শ্রাবস্তীর কারুকার্য: শ্রাবস্তী কী এবং কেন কবিতায় উপমা

ড. মোহাম্মদ আমীন

শ্রাবস্তী (পালি: সাবত্থি) ছিল প্রাচীন কোশল রাজ্যের একটি সমৃদ্ধ শহর। গৌতম বুদ্ধের আগমন উপলক্ষ্যে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী সুদত্ত ও ধনকুবের যুবরাজ জেত পুরো শহরটিকে কারুকার্য-খচিত করার জন্য প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করে পৃথিবীর সব বিখ্যাত কারু ও চারু শিল্পীদের শ্রাবস্তী নগরে জড়ো করে ফেলেছিলেন। কথিত হয়, এই নগর-কারুকার্যক্রম এত মুগ্ধকর, সুচারু ও শৈল্পিক হয়েছিল যে, শ্রাবস্তী বিশ্ব-সৌন্দর্যের অতুলনীয় নিদর্শন হিসেবে সারা পৃথিবীর নজর কেড়ে নিতে সক্ষম হয়। যা জীবনানন্দ দাশের কবিতার উপমায় ব্যাকুল হয়ে উঠেছে আকুল ভাষায়: 

 “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের পর
হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা।”

কবিতায় বর্ণিত সমুদ্রটি ছিল মূলত রাপ্তি নদী। যেখানে পৃথিবীর বিভন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার নাবিক ও সৌন্দর্য পিয়াসী লোক জড়ো হতেন শ্রাবস্তীর

কারুকার্যমণ্ডিত শোভা উপভোগ করার জন্য। শহরটির প্রতিটি আনাচ-কানাচ এবং অবকাঠামোসমূহ এমনভাবে সজ্জিত করা হয়েছিল যে, পুরো পৃথিবীর সব সৌন্দর্য যেন এখানে এসে  উপছে পড়ছিল কানায় কানায়। তখন শ্রাবস্তীর সৌন্দর্য, সমৃদ্ধি ও মহিমান্বিত রূপের কথা সারা বিশ্বে অনুপম সৌন্দর্যের অনবদ্য উদাহরণ হয়ে ওঠে— কবিতায়, গানে, কথায় আর সাহিত্যে।কথিত হয়, বুদ্ধ ২৪ চতুর্মাস শ্রাবস্তীতে ছিলেন। গৌতম বুদ্ধের ব্যবহারের জন্য সুদত্ত গন্ধকাষ্ঠ দিয়ে একটি কুটির নির্মাণ করেন। যা বৌদ্ধসাহিত্যে গন্ধকুটির নামে খ্যাত।

খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের আগেই শ্রাবস্তী উপমহাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। নাগার্জুনের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতকে শ্রাবস্তীর জনসংখ্যা ছিল নয় লাখ। সেসময় এটি মগধের রাজধানী রাজগিরের চেয়ে অধিক সমৃদ্ধ ও মহিমান্বিত ছিল। পশ্চিম রাপ্তি নদীর নিকটে অবস্থিত শ্রাবস্তী এখন ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের দেবিপাটন বিভাগের একটি জেলা। ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে বাহরাইচ জেলা বিভক্ত করে শ্রাবস্তী জেলা গঠন করা হয়। ভিঙ্গা, শ্রাবস্তী জেলার সদর।২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রক শ্রাবস্তীকে ভারতের ২৫০টি জেলার মধ্যে একটি সর্বাধিক পিছিয়ে পড়া জেলা ঘোষণা করেছিল। প্রসঙ্গত, তখন ভারতে জেলার সংখ্যা ছিল মোট ৬৪০টি। 

চতুর্দশ শতকের ‘বৃহৎকল্প’-সহ বিবিধ কল্পের বর্ণনামতে, শ্রাবস্তীর প্রাচীন নাম ছিল মাহিদ। পরবর্তীকালে নাম হয় সাহেত-মাহেত। শহরটি জুড়ে একটি বিশাল দুর্গ ছিল যেখানে অনেকগুলো মন্দির ছিল।মন্দিরে ছিল দেবকুলিকাদের মূর্তি। গঙ্গার উত্তরে ছিল কোশল রাজ্য। শ্রাবস্তী ছিল কোশল রাজ্যের সমৃদ্ধ

শহর। ভারতীয় পুরাণমতে, রামের দুই পুত্র লব ‍ও কুশ। লবের জন্যই শ্রাবস্তী নগরী প্রতিষ্ঠা করা হয়। রাম কোশল মহাজনপদকে দুভাগে ভাগ করে লবকে শ্রাবস্তী  এবং জ্যেষ্ঠপুত্র কুশকে কুশবতী শহর প্রদান করেন।

মহাভারত অনুযায়ী শ্রাবস্তী শহরের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সম্রাট শ্রাবস্ততবে এর নামকরণ নিয়ে একাধিক প্রবাদ আছে। পালি ভাষায় শ্রাবস্তী হচ্ছে সাবত্থি। বৌদ্ধ ঐতিহ্যমতে, সাবত্থি নগরে সাধু সাবত্থা বাস করতেন।তাই নাম হয় সাবত্থি। অনেকের মতে, যেখানে শ্রাবস্তী  গড়ে উঠেছিল সেখানে একটি বিশাল অতিথিশালা ছিল। অতিথিশালায় বিভিন্ন রাজ্যের বণিকেরা সমবেত হতেন। একে অন্যকে জিজ্ঞেস করতেন, কিম বানডাম আত্থি? (কী আছে সঙ্গে?)
প্রায়শ উত্তরে আসত, সাবাম আত্তি (আমাদের সব আছে)।
এই সাবাম আত্তি শব্দ মিলে শহরটির নাম হয়েছে শ্রাবস্তী। 

শ্রাবস্তী গৌতম বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত একটি পুণ্যস্থান। সুদত্ত ছিলেন শ্রাবস্তী  এবং ষোড়শ মহাজনপদের অন্যতম ধনকুবের। ব্যবসায়ের কাজে মগধের রাজধানী রাজগৃহ শহরে অবস্থানকালে গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। গৌতম বুদ্ধকে শ্রাবস্তী যাওয়ার অনুরোধ করেন সুদত্ত। বুদ্ধ রাজী হন। খুশি হয়ে সুদত্ত শ্রাবস্তী ফিরে বুদ্ধের আগমন সংবাদের অপেক্ষায় থাকেন এবং নানা অবকাঠামো নির্মাণের তোড়জোড় শুরু করে দেন। একদিন শুনতে পান বুদ্ধ কয়েক হাজার শিষ্যসহ শ্রাবস্তী আসছেন। এত লোক কোথায় রাখবেন? শ্রাবস্তী নগরীর বাইরে যুবরাজ জেত-এর বিশাল একটি বাগান ছিল। সুদত্ত বাগানটি কিনতে চাইলেন। জেত প্রথমে রাজি হননি। পরে শর্ত দিয়ে বললেন,“স্বর্ণমুদ্রায় সম্পূর্ণ বাগান ঢেকে দিলে বাগনটি বিক্রি করব।” সদুত্ত সম্মত

হয়ে গোশকট করে স্বর্ণমুদ্রা এনে পুরো বাগান ঢেকে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। সুদত্তের পরম বুদ্ধভক্তি দেখে যুবরাজ জেত অভিভূত হয়ে সুদত্তকে পুরো বাগানটি দান করে দিলেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সুদত্ত জেত-এর নামে বাগানের নাম রাখলেন জেতবনকথিত হয়, বুদ্ধ ২৪ চতুর্মাস শ্রাবস্তীতে ছিলেন। যুবরাজ জেত অসম্ভব ধনাঢ্য ছিলেন। তিনি বুদ্ধকে আঠারো কোটি স্বর্ণ মুদ্রা দান করেন। গৌতম বুদ্ধের ব্যবহারের জন্য সুদত্ত গন্ধকাষ্ঠ দিয়ে একটি কুটির নির্মাণ করেন, যা বৌদ্ধ সাহিত্যে গন্ধকুটির নামে খ্যাত।

 
“সাহেত-মাহেত গ্রামের নিকটবর্তী প্রাচীন স্তূপ, মহিমান্বিত বিহারসমূহ এবং বেশ কয়েকটি মন্দির শ্রাবস্তীর সঙ্গে বুদ্ধের স্মৃতির সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। এখনো এখানে মাটি এবং ইটের একটি বিরাট গড়-প্রাচীর এই শহরটিকে ঘিরে রেখেছে। প্রাচীন শ্রাবস্তীর শহরের দেওয়াল এখনও দাঁড়িয়ে।  তন্মধ্যে তিনটি প্রাচীন স্থাপত্য দেখার জন্য  দেশবিদেশের পর্যটকেরা ভিড় করেন।  এগুলো হলো— আঙ্গুলিমালা স্তূপ, অনাথপিণ্ডিক স্তূপ  এবং জনৈক জৈন তীর্থঙ্করের উদ্দেশ্যে নিবেদিত প্রাচীন জৈন চৈত্যগৃহ। দর্শনীয় স্থানের মধ্যে আরও রয়েছে জেতবন, গৌতম বুদ্ধের নিবাস গন্ধকুটির। জেতবনে রয়েছে আনন্দবোধি বৃক্ষ।
 
 
error: Content is protected !!