সংগ্রাম পরিষদের দাবি দিবস ও কার্যক্রম

সংগ্রাম পরিষদের দাবি-দিবস

১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই জানুয়ারি সংগ্রাম পরিষ ‘দাবি-দিবস’ পালন উপলক্ষ্যে প্রথম ছাত্রসভা আহবান করে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে (১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের   ৭ ডিসেম্বর থেকে বলবৎ) মিছিল বের করে। কিন্তু দায়িত্বরত পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, রায়ট গাড়ি থেকে লাল রঙের পানি নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে ছাত্রদের মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষে বাংলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মোশাররফ হোসেনসহ বহু ছাত্র আহত হন।

সংগ্রাম পরিষদের  ঢাকা শহরে ছাত্র ধর্মঘট

১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই জানুয়ারি পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে ১৮ই জানুয়ারি ঢাকা শহরে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালনের সময় ছাত্ররা ই.পি.আর বাহিনীর ডবল ডেকার বাসে অগ্নিসংযোগ করে। এসময় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন ছাত্র গ্রেফতার হন। ছাত্র গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১৯শে জানুয়ারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ধর্মঘট আহবান করে মিছিল বের করলে পুলিশ আট জন ছাত্রকে আটক করে।

সংগ্রাম পরিষদের প্রদেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘট

সরকারি নির্যাতন বন্ধ, গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের মুক্তি ও এগারো দফার সমর্থনে সংগ্রাম পরিষদ ২০শে জানুয়ারি প্রদেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘট আহবান করে। এ দিন ধর্মঘটের সমর্থনে ঢাকায় ছাত্ররা মিছিল বের করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে এক পুলিশ অফিসারের পিস্তলের গুলিতে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) ছাত্রনেতা আসাদ (আসাদুজ্জামান) শহীদ হন। একই দিন চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর সব প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা মিছিল বের করে এবং ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ হয়।

সংগ্রাম পরিষদের  সাধারণ হরতাল ও গায়েবানা জানাজা

শহীদ আসাদুজ্জামানের স্মরণে ২১শে জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকায় সাধারণ হরতাল পালন ও গায়েবানা জানাজার আয়োজন করে। সংগ্রাম পরিষদ তিনদিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করে: ২২শে জানুয়ারি প্রদেশব্যাপী মিছিল ও প্রতিবাদ সভা, ২৩ জানুয়ারি মশাল মিছিল এবং ২৪শে জানুয়ারি হরতাল। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবানে ২৪শে জানুয়ারির হরতাল পালনের সময় ময়মনসিংহে ২ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়। নারায়ণগঞ্জে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ এবং টাঙ্গাইলে ৯ জন আহত হয়। ঢাকায় নবকুমার ইনস্টিটিউটের দশম শ্রেণির ছাত্র মতিয়ূর রহমান ও জনৈক রুস্তম আলী নিহত হন। সান্ধ্য আইন উপেক্ষা করে বিকালে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সংবাদপত্রে একটি বিবৃতি প্রদান করে।

শপথ দিবস

 ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ‘শপথ দিবস’ পালন করে। ছাত্রনেতারা পল্টনের জনসভায় কয়েকটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

শপথ দিবসের প্রস্তাব

শোক প্রস্তাব :  শহিদ আসাদ, মতিয়ুর, মিলন, আলমগীর, রুস্তম আলী-সহ যাঁরা এগারো দফা আদায়ের সংগাামে আত্মাহূতি দিয়েছেন তাঁদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করা হচ্ছে; উল্লেখ্য, ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের সারা বাংলায় ৬১ জন নিহত হন যাঁদের মধ্যে ২১ জন ছাত্র।

শপথ প্রস্তাব : স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অবসান, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও এগারো দফা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে নেওয়ার শপথ গ্রহণ করা হচ্ছে;

রাজনৈতিক প্রস্তাব:  আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাসহ সকল রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করতে হবে এবং জরুরি আইন, দেশরক্ষা আইন, নিরাপত্তা আইন প্রভৃতি কালাকানুনে আটক রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের মুক্তিদান করতে হবে; সকল কালাকানুন বাতিল করতে হবে, ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারসমূহকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং এ সকল দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বিরোধী দলের নেতাদের গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত হতে দেয়া হবে না।

অন্যান্য প্রস্তাব :  ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি ঘোষণা ও কালো পতাকা উত্তোলন। সভায় আইয়ুব নগরের নাম শেরে বাংলা নগর, আইয়ুব গেট শহীদ আসাদুজ্জামান গেট এবং আইয়ুব চিলড্রেন্স পার্কের নাম শহীদ মতিয়ুর রহমান পার্ক রাখার প্রস্তাব করা হয়।

আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার শুরু

error: Content is protected !!