সচিবালয় নির্দেশমালা: গেজেট, প্রজ্ঞাপন, নথি- শ্রেণি সংরক্ষণ তথ্য অধিকার আইন

ড. মোহাম্মদ আমীন

সচিবালয় নির্দেশমালা: গেজেট, প্রজ্ঞাপন, নথি- শ্রেণি সংরক্ষণ তথ্য অধিকার আইন

রেকর্ড ও রেকর্ডের শ্রেণিবিভাগ

 
তথ্য অধিকার (তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা) প্রবিধানমালা, ২০১০-এর ৬(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তথ্যসমূহ সংরক্ষণ করার জন্য চারটি ভাগে ভাগ করবে। সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০১৪-এর ১০(১) বিধিমতে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে রেকর্ডসমূহকে নিম্নলিখিত চারটি শ্রেণিতে ভাগ করতে হবে
(ক). ক শ্রেণির রেকর্ড/তথ্য: ক শ্রেণির তথ্য স্থায়ী রেকর্ড হিসেবে স্বীকৃত। যে তথ্যসমূহের প্রয়োজনীয়তা অনাদিকাল পর্যন্ত বিদ্যমান থাকার সম্ভাবনা— সেসব তথ্যসংবলিত নথি বা গেজেট এই শ্রেণির অন্তর্ভূক্ত। এগুলো কখনো ধ্বংস করা হয় না এবং চিরদিনের জন্য সংরক্ষণ করতে হয়। সচিবালয় নির্দেশমালা ২০১৪-এর বিধি ১০(১)(ক) অনুযায়ী— এটি স্থায়ী রেকর্ড। যার স্থান অন্য কিছু দ্বারা পূরণীয় নয়। স্থায়ী মূল্যে অত্যাবশ্যকীয় নথিসমূহ এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। সাধারণ নিয়মানুসারে নিম্নরূপ নথিগুলো এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত—
(অ) নীতি, আইন, বিধি এবং প্রবিধানসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর আলোচনা ও আদেশ সংবলিত নথিসমূহ;
(আ) বরাতসূত্র নির্দেশের জন্য দীর্ঘকাল বা যে-কোনো সময় প্রয়োজন হতে পারে এরূপ গুরুত্বপূর্ণ আদেশের পূর্ব দৃষ্টান্তবিষয়ক নথিসমূহ;
(ই) যাঁদের বিষয়ে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন এইরূপ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কিত নথি;  এবং
(ঈ) রাষ্ট্রীয় দলিলপত্র (state document)। যেমন: সন্ধিপত্র (treaties), বিদেশের সঙ্গে চুক্তিপত্র প্রভৃতি।
 
(খ). খ শ্রেণির তথ্য:  যেসব তথ্য দশ বছর বা তদূর্ধ্ব সময়ের জন্য সংরক্ষণ করা হয়, কিন্তু চিরকালের জন্য সংরক্ষণ করার আবশ্যকতা নেই সেগুলো খ শ্রেণির তথ্য হিসেবে স্বীকৃত। সচিবালয় নির্দেশমালা অনুযায়ী এটি অর্ধস্থায়ী রেকর্ড। দশ বছর বা তার বেশি সময়ের জন্য এই শ্রেণির রেকর্ডসমূহ সংরক্ষণ করতে হয়। স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়, অথচ দশ বছর অথবা সংশ্লিষ্ট নথির উপযোগিতা অনুযায়ী তার বেশি সময় সংরক্ষণযোগ্য— এমন গুরুত্ববহ নথি এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এই শ্রেণির নথিসমূহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগে রেকর্ডকৃত সূচিপত্রসহ তিন বছরের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। এরপর নথিসমূহ সচিবালয়ে নথিপত্র সংরক্ষণাগারে পাঠাতে হবে। নিম্নরূপ নথিসমূহ এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত—
সরকারি কর্মচারীগণের সার্ভিস রেকর্ড;
উন্নয়ন প্রকল্প, বাজেট; 
সরকার গঠিত বিভিন্ন কমিশন বা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন; এবং
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী আদেশসংক্রান্ত নথিসমূহ এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
এ নথিসমূহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগে রেকর্ডকৃত সূচিপত্রসহ তিন বছরের জন্য সংরক্ষিত হবে। এরপর এগুলো সচিবালয়ে নথিপত্র সংরক্ষণাগারে পাঠাতে হবে।
 
(গ). গ শ্রেণির তথ্য: যেসব তথ্যের আবশ্যকতা দশ বছরের কম সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যায় এবং এর পর সাধারণত তার আর প্রয়োজন হয় না সেসব নথি বা তথ্য গ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এরূপ তথ্যসংবলিত নথিসমূহ সাধারণত গুরুত্ব অনুযায়ী তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য সংরক্ষণ করা হয়। সচিবালয় নির্দেশমালা অনুযায়ী, এগুলো সাধারণ শ্রেণির রেকর্ড। এ রেকর্ডসমূহ তিন হতে পাঁচ বছরের জন্য সংরক্ষিত হবে। যে নথিসমূহের উপযোগিতা সীমিত এবং রেকর্ডভুক্ত হবার পর মাত্র কয়েক বছরের জন্য প্রয়োজন হতে পারে তা এই শ্রেণির রেকর্ড হিসেবে স্বীকৃত।   ‍সুনির্দিষ্টকালের জন্য মন্ত্রণালয় বা বিভাগে রক্ষিত হওয়ার পর এই শ্রেণির নথিগুলো বিনষ্টযোগ্য। এ প্রকৃতির নথিগুলো সূচীকরণের প্রয়োজন হয় না। নিম্নরূপ নথিসমূহ এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত—
ক্রয়-বিক্রয়; 
অস্থায়ী পদ সৃজন;
কর্মকর্তৃবৃন্দের বদলি; এবং
প্রশিক্ষণসংক্রান্ত নথিসমূহ।
 
(ঘ). ঘ শ্রেণির রুটিন রেকর্ড: সচিবালয় নির্দেশমাল অনুযায়ী, এ শ্রেণির রেকর্ড এক বছরের জন্য সংরক্ষিত হবে। সাধারণত এক বছর অতিক্রান্ত হবার পর, যেসব নথির আবশ্যকতা আর থাকবে না সেসব  সাধারণ বা স্বল্পকালীন সংরক্ষণযোগ্য কাগজপত্র এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এসব কাগজপত্র সূচিকরণ করা হবে না। এই শ্রেণির রেকর্ড এক বছর পর বিনষ্ট করা হবে।
 
গেজেট ও প্রজ্ঞাপন
গেজেট: গেজেট হলো বিভিন্ন তথ্য ও সংবাদসংবলিত সরকারি প্রজ্ঞাপন ,আদেশ বা ঘোষণা প্রভৃতি জারি, প্রচার ও সংরক্ষণের নিমিত্ত প্রকাশিত বিশেষ ধরণের পুস্তিকা বা সংবাদপত্রবিশেষ। একটি সরকারিভাবে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত। কোনো বিষয় গেজেটে প্রকাশিত হলে তা চূড়ান্তভাবে সরকারি ঘোষণা গণ্য হয়। তাই গেজেট সরকারি মূল্যবান দলিল বা রেকর্ড হিসেবে স্বীকৃত।
 
প্রজ্ঞাপন: প্রজ্ঞাপন হলো রাষ্ট্রপতি বা তাঁর পক্ষে স্বাক্ষর প্রদান করতে ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তির দ্বারা স্বাক্ষরিত হয়ে প্রকাশিত সরকারি ঘোষণা, আদেশ, বিজ্ঞপ্তি প্রভৃতি। ইংরেজিতে প্রজ্ঞাপনকে বলা হয় বা notification। গেজেটের সিংহভাগ তথ্য বা ঘোষণাই প্রজ্ঞপন। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে,  সংস্কৃত প্রজ্ঞাপন (প্র+√জ্ঞাপি+অন) অর্থ— (বিশেষ্যে) প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি, পরিভাষা হলো: notification।
 
গেজেট কোথায় ছাপানো হয়: সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রজ্ঞাপন, আইন, বিধি, প্রবিধান, আদেশ, নির্দেশ, ঘোষণা গেজেটে অন্তুর্ভুক্ত করার জন্য ঢাকা শহরের তেজগাঁও এলাকায় অবস্থিত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়র নিয়ন্ত্রণাধীন বাংলাদেশ ফরমস ও প্রকাশনা অফিসে পাঠানো। এখানে রয়েছে বিজি প্রেস বা বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়। এই মুদ্রাণালয় থেকে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় প্রেরিত তথ্যাদি গেজেট আকারে ছাপানো হয়। প্রসঙ্গত, প্রজ্ঞাপন, আইন, বিধি, প্রবিধান প্রভৃতি ছাড়াও সরকারি গোপনীয় বিভিন্ন বিষয় যেমন: প্রশ্নপত্র প্রভৃতি ছাপা হয়।
 
গেজেট-এর প্রকারভেদ
গেজেট প্রধানত দুই প্রকার। যথা— 
১. সাপ্তাহিক গেজেট এবং
২. অতিরিক্ত গেজেট।
 
১. সাপ্তাহিক গেজেট: সাপ্তাহিক গেজেট সাধারণত নিয়মিতভাবে প্রতি বৃহস্পতিবার “বাংলাদেশ গেজেট” শিরোনামে প্রকাশ করা হয়। এটি সরকারের সাধারণ প্রাত্যহিক ঘোষণার অন্তর্ভুক্ত। সাধারণ গেজেট ৮ খণ্ডে বিভক্ত থাকে। যেমন:
 
১ম খণ্ড:  গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংযুক্ত ও অধীনস্থ দপ্তরসমূহ এবং বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট হতে জারি করা বিধি ও আদেশাবলি সংবলিত বিধিবদ্ধ প্রজ্ঞাপনসমুহ এই খণ্ডে প্রকাশিত হয়।
 
২য় খণ্ড:  প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট ব্যতীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার  জারিকৃত  নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি প্রভৃতি রুটিন কার্যক্রমবিষয়ক প্রজ্ঞাপনসমুহ  এই খণ্ডে প্রকাশিত হয়।
 
৩য় খণ্ড: প্রথম খন্ডে অন্তর্ভুক্ত সরকারি প্রজ্ঞাপনসমুহ ছাড়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় হতে জারিকৃত অন্যান্য প্রজ্ঞাপন তৃতীয় খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়।
 
৪র্থ খণ্ড:  প্রথম খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত প্রজ্ঞাপনসমুহ ব্যতীত নিবন্ধন অফিস হতে  জারিকৃত প্রজ্ঞাপনসমুহ চতুর্থ খণ্ডের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
 
৫ম খণ্ড:  বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের যাবতী অ্যাক্ট, বিল প্রভৃতি গেজেটের পঞ্চম খণ্ডের অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়।
 
৬ষ্ঠ খণ্ড:  প্রথম খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত প্রজ্ঞাপনসমূহ ব্যতীত বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশন সচিবালায় এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অধস্তন ও সংযুক্ত দপ্তর হতে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনসমুহ এই খণ্ডে প্রকাশিত হয়।
 
৭ম খণ্ড:  অন্য কোনো খন্ডে প্রকাশিত হয়নি, কিন্তু প্রকাশ করা আবশ্যক—  এমন অ-বিধিবদ্ধ ও বিবিধ প্রজ্ঞাপনসমূহ যা  অধস্তন প্রশাসন সরকারি প্রয়োজনে জারি করেছে, তা সপ্তম খণ্ডে প্রকাশিত হয়।
 
৮ম খণ্ড:  বেসরকারি ব্যক্তি এবং কর্পোরেশন হতে জারি করা প্রজ্ঞাপন ‍ও নোটিশসমূহ অর্থের বিনিময়ে এই খণ্ডে জারি করা হয়।
 
খ. অতিরিক্ত গেজেট: এটি বিশেষ উদ্দেশ্যে মূলত জরুরি কোনো বিষয় জারি সে মুহূর্তে আবশ্যক হলে তখন জারি করা হয়। জরুরি প্রয়োজনে সপ্তাহের যেকোন দিন যে-কোন সময় বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রকাশিত গেজেটকে অতিরিক্ত গেজেট বলা হয়। মন্ত্রণালয় বা বিভাগের উপসচিব পদমর্যাদার চেয়ে নিম্ন পদমর্যাদাসম্পন্ন নন কোনো কর্মকর্তা অতিরিক্ত গেজেটে প্রকাশের জন্য কোনো বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করতে পারেন।
 
 
বিস্তারিত ও অন্যান্য বিষয় নিচের সংযোগে: https://draminbd.com/সচিবালয়-নির্দেশমালা-গেজ/
 
error: Content is protected !!