সন্মিত্রা : এক মলাটে সন্মিত্রা: সন্মিত্রা সম্পূর্ণ উপন্যাস : প্রথম থেকে শেষ পর্ব

সন্মিত্রা: ত্রয়স্ত্রিংশ (৩৩) পর্ব / ড. মোহাম্মদ আমীন

ম্যাম আপনাকে খুব ভালোবাসেন।
“তা ঠিক”, রচনাকে বললাম, “আমিও আমার অনেক বন্ধুকে একই কথা বলি; কিন্তু আমরা যে পরস্পর তা বুঝি-না!
হয়তো এটাই জম্পতির ট্র্যাজেডি। এরা কেন জানি একজন আরেক জনকে বুঝতে পারে না। এজন্য বলা হয়: Familiarity breeds contempt. যান্ত্রিক যোগাযোগে মানুষ যতই উন্নত হোক না কেন, আত্মিক যোগাযোগে এখনো সেই আদিম অবস্থায় রয়ে গেছে। মন্ত্র বাদ দিয়ে মানুষ যেভাবে যন্ত্র নিয়ে পড়ে আছে, তাতে দূরত্ব বাড়তে বাড়তে একদিন পরস্পর অদৃশ্য হয়ে যাবে।
তুমি বুদ্ধিমান।
ভাব্বা, বুদ্ধিমত্তা কী?
বর্তমান এবং একই সঙ্গে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারার যোগ্যতা।
ভাব্বা, আমি অত কঠিন করে বুঝতে পারি না। শুধু বুঝি, নিজের চিন্তাকে বদলে দিতে পারলে সব অবস্থায় ভালো থাকা যায়। যারা মেনে নিতে পারে তাদের কাছে সমস্যা কখনো ভিড়তে পারে না। আমাকে কেউ মাগি ডাকল, আমি শেষের গি-টা শুনব না। শুনব— মা।
তারপর?
যে আমাকে মাগি ডাকল তাকে ‘মা’ শুনে পুত্র বলে সম্বোধন করব। ব্যাস, হয়ে গেল। সমস্যার আশি ভাগ আমার কান আর চোখমুখ এবং অনুভূতি। কে কী বলল তা বিষয় নয়, কী শুনলাম তা আসল বিষয়।
গল্পে গল্পে নাশতার সময় হয়ে এল। ছুটতে হবে কাজে। কল্পনা নাশতা না-করে বের হয়ে গেছে। তার জরুরি মিটিং। লন্ডনের মানুষ মাছের মতো। তাদের আর্থিক সচ্ছলতা আছে, কিন্তু বিশ্রাম আর ঘুম আছে কি না আমার জানা নেই। আর্থিক সমৃদ্ধি যত বাড়ে মানসিক সমৃদ্ধি তত কমে। অর্থের পিছনে ছুটতে ছুটতে তারা প্রত্যেকে অর্থের ক্রীতদাস হয়ে গেছে।
তাড়াহুড়ো করে রচনাও বের হয়ে গেল। বিভাগীয় জরুরি প্রাশাসনিক কাজ আছে। নইলে যেত না। ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে চলে আসবে। আমি থাকলে সে অত্যন্ত জরুরি না হলে অফিসে যায় না।
যুক্তরাজ্যে আমার কাজ শেষ। দুমাস পর আবার আসতে হবে এক মাসের জন্য। পরশু দেশের উদ্দেশে উড়াল দেব।
ওরা চলে যাওয়ার পর নতুন গল্প শুরু হলো। গল্পের সঙ্গী আল্পনা, রাজ-রোজি আর নিনি। টুটুল পড়ার কক্ষে। সামনে তার পরীক্ষা। নইলে সেও যোগ দিত। এসময় এল গাড়ির আওয়াজ। গাড়ির আওয়াজ বন্ধ হওয়ার কয়েক মিনিট পর বেজে উঠে কলিংবেল।
দরজা খুলে দিল নিনি।রুমে ঢুকল টিআই চৌধুরী, মানে কল্পনার স্বামী। দুহাত বোঝাই বোঝা। সে রচনাদের বাসায় এলে প্রচুর জিনিস নিয়ে আসে। বেশ ফুরফুরে লাগছে তাাকে। এতদিন ব্রিস্টল ছিল।
কখন এলে? জানতে চাইলাম।
বোঝাগুলো নিনির হাতে দিতে দিতে বলল, এই মাত্র।
শ্যামস কোথায়?
রচনা আপুর সঙ্গে দেখা করতে গেছেন।
কল্পনার সঙ্গে দেখা হয়েছে?
না।
সে কোথায় জানো?
জানি না। যেখানে থাকুক ডাকলে চলে আসবে। সে আমার জন্য পাগল। জীবনও দিতে পারে। আমিও তার জন্য জীবন দিতে পারি।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এমন হওয়া উচিত।
ভাব্বা, কল্পনা একদম শেষ হয়ে গেছে। কী মেয়ে কী হয়ে গেল!
কী হয়েছে?
“কষ্ট লাগে খুব”, আনন্দের সঙ্গে অহংকার মেশানো হাসি দিয়ে তাহসিন বলল, “কল্পনা এখন পুরো আমার। ভাব্বা, সে এখন আমার ক্রীড়নক। হাসতে বললে হাসে, কাঁদতে বললে কাঁদে। আমার কথা ছাড়া টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করে না। এমন অনুগত স্ত্রী আর হয় না। শুধু কষ্ট নয়, মাঝে মাঝে বিরক্তও লাগে।”
সে তোমাকে ভালোবাসে। ভালোবাসায় সবাই এমন আচরণই করে। কিন্তু কল্পনা শেষ হয়ে গেছে— বলছ কেন? কারো প্রতি ভালোবাসা দেখানো মানে শেষ হয়ে যাওয় নয়। কেন বলছ— কষ্ট লাগে?
সাগরে যদি ঢেউ না থাকে, বাঘ যদি হুংকার না দেয়, ইগলে যদি নখর না থাকে, বোশেখে যদি কালবৈশাখী না আসে, শীতে যদি হাড় কাঁপুনি শীত না পড়ে, বর্ষায় যদি না প্লাবিত হয় পথ তাহলে কী স্যার ভালো লাগে? কল্পনা থাকবে উদ্দাম। সুনামির মতো ভয়ংকর। এখন সে স্যার আমার একান্ত অনুগত। সমুদ্রটা পুষ্করণী হয়ে গেছে।
তাহসিন, কল্পনার ভালোবাসাকে তুমি অবমূল্যায়ন করতে শুরু করেছ। তোমার চোখেমুখে ভালোবাসার অহংকার উপহাস রূপ ধারণ করে কল্পনা হয়ে আমার দিকে ছুটে আসছে। তোমার কপালে খারাবি আছে।
কেন স্যার?
কল্পনা তোমার স্ত্রী। সে তোমার অনুগত। এটা নিয়ে তোমার এমন বড়াই এবং অপমানজনক উক্তি যে কোনো সময় যে-কোনো বিকট অঘটন ঘটিয়ে দেবে।
এমন হবে না। সে আপনার মেয়ে। আপনার শিক্ষা পেয়ে বড়ো হয়েছে।
আমার মেয়ে বলেই বলছি, তোমার কপালে খারাবি আছে।
তাহসিন হেসে বলল, না, এমন হবে না।
এই হাসির জন্য তোমাকে কাঁদতে হবে। সুনামি চাইছ? সুনামি নয়, তোমাকে বিশ্ববিধ্বংসী ভূমিকম্পের কবলে পড়তে হবে। কল্পনাই হবে তোমার এ ভূমিকম্প।
কল্পনা আমার ভালোবাসায় বন্দি হয়ে গেছে। তার পুরো সত্তা এখন আমার কাছে নত। আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে না।
“কল্পনাকে বাঁধার মতো বন্ধন এখনো তৈরি হয়নি।”, আল্পনা বলল, “তুমি তাহসিন তার কাছে খড়কুটো। আস্ফালন করো না। যা বলেছ তা যদি সে শুনতে পায়, তখন বুঝবে কল্পনা কত ভয়ানক সুনামি।”
“ঠিক বলেছ”, আমি আল্পনাকে সায় দিয়ে বললাম, “তাকে বিশ বছর থেকে জানি।”
তাহসিন আমার কথা বিশ্বাস করল— এমন মনে হলো না। গুনগুন সুর ভেসে আসছে তাহসিনের গলা থেকে গানের কথা—
I’m glad when I’m makin’ love to you
I’m glad for the way you make me feel
I love it ’cause you seem to blow my mind every time.
আমি কিছু বললাম না।
শুধু শিউরে উঠলাম অন্তরের চোখে তাহসিনের ভবিষ্যৎ দেখে। কল্পনা কেমন মেয়ে তা আমার চেয়ে কেউ বেশি জানে না। একটা মাত্র ভুল করলে তাহসিনের জীবনকে দুর্বিষহ সংকটের নরক বানিয়ে ছাড়বে।
তাহসিন?
বলুন।
তোমার জিহ্বা উচ্ছ্বাসে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। খুব সাবধান। নইলে কল্পনাই তোমার জিহ্বা কেটে নেবে।
 
 

Language
error: Content is protected !!