সংবিধান সংশোধন : একনজরে প্রথম থেকে সপ্তদশ সংশোধন পর্যন্ত

সংবিধানের সংশোধন

ড. মোহাম্মদ আমীন

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৭টি সংশোধনী আনা হয়েছে। এ সময়ে বিদ্যমান ১০টি সংসদের মধ্যে সপ্তম সংসদ ছাড়া প্রতিটি সংসদেই সংবিধান সংশোধন হয়েছে। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদকালের সপ্তম সংসদে সংবিধানের কোনও সংশোধন হয়নি। অন্যদিকে, প্রথম সংসদের মেয়াদকালে ৪ বার সংবিধানে সংশোধন হয়। যা এক সংসদের অধীনে সর্বোচ্চ।

প্রথম সংশোধন
সংবিধান সংশোধনের প্রথম বিলটি ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই জুলাই সংসদে উত্থাপিত হয় এবং ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জুলাই পাস হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধাপরাধীসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা। তৎকালীন আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। ২৫৪-০ ভোটে বিলটি পাস হয়। তিনজন ভোটার ওই সময় ভোটদানে বিরত থাকেন। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই জুলাই বিলটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাভ করে। এসময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আইনমন্ত্রী ছিলেন ড. কামাল হোসেন।

দ্বিতীয় সংশোধন
সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী বিল ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই সেপ্টেম্বর সংসদে উত্থাপিত হয় এবং ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ২০ শে সেপ্টেম্বর পাস হয়। এতে সংবিধানের ২৬, ৬৩, ৭২ ও ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদের সংশোধন আনা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ গোলযোগ বা বহিরাক্রমণে দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জীবন বাধাগ্রস্ত হলে ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার বিধান চালু করা হয়। আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর বিলটি সংসদে উত্থাপন করলে ২৬৭-০ ভোটে তা পাস হয়। সংসদের তৎকালীন বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সংসদেরা বিল পাসের সময় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ২২ শে সেপ্টেম্বর বিলটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পায়।

তৃতীয় সংশোধন
ভারত ও বাংলাদেশের সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত একটি চুক্তি বাস্তবায়ন করার জন্য ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ২১ শে নভেম্বর এ সংশোধন বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হয় এবং ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ শে নভেম্বর বিলটি পাস হয়। এই সংশোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত চুক্তি অনুমোদন এবং চুক্তি অনুযায়ী ছিটমহল ও অপদখলীয় জমি বিনিময়ের বিধান প্রণয়ন করা হয়। আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর উত্থাপিত বিলটি ২৬১-৭ ভোটে পাস হয়। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে নভেম্বর বিলটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পায়।

চতুর্থ সংশোধন
১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে জানুয়ারি বিলটি সংসদের উত্থাপন করা হয়। এর মাধ্যমে সংসদীয় শাসন পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন পদ্ধতি চালু এবং বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে একদলীয় রাজনীতি প্রবর্তনই ছিল এই সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য। আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর সংশোধনীর বিষয়টি উত্থাপন করেন। বিলটি ২৯৪-০ ভোটে পাস হয়। বিলটি পাসের সময় সরকারি দলের সদস্য এমএজি ওসমানী ও ব্যারিস্টার মঈনুল ইসলাম সংসদ বর্জন করেন। বিলটি যেদিন উত্থাপন করা হয় সেদিনই পাস হয় এবং সেদিনই অর্থাৎ ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ শে জানুয়ারি তা রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাভ করে।

পঞ্চম সংশোধন
১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই এপ্রিল জাতীয় সংসদে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চম সংশোধন বিলটি আনা হয়। সংসদ নেতা শাহ আজিজুর রহমান উত্থাপিত বিলটি ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই এপ্রিল ২৪১-০ ভোটে সংসদে পাস হয়। এই সংশোধনের মাধ্যমে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই অগস্টের পর থেকে ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক সরকারের যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দানসহ সংবিধানের বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম সংযোজন করা হয়। বিলটি উত্থাপনের সময় রাষ্ট্রপতি ছিলেন জিয়াউর রহমান। এ সংশোধনটি উচ্চ আদালতের রায়ে ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে অবৈধ ঘোষিত হয়ে যায়।

ষষ্ঠ সংশোধন
১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই জুলাই এই সংশোধন বিল জাতীয় সংসদের উত্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর উপরাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই সময়ে বিএনপি, রাষ্ট্রপতি পদে তাদের প্রার্থী হিসেবে আব্দুস সাত্তারকে মনোনয়ন দেয়। ষষ্ঠ সংশোধনের মাধ্যমে সেই পথটাই নিশ্চিত করা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে উপ-রাষ্ট্রপতি পদে বহাল থেকে, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের বিধান নিশ্চিত করা হয়। সংসদ নেতা শাহ আজিজুর রহমান উত্থাপিত বিলটি ২৫২-০ ভোটে পাস হয়। বিলটি ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই জুলাই রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাভ করে।

সপ্তম সংশোধন
১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই নভেম্বর এই সংশোধন বিল সংসদের উত্থাপন করা হয়। এর দ্বারা সংবিধানের ৮৬ অনুচ্ছেদ এবং সংবিধানের চতুর্থ তফসিলের সংশোধন করা হয় এবং তাতে ১৯ প্যারাগ্রাফ নামে একটি নতুন প্যারাগ্রাফ যুক্ত করা হয়। ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই নভেম্বর পর্যন্ত দেশে সামরিক শাসন বহাল ছিল। ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ১১ নভেম্বর জাতীয় সংসদে সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে এরশাদের ওই সামরিক শাসনে বৈধতা দেওয়া হয়। এই সংশোধনের মাধ্যমে ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে মার্চ থেকে ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই নভেম্বর পর্যন্ত সামরিক আইন বলবৎ থাকাকালীন প্রণীত সব ফরমান, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের আদেশ, নির্দেশ ও অধ্যাদেশসহ অন্যান্য আইন অনুমোদন দেওয়া হয় । আইনমন্ত্রী বিচারপতি কে এম নুরুল ইসলাম উত্থাপিত সংবিধান সংশোধন বিলটি ২২৩-০ ভোটে পাস হয়। ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই নভেম্বর এটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাভ করে। ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ শে আগস্ট আদালত এ সংশোধনকে অবৈধ ঘোষণা করে।

অষ্টম সংশোধন
অষ্টম সংশোধন বিল ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই মে সংসদ নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সংসদে উত্থাপন করেন। ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই জুন এটি ২৫৪-০ ভোটে পাস হয় এবং ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই জুন রাষ্ট্রপতির অনুমতি লাভ করে। এর দ্বারা সংবিধানের ২, ৩, ৫, ৩০ ও ১০০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হয়। এই সংশোধন আইনবলে (১) ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষিত হয়; (২) ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট বিভাগের ছয়টি স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়; (৩) সংবিধানের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে ইবহমধষর শব্দটি পরিবর্তন করে ইধহমষধ করা হয় এবং উধপপধ পরিবর্তন করে উযধশধ করা হয়; (৪) সংবিধানের ৩০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পূর্বানুমতি ছাড়া দেশের কোনো নাগরিক কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের প্রদত্ত কোনো খেতাব, সম্মাননা, পুরস্কার বা অভিধা গ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়। প্রসঙ্গত, পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদের সংশোধনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে, কারণ তার দ্বারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তিত হয়েছে।

নবম সংশোধন
সংসদ নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই জুলাই সংশোধন বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই জুলাই বিলটি ২৭২-০ ভোটে সংসদে পাস হয়। এ সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতিকে নিয়ে কিছু বিধান সংযোজন করা হয়। এ সংশোধনে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের সঙ্গে একই সময়ে উপরাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা হয় এবং রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিমেয়াদের পাঁচ বছর করে কোনও ব্যক্তির পর পর দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন সীমাবদ্ধ রাখা হয়। এই সংশোধনে আরও বলা হয় যে, শূন্যতা সৃষ্টি হলে একজন উপ-রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করা যেতে পারে, তবে সেই নিয়োগের পক্ষে জাতীয় সংসদের অনুমোদন আবশ্যক হবে। অবশ্য দ্বাদশ সংশোধনের পর এ সংশোধনের কার্যকারিতা আর নেই।

দশম সংশোধন
আইন ও বিচারমন্ত্রী হাবিবুল ইসলাম ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই জুন বিলটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন এবং ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই জুন বিলটি ২২৬-০ ভোটে পাস হয়। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ শে জুন বিলটি রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের অনুমোদন লাভ করে। এই সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কার্যকালের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে ১৮০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যাপারে সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদের বাংলা ভাষ্য সংশোধন করা হয়। অধিকন্তু, সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে পরবর্তী ১০ বছরের জন্য জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য ৩০টি আসন সংরক্ষণের বিধান করা হয়, যেসব আসনে নারীরা নির্বাচিত হবেন সংসদ সদস্যদের ভোটে।

একাদশ সংশোধন
আইন ও বিচারমন্ত্রী মির্জা গোলাম হাফিজ ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ২রা জুলাই বিলটি সংসদের উত্থাপন করেন এবং ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই অগাস্ট ২৭৮-০ ভোটে পাস হয়। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই অগাস্ট ২৭৮-০ ভোটে পাস হয়। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই অগাস্ট বিলটি রাষ্ট্রপতি/প্রধান উপদেষ্টার শাহাবুদ্দিন আহমেদের অনুমোদন লাভ করে। এই আইন পাস হয় ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই আগস্ট। এ আইনবলে সংবিধানের চতুর্থ তফসিল সংশোধন করা হয় এবং তাতে ২১ নং নতুন প্যারাগ্রাফ সংযুক্ত করা হয়; এই প্যারাগ্রাফ বাংলাদেশের উপ-রাষ্ট্রপতি পদে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নিয়োগ ও শপথ গ্রহণ এবং ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর তাঁর নিকট রাষ্ট্রপতি এইচ.এম এরশাদের পদত্যাগ পত্র পেশ এবং নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস কর্তৃক ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই অক্টোবর রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব গ্রহণকে বৈধতা দান করে। এই সংশোধন আইন ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর থেকে ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই অক্টোবর পর্যন্ত অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে উপ-রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রয়োগকৃত সকল ক্ষমতা, প্রবর্তিত সকল আইন ও অধ্যাদেশ, জারিকৃত সকল আদেশ ও আইন এবং গৃহীত সকল পদক্ষেপ ও কার্যপ্রণালীকে অনুমোদন দেয়, নিশ্চিত করে ও বৈধতা দেয়। এই আইন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শেষে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের পূর্ববর্তী পদ, অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির পদে প্রত্যাবর্তনকে সম্ভব করে ও এ ব্যাপারে নিশ্চয়তা দেয়।

দ্বাদশ সংশোধন
প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া উত্থাপিত বিলটি ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ২রা জুলাই সংসদে উত্থাপন করা হয় এবং ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই অগাস্ট ৩০৭-০ ভোটে পাস হয়। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই সেপ্টেম্বর বিলটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাভ করে। বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিকাশের ইতিহাসে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে খ্যাত এই সংশোধন আইন পাস হয় ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই আগস্ট। এর দ্বারা সংবিধানের ৪৮, ৫৫, ৫৬, ৫৮, ৫৯, ৬০, ৭০, ৭২. ১০৯, ১১৯, ১২৪, ১৪১ক এবং ১৪২ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হয়। এই সংশোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশে সংসদীয় সরকার পদ্ধতির পুনঃপ্রবর্তন ঘটে; রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হন; প্রধানমন্ত্রী হন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী; প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদ জাতীয় সংসদের কাছে দায়বদ্ধ হয়; উপ-রাষ্ট্রপতির পদ বিলোপ করা হয়, জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান করা হয়। তাছাড়া, সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে এই আইনে স্থানীয় সরকার কাঠামোতে জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়।

ত্রয়োদশ সংশোধন
আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ২১ শে মার্চ ত্রয়োদশ সংশোধন বিল জাতীয় সংসদের উত্থাপন করেন। বিলটি ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ শে মার্চ ২৬৮-০ ভোটে পাস হয় এবং ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ শে মার্চ রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাভ করে। এই সংশোধনের দ্বারা একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান করা হয়, যা একটি অন্তবর্তীকালীন প্রশাসন হিসেবে কাজ করবে এবং সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে সর্বতোভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করবে। একজন প্রধান উপদেষ্টা ও অনূর্ধ্ব ১০ জন উপদেষ্টার সমন্বয়ে গঠিতব্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার সমষ্টিগতভাবে রাষ্ট্রপতির নিকট দায়বদ্ধ থাকবে এবং নতুন সংসদ গঠনের পর নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী দাযয়িত্ব গ্রহণের তারিখে বিলুপ্ত হবে। উচ্চ আদালতের আদেশে ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে এই সংশোধনটি বাতিল ঘোষিত হয়।

চতুর্দশ সংশোধন
আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ প্রথম বার ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে মার্চ এবং দ্বিতীয়বার ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে এপ্রিল বিলটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই মে বিলটি ২২৬-১ ভোটে পাস হয় এবং ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই মে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাভ করে। বিলটি পাসের সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া। এই সংশোধন দ্বারা অপরাপর বিষয়ের সঙ্গে জাতীয় সংসদে পরবর্তী দশ বছরের জন্য মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৩০ থেকে ৪৫-এ বর্ধিতকরণ; সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অবসরগ্রহণের বয়স ৬৫ বছরের স্থলে ৬৭ বছর নির্ধারণ; রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অফিসে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি এবং সকল সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার অফিস এবং বিদেশে কুটনৈতিক মিশনে প্রধানমন্ত্রীর ছবি প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়।

পঞ্চদশ সংশোধন
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমদ ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ শে জুন বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন এবং ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ শে জুন ২৯১-১ ভোটে পাস হয়। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা জুলাই বিলটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাভ করে। এসময় প্রধামন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা। এই সংশোধন দ্বারা সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা পুনর্বহাল করা হয় এবং রাষ্টীয় মুলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি সংযোজন করা হয়। এর মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক হিসেবে স্বীকৃতিও দেওয়া হয়। এই সংশোধনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, জাতীয় সংসদে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বিদ্যমান ৪৫-এর স্থলে ৫০ করা হয়। সংবিধানে ৭ অনুচ্ছেদের পরে ৭ (ক) ও ৭ (খ) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে সংবিধান বহির্ভূত পন্থায় রাষ্টীয় ক্ষমতা দখলের পথ রুদ্ধ করা হয়।
ষোড়শ সংশোধন
আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন এবং ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই সেপ্টেম্বর ৩২৮-০ ভোটে পাস হয়। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে সেপ্টেম্বর এটি রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে। এই সংশোধনের মাধ্যমে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বিরোধী দল জাতীয় পার্টি বিলটির পক্ষে ভোট দেয়। পরে হাইকোর্ট একে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। আপিল বিভাগও ওই রায় বহাল রাখে। তবে, বর্তমানে এই রায়টি রিভিউতে রয়েছে।

সপ্তদশ সংশোধন
আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই এপ্রিল বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই জুলাই ২৯৮-০ ভোটে সংসদে পাস হয় এবং ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ শে জুলাই এটি রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে। এই বিলে আরও ২৫ বছরের জন্য জাতীয় সংসদের ৫০টি আসন শুধু নারী সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়।


বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

বাংলাদেশের সকল জাতীয় দিবস

বাংলাদেশের সকল জাতীয় দিবস/১

বাংলাদেশের সকল জাতীয় দিবস/২

বাংলাদেশের সকল জাতীয় দিবস/৩

বাংলাদেশের সকল জাতীয় দিবস/৪

বাংলাদেশের সকল জাতীয় দিবস/৫

বাংলাদেশের সকল জাতীয় দিবস/৬

বাংলাদেশের সকল জাতীয় দিবস/৭

বাংলাদেশের সকল জাতীয় দিবস/৮

বাংলাদেশের সকল জাতীয় দিবস/৯

বাংলাদেশের সকল জাতীয় দিবস/১০

বাংলাদেশের সকল জাতীয় দিবস/১১

বাংলাদেশের সকল জাতীয় দিবস/১২

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম-এর আমলে বঙ্গভবন

ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ সমগ্র লিংক

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

শুদ্ধ বানান চর্চা /৪

error: Content is protected !!