শুদ্ধ হয়েও অশুদ্ধ: শুদ্ধ, অনেকে মনে করেন অশুদ্ধ

ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/শুদ্ধ-হয়েও-অশুদ্ধ-শুদ্ধ-অ/

শুদ্ধ, কিন্তু অনেকে মনে করেন অশুদ্ধ/১

অশ্রুজল: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত অশ্রুজল (অশ্রু+জল) এবং সংস্কৃত অশ্রুবারি (অশ্রু+বারি) শব্দের অর্থ, নয়নবারি। শব্দদুটো ‘অশ্রু’র সমার্থক। অনেকে বলেন, ‘অশ্রুজল’ ও ‘অশ্রুবারি’ বাহুল্য। তাদের যুক্তি— যেখানে অশ্রু অর্থ চোখের জল, সেখানে অশ্রু শব্দের সঙ্গে পুনরায় জল ও বারি লেখা হলে ‘অশ্রুজল/অশ্রুবারি’ শব্দের অর্থ হয়ে যায় : নয়নের জল জল, চোখের জল জল ইত্যাদি। এ যুক্তি ঠিক নয়; ঠিক হতো যদি ‘অশ্রু’ ও ‘বারি এবং ‘অশ্রু ও ‘জল’ পরস্পর ফাঁক রেখে যথাক্রমে ‘অশ্রু জল’/‘অশ্রু বারি’ লেখা হতো।‘অশ্রুজল/অশ্রুবারি’ সন্ধিজাত শব্দ, যা অশ্রু শব্দের সমার্থক। প্রসঙ্গত, অশ্রুজল ও অশ্রুবারি শব্দকে সমাসবদ্ধ শব্দ হিসেবেও নির্দেশ করা যায়। যেমন : অশ্রুর জল= অশ্রুজল, অশ্রুর বারি= অশ্রুবারি। এমন হলেও শব্দদুটোকে বাহুল্য বলা যায় না। কারণ সমাসবদ্ধ হলে অনেক সময় ব্যাসবাক্যের অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়। ছাগীর দুগ্ধ = ছাগদুগ্ধ; ছাগদুগ্ধ অর্থ যেমন ছাগলের দুগ্ধ নয়, তেমনি অশ্রুজল বা অশ্রুবারি অর্থ নয়নের জল জল নয়। হংসডিম্ব, আশীবিষ, ছাপোষা, দশুভুজা, দশানন— এরূপ আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। সুতরাং অশ্রুজল ও অশ্রুবারি বাহুল্য নয়। অশ্রুজল যদি বাহুল্য হয় তাহলে, বইপুস্তক, বসবাস, দাবিদাওয়া, জলপানি, প্রভৃতি শব্দ বাহুল্য বা অসিদ্ধ হবে না কেন? অথচ, এসব শব্দ আমরা হরহামেশা লিখে যাচ্ছি কাগজপত্রে। কথাবার্তা আর চিঠিপত্রের কথা নাই বা বললাম।‘জামবাটি’ বহুল প্রচলিত একটি শব্দ। অথচ জাম শব্দের অর্থ বাটি। তাহলে ‘জামবাটি’ কেন অসিদ্ধ হবে না? পাউ বা পাঁউ শব্দের অর্থ রুটি, তো পাউরুটি বলি কেন? ‘অশ্রুজল’ বাংলা একাডেমির অভিধানে প্রমিত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অতএব, অশ্রুজল অশুদ্ধ নয়। এটি শুদ্ধ, সিদ্ধ ও প্রমিত।
শুদ্ধ,  অনেকে মনে করেন অশুদ্ধ/২
নাগিনি: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান মতে, সংস্কৃত নাগী থেকে উদ্ভূত তদ্ভব বা খাঁটি বাংলা নাগিনি শব্দের অর্থ সর্পিণী। সাধারণ কথায় নাগিনি হচ্ছে নাগ বা সাপের স্ত্রীবাচক রূপ। এর সমার্থক নাগী। সর্প অর্থদ্যোতক নাগ (√নগ্‌+অ) হচ্ছে নাগিনি বা নাগী শব্দের পুংবাচক রূপ। অনেকে মনে করেন নাগিনি শব্দটি অশুদ্ধ। তা ঠিক নয়। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে শব্দটি প্রমিত ও শুদ্ধ হিসেবে পৃথকভুক্তিতে যথামর্যাদায় ঠাঁই দেওয়া হয়েছে। অতএব, এটি অশুদ্ধ নয়; শুদ্ধ সিদ্ধ ও প্রমিত।
শুদ্ধ, কিন্তু অনেকে মনে করেন অশুদ্ধ/৩
নিন্দুক: অভিধান মতে, নিন্দুক সংস্কৃত নিন্দক শব্দ হতে উদ্ভূত খাঁটি বাংলা শব্দ। এর অর্থ বিশেষণে নিন্দাকারী। অনেকে মনে করেন, নিন্দুক শব্দটি অশুদ্ধ। সংস্কৃত শব্দ হিসেবে নিন্দুক অশুদ্ধ হতে পারে, কিন্তু খাঁটি বাংলা শব্দ হিসেবে নিন্দুক শুদ্ধ। নিন্দুক শব্দকে অশুদ্ধ ধরলে সংস্কৃত শব্দের পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রাপ্ত সকল তদ্ভব বা খাঁটি বাংলা শব্দেই অশুদ্ধ হয়ে যাবে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:
নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভাল,
যুগ জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আঁলো।
সবাই মোরে ছাড়তে পারে, বন্ধু যারা আছে,
নিন্দুক সে ছায়ার মত থাকবে পাছে পাছে।
নিন্দুকে সে বেঁচে থাকুক বিশ্ব হিতের তরে;
আমার আশা পূর্ণ হবে তাহার কৃপা ভরে।
শুদ্ধ, কিন্তু অনেকে মনে করেন অশুদ্ধ/৪
আপ্রাণ: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান মতে আপ্রাণ (আ+প্রাণ) তৎসম শব্দ। আপ্রাণ শব্দের অর্থ: (ক্রিয়াবিশেষণে) প্রাণ থাকা পর্যন্ত, আজীবন (আমি আপ্রাণ লড়ে যাব দেশের জন্য। তোমাকে আপ্রাণ মনে রাখব।); (বিশেষণে) প্রাণপণ, যথাসাধ্য (আপ্রাণ চেষ্টা করেও তাকে শেষ পর্যন্ত পরাজয় বরণ করতে হলো। আপ্রাণ চেষ্টায় তার সফলতার মূল।)। আপ্রাণ শব্দটির উচ্চারণ: আপ্‌প্রান্। 
শুদ্ধ, কিন্তু অনেকে মনে করেন অশুদ্ধ/৫
সমতুল্য:   বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান মতে, তৎসম সমতুল্য (সম+তুল্য) অর্থ (বিশেষণে) সমান সমকক্ষ তুল্যরূপ। এর স্ত্রীবাচকরূপ হলো: সমতুল্যা। শব্দটির উচ্চারণ শমোতুল্‌লো। অনেকে মনে করেন, শব্দটি অশুদ্ধ ও বাহুল্য। তা আদৌ ঠিক নয়। এটি অভিধান ও ব্যাকরণমতে শুদ্ধ ও প্রমিত। অধিকন্তু বহুল প্রচলিত। সমতুল অর্থ (বিশেষণে) সমান ওজনবিশিষ্ট; সমকক্ষ, সমান।
শুদ্ধ, কিন্তু অনেকে মনে করেন অশুদ্ধ/৬
সঠিক: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী  বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা ‘সঠিক’ শব্দের অর্থ নির্ভুল, প্রকৃত প্রভৃতি। সংস্কৃত ‘স্থিত’ শব্দ থেকে উদ্ভূত তৎসম ‘ঠিক’ শব্দের অর্থ সত্য, নির্ভুল, স্থিরকৃত, সম্পূর্ণ, হুবহু, প্রস্তুত, পরিপাটি প্রভৃতি। সুতরাং উভয় শব্দ সমার্থক। অনেকে মনে করেন, ‘সঠিক’ শব্দটি শুদ্ধ নয়; বাহুল্য এবং অপপ্রয়োগ। তাঁদের মতে, ‘সঠিক’ শব্দের ‘স’ একটি উপসর্গ। আসলে এ ধারণা সঠিক নয়। ‘ঠিক’ ও ‘সঠিক’ দুটি ভিন্ন শব্দ এবং সমার্থক। তাই শব্দ হিসেবে ‘সঠিক’ অবশ্যই ঠিক। সঠিক শব্দটি শুদ্ধ ও প্রমিত হিসেবে অভিধানে পৃথক ভুক্তিতে ঠাঁই পেয়েছে। অতএব, এটি শুদ্ধ ও প্রমিত। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানেও ‘সঠিক’ শব্দটি প্রমিত হিসেবে পৃথক ভুক্তিতে স্থান পেয়েছে।
শুদ্ধ, কিন্তু অনেকে মনে করেন অশুদ্ধ/৭

তবুও: ‘তবুও’ শব্দটি কি অপপ্রয়োগ কিনা? অনেকে মনে করেন অপপ্রয়োগ। তবু লেখায় যথেষ্ট। তা আদৌ ঠিক নয়। তবু শব্দটি অপপ্রয়োগ বা ভুল নয়।  অভিধানমতে বাক্যেঅব্যয় হিসেবে ব্যবহৃত ‘তবু’ এবং ‘তবুও’ সমার্থক। উভয় শব্দের অর্থ— তথাপি, তা সত্ত্বেও।যেসব শব্দ বা শব্দের বানান অশুদ্ধ কিন্তু প্রচলিত বা অপপ্রয়োগ কিংবা অসংগত বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানের সংশ্লিষ্ট ভুক্তিতে তা উল্লেখ করা হয়েছে। এই অভিধানে ‘তবুও’ শব্দটি পৃথক ভুক্তিতে শুদ্ধ হিসেবে ঠাঁই পেয়েছে। শব্দটিকে অপপ্রয়োগ বা অশুদ্ধ কিংবা অসংগত চিহ্নিত করা হয়নি। তাই এটি অপপ্রয়োগ নয়। প্রসঙ্গত, ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’ বাংলা একাডেমি হতে প্রকাশিত সর্বশেষ বাংলা অভিধান।

শুদ্ধ, কিন্তু অনেকে মনে করেন অশুদ্ধ/৮

কুশ্রী: বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত কুশ্রী অর্থ: কুৎসিত, কদর্য, জঘন্য, যার শ্রী নেই, শ্রীহীন। বাংলায় এটি বহুলপ্রচলিত একটি শব্দ। কিন্তু বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী এটি অশুদ্ধ প্রয়োগ। সংস্কৃত ব্যাকরণমতে কুশ্রী অশুদ্ধ হতে পারে, কিন্তু বাংলা শব্দ হিসেবে এটি শুদ্ধ। যেহেতু কুশ্রীয় কুৎসিত থেকে উদ্ভূত খাঁটি বাংলা শব্দ, সুতরাং এটাকে অশুদ্ধ বলার কোনো সুযোগ নেই। শব্দটি এত বহুল প্রচলিত যে, একে রোধ করার সাধ্য বাংলা একাডেমির নেই। তাই ‘কুশ্রী’কে বাংলা শব্দ হিসেবে শুদ্ধ স্বীকৃতি দেওয়ায় সমীচীন। অধিকন্তু কুশ্রী অশুদ্ধ হলে সংস্কৃত হতে বিকৃত হয়ে উদ্ভূত সকল শব্দকে অশুদ্ধ বলতে হয়।

শুদ্ধ, কিন্তু অনেকে মনে করেন অশুদ্ধ/৯

গরু: গরু বানান অশুদ্ধ কি?  অশুদ্ধ বলা যাবে না। কারণ বর্তমানে প্রচলিত বাংলা একাডেমি প্রণীত প্রমিত বাংলা বানান কিংবা প্রামাণ্য ব্যাকরণবিধি মতে গরু বানান কোনো ত্রুটিতে পড়েনি। এছাড়া বর্তমানে প্রচলিত সবকটি অভিধানে গরু শব্দটি শুদ্ধ হিসেবে স্থান পেয়েছে। তাই গরু বানান যেমন শুদ্ধ তেমনি গোরু বানানও শুদ্ধ। তবে আপনি যদি ঈগল লিখেন তাহলে অশুদ্ধ বলব। কারণ, প্রমিত বানানবিধি মতে অতৎসম শব্দে ঈ-কার বিধেয় নয়। ‘গরু’ বানান লিখলে বাংলা একাডেমি প্রণীত প্রমিত বানানবিধির কোনো ব্যত্যয় হয় না। ওই বিধিতে এমন কোনো নিয়ম নেই যাতে ‘গরু’ লিখলে বিধি লঙ্ঘিত হবে।
শুদ্ধ, কিন্তু অনেকে মনে করেন অশুদ্ধ/১০
বৈচারিক: সংস্কৃত ব্যাকরণমতে বিচারিক শুদ্ধ নয়। বিচার শব্দের সঙ্গে ইক প্রত্যয় যুক্ত হলে শব্দটি হয় বৈচারিক। যেমন: দিন+ ইক= দৈনিক, বিদেশ+ইক= বৈদেশিক, বিজ্ঞান+ইক= বৈজ্ঞানিক, নীতি+ইক= নৈতিক; তেমনি, বিচার+ ইক= বৈচারিক। তবে সংস্কৃত বিচার (বি+ √চারি+অ) হতে উদ্ভূত খাঁটি বাংলা শব্দ হিসেবে বিচারিক শুদ্ধ ও প্রমিত। অবশ্য বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে বিচারিকবৈচারিক কোনো  শব্দই ঠাঁই পায়নি।  বিচারিক ও বৈচারিক উভয় শব্দ শুদ্ধ।

শুদ্ধ, কিন্তু অনেকে মনে করেন অশুদ্ধ/১১

ভাষাভাষী:এটি নির্ভর করে বাক্যের গঠনের ওপর। তাই ভাষাভাষী শব্দটি সর্বত্র অপপ্রয়োগ নয়। যেমন: ভাষাভাষীর দিক দিয়ে পৃথিবীতে বাংলার স্থান চতুর্থ। এখানে ভাষাভাষী শব্দটির প্রয়োগ শুদ্ধ। তবে ভাষাভাষী শব্দটির আগে কোনো ভাষার নাম থাকলে ভাষাভাষী শব্দটি অপপ্রয়োগ হয়ে যায়। যেমন: ইংরেজি ভাষাভাষী, হিন্দি ভাষাভাষী। “পৃথিবীর সকল ভাষাভাষীর প্রতি আমার ভাষিক শ্রদ্ধা।” এই বাক্যে ভাষাভাষী সঠিক। যদি লেখা হয় “পৃথিবীর সকল বাংলা ভাষাভাষীর প্রতি আমার ভাষিক শ্রদ্ধা।” এই বাক্যে ভাষার নাম উল্লেখ থাকায় ভাষাভাষী অপপ্রয়োগ হয়ে গিয়েছে। বাক্যটির শুদ্ধ রূপ হবে: “পৃথিবীর সকল বাংলাভাষীর প্রতি আমার শ্রদ্ধা।” কেউ বাংলাভাষী, কেউ ইংরেজিভাষী, কেউ হিন্দিভাষী, তবে সব মানুষই ভাষাভাষী
শুদ্ধ, কিন্তু অনেকে মনে করেন অশুদ্ধ/১২
লাইব্রেরি অর্থে বইয়ের দোকান:অনেকে মনে করেন, লাইব্রেরি শব্দটি বইয়ের দোকান অর্থে ব্যবহার করা ভুল এবং অপপ্রয়োগ। তা আদৌ সঠিক নয়। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান মতে, ইংরেজি লাইব্রেরি (library) হতে উদ্ভূত লাইব্রেরি অর্থ (বিশেষ্যে) পাঠ বা তথ্যসূত্রের জন্য ব্যবহৃত সুবিন্যস্ত গ্রন্থভাণ্ডার, গ্রন্থাগার; বইয়ের দোকান। সুতরাং লাইব্রেরি কথাটি বইয়ের দোকান অর্থেও শুদ্ধ ও প্রমিত। প্রচলিত অভিধানে লাইব্রেরি শব্দটিকে গ্রন্থাগার ও বইয়ের দোকান উভয় অর্থে নির্দেশ করা হয়েছে।
শুদ্ধ, কিন্তু অনেকে মনে করেন অশুদ্ধ/১৩
নিশিরাত বা নিশি রাত:নিশি রাত মিলে নিশিরাত। অনেকে মনে করেন, নিশি ও রাত সমার্থক। তাই নিশিরাত শব্দটি বাহুল্য এবং অপপ্রয়োগ। এই শব্দটির পরিবর্তে নিশীথ নিশীথিনী নিশুতি, নিশীতরাত প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার করা সমীচীন। এখন দেখি ব্যাকরণ ও প্রয়োগ কী বলে। নিশিরাত বা নিশি রাত সমাসবদ্ধ পদ। যদিও নিশি শব্দের অন্যতম একটি অর্থ ঘুমন্ত অবস্থায় হেঁটে বেড়ানোর রোগ, তবে এখানে নিশি শব্দের অর্থ রাত। অন্যদিকে, রাত শব্দের অর্থ রাত্রি, রজনি।  উভয় শব্দ সমার্থক তাই মনে করা হয় নিশিরাত বা নিশি রাত কথাটি অশুদ্ধ। সমার্থক হওয়ায় নিশিরাত যদি অশুদ্ধ বা অপপ্রয়োগ হওয়ার  একমাত্র কারণ হয় তাহলে জামবাটি, টাকাপয়সা, ধনদৌলত, কলাকৌশল, বইপুস্তক, ঘরবাড়ি, বালবাচ্চা, মানুষজন প্রভৃতি অসংখ্য শব্দ অশুদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কেউ এসব শব্দকে অশুদ্ধ বলে না। অন্যদিকে, নিশিরাত একটি বহুল প্রচলিত শব্দ। অনেক সাহিত্যকর্মে এর জমজমাট প্রয়োগ দেখা যায়: “নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে . . .।” নিশিরাত বা  ‘নিশি রাত’ অর্থ গভীর রাত।  ‘নিশিরাত’ বা ‘নিশি রাত’ কথার ‘নিশি’ অর্থ গভীর রাত। সামসবদ্ধ হলে অনেক সময় পদের অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়। যেমন: ছাগীর দুগ্ধ: ছাগদুগ্ধ। এটি সমাসবদ্ধপদ।  ‘নিশি’ ও ‘নিশি রাত’  দুটোই সমাসবদ্ধ পদ। দ্বিতীয়টি অসংলগ্ন বসলেও এটি সমাসবদ্ধ পদ। এরূপ অসংলগ্নভাবে বসা  সমাসবদ্ধ পদকে অসংলগ্ন সমাস বলা হয়।

শুদ্ধ, কিন্তু অনেকে মনে করেন অশুদ্ধ/১৪

সমসাময়িক না কি সামসময়িক:  অনেক মনে করেন সমসাময়িক শব্দটি অশুদ্ধ। তাদের মতে, সমসময় (একই সময়) + ষ্ণিক (ইক)= সামসময়িক। তাই সমসাময়িক ব্যাকরণিকভাবে অশুদ্ধ।  বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে সমসাময়িক শব্দটাকে সামসময়িক শব্দের অশুদ্ধ প্রচলিত ‍রূপ নির্দেশ করা হয়েছে। তবে, সমসাময়িক শব্দটি ব্যাকরণিকভাবে অশুদ্ধ নয়। সাময়িক শব্দের সঙ্গে সম যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে সমসাময়িক। যেমন: সময়+ইক= সাময়িক এবং সমসাময়িক= সম+সাময়িক। সুতরাং, সমসাময়িক ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ। অধিকন্তু, সমসাময়িক শব্দটি সামসময়িক শব্দের চেয়ে অধিক প্রচলিত। ‘সমসাময়িক’ এবং ‘সামসময়িক’ উভয় শব্দ শুদ্ধ। উভয় শব্দের অর্থ সমকালীন।

 

শুদ্ধ, কিন্তু অনেকে মনে করেন অশুদ্ধ/১৫
প্রশাসন ও প্রশাসনিক : ‘প্রশাসন’ শব্দের সঙ্গে ‘ইক’ প্রত্যয় যুক্ত করলে হয়, ‘প্রশাসন+ইক = প্রাশাসনিক’। যেমন : সময়+ইক = সাময়িক, বর্ষ+ইক= বার্ষিক, প্রত্যহ+ইক= প্রাত্যাহিক, নন্দন+ইক= নান্দনিক, সমষ্টি+ইক= সামষ্টিক ইত্যাদি। এ হিসেবে ‘প্রাশাসনিক’ শব্দটি শুদ্ধ। ‘শাসন’ শব্দের সঙ্গে ইক প্রত্যয় যুক্ত করলে হয়, ‘শাসন+ইক= শাসনিক’। যেমন : মাস+ ইক = মাসিক, কাল + ইক = কালিক, আত্মন্+ইক = আত্মিক, জাল+ইক= জালিক ইত্যাদি। এভাবে শাসন শব্দের সঙ্গে ‘ইক’ প্রত্যয় যোগে প্রাপ্ত ‘শাসনিক’ শব্দের সঙ্গে ‘প্র’ উপসর্গ যোগ করলে হয় ‘প্র+ শাসনিক= প্রশাসনিক’।অতএব ব্যাকরণগতভাবে ‘প্রশাসনিক’ এবং ‘প্রাশাসনিক’- দুটোই শুদ্ধ। ‘সমসাময়িক’ এবং ‘সামসময়িক’ শব্দদ্বয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
শুদ্ধ, কিন্তু অনেকে মনে করেন অশুদ্ধ/১৬
তরোয়াল:  ‘তরোয়াল’ ও ‘তলোয়ার’ সমার্থক। সংস্কৃত ‘তরবারি’ শব্দের মূল ও বিশুদ্ধ তদ্ভব রূপ ‘তরোয়াল’‘তরোয়াল’ বর্ণ বিপর্যয় হয়ে ‘তলোয়ার’ হয়েছে। সুতরাং, ‘তলোয়ার’ হচ্ছে তদ্ভব ‘তরোয়াল’ শব্দের বিপর্যস্ত বা বিকৃত বা অসংগত রূপ।বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত ‘তরবারি’ হতে উদ্ভূত ‘তরোয়াল’ অর্থ— (বিশেষ্যে) অসি, তরবারি, তলোয়ার। ‘তলোয়ার’ বাংলা শব্দ। যা ‘তরোয়াল’-এর বিকৃত উচ্চারণ হতে সৃষ্ট। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘তরোয়াল’ ও ‘তলোয়ার’ দুটোই ঠাঁই পেয়েছে। দুটোই প্রমিত। বিকৃত রূপটিই (তলোয়ার) বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত।
 ——————————
জানা অজানা অনেক মজার বিষয়: https://draminbd.com/?s=অজানা+অনেক+মজার+বিষয়
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
আমি শুবাচ থেকে বলছি
error: Content is protected !!