সন্মিত্রা : এক মলাটে সন্মিত্রা: সন্মিত্রা সম্পূর্ণ উপন্যাস : প্রথম থেকে শেষ পর্ব

সন্মিত্রা: চতুস্ত্রিংশ (৩৪) পর্ব / ড. মোহাম্মদ আমীন

বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে বলাকা অফিস পার হওয়ার আগে রিং এল মোবাইলে। অপরিচিত নম্বর। তবু নিরাশ করলাম না। সাদরে নিলাম।
কে?
জামাল নজরুল ইসলাম। তুমি শামীম না?
কোন জামাল নজরুল ইসলাম?
তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ের- – -।
স্যার, আপনি! আপনি রিং করেছেন। আমার পরম সৌভাগ্য। বিশ্বাসই হচ্ছে না। স্যার, কেমন আছেন আপনি? কতদিন দেখি না!
আগামীকাল ঢাকা আসছি। সচিবালয় যেতে হবে। একটা জরুরি কাজ আছে। একটা গেটপাশ লাগবে। তুমি এখন কোথায়?
কিছুক্ষণ আগে ক্যামব্রিজ থেকে দেশে ফিরলাম। আপনার বন্ধু হকিং-এর সঙ্গে দেখা হয়েছে। খুব প্রশংসা করলেন আপনার।
তাঁর কি আমার কথা মনে আছে?
পরিষ্কার মনে আছে। এমনকি আপনার স্ত্রী এবং কন্যাদের নামও। আপনি স্যার কখন এবং কীসে আসবেন?
সাড়ে এগারোটার ট্রেনে।
গাড়ি পাঠিয়ে দেব। ড্রাইভারের নম্বরটা এসএমএস করে দিচ্ছি।
লাগবে না।
কেন?
বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে গাড়ি দেয়নি, তুমি কেন দেবে?
আমি তো স্যার বিশ্ববিদ্যালয় নই। আপনার ছাত্র।
আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন আছেন। রেলওয়ে স্টেশন থেকে সোজা টিচার্স গেস্টরুমে যাব। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে সচিবালয় আসব।
গাড়ি আপনার সঙ্গেই থাকবে।
সচিবালয়ের কাজটা সেরে আরও দুই-এক জায়গায় যেতে হবে। তখন নেব। চারটার দিকে পাঠালে হবে।
কথা বন্ধ করার পরও আমার শ্রবণযন্ত্র তৃপ্তিতে নাচছে। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী তিনি। উপমহাদেশের সরকারি কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ শামসুল ওলেমা খানবাহাদুর কামাল উদ্দিনের পৌত্র, খ্যাতিমান সাহিত্যিক আবু সয়ীদ আইয়ুবের ভাগ্নে এবং ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মামাতো ভাই।
পৃথিবীর কত বিখ্যাত লোক তাঁর ভক্ত। আবদুস সালাম, ওয়েনবার্গ, জোসেফসন, ফ্রিম্যান ডাইসন, রিচার্ড ফাইনম্যান, সুব্রহ্মনিয়াম চন্দ্রশেখর, অমর্ত্য সেন, অমিয় বাগচী, জয়ন্ত নারলিকর, জিম মার্লিস, স্টিভেন হকিং, রজার পেনরোজ, জ্যা অ্যান্দুজ, মার্টিন রিজ, লুইজ জনসন, হোয়েল, জন টেইলর, জ্যাজ ওয়ান প্রমুখ বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলামের নাম প্রশংসার সঙ্গে স্মরণ করেন।
বিদেশ থেকে এলে একদিন আমি রেস্ট করি। এবার করলাম না। বরং অন্যদিনের চেয়ে একটু আগে অফিসে চলে গেলাম। প্রথমে জামাল নজরুল ইসলাম স্যারের জন্য পাশ পাঠিয়ে দিলাম।
সচিব সাহেবের রুমে গিয়ে বললাম, আমার স্যার আসবেন।
কোন স্যার?
জামাল নজরুল ইসলাম।
তিনি আবার কে?
দ্যা আল্টিমেট ফেইট অব দি ইউনিভার্স গ্রন্থের লেখক।
এই প্রথম বইটার নাম শুনলাম, উপন্যাস না কি?
কষ্টের হাসিটা লজ্জার ছাইয়ে চাপা দিয়ে বললাম, স্টিভেন হকিং-এর নাম শুনেছেন?
আমার বাড়ির কাজের লোকও তাঁর নাম জানে। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী, ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম বইটির লেখক।
জামাল নজরুল ইসলাম হকিং-এর চেয়ে বড়ো বিজ্ঞানী। দুজন রুমমেট ছিলেন। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জীবিত জ্যোতির্বিজ্ঞানী।
সচিব সাহেব নাকে-মুখে অবজ্ঞা ডেকে বললেন, পাগলামি করার জায়গা পাও না। বাঙালি আবার কীভাবে হকিং-এর চেয়ে বড়ো বিজ্ঞানী হয়? কী আবিষ্কার করেছে সে?
হকিং কী আবিষ্কার করেছেন?
তুমি বেশি কথা বলো, আবিষ্কার না করলে কি এত বিখ্যাত হন? তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী, জ্যোতিষ্ক আবিষ্কার করেছেন। আমি ভাই জামাল নজরুল ইসলাম-টিসলাম চিনি না। এত বড়ো বিজ্ঞানী হলে অবশ্যই চিনতাম। এখন যাও, কাজ শেষ হলে তোমার স্যারকে সময় দিও। আমার এখানে আবার নিয়ে এসো না। অনেক মূল্যবান মানুষের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।
আপনি স্যার, এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম পড়েছেন?
বাসায় আছে।
পড়েছেন কি না?
এটা কী ধরনের প্রশ্ন করলে? কিনলে পড়তে হবে, থাকলে ভোগ করতে হবে— এমন নীচ মানসিকতা ছেড়ে দাও। বেস্ট সেলার বই ভিআইপি লোকের মতো।
ঠিক বলেছেন। বিক্রির সংখ্যা দিয়ে কোনো বই বেস্ট সেলার হয়, পঠন হিসেবে হয় না। বেস্ট সেলার বইগুলো প্রায় সবকটি খুব সাধারণ পাঠকের জন্য লেখা সাধারণ মানের বই। সাধারণ পাঠকের সংখ্যা বেশি। তাই সাধারণ বইগুলোই বেস্ট সেলার হয়। অনেকে আবার সাজিয়ে রাখার জন্যও এ ধরনের বই কেনে।
এখন যাও। আমার কাজ আছে।
মনটা খারাপ করে চলে এলাম। সরকারের একজন সচিব বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলামকে চেনেন না। চট্টগ্রামের না হলে হয়তো আমিও চিনতাম না। স্যার দশটার মধ্যে চলে আসার কথা। এগারোটা হয়ে গেল তবু আসছেন না।
রিং করলাম, স্যার, আপনি কোথায়?
সচিবালয় গেটে।
তাড়াতাড়ি চলে আসুন।
এসেছি অনেক আগে, কিন্তু ভিড়। লাইনের ফাঁদে আটকা পড়েছি। লাইন ছুটতে দেরি হবে।
পাশটা পেয়েছেন?
কয়েকবার বললাম। পাশটা দিচ্ছেন না।
কী বলে?
অপেক্ষা করতে বললেন।
আমি গেটে গিয়ে তাঁকে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। কয়েকজন সহকর্মীকে বললাম “আমি গেট থেকে জামাল নজরুল ইসলাম স্যারকে আনতে যাচ্ছি। তাঁকে স্বাগত জানাতে হবে। আমার রুমে গিয়ে বোসো।”
গেটে এসে যা দেখলাম, তা আমার পুরো শরীর লজ্জা আর ক্ষোভে অবশ করে দিল। জামাল নজরুল ইসলাম অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। মনে হলো একজন নিষ্পাপ এতিম শিশু বিস্ময় চোখে চারদিকের বিষময় কাণ্ড দেখে হতভম্ব হয়ে গেছে লজ্জা আর ঘৃণায়।
ব্যাপার কী? প্রশ্ন করলাম নিরাপত্তা কর্মীকে।
নিরাপত্তা কর্মী বলল, শুটিং হবে সচিবালয়ে। তাই কয়েকজন অভিনেতা-অভিনেত্রী এসেছেন। তাদের পাশ দেওয়ার জন্য বাকিদের দেরি হচ্ছে।
আমি ক্ষুব্ধ হয়ে বললাম, কয়েকজন অভিনেতার জন্য বিশ্বখ্যাত একজন বিজ্ঞানীকে কতক্ষণ দাঁড় করিয়ে রেখেছেন আপনারা?
নিরাপত্তাকর্মী বললেন, তিনি কে?
জামাল নজরুল ইসলাম, বলেই স্যারকে দেখিয়ে বললাম।
আমরা তাঁকে চিনি না।
স্যারকে বললাম, আমার গাড়ি নিয়ে এলে এমন অপমান হতে হতো না।
শামীম, বাংলাদেশে এর চেয়েও অপমানজনক অভিজ্ঞতা আমার আছে।
কী?
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একটা সভায় আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। সম্ভবত ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে। ভাবলাম, গুরুত্বপূর্ণ কিছু এবং অবশ্যই অতি বিশেষায়িত কিছু হবে। অনেক কাজ রেখে চলে এলাম ঢাকায়। ট্রেনের ইঞ্জিন নষ্ট হওয়ায় সভায় পৌঁছতে কিছু দেরি হয়ে গেল। আমি ঢোকার কয়েক মিনিট আগে সভা শুরু হয়ে গেছে। সভাকক্ষে ঢুকলাম। কেউ আমাকে চিনল না। পিছনের দ্বিতীয় সারিতে কয়েকটা চেয়ার খালি আছে। একটায় গিয়ে বসে পড়লাম। একসময় সভা শেষ হলো। সভার উপস্থিতি খাতায় স্বাক্ষর ছাড়া আর কিছুই আমাকে করতে হলো না। আমাকে দাওয়াত দিলেও এসেছি কি না তাও জানার কোনো আগ্রহ কারও দেখলাম না। কেন এত কষ্ট করে আমাকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ডেকে আনা হলো এবং কেনই বা আমি এলাম, কিছুই মাথায় ঢুকল না।
আপনাকে কেউ চিনল না?
সভা শেষে বেরিয়ে আসার সময় রঞ্জিত নামের এক অফিসার আমাকে চিনতে পারলেন। বাড়ি রাঙ্গুনিয়া। সালাম দিয়ে পরিচয় দিলেন যুগ্মসচিব। দুঃখ প্রকাশ করলেন, এমন হওয়ার জন্য।
জামাল স্যারকে নিয়ে আমার রুমে ঢুকে দেখি অফিস সহায়ক সোহরাব এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা সুদীপ ছাড়া কেউ নেই। তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য আমার কোনো সহকর্মী আসেনি। হয়তো আসবে, কিন্তু ডাকলাম না। ভেবেছিলাম, সচিব সাহেব তাঁকে দাওয়াত দিয়ে সম্মান জানাবেন, কিছুই হলো না। মনটা ছোটো হয়ে গেল। প্রশাসন মানে প্রহৃত শাসন। এর একটা মোক্ষম জবাব দিতে হবে।
পরদিন অফিসে গিয়ে অফিস সহায়ককে বললাম, অভিনেতা রাজ্জাক আসবেন আমার রুমে। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় আছে, এটি অনেকে জানেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ছড়িয়ে পড়ল কথাটা। সবাই আমার রুমে এসে উঁকি দিচ্ছে। যে ব্যাচমেটগণ আমার অনুরোধ সত্ত্বেও জামাল নজরুল ইসলামকে স্বাগত জানাতে আসেনি তারাও বারবার জানতে চাইছে কখন আসবেন নায়ক রাজ্জাক। একটু পর সচিব সাহেব সালাম পাঠালেন। রুমে ঢুকতেই জানতে চাইলেন, রাজ্জাক সাহেব কখন আসবেন?
কেন স্যার?
তিনি আসামাত্র আমার রুমে নিয়ে আসবে।
আপনার যে অনেক প্রোগ্রাম?
সব প্রোগ্রাম ক্যান্সেল করে দিয়েছি। তিনি কখন আসবেন?
জানি না।
তুমি-না বললে, এগারোটায় তোমার রুমে আসবেন? এগারোটা তো বেজেই গেল।
একজন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আর একজন অভিনেতা— আপনাদের কাছে কে কীভাবে বিচার্য তা দেখার জন্য মিথ্যা বলেছি। যদি রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে চান, তো কখন দাওয়াত দেব বলেন।
কাজটা ভালো করনি, তোমার এসিআর কিন্তু আমার হাতে।
জানি।
আর কী জান?
কয়েক বাক্যে বাঙালির চরিত্রকথা—আপন ভাই মহাশয়, এই জ্বালা কী প্রাণে সয়?
আর কী জান?
পড়শির ছেলে করল পাশ, আমার এখন সর্বনাশ।
 

Language
error: Content is protected !!