, বুকের বিস্তৃতি এবং আলংকারিক অর্থে সাহস (বুকের পাটা)।
 
 
১১০. নদীশাসন
নদী ও শাসন মিলে নদীশাসন। এটি অনেকটা ব্যক্তি বা প্রাণী বা প্রাতিষ্ঠানিক সত্তা প্রভৃতির স্বাধীন চলাচল বা ইচ্ছাকর্মকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো একটি ব্যবস্থা। রাষ্ট্রশাসন, প্রশাসন প্রভৃতি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার বিভিন্ন কৌশল। প্রত্যেকটির উদ্দেশ্য বৃহত্তর কল্যাণ সাধন। কাউকে শাসন করা মানে তার স্বাধীনতায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। নদীকে শাসন করা মানে নদীর স্বাধীন চলাচলকে নিয়ন্ত্রণ করা।
 
নদীশাসন বলতে এমন কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করা বোঝায়, যাতে নদী প্রকৃতির ইচ্ছেমতো দামাল রূপ নিয়ে যেদিকে খুশি ছুটে যেতে না পারে। তার গতিপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করার নামই হচ্ছে নদীশাসন। নদী প্রাকৃতিক কারণে ইচ্ছেমতো ধাবিত হয়। দুকূল উপচে তীর-পাড় ভেঙে যখন যেদিকে খুশি চলে যায়। নদীশাসন বলতে এমন কিছু কার্যক্রম গ্রহণ বোঝায়, যাতে নদী তার ইচ্ছেমতো যাতে তীর-পাড় ভেঙে যেদিকে খুশি সেদিকে যেতে না পারে।
নদী প্রতিনিয়ত ধেয়ে চলে। চলার পথে  উভয় পাড়ের ভুমি ক্ষয় করে। একূূল ভাঙে ওকূল গড়ে। আবার উভয় পাড় ভেঙে অনির্ধারিত পথে ছুটে চলে। ক্ষতি করে জনপদের, লোকবল আর সহায়সম্পদের। ধ্বংস করে ঘরবাড়ি, গবাদিপশু। এসব ক্ষয়ক্ষতি রোধ করার লক্ষ্যে নদীপৃষ্ঠ থেকে উভয় পারের নির্ধারিত উচ্চতা পর্যন্ত পাথরাদি ফেলে বা অন্যকোনো উপায়ে নদীর স্বাধীন প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টাকে নদীশাসন বলা হয়। নদীর স্বাধীন প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণপূর্বক মানুষের সহায়সম্পদ ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা নদীশাসনের উদ্দেশ্য। এর ভালো ও খারাপ উভয় দিক রয়েছে। হেমন্তের গানে ধ্বনিত হয় নদীশাসনের আবশ্যকতা:
এ কূল ভেঙে ও কূল তুমি গড়ো,
যার এ কূল ও কূল দু-কূল গেল তার লাগি কী করো- – -।
 

১১১. খদ্দের বনাম খরিদদার (ম্যানুয়েল ত্রিপুর)

ফারসি খরিদ অর্থ ক্রয় বা কেনা। আর দার হলো অধিকারী, মালিক, যুক্ত প্রভৃতি অর্থবাচক ফারসি প্রত্যয়বিশেষ। এই খরিদ ও দার যোগে গঠিত খরিদদার অর্থ ক্রেতা বা ক্রয়কারী (Consumer/Purchaser)। আর খদ্দের হলো খরিদদার হতে উদ্ভূত শব্দ— যার অর্থ গ্রাহক বা মক্কেল (Client/Customer)। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খরিদদার আর খদ্দের প্রায় সমার্থক।
হাটবাজারে আমরা অনেক মানুষজন দেখি, তাঁদের কেউ খদ্দের আবার কেউ খরিদদার। যেকোনো ব্যক্তি কোনো কিছু ক্রয় করার আগপর্যন্ত বিক্রেতার কাছে খদ্দের হিসেবেই বিবেচিত। আর দ্রব্যপণ্য ক্রয় করলে পর পরিগণিত হন খরিদদার (Consumer/Purchaser) হিসেবে।
সুতরাং কাঁচাবাজার, গোরুবাজার, মাছবাজার, কসমেটিকসের দোকান, কাপড়ের দোকান, চালের দোকান, মাংসের দোকান যেখানেই যান, কোনোকিছু খরিদ না-করলে আপনি কেবল খদ্দের হতে পারেন— খরিদদার নন।
 
আবার, চুল কাটাতে বা শেভ করাতে যে ব্যক্তি সেলুনে উপস্থিত হয়, সে ব্যক্তি সেলুনের মালিকের কাছে খরিদদার নয়— খদ্দের (Customer)।
তেমনি, কোনো মামলা নিয়ে যে উকিলের কাছে যায়, তাকেও খরিদদার নয়— খদ্দেরই বলা হয় (Client)। আরও যেমন— আমলা, কারিগর, চর্মকার, দালাল, ভ্রষ্টা যারই কাছে যান, খরিদদার নন, তাদের কাছে আপনি শুধু লোভনীয়— খদ্দের (Client/Customer)। ক্ষেত্রবিশেষে খদ্দের রকমারি হয়ে থাকে, যাদের সংখ্যা খরিদদারের তুলনায় নেহাত কম নয়। ক্লিনিক-হাসপাতালেও আমরা কেউ মৌলিক চাহিদার দাবিদার অথবা চিকিৎসা বা সেবাপ্রার্থী নই, তাদের কাছে আমরা খরিদদার না-হই— একেকজন খদ্দের অবশ্যই। [ ম্যানুয়েল ত্রিপুরা, সব খদ্দের খরিদদার নয়,শুদ্ধ বানান চর্চ (শুবাচ)।]
১১২. যতিচিহ্ন হিসেবে ‘কমা’:  ব্যবহার-কৌশল
 
কোনো গ্রন্থ বা ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে কিছু লিখবার জন্যে ওই গ্রন্থ বা ব্যক্তির বরাত দিতে ‘অনুসারে’ বা ‘অনুযায়ী’ লেখার ক্ষেত্রে একটি নিয়ম মানা উচিত। কেননা, ওই নিয়মটির মাধ্যমে গ্রন্থ বা ব্যক্তির বক্তব্য হুবহু উল্লেখ করা হয়েছে, না কি বক্তব্যটি নিজের পছন্দমতো পরিবর্তন করে লেখা হয়েছে, তা নির্দেশ করা হয়। নিয়মটি একেবারেই সহজ, এবং তা নিম্নরূপ:
‘ক (যে-কোনো ব্যক্তি বা গ্রন্থের নাম) গ্রন্থ বা ব্যক্তি অনুসারে/অনুযায়ী’— এতটুকু লেখার পর পরবর্তী অংশটুকু কোনো গ্রন্থ বা ব্যক্তির বক্তব্য অবিকল হলে ‘অনুসারে’ বা ‘অনুযায়ী’-র পর একটি কমা ব্যবহার করতে হবে। কারণ, এরূপ ক্ষেত্রে পরবর্তী অংশটুকু প্রত্যক্ষ উক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এবং প্রত্যক্ষ উক্তিতে বক্তার মূল বক্তব্যের পূর্বে কমা ব্যবহার করা আবশ্যক। কিন্তু, যদি ‘ক (যে-কোনো ব্যক্তি বা গ্রন্থের নাম) ব্যক্তি বা গ্রন্থ অনুসারে/অনুযায়ী’— এতটুকু লেখার পর পরবর্তী অংশটুকুতে কোনো ব্যক্তি বা গ্রন্থের বক্তব্য অবিকল উল্লেখ না-করে মূল বক্তব্যটুকু নিজের মতো করে গুছিয়ে লেখা হয়, তাহলে ‘অনুসারে’ বা ‘অনুযায়ী’-র পরে কোনো কমা বসবে না। কারণ, তখন বাক্যটি আর প্রত্যক্ষ উক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয় না; লেখার স্বাভাবিক ধারায় উল্লেখ করা হয়মাত্র। কয়েকটি প্রয়োগোদাহরণ দিচ্ছি—
১. ‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুসারে, বিশেষণ পদ সাধারণভাবে পরবর্তী পদের সঙ্গে যুক্ত হবে না।’— এখানে ‘অনুসারে’-র পরের বক্তব্যটুকু ‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ গ্রন্থ থেকে অবিকল উল্লেখ করা হয়েছে, তাই ‘অনুসারে’-র পরে কমা ব্যবহার করা হয়েছে।
 
২. ‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুসারে বিশেষণ পদ সাধারণত পরবর্তী পদ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে লিখতে হয়।’— এই বাক্যটিতে বাংলা একাডেমির নিয়মটি নিজের মতো করে সাজিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে বিধায় ‘অনুসারে’-র পরে কোনো কমা ব্যবহার করা হয়নি।
 
৩. ‘ড. মোহাম্মদ আমীনের বক্তব্য অনুযায়ী, ভুল থেকে ফুল, ফুল থেকে ফল।’— ১ নম্বর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।
 
৪. ‘ড. মোহাম্মদ আমীনের বক্তব্য অনুযায়ী ভুল থেকেই ফুল ফোটে এবং সেই ফুল থেকে ফল হয়।’ ২ নম্বর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।
 
১১৩.  উপনেত্র মানে কী?
নেত্র মানে চোখ, নয়ন, চক্ষু। কিন্তু উপনেত্র মানে চশমা। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত উপনেত্র (উপ+নেত্র) অর্থ— (বিশেষ্যে) চশমা।  নয়ন ও নেত্র সমার্থক। উভয়ের অর্থ— চোখ। নয়ন অর্থ নেত্র হলেও উপনয়ন মানে কিন্তু উপনেত্র বা চশম নয়।  সংস্কৃত উপনয়ন (উপ+নয়ন) অর্থ— (বিশেষ্যে) বালকের উপবীত ধারণের অনুরষ্ঠান; বেদ অধ্যয়নের জন্য গুরুর সান্নিধ্যে আনয়ন।
 
 
১১৪. উপ বনাম উপ
সংস্কৃত উপে অব্যয় পদ। এটি নৈকট্য (উপকণ্ঠ); সাদৃশ(উপকথা), সহকারী (উপনেতা), উৎকর্ষ (উপাদেয়); অতিরিক্ত (উপকর) প্রভৃতি সূচক সংস্কৃত অব্যয়। শব্দের আগে উপ দিলে এসব অর্থ যুক্ত হয়। ধ্বন্যাত্মক উপ অর্থ— হনুমানের ডাক; ক্রিয়াবিশেষণে অকস্মাৎ।
 
১১৫. বাংলা বানান 
নয়ন কিন্তু পরিণয়ন।
নাম কিন্তু পরিণাম।
নেতা কিন্তু পরিণেতা।
বহন কিন্তু পরিবহণ।
বাহন কিন্তু পরিবাহণ
যান কিন্তু পরিযাণ।
সেক কিন্তু পরিষেক।
সেবক কিন্তু পরিষেবক।
সেবা কিন্তু পরিষেবা।
পরিষ্কার কিন্তু পরিষ্করণ।

১১৬. রুপা ও রূপ নিমোনিক

সংস্কৃত ‘রূপা’ থেকে উদ্ভুত তদ্ভব ‘রুপা’ শব্দের অর্থ, অলংকার তৈরির জন্য ব্যবহৃত মূল্যবান উজ্জ্বল সাদা ঘাতসহ মৌলিক ধাতু যার পারমাণবিক সংখ্যা ৪৭, রৌপ্য, রুপো, রজত, চাঁদি প্রভৃতি। সংস্কৃত ‘রূপ (√রূপ+অ)’ শব্দের অর্থ বিশেষ্যে- মূর্তি (মনুষ্য রূপ), সৌন্দর্য, শ্রী, আকৃতি, চেহারা, প্রকার, রকম, বিভক্তিযুক্ত শব্দ বা ধাতু (ধাতুরূপ), দৃষ্টিগ্রাহ্য বা প্রত্যক্ষ বিষয় এবং বিশেষণে তুল্য, অভিন্ন প্রভৃতি। “এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী–জননী (রবীন্দ্রনাথ)।”
 
অনেক সময় ‘রুপা’ ও ‘রূপ’ শব্দ লেখার সময় ভুল হয়ে যায়। ভুল যাতে না হয় সেজন্য একটা নিমোনিক বানানো যেতে পারে : বর্ণমালায় আগে উ-কার তারপর ঊ-কার। এজন্য আগে ‘রুপা’ তারপর ‘রূপ’। মনে রাখুন, ‘রুপা’ পরিধান করার পর ‘রূপ’ বৃদ্ধি পায়। আসলে, রুপ বানানের কোনো শব্দ নেই। আছে রুপা।

১১৭. চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

 বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ঔপন্যাসিক, লেখক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৭৭  খ্রিষ্টাব্দের ১১ই অক্টোবর অবিভক্ত বাংলার মালদহের চাঁচল এলাকায় জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁদের আদি বাসস্থান ছিল  যশোর।  তিনি ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে বলাগড় হাই স্কুল থেকে এন্ট্রান্স, ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজ) থেকে এফ এ এবং ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বি.এ. পাশ করেন। ‘মেঘদূত’, ‘মাঘ’ প্রভৃতি পত্রিকায় সংস্কৃত সাহিত্যের সমালোচক হিসাবে তাঁর সাহিত্য জীবনের সূচনা। তিনি কিছুদিন ‘ভারতী’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ‘প্রবাসী’র সহ-সম্পাদক হিসাবে সমধিক পরিচিতি পান। ‘প্রবাসী’ পত্রিকায়  তাঁর প্রথম মৌলিক রচনা ‘মরমের কথা’ ছোটগল্প প্রকাশিত হয়।  ১৯১৯  খ্রিষ্টাব্দে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদে যোগদানের জন্য তিনি ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা চলে আসেন।

ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে যে কয়েক জন লেখক বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের জগতে প্রবল পাঠক প্রিয়তা অর্জন করেছিলেন তন্মধ্যে অন্যতম একজন চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তার সামসময়িক অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাসিক হচ্ছেন: ইন্দিরা দেবী, অনুরূপা দেবী, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, রাজশেখর বসু প্রমুখ। তাঁর লেখা মোট উপন্যাস পঁচিশ। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে:  ‘স্রোতের ফুল’ ও ‘পরগাছা’।  শিশুতোষ গ্রন্থের রচয়িতা হিসেবেও তিনি খ্যাত ছিলেন। ভাতের জন্মকথা তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য শিশুতোষ গ্রন্থ।  গবেষক হিসেবেও তিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। রবীন্দ্র-গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘রবি-রশ্মি’ একটি অনবদ্য গ্রন্থ। এই গ্রন্থের জন্য তিনি প্রচুর খ্যাতি অর্জন করেন।  অনুবাদের তিনি পারদর্শী ছিলেন।  আগুনের ফুলকি (১৯১৪),  সেরাতের ফুল (১৯১৫),  পরগাছা (১৯১৭),  দুই তীর (১৯১৮), হেরফের (১৯১৮), পঙ্কতিলক (১৯১৯), দোটানা (১৯২০),  আলোকপাত (১৯২০), রূপের ফাঁদে (১৯২৫),  কবিকঙ্কণ-চণ্ডী,  প্রথম ভাগ (পরিলেখন প্রকল্প)(১৯২৫),  সুর বাঁধা (১৯৩৭), অগ্নিহোত্রী (১৯৩৮) প্রভৃতি তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সাহিত্যকর্ম। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই ডিসেম্বর তিনি মারা যান।

১১৭. কৃত বনাম ক্রীত

সংস্কৃত কৃত (কৃ+ত) অর্থ (বিশেষণে)— রচিত (সৈয়দ মুজতবা আলী কৃত পুস্তক)। সম্পাদিত (সুকৃত সংকলন, প্রকৃত কর্ম)। লব্ধ, সুশিক্ষিত (কৃতবিদ্য, কৃতজ্ঞান)। নির্মিত, গৃহীত (লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি কৃত চিত্রকর্ম)। পূর্ণ, সফল (কৃতকার্য) এবং (বিশেষ্যে)— পুরাণে কল্পিত সৃষ্টির আদি যুগ, সত্যযুগ। সংস্কৃত ক্রীত (ক্রী+ত) অর্থ (বিশেষণে)— অর্থের বিনিময়ে লব্ধ। যেমন: ক্রীতদাস, ক্রীতপুস্তক, ক্রীতবাড়ি, ক্রীতগাড়ি, ক্রীতজমি। যা ক্রয় করা হয়েছে তা ক্রীত। অনেকে লিখেন: ক্রয়ক্রীত। তা বাহুল্য। ক্রীত শব্দের মধ্যে ক্রয় করা হয়েছে অর্থ নিহিত।

কৃত হতে হলে চেষ্টা, জ্ঞান, মহানুভবতা, প্রজ্ঞা, বিদ্যা, কর্ম, চেতনা, বোধ প্রভৃতি বিষয় জড়িত। কৃত হতে হলে প্রজ্ঞার স্ফুরণ ঘটানো অনিবার্য। প্রত্যক্ষভাবে শুধু অর্থ দিয়ে এসব করা যায় না। কিন্তু ক্রীত অর্জনে শুধু অর্থ হলেই চলে। অর্থ-সম্পদ থাকলে একজন মূর্খ মানুষও সহস্র কোটি ডলারের বই কিনে বিশাল পাঠাগার দিতে পারে, কিন্তু কৃতবিদ্য হতে পারবেন না। প্রজ্ঞা-অধ্যবসায় প্রভৃতি না-থাকলে কারও পক্ষে কৃতবিদ্য বা সুকৃত ইত্যাদি হওয়া সম্ভব নয়। 

১১৮. জগদ্দল পাথর

জগদ্দলপাথর মিলে জগদ্দল পাথর। আবার জগৎদল মিলে জগদ্দল।  দলন (দল্‌+অন) থেকে উদ্ভূত দল অর্থ— (বিশেষ্যে) মর্দন, চূর্ণীকরণ, নিপীড়ন; যা দলিত করে। যা দলন করে তাই দলন বা দল। সুতরাং,  জগদ্দল কথার আক্ষরিক অর্থ—জগতের দলন কর্তা;  জগৎকে দলনে সক্ষম গুরুভার পাষাণ, নিপীড়ক, কষ্ট দেয় এমন।   জগৎকে দলিত করতে সক্ষম পাথর কত ভারী হতে পারে তা সহজে অনুমেয় হলেও অত ভার বহন করা সম্ভব নয়। জগদ্দল পাথর অর্থ এমন একটি পাথর যা দলিত করে, দলন করে, পীড়া দেয় এবং যে  পাথরের গুরুভার বহন করা কষ্টসাধ্য; কিংবা আদৌ সম্ভব নয় । যখন কোনো অব্যক্ত বেদনা  বা সীমাহীন কষ্ট জগদ্দলের মতো পাথর হয়ে বুকের ওপর চেপে বসে তখন কথাটি ব্যবহার করা হয়। যেমন: একমাত্র সন্তানের মৃত্যুকথা পিতার বুকে জগদ্দল পাথর হয়ে আছে।  এটি এমন একটি ঘটনা বা বিষয় যা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবল চেষ্টা সত্ত্বেও সম্ভব হয় না।  বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, জগদ্দল (জগৎ+দল) অর্থ: অতি বিশাল ও গুরুভার, অত্যন্ত ভারি।

নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলার জগদ্দল গ্রামে জগদ্দল বিহার নামের একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই বিহারের চারপাশে অনেক ভারি পাথর ছিল এবং এখনো আছে। অনেক ভারি ভারি পাথর দিয়ে বিহারটি নির্মিত। কথিত হয়, পাথরসমূহ কারও পক্ষে উত্তোলন করা সম্ভব হতো না। এসব  পাথর জগতের বুকে অলৌকিকভাবে চেপে বসা ছিল। তাই নাম হয় জগদ্দল মন্দির।

১১৯ ইদ না কি ঈদ?

বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী—
ইদ: ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব (ইদুল ফিতর বা ইদুল আজহা); খুশি, উৎসব; ঈদ-এর সংগততর ও অপ্রচলিত বানান।
ঈদ: ইদ-এর প্রচলিত ও অসংগত বানান।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ইদ ও ঈদ উভয় শব্দকে পৃথক ভুক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে ইদ বানানকে ঈদ-এর সংগততর ও অপ্রচলিত বানান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আমার প্রশ্ন— ঈদ বানান অসংগত হবে কেন?
উত্তর পাওয়া গেল বাংলা একাডেমি থেকে— বিদেশি শব্দে ঈ-কার বিধেয় নয়, তাই ঈদ বানান অসংগত।
অনেকে প্রশ্ন করেন চীন ও শ্রীলঙ্কা বিদেশি শব্দ। তাদের ঈ-কার পরিয়ে অসংগত না বলে সরাসরি প্রমিত ঘোষণা করা হয়েছে কেন? চীন বিদেশি শব্দ নয়। তৎসম শব্দ। শ্রীলঙ্কাও বিদেশি শব্দ নয়, তৎসম শব্দ। তাই মূল বানান অনুযায়ী ঈ-কার দেওয়া হয়েছে।
তাহলে কী-বোর্ড বানানে ঈ-কার কেন? এটি তো বিদেশি শব্দ?
একাডেমি কোনো উত্তর দিতে পারল না।
বাংলা একাডেমি যদি—
১. ইংরেজি ‘Key board’- এর ‘ঈ-কার’-যুক্ত ‘কী-বোর্ড’ বানানকে প্রমিত নির্দেশ করতে পারে;
২. “বিদেশি শব্দের বানানে ‘মূর্ধন্য-ষ’ সমীচীন নয়”— বিধি উপেক্ষা করে বিদেশি ‘Christ” শব্দকে উচ্চারণানুগ করার অজুহাতে ‘মূর্ধন্য-ষ’-যুক্ত ‘খ্রিষ্ট’, ‘খ্রিষ্টাব্দ’ প্রভৃতি বানানকে প্রমিত নির্দেশ করতে পারে; তাহলে আরবি ‘عيد (Eid)’-এর বাংলা ‘ঈদ’ বানানকে প্রমিত নির্দেশ করবে না কেন?
১২০. কিন্ডারগার্টেন 
কিন্ডারগার্টেন (kindergarten) শব্দটির প্রবক্তা জার্মান শিশু-শিক্ষাবিদ ফ্রেডরিখ ফ্রোয়েবল (Friedrich Wilhelm August Froebel)। এর বাংলা অর্থ— হয় শিশুদের বাগান। ফ্রোয়েবল ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্যাড ব্ল্যাংকেনবার্গ শহরে শিশুদের জন্য একটি শিক্ষপ্রতিষ্ঠান খুলেন। এই প্রতিষ্ঠানে খেলাচ্ছলে শিশুদের পড়ানো এবং খেলাধুলা-সহ নানা প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের বিষয় যুক্ত করা হয়। ফ্রোয়েবল এর নাম দেন কিন্ডারগার্টেন।
 
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, জর্মন কিন্ডারগার্টেন অর্থ (বিশেষ্যে) যে বিদ্যালয়ে ক্রীড়াচ্ছলে শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হয়, শিশুদের প্রারম্ভিক বিদ্যালয়।
 
১৮১৬ খ্রিষ্টাব্দে দার্শনিক ও শিশু-শিক্ষাবিদ রবার্ট ওয়েন স্কটল্যান্ডের নিউ ল্যানার্ক এলাকায় তাঁর বাসস্থানের কাছে ‘ইনফ্যান্ট স্কুল’ নামের একটি শিশুশিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বলা হয়— এটিই শিশু শিক্ষার বর্তমান চলমান ধারার প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ১৮১৯ খ্রিষ্টাব্দে শিশু-শিক্ষাবিদ স্যামুয়েল ওয়াইল্ডারস্পিন লন্ডনে আরেকটি শিশু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
 
১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে মে কাউন্টেস থেরেসা ব্রুন্সভিক (১৭৭৫-১৮৬১) হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট-এর নিজ বাড়িতে ‘এঙ্গিয়েলকার্ট’ বা পরিদের বাগান নামের একটি শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলেন। অল্পসময়ে এটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এখান থেকে প্রাণিত হয়ে ফ্রেডরিখ ফ্রোয়েবল ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন কিন্ডারগার্টেন
— — — — — — — — — — — — — — — — — —  — — — — — — — — —
বাকি অংশ এবং অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর দেখার জন্য নিচের লিংক
 
https://draminbd.com/শুদ্ধ-বানান-চর্চা-শুবাচ-থ-8/
 
https://draminbd.com/শুদ্ধ-বানান-চর্চা-শুবাচ-থ-7/
 
 
লিংক: https://draminbd.com/শুদ্ধ-বানান-চর্চা-শুবাচ-থ-6/
 
 
লিংক:  https://draminbd.com/শুদ্ধ-বানান-চর্চা-শুবাচ-থ-5/
 
 
লিংক: https://draminbd.com/শুদ্ধ-বানান-চর্চা-শুবাচ-থ-4/
 
 
 
শুবাচ -ওয়েবসাইট: www.draminbd.com
 
 
সূত্র:
error: Content is protected !!