ষড়যন্ত্র ব্যুৎপত্তি, ষড়যন্ত্র তৎসম না অতৎসম, সড় সড়ক ও সড় করা, তৎসম ও ণত্ব-ষত্ব 

ড. মোহাম্মদ আমীন

ষড়যন্ত্র ব্যুৎপত্তি, ষড়যন্ত্র তৎসম না অতৎসম, সড় সড়ক ও সড় করা, তৎসম ও ণত্ব-ষত্ব 

ষড়যন্ত্র শব্দের ব্যুৎপত্তি
তান্ত্রিকদের তন্ত্রসাধনার ছয় রকম আভিচারিক প্রক্রিয়া থেকে ষড়যন্ত্র শব্দের উদ্ভব। আভিচারিক পক্রিয়া মানে নিজের ইষ্ট, কিন্তু অন্যের অনিষ্ট সাধনের জন্য করা তান্ত্রিক প্রক্রিয়া। তাই ষড়যন্ত্র শব্দের মূল অর্থ হলো ছয়টি বন্ধন। এ ছয় বন্ধনে যাকে বাঁধা যাবে তার সর্বনাশ অবশ্যম্ভাবী। ছয়টি বন্ধনের সাধনাই হলো ষড়যন্ত্র।
এ ছয়টি বন্ধন হলো:
(১) মারণ বা প্রাণ হরণ করা;
(২) মোহন বা চিত্ত বিভ্রম ঘটানো;
(৩) স্তম্ভন বা যাবতীয় প্রবৃত্তি নষ্ট করা;
(৪) বিদ্বেষণ বা অন্তরে বিদ্বেষ সৃষ্টি করা;
(৫) উচ্চাটন বা স্বদেশবিভ্রম ঘটানো এবং
(৬) বশীকরণ বা ইচ্ছাশক্তি রোধ করে বশে আনা।
বর্তমানে তান্ত্রিকতা না থাকলেও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ছয় প্রকার আভিচারিক প্রক্রিয়ায় নিজের ইষ্ট ও অন্যের ক্ষতিসাধন অব্যাহত আছে। বরং আগের চেয়ে এর বিস্তার ও নিবিড়তা বৃদ্ধি পেয়েছে।
 
শুবাচের একটি যযাতিতে অভিজিৎ অভি বলেছেন: শ্রদ্ধেয় ম্যাডাম এবং স্যার, আপনারা দুজনেই ষড়যন্ত্রকে ছয়টি তান্ত্রিক ক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আমার জানামতে (আমার জানায় ভুল হতে পারে) শান্তিকর্ম, বশীকরণ কর্ম, স্তম্ভণ কর্ম, উচ্চাটন কর্ম, বিদ্বেষণ কর্ম ও মারণ কর্ম এই ছয়টি ক্রিয়াকে ষটকর্ম বলা হয়, ষড়যন্ত্র নয়। [পৌরাণিক অভিধান, সুধীরচন্দ্র সরকার]
 
তাছাড়াও যন্ত্র শব্দটি কেন ক্রিয়াকর্ম বা বন্ধন অর্থে প্রয়োগ করা হল, এই বিষয়টি বুঝিয়ে দিলে ভাল হয়। তন্ত্রে যন্ত্র শব্দটির বিশেষ তাৎপর্য আছে। “নির্দিষ্ট ফললাভের জন্য নির্দেশিত মন্ত্র কিংবা মন্ত্রের অন্তর্গত বর্ণসমূহের মান অনুযায়ী সংখ্যারেখা, বিন্দু, চিত্র ইত্যাদি বিশেষ কিছুর উপর লিখিয়া ব্যবহার করা হয়, তাহাই যন্ত্র।” – তন্ত্র মন্ত্র সম্ভার, শ্রী হরিমোহন তান্ত্রিকাচার্য
 
সংসদ বাঙ্গালা অভিধানমতে ষড় শব্দের সাথে সংস্কৃত ‘যন্ত্র’ যুক্ত হয়ে ষড়যন্ত্র শব্দের উদ্ভব। ষড় শব্দটি ফারসি শলাহ শব্দ হতে এসেছে, যার অর্থ চক্রান্ত বা গুপ্ত পরামর্শ করা। এর সাথে ‘ক্রিয়াসাধক কৌশল’ অর্থে যন্ত্র যুক্ত হয়েছে। তাই ষড়যন্ত্র শব্দটি ফারসি+সংস্কৃত, একটি মিশ্র শব্দ।
আপনাদের মতামত পড়ে বেশ দ্বিধায় পড়ে গেলাম, আশা করি আপনারা এই দ্বিধা দূর করবেন এবং আমার কোন ভুল হলে তা শুধরে দেবেন। আপনাদের কাছেই শেষ আশ্রয়, অন্য কোথাও এই দ্বন্দ্ব মিটানোর কোন আশা নেই। আপনাদের অনেক ধন্যবাদ।
 
খুরশেদ আহমেদ বলেছেন: “সংসদ বাঙ্গালা অভিধানমতে ষড় শব্দের সাথে সংস্কৃত ‘যন্ত্র’ যুক্ত হয়ে ষড়যন্ত্র শব্দের উদ্ভব। ষড় শব্দটি ফারসি শলাহ শব্দ হতে এসেছে, যার অর্থ চক্রান্ত বা গুপ্ত পরামর্শ করা। এর সাথে ‘ক্রিয়াসাধক কৌশল’ অর্থে যন্ত্র যুক্ত হয়েছে। তাই ষড়যন্ত্র শব্দটি ফারসি+সংস্কৃত, একটি মিশ্র শব্দ।” — ষড়যন্ত্র শব্দটির ব্যুৎপত্তিসহ অধিকতর যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য একটি ব্যাখ্যা উপস্থাপন করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ, অভিজিৎ অভি !

সড় সড়ক ও সড় করা

সংস্কৃত ষড়যন্ত্র থেকে উদ্ভূত ‘সড়’ অর্থ ষড়যন্ত্র, গুপ্তমন্ত্রণা। ‘সড় করা’ অর্থ— গোপনে পরামর্শ করা, ষড়যন্ত্র করা। ‘সড়’ থেকে ‘সড়ক’ নয়। সড়ক হিন্দি শব্দ। এর অর্থ— রাস্তা, পথ। ‘সড়কি’ সড়কের স্ত্রী নয়। `সড়কি’ অর্থ— বর্শা, বল্লম। এটি দেশি শব্দ।
 

আমার প্রশ্ন

ষড়যন্ত্র কি তৎসম না কি অতৎসম?
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানের ১২৭৬ পৃষ্ঠায় সড় ভুক্তিতে বলা হচ্ছে ষড়যন্ত্র সংস্কৃত বা তৎসম। আবার ১২৬০ পৃষ্ঠায় ষড়যন্ত্র ভুক্তিতে বলা হচ্ছে ষড়যন্ত্র শব্দটি আরবি শলাহ্ ও সংস্কৃত যন্ত্র সমন্বয়ে গঠিত।এ হিসেবে এটি অতৎসম, মিশ্র শব্দ।
কোনটি ঠিক?
 
 
তৎসম ও ণত্ব-ষত্ব 
তৎসম ছাড়া অন্য শব্দের বানানে ণত্ববিধান ও ষত্ববিধান প্রযোজ্য নয়- কথাটি সর্বক্ষেত্রে ঠিক না। যেমন : ষড়যন্ত্র (আরবি), ষণ্ডা, ষাঁড়, ষাঁড়া, ষাট, ষেট, ষোলো, ষোলোকলা প্রভৃতি অতৎসম শব্দ। ‘বর্ণালি, বর্ণিল, বর্ণা, বর্ণানুক্রমে প্রভৃতি অতৎসম হওয়া সত্ত্বেও মূর্ধন্য-ণ ব্যবহৃত হয়েছে।
error: Content is protected !!