সন্মিত্রা : এক মলাটে সন্মিত্রা: সন্মিত্রা সম্পূর্ণ উপন্যাস : প্রথম থেকে শেষ পর্ব

সন্মিত্রা: ঊনত্রিংশ  পর্ব / ড. মোহাম্মদ আমীন

লুসির সঙ্গে অপরিচিত সবার পরিচয় করিয়ে দিলেন মাসাহিতো। ফাতিমা, মুনওয়ারা, আল্পনা, কল্পনা, টুটুল এবং আমি লুসির অপরিচিত। লুসিকে বেশ প্রাণবন্ত এবং বন্ধুবৎসল মনে হলো। আসলেই। আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতে করতে বললেন, ফ্রম বাংলাদেশ?
ইয়েস।
বাংলাদেশ মানে জে এন ইসলামের দেশ। আপনি কি তাঁকে চেনেন?
অজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি এমন আশঙ্কায় উত্তর দেওয়ার আগে রচনা আমার দিকে তাকিয়ে বাংলায় বলল, স্যার, জে এন ইসলাম মানে জামাল নজরুল ইসলাম। বাংলাদেশকে অক্সব্রিজের বিজ্ঞানীর কান্ট্রি অব জে
এন ইসলাম বলে।
“তিনি আমার পরিচিত”, বললাম, “‘দি আল্টিমেট ফেট অব দি ইউনিভার্স’ এর লেখক। ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে বইটি বের হয়েছিল। আমার প্রাক্তন বস সিএসপি আবদুল হামিদ খান স্যারের বন্ধু। জে এন ইসলাম নিজেই বইটির একটি কপি আমাকে দিয়েছিলেন। তিনি রচনার প্রথম চাকুরি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ছিলেন।
বইটি এখন স্যার কার কাছে? রচনা বলল।
সম্ভবত যিনি প্রশ্ন করিয়াছেন তাহার কাছে। ফরাসি, ইতালীয়, জর্মান,
পোর্তুগিজ, সার্ব, ক্রোয়েট, রুশ, ডাচ, স্প্যানিস, চায়নিজ ও জাপানিজ-সহ কমপক্ষে বিশটি ভাষায় বইটি অনূদিত হয়েছে।
“হিব্রু ভাষাতেও অনূদিত হয়েছে”, সুসানা বললেন, “আমার দেশ ইসরাইলে বিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ বই হিব্রু ভাষায় অনুবাদ করিয়ে নেয়। এরা জানে বই হচ্ছে জ্ঞানের সংরক্ষণাগার। অনুবাদের জন্য সরকার প্রচুর টাকা খরচ করে। একজন মাঝারি মানের অনুবাদকের মাসিক বেতন এক লাখ ডলার। ”
মুনওয়ারা বললেন, জে এন ইসলাম আরও অনেক বিখ্যাত বইয়ের লেখক। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ডব্লিউ বি বোনার-এর সঙ্গে সম্পাদনা করেছেন ‘ক্লাসিক্যাল জেনারেল রিলেটিভিটি’। ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় ‘রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি’। দুটিই জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং বিশ্বতত্ত্বের প্রচলিত জ্ঞানকে নতুন ধারণায় সমৃদ্ধ করেছে। তিনি আমর প্রিয় বিজ্ঞানী।
“আমার বাবার অভিমত”, লুসি বললেন, “ জে এন আংকেল আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথিকৃৎ। তাঁর লেখা সাতটি বই ক্যামব্রিজ, অক্সফোর্ড, প্রিন্সটন এবং হার্ভার্ড-সহ পৃথিবীর নামকরা শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। আর একটা বিষয়, জে এন ইসলামই একমাত্র বাঙালি— যাঁর লেখা সাতটি বই ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রকাশ করেছে।
আমি বললাম, বাংলায়ও লিখেছেন। ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে, ‘কৃষ্ণ বিবর’। ‘মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা এবং অন্যান্য প্রবন্ধ’ আর ‘শিল্প সাহিত্য ও সমাজ’ তাঁর লেখা দুটি বই। বই দুটো পড়লে বোঝা যায়, তিনি শুধু বিজ্ঞানী ছিলেন না, দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ এবং রাষ্ট্রচিন্তকও ছিলেন।
মাসাহিতো বললেন, ‘স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ’ জামাল নজরুল ইসলামের একটি আর্টিকেল। এটির স্প্যানিশ সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর আরেকটি সাড়াজাগানো আর্টিক্যাল ‘দা ফার ফিউচার অব দি ইউনিভার্স, এনভেডর’। এই আর্টিকেলটি জার্মান, ডাচ এবং ইতালিয়ান জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
“কিন্তু জে এন ইসলাম ইউরোপীয়ান নন”, সুসানা বললেন, “এবং মুসলিম। তাই ইউরোপ তাঁকে যথাযথ মূল্যায়ন করেনি। তাঁর লেখা গবেষণাপত্রের সংখ্যা ষাটের অধিক। তাঁর গবেষণার তথ্য নিয়ে অনেক বিজ্ঞানী নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, বিশ্বব্যাপী খ্যাতি পেয়েছেন। তিনি পাননি কারণ তিনি মুসলিম।”
ফাতিমা বললেন, এর জন্য দায়ী কে?
মুনওয়ারা বললেন, অবশ্যই মুসলিম। প্রত্যেকে প্রত্যেকের কাজের জন্য দায়ী। মুসলিমরা মধ্যযুগ থেকে বের হয়ে আসার কোনো সুযোগ রাখেনি। পশ্চাৎপদতা প্রতিভাকে অবিকশিত এবং অধ্যবসায়কে অথর্ব করে রাখে। মুসলিমে ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছে।
লুসি বললেন, জে এন আংকেল এবং বাবা সহকর্মী, সহপাঠী এবং সতীর্থ ছিলেন। উভয়ে একই সময়ে ক্যামব্রিজ থেকে ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি করেছেন। ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রিও অর্জন করেন। তাও ক্যামব্রিজ থেকে। দুজন একই রুমে থাকতেন। জেএন আংকেলের বড়ো মেয়ে সাদাফ যাস আমার বন্ধু। ছোটো মেয়ের নাম নার্গিস। আমরা সবাই ছোটোবেলায় একসঙ্গে খেলতাম।
“জে এন ইসলাম পৃথিবীর কয়েকজন মেধাবী মানুষের অন্যতম।”, সুসানা বললেন, “১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা থেকে অনার্স শেষ করে ট্রিনিটি কলেজে গণিতশাস্ত্রে ট্রাইপস করতে গিয়ে তিন বছরের কোর্স দুই বছরে শেষ করে ফেলেছিলেন “
আমি বললাম, চট্টগ্রামের কলেজিয়েট স্কুলের ভর্তি পরীক্ষায় তার মেধা দেখে শিক্ষকগণ এতই বিস্মিত হয়ে পড়েছিলেন যে, তাকে এক ক্লাস ওপরে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছিল।
“ভারতের বিখ্যাত জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী জয়ন্ত নারলিকর জে এন ইসলামের সহপাঠী ছিলেন।”, মাসাহিতো বললেন, “ফ্রেডরিক হয়েল, নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ব্রায়ান জোসেফসন, আব্দুস সালাম, অমর্ত্য সেন এবং রিচার্ড ফাইনমেন ছিলেন জামাল নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁদের মুখে আমি অনেকবার জে এন ইসলামের কথা শুনেছি “
লুসি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, আমাদের গাড়ি চড়ার সময় হয়ে গেছে। যেতে যেতে কথা হবে। এক সেকেন্ড এদিক-ওদিক হলেও বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা যাবে না। আপনাদের পরে আসবেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট।
আল্পনা বলল, জে এন ইসলামের হোম ডিস্ট্রিক্ট?
“চট্টগ্রাম”, আমি বললাম, “তবে জন্ম বাবার কর্মস্থল ঝিনাইদহে। তিনি ছিলেন মুন্সেফ। ”
“অসম্ভব দেশপ্রেমিক ছিলেন জে এন ইসলাম।”, রচনা বলল, “ক্যামব্রিজের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশে গিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে মাসিক তিন হাজার টাকা বেতনের অধ্যাপক পদে যোগ দিলেন। কবীর চৌধুরী স্যারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। ভারতের অর্থনীতিবিদ অমিয় বাগচীর বাসায় ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে দুজনের পরিচয়। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে অমর্ত্য সেন বাংলাদেশে সফরে এলে চট্টগ্রামে গিয়ে জামাল নজরুল ইসলামের বাসায় ছিলেন। লন্ডন এলে জে এন ইসলাম অমর্ত্য সেনের বাসায় থাকতেন।
আমি বললাম, ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে প্রফেসর আব্দুস সালাম ঢাকা জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে নেমে প্রথম যে মানুষটির সঙ্গে দেখা করার কথা বলেছিলেন, তিনি জে এন ইসলাম।
লুসিকে অপূর্ব দেখাচ্ছিল, পোশাকও পরেছেন তেমন। বললাম, লুসি, আপনি বেশ ইয়াং, হ্যান্ডসাম এবং অসম্ভব সুন্দরী।
প্রশংসার জন্য ধন্যবাদ। তবে ইয়াং নই। আমি লুকাসিয়ান প্রফেসর হকিংয়ের বড়ো মেয়ে। কিন্তু দ্বিতীয় সন্তান। অনেক বয়স। বড়োজনের নাম রবার্ট এবং কনিষ্ঠজনের নাম টিমোথি। তিনজনের মায়ের নামই জেন। আমাদের মায়ের পুরো নাম জেন বেরিল ওয়াইল্ড হকিং জোনস। তিনি বাবার বোনের বন্ধু ছিলেন। সে সূত্রে পরিচয়, প্রেম এবং বিয়ে। মা ছিলেন পেশায় শিক্ষক এবং লেখক।
আপনার বাবার রোগ কখন ধরা পড়ে? আমি প্রশ্ন করলাম।
বাবার মোটর নিউরন রোগ ধরা পড়ে ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে। এর এক বছর পর মা-বাবার বিয়ে সম্পন্ন হয়। মা জানতেন পরিণতি। তারপরও না করেননি। আমরা এ নিয়ে প্রশ্ন করলে বলতেন—ভালোবাসার আবেগ এত প্রবল থাকে যে, জন্মমৃত্যু একাকার হয়ে যায়। মলকে মনে হয় মজনু। পরিণতির চিন্তা মাথায় থাকে না। একদিন জনাথন জোনস-এর সঙ্গে মায়ের পরিচয় হয়।
জোনস কে?
গায়িকা। মা তাকে আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে এলেন। বাবা নিষেধ করেছিলেন, মা শোনেননি। শিক্ষক মা সর্বক্ষণ বাবার সঙ্গে থাকতে পারতেন না। ফলে নার্স ম্যাশনের সঙ্গে বাবার ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যায়। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে বাবা তাঁর নার্স, ম্যাশনকে নিয়ে অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে চলে গেলেন। এরপর থেকে বাবা-মা পৃথক থাকতে শুরু করেন। তবে বিবাহ বিচ্ছেদ হয় ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে বাবা, ম্যাশনকে বিয়ে করেন। ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এরপর বাবা বিয়ে করেন ‘জোনস’কে।
বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ কী ছিল?
মেসন ছিলেন ধর্মপরায়ণ। তিনি দিন দিন ধর্মের প্রতি ঝুঁকে পড়ছিলেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবা ধর্ম হতে দূরে সরে যাচ্ছিলেন। জোনস-এর উপস্থিতি ও ঘনিষ্ঠতা এবং বাবার শারীরিক অসুস্থতাও বিবাহ বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ ছিল। ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে বাবার দ্বিতীয় বিয়েও ভেঙে গেল। অবশ্য এটি উভয়ের জন্য ভালো হয়েছিল।
কেন? জানতে চাইলাম।
বাবার ওপর খুব অত্যাচার করতেন । অনেকবার আহতও করেছেন। থানা-পুলিশও হয়েছে।
কী অবাক!
অনেকে বিশ্বাসই করতে চান না। এরপর থেকে বাবাকে আমাদের কাছে নিয়ে আসি। এখন সবাই একসঙ্গে থাকি।
 
 

 

Language
error: Content is protected !!