Warning: Constant DISALLOW_FILE_MODS already defined in /home/draminb1/public_html/wp-config.php on line 102

Warning: Constant DISALLOW_FILE_EDIT already defined in /home/draminb1/public_html/wp-config.php on line 103
সন্মিত্রা : এক মলাটে সন্মিত্রা: সন্মিত্রা সম্পূর্ণ উপন্যাস : প্রথম থেকে শেষ পর্ব – Page 11 – Dr. Mohammed Amin

সন্মিত্রা : এক মলাটে সন্মিত্রা: সন্মিত্রা সম্পূর্ণ উপন্যাস : প্রথম থেকে শেষ পর্ব

সন্মিত্রা: একাদশ  পর্ব / ড. মোহাম্মদ আমীন

তৃতীয় দিন বিতরণদিবস।
বিতরণ শব্দটির সঙ্গে বিস্ফোরণ কথাটির অদ্ভুত মিল। বিতরণে বিস্ফোরণ; বিস্ফোরণের মতো হট্টগোল আর হইচই। আজ কোনো প্রতিযোগিতা নেই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রবোধ এবং বস্তির লোকদের সহায়তায় প্রস্তুতকরা তালিকা অনুযায়ী কিছু লোককে পেশা ও দক্ষতা বিবেচনায় আয়-সহায়ক-সামগ্রী প্রদান করা হবে। দান খুব বাজে কাজ। সবাই পেতে চায়। কিন্তু সবাইকে দেওয়া এবং সন্তুষ্ট করা মানব-অতিমানব কারো পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই দানে গন্ডগোল হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। এজন্য মোটামুটি প্রস্তুতি আছে। পুলিশ আছে। রচনা আর প্রমিতা উভয়ে সশস্ত্র।
পঞ্চকন্যা, রঞ্জন, মাছুম, স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং পুলিশ-সদস্যদের নিয়ে তালিকাভুক্তদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো। ঠিক দশটায় আমার মাধ্যমে এক মহিলার হাতে সেলাই মেশিন তুলে দিয়ে আয়-সহায়ক-সামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠান উদ্‌বোধন করা হয়। তিন ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। এরপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।
ঘণ্টা দুয়েক ভালোভাবে চলল। হঠাৎ সাহায্যপ্রার্থীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। কিছু লোক সারি ভেঙে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের ওপর। তাদের দাবি— সবাইকে দিতে হবে। কাউকে বাদ দেওয়া যাবে না। নইলে সাহায্য প্রদান বন্ধ করতে হবে। কেউ পাবে, কেউ পাবে না; তা হবে না; তা হবে না।
অবস্থা দেখে আমি হতভম্ব। ভীতু মানুষ— কাঁপতে শুরু করি ভয়ে। আমার যাই হোক, রচনার যেন কিছু না হয়। সে দেখি অবিচল। কিছু ঘটার আগে চোখের পলকে আমি আর রচনার সামনে প্রমিতা ও মিশু এবং পেছনে দীপালী, রেবেকা আর জগদ্‌গৌরী ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সেকেন্ডের মধ্যে গড়ে তুলল অপ্রতিরোধ্য ব্যূহ।
পুলিশরা এতক্ষণ কাছেই ছিল। গন্ডগোল শুরু হওয়ামাত্র একটু দূরে সরে গিয়ে দায়িত্ব পালনে আন্তরিক— এটি প্রমাণের জন্য কানফাটানো বাঁশি বাজিয়ে কোলাহল থামানোর চেষ্টার নামে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে থাকে।
মেয়েরা আপ্রাণ চেষ্টা করছে লোকদের থামাতে। জনশৃঙ্খলা বিশৃঙ্খল হয়ে গেলে থামানো কষ্টকর। বোঝা যায় না কে বন্ধু আর কে শত্রু। হুড়োহুড়িতে সবাই এক হয়ে যায়। কয়েকজন লোক রচনার দিকে এগিয়ে আসতে চাইলে। প্রমিতা আর মিশু তাদের প্রচণ্ড মার দিল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম— অর্ধ ডজন সোমত্ত পুরুষ প্রমিতার কাছে কুপোকাত হয়ে গেল নিমিষে। যেন হিন্দি সিনেমার অতিদানবীয় নায়ক।
গন্ডগোল ক্রমশ বাড়ছে আর ছড়িয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় প্রমিতা কোমর থেকে রিভলভার বের করে ফায়ার করল আকাশে। এটাকে বলে ব্ল্যাংক ফায়ার। আকস্মিক রিভলবারের বিদঘুটে আওয়াজে ভয় পেয়ে গেল সবাই। অনেকে পালিয়ে যেতে থাকে। মুহূর্তের মাঝে ফাঁকা হয়ে গেল অনুষ্ঠান মঞ্চ।
ভাগ্যিস, কারও কোনো ক্ষতি হলো না। তবে প্রমিতা তার ডান হাতের মধ্যমায় ব্যথা পেয়েছে। ফার্স্ট-এইড বক্স থেকে ওষুধ নিয়ে আমিই ব্যান্ডেজ করে দিলাম। এসব বিষয়ে আমি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তেমন কিছু না— হাড়ের একটা জোড়া মচকে গেছে। ঘণ্টা কয়েক ব্যথা থাকবে। তারপর ঠিক হয়ে যাবে।
প্রমিতা মাইকে গিয়ে সাহায্যপ্রার্থীদের উদ্দেশে বলল, যদি আপনারা লাইন ধরে আমাদের কথামতো অবস্থান না করেন তাহলে আমরা চলে যাব। একজন লোক লন্ডন থেকে আপনাদের সাহায্য করার জন্য এসেছেন। তাঁর প্রতি আপনাদের এমন অভক্তি কোনোভাবে মেনে নেব না। কয়েকজন লোক সমবেত গলায় ক্ষমা প্রার্থনা করে বললেন, “আমাদের দুর্নাম রটানোর জন্য জন্য রবিন দাস আর মারুফ বালার গ্রুপ এমন করেছে।”
রঞ্জন আর মাছুম কোথায়? প্রবোধ জানতে চাইলেন।
খেতে গেছে।
না বলে খেতে চলে গেল? আমি বললাম।
“আমার অনুমতি নিয়ে গেছে”, রচনা বলল।
“অনুমতি দেওয়া উচিত হয়নি”, আমি বললাম, “অমল কাল কী বলেছিল মনে ছিল না বুঝি? যাই হোক এ নিয়ে আর ভাবার কোনো কারণ নেই।”
খবর পেয়ে রঞ্জন আর মাছুম ছুটে এলেন। তাদের দেখে বস্তিবাসী পুরোপুরি শান্ত হয়ে গেল। দুচারজন লোককে কয়েকটা চড়-থাপ্পড় দিয়ে বললেন, রবিন-মারুফের লোক এসেছে, তাদের মেরে ফেললি না কেন? একটা কল্লা নিতে কত শ্রম হয়?
আবার সামগ্রী-বিতরণ কাজ শুরু হলো। কিছুক্ষণের মধ্যে অমল চলে এলেন। তিনি কয়েকজন বস্তিবাসীকে ধরে নিয়ে রচনার সামনে হাজির করে বললেন, ম্যাম এরাই গন্ডগোলের হোতা। জবাই করে দেব?
না।
কী করব?
ওরা হাঁটু গেড়ে রচনার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করল।
“এরা বুঝতে পারেননি”, রচনা বলল, “হঠাৎ ভুল হয়ে গেছে। ক্ষমা করে দিন।”
এরপর সত্যি আর কোনো গন্ডগোল হয়নি।
তিনটায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার। খাওয়া-দাওয়া ওখানে। ঘড়ি দেখলাম একটা পঞ্চাশ। যথেষ্ট সময় আছে। এখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় যেতে দশ-বারো মিনিটের বেশি লাগবে না। কিছুক্ষণের মধ্যে বিতরণ কাজ শেষ হয়ে গেল। গতকালই অমলকে সম্ভাব্য সব খরচ ভারতীয় মুদ্রায় পরিশোধ করা হয়েছে। তারপরও যদি কোনো পাওনা বাকি থাকে রাতে বাসায় গিয়ে নিয়ে আসবে।
যথাসময় বিশ্ববিদ্যালয় গিয়ে পৌঁছলাম। খাওয়া-দাওয়ার পর সেমিনার শুরু হলো। বিষয় ছিল— “ভারতে সংখ্যালঘুদের অবস্থা ও ভূমিকা”। বেশ প্রশংসা পেল রচনার ভাষণ। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে সেমিনার শেষ। তারপর শুরু হলো শিক্ষকদের নিয়ে আড্ডা।
পঞ্চকন্যা অদূরে বসে। এ বয়সে শিক্ষকদের ভারিক্কি কথা শুনতে ভালো লাগে না। ইচ্ছা করছিল শিক্ষকদের মাঝ থেকে সরে গিয়ে পঞ্চকন্যার মাঝে গিয়ে বসি। শোভন হবে না। মোটেও ভালো লাগছিল না অ্যাকাডেমিক পরিবেশ।
রচনাকে কানে কানে বললাম, আড্ডা শেষ করো।
কোথায় যাব?
ড্রাইভারকে বলব—
“যেথা খুশি সেথা; নিয়ে যান দাদা,
আজ আর নেই কোনো পাঠ
নেই কোনো বাধা।”
আমার অনুরোধ রচনার জন্য নির্দেশ। সবাই আমার মনোভাব বুঝে নিল। কয়েক মিনিটের মধ্যে শিক্ষকাড্ডা শেষ।
রচনা, প্রমিতার কাছে রক্ষিত একটি বক্স থেকে পাঁচটি গিফট-প্যাকেট বরে করে উপচার্যের হাতে দিয়ে বলল, “এগুলো আপনার হাত দিয়ে আমাদের পঞ্চকন্যার হাতে তুলে দিন।”
তাই করলেন উপাচার্য। মেয়েরা খুব খুশি হলো। উপহার অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং মর্যাদাপূর্ণ— ক্যাপ-সহ এক সেট অক্সফোর্ড ড্রেস।
রচনা আর আমাকে কদমবুসি করে মেয়েরা বলল, আপনাদের সান্নিধ্য আমাদের জীবনে অবিস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে থাকবে।
“তোমাদের কাজ শেষ”, রচনা বলল, “ এখন বিদায়। আমরা কাল কলকাতা ছাড়ছি। ভালো থেকো। আবার এলে দেখা হবে। আমার ঠিকানা সবার আছে। প্রয়োজনে যোগাযোগ কোরো। অক্সফোর্ড গেলে বাসায় এসো। কোনো সংকোচ করো না। ”
কেঁদে দিল পঞ্চকন্যা, একদম শিশুর মতো হাউমাউ। রচনা তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। শিক্ষকগণ অবাক হয়ে দেখছেন পঞ্চকন্যার কান্না।
“চার বছর থাকে আমাদের সঙ্গে”, উপাচার্য বললেন, “কিন্তু বিদায়কালে এ পর্যন্ত কাউকে এমন কাঁদতে দেখিনি; কেউ আমাদের এমন হৃদয় উপড়ানো জলোপহার দেয়নি। চার দিনে আপনি তাদের মনে যে দাগ কেটেছেন তা আমাদের চার বছরেও সম্ভব হয় না। কীভাবে?”
“জীবন ক্ষণস্থায়ী বলে এত প্রিয়”, রচনা বলল, “যদি দীর্ঘস্থায়ী হতো এত প্রিয় জীবনটাও একসময় বিরক্তিকর বোঝা হয়ে যেত। আমি তাদের প্রতিটি মুহূর্তকে মুগ্ধ ক্ষণে ভরিয়ে রেখেছিলাম। ”
প্রমিতা আর মিশু বলল, ম্যাম, আমরা আপনাদের সঙ্গে যাব। বাসা তো আছে।
“চলো”, রচনা আর আমি একসঙ্গে বলে উঠলাম।
রেবেকা, দীপালী আর জগদ্‌গৌরীও বলে উঠল, তাহলে আমরা?
সবাই চলো।
প্রবোধ সেমিনার শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চলে গেছে। প্রেসক্লাবে তার সভা। কলকাতায় দেখা করবে বাসায়।
“ম্যাম”, প্রমিতা বলল, আসার সময় মিশু আপনাদের সারিতে বসেছে, এবার আমার পালা। স্যার আর আপনার সারিতে আমি বসব।
গাড়িতে উঠলাম। আমার ডান পাশে রচনা, বাম পাশে প্রমিতা। পেছনে বাকি তিন জন। ড্রাইভারের পাশে বডিগার্ড।
কোথায় যাব, ম্যাম?ড্রাইভার জানতে চাইলেন।
যেখানে ইচ্ছা। আজ কেবল ঘুরব আর দেখব।
সময় কতক্ষণ? গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে ব্রিটিশ কাউন্সিলের ড্রাইভার বললেন।
দুঘণ্টা। তারপর তোমার অফিস, মানে ব্রিটিশ কাউন্সিল। নয়টার মধ্যে পৌঁছতে হবে। আজ তোমাদের ওখানে ডিনার।
দুঘণ্টা ঘোরার পর ব্রিটিশ কাউন্সিল। ডিনার শেষ করে আবার গাড়িতে। বাসার সদর গেইটে যখন এলাম তখন রাত দশটা দশ। কেয়ারটেকার-সহ সবাই আমাদের অপেক্ষায়। গাড়ি থামামাত্র সবাই হুটোপুটি করে নামার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে উঠল।
“স্যার”, দীপালী বলল, “আমরা হাতমুখ ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে আসছি, আড্ডা হবে জম্পেশ।”
মিশু বলল, আড্ডা কেবল ডাকছে ভারি, আয়রে ত্বরা আয়।
তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে হঠাৎ উহ করে উঠল প্রমিতা।
কী হলো? আমি বললাম।
ব্যথা।
কোথায়?
“মধ্যমায়”, প্রমিতা বলল, “বারোটা থেকে সে বিরক্ত করছে। এক সেকেন্ডের জন্যও ভুলতে পারিনি।”
প্রমি, তোমার কয়টা আঙুল? আমি প্রশ্ন করলাম।
হাতে পায়ে মিলে বিশটা।
কয়বার মনে পড়েছে বাকি আঙুলগুলোর কথা? কয়বার স্মরণে এসেছে অন্য প্রত্যঙ্গসমূহের কথা? এ যেমন— চোখ, মগজ, নাক, মুখ- – -।
একবারও না।
দেখো, নষ্ট প্রত্যঙ্গই মনে বেশি নাড়া দেয়। ভালোর কথা কেউ মনে রাখে না গো। দুষ্টদের প্রতি সবার নজর থাকে, দিতে হয়, না-দিয়ে উপায় থাকে না। ভালোদের-না প্রমি, সবাই ভুলে যায়। ভালোরা আমাদের ভালো রাখে বলে ভালোদের কেউ মনে রাখে না।
তাই তো স্যার! বললাম—
“চুমোতে মমতা বেশি, কামড়েতে স্মরণ
নৈকট্য বিরক্তি আনে , বিচ্ছেদ চায় বরণ।”