সন্মিত্রা: অকপট বন্ধুর কপটতাহীন কথার সম্ভার

এবি ছিদ্দিক

সন্মিত্রা: অকপট বন্ধুর কপটতাহীন কথার সম্ভার

নিজের দেওয়া কথা রাখতে ড. মোহাম্মদ আমীন ক্লান্তিহীন পরিচর্যায় এক ফুলের স্যমন্তককে জোড়া ফুলের সুবাসে ভরিয়ে যে অর্হণার রচনা সম্পন্ন করেছিলেন, সন্মিত্রার যাত্রা ঠিক সেখান থেকেই শুরু। লেখক এ যাত্রায় কেবল হাতেগোনা ফুলের সুবাসে তাঁর রচনাকে সুরভিত করেননি, রীতিমতো

মাদার্স পাবলিকেশন্স

ফুলের মেলায় বাগান সাজিয়ে ছেড়েছেন। নানান জায়গা থেকে হরেকরকম ফুলের চারা আর বিকশিত গাছ একাট্টা করে এই বাগান সাজিয়েছেন। সেসব ফুলের জাত-বর্ণ-স্থান-ঘ্রাণের ভেদাভেদ ভুলিয়ে দিয়ে গড়ে দিয়েছেন অভেদ্য সম্পর্ক। তাতে প্রতিটি ফুলই আপনার সুন্দরতায় অনুপম, নিজের খুশবুয় অনন্য, সামগ্রিক সৌন্দর্যে অতুলনীয়। এ যেন অকৃত্রিম-অকপট বন্ধুতার সুনিপুণ সমন্বয়। সে সমন্বিত উদার-কপটতাহীন বন্ধুত্বের আধারের নামেই এই গ্রন্থের নামকরণ— ‘সন্মিত্রা‘।

সন্মিত্রা ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা স্যমন্তক ধারার তৃতীয় উপন্যাস। ভাষাজ্ঞানে চৌকশ ড. মোহাম্মদ আমীন এই ধারার পূর্বের দুটি উপন্যাসের মতো এই উপন্যাসের নামকরণেও অতি আলংকারিক শব্দ নির্বাচন করেছেন। পরম ভালোবাসা, চরম ধৈর্য এবং সর্বোচ্চ ত্যাগের সুনিপুণ সমন্বয়ে যে সার্থক স্যমন্তকের রচনা সম্পন্ন করেছিলেন, তার প্রাপ্য সম্মানের প্রয়োজনেই সম্মানের বানে অনুরাগের ভেলা ভাসিয়ে ভক্তির সীমা ছাড়িয়ে প্রতিদানের পসরায় পুজোর ডালা সাজিয়ে শেষ করেছিলেন অর্হণার রচনা। অর্হণার উত্তরে রচনা ও রচয়িতার বিভাজন ঘুচিয়ে দিয়ে হয়ে উঠেছেন একে-অপরের অকপট বন্ধু, সে বন্ধুর নাম দিয়েছেন অতি নান্দনিক শব্দে— সন্মিত্রা!

সুবিস্তৃত পরিবেশে সুনির্বাচিত চরিত্রবর্গের সমন্বয়ে সুসংগঠিত বক্তব্যের সুরেলা সংলাপে এই সন্মিত্রার এক-একটি পন্নো সাজানো হয়েছে। সন্মিত্রার পাতায় পাতায় গীতল সংলাপে ভালোবাসার আলপনা যেমন আঁকা হয়েছে, তেমনি অকপট ভাষায় নিদারুণ বাস্তবতার দারুণ রূপরেখাও দেখানো হয়েছে। শব্দের বাহারি প্রয়োগ সন্মিত্রাকে শব্দভান্ডারে সমৃদ্ধ করেছে। ব্যতিক্রমী উপমা সন্মিত্রার ভাষাকে বৈচিত্র্যময় করেছে। ভাষার নানান অলংকার সন্মিত্রাকে নববধূর মতো সাজিয়েছে। পরিবেশের শ্লক্ষ্ণ বর্ণনায় এ উপন্যাসের দৃশ্যপট স্পষ্টতর চিত্রে অঙ্কিত হয়েছে। বাহুল্যবর্জিত সংলাপ এই গ্রন্থের পাঠকে

স্যমন্তক সিরিজের, দ্বিতীয় উপন্যাস। পুথিনিলয়

বানিয়েছে সুখকর। পরম যত্নে সুনির্বাচিত-শক্তিশালী বক্তব্যের অনুপম প্রকাশ এই উপন্যাসকে বানিয়েছে সর্বজনীন। এতসব বিষয়ের আধার যে গ্রন্থ, সে গ্রন্থ বিচক্ষণ পাঠককে আন্দোলিত করবে বইকি।

আপাত দৃষ্টিতে সন্মিত্রা একটি বৈশ্বিক উপন্যাস৷ তবে লেখক স্যমন্তক ধারার আগের দুটি উপন্যাসের মতো এই উপন্যাসের বিষয়বস্তুও নির্দিষ্ট ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। উপন্যাসের পর্বে পর্বে পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী বিশ্বের বৃহত্তর গণ্ডিকে সংকুচিত করে রাষ্ট্র, রাজ্য, সমাজ, পরিবার— এমনকি ব্যক্তি অবধি ফিরে দেখেছেন। তাতে এই উপন্যাসের গায়েও অনায়াসে ‘বহুমাত্রিক উপন্যাস’ তকমা লাগিয়ে দেওয়া যায়। উপন্যাসের পরিবেশের ও প্রতিবেশের সংকোচন-প্রসারণ খেলায় এই গ্রন্থে বর্তমান বিশ্বে চলমান নানান দ্বন্দ্বের অনাকাঙ্ক্ষিত সত্য যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি আঁকা হয়েছে জাতিগত বৈষম্যের করুণ চিত্র। গোঁড়ামি-কুসংস্কার কোনো জাতিকে কতটা নখদন্তহীন-দুর্বল-অনুগ্রহকামী বানিয়ে দিতে পারে, তার সুস্পষ্ট দৃষ্টান্তও এই উপন্যাসে অত্যন্ত নৈপুণ্যের সঙ্গে উপস্থাপিত হয়েছে। এই উপন্যাসে রয়েছে জীবনদর্শনের সুন্দর বক্তব্য, ইতিহাসের বিভিন্ন আলোচিত দিক, সাহিত্যের মার্জিত সমান আলোচনা, সংগীতের মূর্ছনা, মোহনীয় নরকতুল্য সংসারের চিরায়ত গল্প, ব্যক্তির আজন্ম ইচ্ছার কিচ্ছা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতার সামসময়িক বর্ণনা, হার্দিক ভালোবাসায় আত্মিক বন্ধনের মনোহর গল্প, উদ্দীপনার প্রেরণাময় ঘটনা। এতসব বিষয়ের পরিচ্ছন্ন ও স্পষ্ট অবতারণা সন্মিত্রার পাঠ পাঠককে একই সঙ্গে বৈশ্বিক, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক, দার্শনিক, সাহিত্যিক, কাব্যিক, নাটকীয়, সমালোচনামূলক, উদ্দীপনামূলক, আত্মজীবনীমূলক, পারিবারিক প্রভৃতি বহুবিধ উপন্যাস পাঠের স্বাদ একসঙ্গে দেবে।

সন্মিত্রার পাঠে নির্দিষ্ট কোনো চরিত্রকে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে রায় দেওয়া অত্যন্ত বিড়ম্বনার কাজ হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। লেখক নিজের অসামান্য চিন্তনপ্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতায় এই উপন্যাসের চরিত্রদের এমনভাবে সাজিয়েছেন— উত্তম পুরুষের জবানিতে লেখা এই উপন্যাসে যখন যে চরিত্র হাজির হবে, পাঠক সেটিকেই প্রধান চরিত্র বলে রায় দিয়ে বসবেন। সেসব চরিত্রও অতি নিপুণতায় বাছাইকৃত। এদের মধ্যে বিশ্ববিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং, বৌদ্ধিক দার্শনিক চিকুচি, অবহেলিত অনন্য প্রতিভা জামাল নজরুল, কালজয়ী সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মাদার মারিয়া, মাসাহিতো, সুসানা, লেনভেল ভ্যালেসিয়ান, হারুটিউনিয়ান, পিসি রায়, রচনাদের মতো বিকশিত গম্ভীর চরিত্র যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে কল্পনা, আল্পনা, প্রমিতা, রাশিদা,

ড. মোহাম্মদ আমীন

ফাতিমা, মনওয়ারা, টুটুল, তাহসিনদের মতো চঞ্চল সম্ভাবনা, আর আছে ঋধিতা, মোজাম্মেলদের মতো সাংসারিক চরিত্র। উপন্যাসের পাতায় পাতায় লেখক কখনো এদের দিয়ে মানবতার গান রচেছেন, ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় মেলে ধরে সামসময়িক অশান্তির যৌক্তিক কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছেন, শান্তির পথ বাতলানোর প্রয়াস দেখিয়েছেন। আবার কখনো কখনো হকিঙের মতো চরিত্রকে দিয়ে কওয়িয়েছেন নারীর দুর্বোধ্যতার গল্প। কখনোবা চিকুচির জবানিতে ব্যক্ত করেছেন জীবনদর্শন এবং সাহিত্যের ব্যতিক্রমী বিশ্লেষণ। জামাল নজরুলের জীবনী টেনে এঁকেছেন অপ্রিয় সত্যের নিখুঁত চিত্র। সুসানা, মাসাহিতো, বৎশিবাদের মন্তব্যে বারবার মনুষ্যত্বের বাণী শুনিয়েছেন। কল্পনার আচরণে চিরাচরিত ভালোবাসার সংজ্ঞার্থ আরেকবার বুঝিয়ে দিয়েছেন, আল্পনাকে দিয়ে বয়াঁ করেছেন সদা জোয়ারে টইটম্বুর ভালোবাসার কাঙ্ক্ষিত রূপ, ঋধিতার ওপর প্রতিফলন ঘটিয়েছেন নারীর আজন্ম ঈর্ষার অভিনব প্রতিবিম্ব। প্রমিতা ধারণ করেছে শ্রদ্ধা, ভক্তির ও অসম সাহসের ডালা। টুটুল-নিনিদের রাত্তিরের অন্ধকারে মোমের আলোর মতো মেদুর সুন্দরতার আধার হিসেবে দৃশ্যপটে এনেছেন। সবশেষে প্রজ্ঞা, ভক্তি, স্নেহ, ভালোবাসা ও বিচক্ষণতার অনন্য সমন্বয়ে রচনাকে বসিয়েছেন বহুল কাঙ্ক্ষিত অকপট মিত্রার আসনে, সার্থক করেছেন গ্রন্থের নামকরণ।

সন্মিত্রার প্রাণ হচ্ছে এর অকপটসব মন্তব্য। কপটতার ধার না-ধেরে করা এক-একটি মন্তব্যের কারণে এ উপন্যাসের পাঠ শেষে পাঠকমহল দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবেন। নিজের ধ্যানধারণায় অটল গোঁয়ার পাঠকের কাছে এই উপন্যাসের পাঠ বিরক্তির কিংবা ক্রোধের কারণ হলে অবাক হওয়ার অবকাশ থাকবে না। তবে নিরপেক্ষ-সর্বজনীন পাঠকের কাছে এই উপন্যাস যে সমাদৃত হবে, বৌদ্ধিক পাঠককে যে এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু নাড়া দেবে— তা পাঠক এসব বিষয়ের সঙ্গে একমত হোন কিংবা না-হোন— সে রায় পুরো আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দেওয়া যায়।

সন্মিত্রা পাঠের আরেকটি সুখানুভূতি হচ্ছে এর স্বচ্ছ বানান, নান্দনিক উপায়ে নতুন শব্দগঠন, আকর্ষণীয় বাঁধাই এবং উপযুক্ত ফন্ট। একটি বইয়ের পাঠ শেষে কয়টি নতুন শব্দ শিখতে মিলেছে, মনোযোগী পাঠকের কাছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং সন্মিত্রার রচনায় এই গুরুতা রক্ষায় লেখক সর্বাত্মক চেষ্টা

স্যমন্তক, স্যমন্তক সিরিজের প্রথম উপন্যাস। প্রকাশক: পুথিনিলয়। প্রথম উপন্যাস। লেখক: ড. মোহাম্মদ আমীন। প্রকাশক: পুথিনিলয়।

করেছেন। লেখক ও প্রকাশক এই গ্রন্থ বানানগত দিক দিয়ে স্বচ্ছ রাখতেও সর্বাধিক সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। সামনে নতুন বই খুলে পড়তে বসলে পাঠকের মনে যে মনোগ্রাহী অনুভূতির সঞ্চার হয়, তা এই বইয়ের ক্ষেত্রে আরও প্রকটভাবে অনুভূত হবে।

এতটা আন্তরিকভাবে শ্রম দেওয়ার পরও স্যমন্তক ও অর্হণার পাঠ শেষে সন্মিত্রার পাঠ শুরু করলে পাঠক দুই জায়গায় খানিকটা বিড়ম্বনায় পড়তে পারেন। প্রথম দিকটি কতিপয় বিবরণের পুনরাবৃত্তি। দ্বিতীয় দিকটি হচ্ছে রচনাকে দিয়ে লেখককে ‘ভাব্বা’ সম্বোধন করানো। অর্হণায় আল্পনা, কল্পনা ও টুটুল কখন থেকে লেখককে এই আজ্ঞায় সম্বোধন করা শুরু করেছে, তার স্পষ্ট বিবরণ দেওয়া হয়েছে। পূর্বের দুই গ্রন্থে লেখককে এ তিনজন ‘ভাব্বা’ আজ্ঞায় সম্বোধন করলেও রচনা পূর্বের মতো ‘স্যার’ বলেই সম্বোধন করে গিয়েছেন। কিন্তু সন্মিত্রার শুরুতেই রচনার সম্বোধনেও ‘ভাব্বা’ চলে এসেছে। রচনা কেন ‘ভাব্বা’ ডাকেন, তার ব্যাখ্যায় আল্পনা-কল্পনা-টুটুলের ‘ভাব্বা’ ডাকার ব্যাখ্যা পুনরায় উল্লেখ করা হলেও তিনিও কখন থেকে বা কীভাবে অনুজ ভাইবোনকে অনুসরণ করতে শুরু করলেন, তার কোনো বর্ণনা দেওয়া হয়নি। আশা করি, লেখক যখনই এই গ্রন্থের সংস্কারে হাত দেবেন, তখন এসব বিষয়ে মনোযোগ দেবেন।
সবশেষে, একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের সূচনালগ্নে এ অসামান্য সংযোজনের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করায় ড. মোহাম্মদ আমীনকে হার্দিক অভিনন্দন জানিয়ে এই নিবন্ধের ইতি টানছি।
< এবি ছিদ্দিক
প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন: মিত্রবর তাহসিন ঐশী (মৌটুসকি)।
আমি শুবাচ থেকে বলছি
ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা নিচের উপন্যাসগুলো একসঙ্গে এক মলাটে পড়ার জন্য ক্লিক করুন নিচের লিংকে:
পড়তে পারেন স্যমন্তক বিষয়ে নিচের আলোচনাগুলো:
error: Content is protected !!