সখি ভাবন কাহারে বলে: ইস্টিশান ও কন্ডিশান

ইউসুফ খান
ইউসুফ খান
মা মেঝেতে থাপন গেড়ে বসে আছে আর দুধের বাচ্চাটা মায়ের থাপনে কাদা হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। শিশুটা কোথায় আছে, না মায়ের থাপনে; শিশুটা কীভাবে আছে, না কাদা হয়ে। থাপন হচ্ছে স্থাপনা স্টেশন আর কাদাকাদা হচ্ছে কণ্ডিশন। অবস্থান আর অবস্থা। তবে অবস্থা কথাটার মূলেও অবস্থানই আছে। তাই কণ্ডিশন-এর জন্য অন্য একটা শব্দ হলে ভালো হয়। সে শব্দ আছে, ওই প্রশ্নটার মধ্যেই আছে – শিশুটা কীভাবে আছে। কণ্ডিশন এর বাংলা হচ্ছে ভাব আর কণ্ডিশনিং এর বাংলা হচ্ছে ভাবন। দুটোরই কংক্রিট অ্যাবস্ট্র্যাক্ট দুটো রূপই হয়। হেয়ার কণ্ডিশনার আর এয়ার কণ্ডিশনার দুটোতেই কণ্ডিশনিং কথাটা একই এবং ঠিকই মানেতে ব্যবহার হয়েছে। বাঙালি হেয়ার কণ্ডিশনারের বাংলা করতে পারেনি। এয়ার কণ্ডিশনারের একটা বাংগালা করা হয়েছিলো কিন্তু সেটা এখন হিন্দির কাছে হেরে বসে আছে। কিন্তু সাহেবদের দাদুর দাদুর আগেই আমাদের দিদার দিদারা কণ্ডিশনিং এর বাংলা করে রেখে গেছে – ভাবন। উচ্চারণ ভাবোন।
ভাবন রসায়ন: আমাদের কবরেজরা জড়ি বুটি শুঁঠ রুট কুটে ঘেঁটে তাতে বিভিন্ন লতা পাতার রস কষ মধু নির্যাস দিয়ে ঘুঁটে সেটাকে ফেলে রাখতো সিজ়ন শোধন সংস্কার করার জন্য। গুঁড়োকে রসে বা তরলে গুলে ফেলে রেখে সিজ়ন করাকে বলতো ভাবন ভাবুন ভাবানো। ওড়িআতে একে বলে ভাবনা দেওয়া। আমাদের দাদি-দিদারা মাথা ধুতে চানের আগে রিঠা শিকাকাই এলামাটি ভিজিয়ে লেই করে মাথায় মেখে বসে থাকতো। এটাই ছিলো সে যুগের চুলের কণ্ডিশনিং ভাবন। এ যুগের কেমিক্যাল কণ্ডিশনারও মাথায় দিয়ে খানিকক্ষণ রেখে দিতে হয়। আমাদের দাদি-দিদারা ত্বকের কণ্ডিশনিং করে ত্বককে নরম তুলতুলে চকচকে করতে ছোলা.বাটা বেসন হলুদ মুলতানি.মাটিতে মাখন মধু মিশিয়ে লেই করে মুখে হাতে পায়ে লেপে বসে থাকতো। এভাবে ত্বকের কণ্ডিশনিং করাটাও ভাবন। প্রাচীন এই ফেসপ্যাক মাডপ্যাক আজও চলে, সঙ্গে লাখো কিসিমের কেমিক্যাল হিমানি ক্রিম ওজ়োন মাজন এসে গেছে।
ভাবরা ও ভাবন: কবরেজের টোটকা ঘোঁটা আর মেয়েদের মুখে ময়দা সাঁটা দুজায়গাতেই ভাবনের মূল ভাবনা হচ্ছে – রস দিয়ে রসায়ন, ড্রাই ভাব দূর করে রসে রসস্থ করতে লিকুইডে ভিজিয়ে ফেলে রাখা। কেশে কুন্তলীন লিপে লিপস্টিক মুখে মাখন ময়েশ্চারাইজ়ার এ সবই রসায়নী ভাবন, হাইড্রেটিং, আব ভাবের ভাবন।
তাই ভাবন ভাবানো ভাপন ভাপানো কথাগুলো কেমনধারা সহোদরা সহোদরা মনে হয়। ভাপ মানেতে ভাব ভাবরা কথাগুলো আগে চলতো। নীলদর্পণে তোরাপ আলি এট্টু পানি চাইলে দেওয়ান গোপীনাথ বলেছিলো – ‘বাবা নীলের গুদাম, ভাবরার ঘর, ঘামও ছোটে জলও পাওয়া যায়। আয় তোরা…।’ ভাবরা দিয়ে ভাবন মানে স্টিম ট্রিটমেন্ট আজও আছে, বাড়াবাড়ি রকমে আছে। ওড়িআতে ভাবনের একটা মানে জল ছিটোনো।
ভাবন ও সাজন: শুধু রসানো ভাপানো ভাবনাতেই ভাবন আটকে ছিলো না। চুলে সুগন্ধী ধোঁয়া দেয়া মায় বগলে বিদেশি এসেন্স দেয়া টাইপের সমস্ত অঙ্গরাগ শৃঙ্গার প্রসাধন কেশবেশ ভাবনের আওতায় এসে গিয়েছিলো। শ্যাম্পু তেলে চুল চকচকে করা বা স্নো ক্রিমে ত্বক চকচকে করা হচ্ছে ভাবন, মেহেদি আলতা রুজ় ব্লাশার লিপস্টিক দিয়ে অঙ্গরাগ করা হচ্ছে রঞ্জন, খোঁপায় ফুল কানে দুল গায়ে গয়না পরাকে বলে সাজন। একসময় সাজন কথাটা বাকি কথাগুলোকে গিলে হজম করে নেয়, ভাবন তখন ভাবনা ঘেঁষা হয়ে তার কাঁচা মানে থেকে সরে যায়। কিন্তু এখনও পুজো প্যাণ্ডেলে যখন লেখা হয় প্রতিমা ভাবনায় প্যালাচাঁদ পাল, তখন সেই ভাবনায় ভাবন সাজন সাজসজ্জা সব চলে আসে। আজকাল মেকআপ কথাটা এসে সাজন কথাটাকেও গিলে খেয়েছে।
ভাবন ও ভাবুনি: যে মেয়ে ভাবন করে বা ভাবন নিয়েই ব্যস্ত থাকে তাকে বলা হতো ভাবনি ভাবুনি ভাবুনী ভাবুনে ভাবনকারী। কথাটা শুধু মেয়েদের সম্পর্কেই বলা হতো। আমরা এখনকার পঞ্চাশপার বুড়োবুড়িরা অনেকেই ভাবন ও ভাবুনি কথাদুটো এই মানেতে শুনেছি। ভাবুনি মেয়ের হাব ভাবকেও বলে ভাবুনি বা ভাবকালি ভাবকালী। ‘কত্ত ভাবুনি করছে’। চর্যায় আছে ভাভরিআলী (ভাবরা স্মর্তব্য)। ডোমনির সঙ্গসুখ লাভ করে সিদ্ধাচার্য ভেবরে গেছে, বুঝে গেছে ডোমনির ফ্যানবেস এত ছড়ানো কী করে হলো (বাহ্য মানে) –
কইসণি হালো ডোম্বী তোহোরী ভাভরিআলী ।
অন্তে কুলিণজন মাঝেঁ কাবালী॥
(কী করে হলো ডোমনি তোর ভাবকালী।
শেষে কুলীনজন মাঝে কাপালী॥)
ডিকশনারিতেও ভাবন ভাবুনি কথাদুটো আছে। নীলমাধব নাগের বীরভূমের আঞ্চলিক ভাষার অভিধানে আছে – ‘যা তোর চ্যাহেরা আর অতো ভাবুন করত্যে হবে না লে!’ কিংবা ‘আচ্ছা ভাবনকারী মেয়্যা বটিস তু।’ বাংলাদেশের আঞ্চলিকে ভাবুনি মানে দিয়েছে – পরিপাটি অবস্থায় অযথা সময় কাটানো। জ্ঞানেন্দ্রমোহন মানে দিয়েছেন – অতিরিক্ত বেশবিন্যাসানুরাগিনী স্ত্রী; ভাবনপ্রিয়া নারী। একটা গ্রাম্য ছড়াও দিয়েছেন –
ভাবনি লো ভাবনি তোর ঘর পুড়ে যায়!
পুড়ুক গে আমার ঘর আমার ভাবন বয়ে যায়।
১৯২৭এ লেখা রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরেতে বিমলার আত্মকথায় আছে – ‘মেজরাণী হেসে বল্লেন, একটা কিছু ছুতো পেলেই অম্‌নি সাজ। ঢের দেখেছি, তোর মতো এমন ভাবুনে দেখি নি।’ রবীন্দ্রনাথও এখানে সাজুনে মানেতে ভাবুনে কথাটা ব্যবহার করলেন।
ভাবুনি ও ভাবিনী: বেশি ভাবন করাকে কোনও যুগেই ভালো চোখে দেখা হয়নি। আজকের যারা বুড়ি তারা চারা বয়েসে সে যুগের বুড়িদের কাছে শুনতো – ‘পড়া নেই শোনা নেই দিনরাত খালি সাজন ভাবন, দাঁড়া তোর বাপকে বলে বিয়ের ব্যবস্থা করছি।’ সে যুগে বিকেল হলে ভাবুনে মেয়েরা ভাবন করে পাড়া বেড়াতে বেরোতো, পাড়ায় এক চক্কর লাগিয়ে মোড়ের মাথার ম্যাড়াগুলোর মাথায় চক্কর লাগিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরতো। এদের মধ্যে যারা একটু ছম্মক.ছল্লো ছিলো তাদের বোঝাতে কথাটা ছিলো ভাবিনী।
ডিকশনারিতে ভাব-এর অন্য অন্য মানের মাঝে এসবও আছে – বিলাস শৃঙ্গারচেষ্টা নাগরীপনা। ভাবন করা মানে ছিলো নাগরীপনা করা। এরই প্যারালালে ভাবিনী-র নানা মানে ডিকশনারিতে দিয়েছে – বিলাসপ্রিয় বিলাসী বিলাসিনী লাস্যময়ী কপটভাবধারী ছদ্মপ্রিয় কৌতুকপ্রিয় রঙ্গপ্রিয় কামিনী কামুকী। ১৮ শতকে ভাবিনী ভালো মানের কথাই ছিলো। হটনে মানে আছে – a distinguished or beloved woman, পরে মানেটা তরল রসের নাগরী হয়েছে।
ভাব ও হাব: ভাবন ও সাজন দুটো কংক্রিট ক্রিয়া, কাজ। এদুটোর কগনেট দুখানা অ্যাবস্ট্রাক্ট টার্ম হচ্ছে ভাব ও সাজ। ভাবুনী ভাবন কোরে আয়নার সামনে বোসে নানা অ্যাঙ্গেলে নিজেকে দ্যাখে আর ‘কী সুন্দরীই না হয়েছি’ এই ভাবনায় মট্‌মট্‌ করে। মানে তার মনে তখন সুন্দরী-সুন্দরী ভাবনা কাজ করছে। এটার নাম ভাব।
আর মাঝে মাঝেই লক্‌স টেনে নিজেকে দেখছে, নিজের রূপে মুগ্ধ হয়ে হাতের পাতা ছুঁড়ে নাচের মুদ্রা করছে, আয়নাতে নিজেকে কিস ছুঁড়ে দিচ্ছে এই মুভমেন্ট গুলোকে বলে হাব।
ভাব মুড আর হাব মুভ: আমরা বলি – এমন ভাব করছে যেন দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছে। এই ভাব করাটাকে ঢাকায় বলে ভাব নেয়া। পরীক্ষা হলে যে ছেলে টুকলি থেকে টুকছে সেই ছেলেই গার্ডকে তার দিকে আসতে দেখলে চোতা লুকিয়ে কলমটাকে গালে ঠেকিয়ে এমন কলা করে যেন সে কিছু একটা মনে করতে ভীষণ চেষ্টা করছে। মানে সে ভাব করছে সে ভাবছে, সে ভালো ছেলে সাজছে। এই ভাব ভাবা সাজা তিনটেই অ্যাবস্ট্রাক্ট। টুকলিবাজ ছেলেটার ঊর্ধ্বনেত্র হওয়া, মাথা চুলকোনো, কলমটা দিয়ে গালে আস্তে আস্তে টোকা দেয়া এগুলো হচ্ছে তার হাব।
প্রচুর পয়সা করলে মানুষের হাব ভাব চাল চলন বদলে যায়। হাবভাব চালচলন এগুলো শব্দদ্বিত্ব না, জোড়শব্দ, কিন্তু আশ্চর্য রাইমিং।
সাজন থেকে আসা অ্যাবস্ট্রাক্ট কথাটা হচ্ছে সাজা। ‘জানোয়ার লোকটা এখন ভদ্দলোক সাজছে।’ এখানে সাজছে মানে লোকটা মাথায় ফুল গুঁজছে না, সে ভদ্দলোকের ভাব করছে ভাবন করছে ভান করছে।
বৈষ্ণব মতে শৃঙ্গার রসে সিক্ত হয়ে স্থায়ী রতি চিন্তা এসে নির্বিকার চিত্তে যে বিকার আসে তাকে বলে ভাব। অধিক ভাবগ্রস্ত নায়িকার গ্রীবা বেঁকানো ভ্রু নাচানোকে বলে হাব। সেখানে ভাবিনী মানে – হাব ভাব করা নারী কামিনী কামুকী স্ত্রী এবং চিন্তাকলা দুইই। ‘ভাবের ভাবিনী রাধা’।
আর ভাববুনি।
(ত্রুটি মার্জনীয় শুদ্ধি প্রার্থনীয়) ইউসুফ খান কলকাতা ২০২১ আগস্ট ২৭
ইউসুফ খানের লেখার সংযোগ: https://www.facebook.com/…/shuvas/posts/3352881334733284/
error: Content is protected !!