সন্মিত্রা : এক মলাটে সন্মিত্রা: সন্মিত্রা সম্পূর্ণ উপন্যাস : প্রথম থেকে শেষ পর্ব

সন্মিত্রা: দশম  পর্ব / ড. মোহাম্মদ আমীন

মুনীরের পরিবর্তনটা দেখলে? দেখলে কত দ্রুত এবং কী দারুণ ইতিবাচকতার সঙ্গে শিশুটা নিজের উদ্দেশ্যকে পালটে নিল? কী অদ্ভুত কৌশলে? একেই বলে অভিযোজন-সক্ষমতা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো মনীষীও হতবাক হয়ে গেছেন।
ভাব্বা, কেবল শিক্ষাই মানুষকে এমন প্রজ্ঞা দিয়ে জন্তু হতে সম্পূর্ণ পৃথক বিবেচনাঋদ্ধ একটি হৃদগত সত্তা দিতে পারে। শিক্ষা ছাড়া মানুষ আর জন্তু উভয়ে অভিন্ন চরিত্রের একটা জানোয়ার।
জানোয়ার মানে কী? আমি প্রশ্ন করলাম রচনাকে।
আপনার ভাষায় বলি?
বলো।
রচনা পঞ্চকন্যার দিকে তাকিয়ে বলল, আমার স্যার জানোয়ার শব্দের একটা সংজ্ঞার্থ দিয়েছেন। তা বলছি—বাংলা শব্দ ‘জান’ এবং ইংরেজি শব্দ ‘ওয়ার (war)’ মিলিত হওয়ার পর ‘জানোয়ার (জান+ওয়ার)’ শব্দটি গঠিত হয়েছে। ওয়ার বা যুদ্ধ মারাত্মক ক্ষতিকর জানা সত্ত্বেও যারা যুদ্ধ বা ওয়ার করে, যুদ্ধ করার জন্য অস্ত্র বানায়, ষড়যন্ত্র করে— তারাই জানোয়ার।
পঞ্চকন্যা হাসির সঙ্গে তালি দিয়ে বলল, দারুণ।
“ম্যাম”, রেবেকা বলল, “শিক্ষা বিষয়টা আসলে কী?”
সাধারণভাবে আমরা বলি— জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। আমি মনে করি শিক্ষা হচ্ছে—অজ্ঞতার আবিষ্কার। “আমি জানি না”—এটা জানতে পারাটাই শিক্ষা। এই বোধে উদ্দীপ্ত হয়ে না-জানা বিষয়গুলো জানার প্রচেষ্টাই হচ্ছে অধ্যয়ন। যা তোমরা করছ। শিক্ষা তোমাকে আমাকে কী বলে জানো?
কী বলে, ম্যাম?
জানো না, জানো না, জানো না। অতএব জানো, জানো, জানো এবং জানার চেষ্টা করো।
শিক্ষার কাজ? প্রমিতা বলল।
আমাদের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভাবনা নামের কুম্ভকর্ণচয়কে জাগিয়ে তোলা, বিকশিত করা এবং কার্যকর করার সক্ষমতা প্রদান। শিক্ষার আর একটি কাজ বহুমতের লালন। এর মাধ্যমে জ্ঞান আর বিশ্বাস দুটো পরস্পর বিপরীত প্রত্যয় পৃথক হয়ে যায়। সামনে এসে দাঁড়ায় যুক্তি আর বাস্তবতা। শিক্ষা বিশ্বাসকে তাড়িয়ে যুক্তিকে প্রতিষ্ঠা করে। এটাই জ্ঞান।
ম্যাম, যে-কোনো শিক্ষাই কি বিকশিত করার উপাদান হবে? জাগিয়ে তোলার প্রেরণা দেবে? জগদ্‌গৌরী বলল।
শিক্ষা বলতে কেবল অনুদার কিছু মগজস্থ করা নয়। বাক্‌স্বাধীনতার বিকাশ শিক্ষার একটি অন্যতম অনুষঙ্গ। তাকে রুদ্ধ করার ইচ্ছা অশিক্ষার সর্বনিম্ন পর্যায়; বিশ্বাসে এমন অপক্রিয়া দেখা যায়। শিক্ষার উদ্দেশ্যই হচ্ছে প্রশ্ন, সংশয় আর অবিশ্বাস দিয়ে বাস্তবতাকে প্রতিষ্ঠা করা। এভাবে মানুষের ধারণা পালটে যায়, চিন্তায় নতুন বোধ উৎসরিত হয়। তবে শিক্ষা যদি ব্যক্তির মৌলিকত্ব নষ্ট করে দেয় তাহলে সেটি হবে অনেকটা প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তন করার মতো বিপজ্জনক। শিক্ষা আমাকে বিকশিত করবে, ধ্বংস নয়। শিক্ষা, আমার মৌলিকত্বকে অক্ষুণ্ন রেখে আমার ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাকে প্রোজ্জ্বল করবে; নিশ্চিহ্ন নয়।
তাহলে ম্যাম মেধা, দক্ষতা আর যোগ্যতা?
তুমি যে জানো না এটা দ্রুত উপলব্ধি করতে পারার বোধই হচ্ছে সক্ষমতা। পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতি না করে শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত বিষয়কে উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর সক্ষমতাই হচ্ছে দক্ষতা। মেধার প্রয়োগকালে সৃষ্ট ভুলের শঙ্কাকে প্রতিহত করে প্রতিভা। যে বিষয়ে শিক্ষা নেওয়া হয়েছে তাকে কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করার আকাঙ্ক্ষা বা সক্ষমতাই হচ্ছে যোগ্যতা।
দীপালী চা-নাস্তা নিয়ে এলেন। তার পেছনে কেয়ারটেকার।
‘ম্যাম’ কেয়ারটেকার বললেন, “প্রমিতা ম্যামকে নিতে সানন্দা নামের একজন ভদ্রমহিলা গাড়ি নিয়ে এসেছেন। আমাকে খবর দিতে বললেন।”
সানন্দা কে? রচনা জানতে চাইল।
প্রমিতা বলল, আমার বাবার অফিসের পিআরও।
যাও।
ম্যাম, আমি যাব না। এখানেই থাকব। কেয়ারটেকার বাবু, আপনি গিয়ে বলে দিন, ম্যাম যতদিন থাকেন ততদিন আমি তাঁর সঙ্গে থাকব।
কেন যাবে না?
আমি আপনাদের সঙ্গে থাকব।
এখানে তো বাড়ির সুবিধা পাবে না।
কিন্তু ম্যাম, যা পাব তা তো সারা ভারতেও পাব না। তাছাড়া আমি বাড়িতে থাকার জন্য আসিনি। আপনার সেবা করার জন্য এসেছি।
চা-নাস্তা শেষ হওয়ার পর মেয়েরা নিজেদের রুমে চলে গেল। আগামীকালের অনুষ্ঠানের যাবতীয় বিষয় ঠিকঠাক করে ফিরে আসবে।
আগামীকাল বয়স্কদিবস। সব আয়োজন বয়স্কদের জন্য এবং বয়স্কদের নিয়ে। বয়স্ক বলতে উনিশ থেকে সত্তর। শিশুরাও থাকবে। তারা দেখবে গুরুজনদের কৌশল, উদ্দীপনা দেবে তালিতে-খুশিতে। বয়স্কদিবসের প্রধান অতিথি কলকাতার মহানাগরিক বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। মহানাগরিককে বাংলাদেশে বলা হয় মেয়র। মহানাগরিক বাংলা শব্দ। পশ্চিমবঙ্গ প্রায় সবগুলো পদকে বাংলা করে নিয়েছে। বাংলাদেশ এখনো তা পারেনি।
বেশ অমায়িক মানুষ বিকাশরঞ্জন। কথা বললে মনে হয় নেহাত সাধারণ একজন মানুষ। এত বড়ো শহরের ক্ষমতাধর মহানাগরিক, কিন্তু কোনো অহংকার দেখলাম না। ঢাকার মেয়রের সঙ্গে তুলনা করলে লজ্জা পেতে হয়।
চল্লিশ মিনিটের মধ্যে মেয়েরা আবার এক নম্বর কক্ষে ফিরে এল। তাদের শরীরে এখন ঘরোয়া পোশাক। হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এসেছে। আবার প্রসাধনহীন মুখ ঘিরে এলোচুলের বাহার। খালি পায়ে নিস্তব্ধ নূপুর।
আগামীকালের অনুষ্ঠানের খবর কী? রচনা জানতে চাইল। মেয়েরা বুঝিয়ে দিল পুরো অনুষ্ঠানসূচি— কখন কী হবে, কোথায় এবং কেন? কাকে কোথায় বসাতে হবে, কী করতে হবে এবং না হবে সব। রচনা তাদের কিছু পরামর্শ দিল।
বাসাতেই রান্না হয়েছে। খেয়েদেয়ে মেয়েরা চলে গেল। তাদের আবার বসতে হবে অনুষ্ঠান নিয়ে আমি আর রচনা আমাদের কক্ষে চলে যাই।
সকালে ঘুম ভাঙে প্রমিতার ডাকে, ম্যাম আমরা গেলাম।
ঘড়ি দেখলাম। সকাল আটটা।
যাও।
এগারোটার সময় অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা। আমরা পৌঁছলাম সাড়ে দশটায়। ততক্ষণ অনুষ্ঠানের সব প্রারম্ভিক কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে। রচনা ঘুরে ঘুরে সব দেখল। সবার সঙ্গে কথা বলল। কোথাও কোনো ফাঁক নেই, সব নিখুঁত। অমল প্রতিটি বিষয় বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে দেখভাল করে যাচ্ছেন। চোখ তার ফিঙে। কোথাও একটি পাতার নড়নও তার দৃষ্টিকে ফাঁকি দিতে পারছিল না। প্রধান অতিথি এগারোটা বাজার দশ মিনিট আগে উপস্থিত হলেন। তিনিও মঞ্চে উঠার আগে চারদিক একবার ঘুরে এলেন। জেনে নিলেন— অনুষ্ঠানের খুঁটিনাটি। সব দেখে বললেন, কলকাতার মানুষ এত সুশৃঙ্খল হয়ে অনুষ্ঠানে বসতে পারে, তাও আবার বস্তিতে—এ প্রথম দেখলাম।
আমি বললাম, এটাই শিক্ষা। যে শিশুটা একদিন হাাঁটতে পারত না, শিক্ষা নিয়ে সে শিশুটাই একদিন মহাকাশ পাড়ি দেয়। মাইলের পর মাইল দৌড়ে অলিম্পিকে স্বর্ণপদক পায়।
দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানও নানা চিত্তাকর্ষক মনোরম আনন্দে অতিবাহিত হলো। অমল তার কাজে এত দক্ষ, বিচক্ষণ এবং আন্তরিক ছিল যে, কোথাও সামান্য ত্রুটি হওয়ার কারণ ছিল না। অমলকে ভালো সংগঠক হিসেবে একটি পুরস্কার দেওয়া হলো। দেওয়া হলো সনদ। এই সনদ তুলে দিয়েছেন কলকাতার মহানাগরিক। পুরস্কার পেয়ে অমল মহাখুশি। মাইকে আবেগাপ্লুত গলায় বললেন, “আমাদের বস্তিজীবনে এমন খুশির দিন আর আসেনি।”
বস্তির শিশুদের পাঠশালার উন্নয়নের জন্য এক লাখ টাকার চেক এবং ক্লাবের জন্য দুটি টেলিভিশন দেওয়া হলো। সবাই তালিতে এলাকা মুখরিত করে দিলেন।
মহানাগরিক বললেন, উপহার যতই ছোটো হোক, তা সবসময় আনন্দদায়ক।
পাঁচটার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল। অবাক করার বিষয় হলো— মহানাগরিক এগারোটা থেকে পাঁচটা অবধি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর ভাষায়, আমি এত ভালো অনুষ্ঠান আর দেখিনি। বস্তির মতো এলাকায় এত বিশাল অথচ পুরো সুশৃঙ্খল জনসমাবেশও দেখিনি।
অনুষ্ঠান শেষে পঞ্চকন্যা সমভিব্যাহারে হুগলি নদী দেখতে গেলাম। ওখান থেকে বাসায় পৌঁছতে পৌঁছতে সাতটা বেজে যায়। দুদিনের বিরামহীন বিশ্রাম। ক্লান্তিতে সবার এলিয়ে পড়ার কথা। কিন্তু কারও চোখেমুখে সামান্য ক্লান্তি দেখা গেল না। মনে হলো পরিশ্রম তাদের শক্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পোশাক বদলে এসে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চকন্যা ঘরোয়া পোশাক পরে আবার রচনাকে ঘিরে ধরে। আড্ডা হবে।
ম্যাম, আপনার জীবন কাহিনি বলুন, দীপালী বলল।
আমি বস্তির মেয়ে। বস্তি হতে উঠে এসেছি। আমার জীবন কাহিনি সময়ের কাছে জেনে নিও। যদি আরও ভালোভাবে জানতে চাও নিজ নিজ কাজে একাগ্র হয়ে যাও। একাগ্রতাই আমার জীবন কাহিনি। স্যারকে ঘিরে আমি আবর্তিত, তিনিই আমার কেন্দ্র। মনে রাখবে— তুমি দক্ষ হলে শুধু তুমি লাভবান হবে না। একই সঙ্গে লাভবান হবে তোমার পরিবার, স্বজন, তোমার সমাজ, জেলা, রাজ্য, দেশ; সর্বোপরি পৃথিবী। তুমি পৃথিবীর বাইরের কেউ নও। ইহুদিদের আবিষ্কারের সুবিধা কি ইহুদি-বিদ্বেষীরা ভোগ করছে না?
ম্যাম, কাহিনি কী?
চোখ খোলা রেখে কান প্রসারিত করো। জীবন তোমার ইতিহাস হয়ে তোমাদের সংকীর্ণ জগৎ থেকে বের হয়ে সবার অন্তরে ছড়িয়ে পড়বে। তখন যে ঘটনাটি রটবে সেটিই কাহিনি।
দশটার দিকে অমল এবং তার লোকজন ডিনার নিয়ে এল। ডিনার বলতে ডিনারই। বস্তির বধূ-কনের হাতে তৈরি। পিঠা থেকে শুরু করে নানা ফল, ভাত, মাংস, চিংড়ি, শুঁটকি এবং নানা রকম মাছ। ডাল তো আছেই। তার সঙ্গে সালাদ। শয়ের অধিক হবে পদ। একসঙ্গে এত বেশি ভিন্ন স্বাদের খাবার ইউরোপ-আমেরিকার তারকা হোটেল ছাড়া কোথাও দেখিনি। বিশাল টেবিল ভরে গেছে থালায় থালায়।
অমলের দলও খেতে বসে গেলেন। পুলিশের সদস্যরা আলাদা খাবেন না। তারাও একই সঙ্গে খাওয়ার আবদার করলেন।
বসে যান, রচনা বলল।
কলকাতায় অমল খুব ভয়ংকর, কিন্তু আচার-আচরণে মনে হলো আগাগোড়া ভদ্র এবং অমায়িক। মনে হয় লেখাপড়াও জানেন। লেখাপড়া না-জানুক, অমল যে জ্ঞানী সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। শিক্ষা নিয়ে তিনি জ্ঞানী হয়েছেন। কেবল বইপড়া কিংবা পড়তে পারা বা বড়ো ডিগ্রি বগলদাবা করা আনুষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে এই শিক্ষা অনেক বড়ো।
আপনি লেখাপড়া করেছেন? আমি প্রশ্ন করলাম।
“করেছিলাম, অষ্টম শ্রেণি তক”, আমার প্রশ্নের উত্তরে অমল বললেন, “এখন ভুলে গেছি। বস্তিতে লেখাপড়ার কোনো দাম নেই। কেবল পেশির দাম, এখানে পেশি মসির চেয়ে শক্তিশালী।”
রচনা বলল, পেশিশক্তিই যুগ যুগ ধরে রাজশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।এখন তা আর প্রবল হয়েছে। কীভাবে পেশি চালাতে হয় রাজশক্তি সেই নিদের্শনাই নিয়েছে মস্তক থেকে। ম্যাকিয়েভ্যালির “দ্য প্রিন্স” তাই বলে। মাইট সর্বদা রাইট। তাই এখনো বিশ্বে “মাইট ইজ রাইট” কথাটি প্রবলভাবে বিরজমান। শক্তির নির্দেশনাই ন্যায়-অন্যায় নির্ধারণ করে। প্রকৃতির নির্দেশনাও প্রায় অভিন্ন। ঝড়ঝঞ্ঝায় দুর্বল বৃক্ষগুলো সবার আগে ভেঙে পড়ে।
অমল বললেন, ম্যাম, আমি আগামীকাল থাকতে পারব না।
কেন?
আদালতে হাজিরা আছে।
কিন্তু আগামীকালই তো আপনার প্রয়োজন।
কোনো অসুবিধা হবে না। রঞ্জন আর মাছুমকে থাকবে। তারা আমার দুই হাত। তারা যতক্ষণ থাকবে, কোনো অসুবিধা হবে না। তবে ফাঁকিবাজ। একদম কোথাও যেতে দেবেন না।
রঞ্জন আর মাছুম বললেন, যাব না।
অমল বলল, খবরদার, অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে কোথাও যাবে না। রবিন-মারুফ গ্রুপ সুযোগ পেলে আমাদের বদনাম রটানোর জন্য অঘটন ঘটিয়ে দিতে পারে।
 

Language
error: Content is protected !!