সন্মিত্রা : এক মলাটে সন্মিত্রা: সন্মিত্রা সম্পূর্ণ উপন্যাস : প্রথম থেকে শেষ পর্ব

সন্মিত্রা: চতুশ্চত্বারিংশ (৪৪) পর্ব / ড. মোহাম্মদ আমীন

স্যার, আমার খিদে পেয়েছে।
খিদে পাওয়ার কথা। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত পেটে কিছু পড়েনি। পড়ার সুযোগ নেই। দু-একটা রেস্টুরেন্টে খাওয়ার জন্য ঢুকেছিল পছন্দ হয়নি তার। তার মতে, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার সড়কের পাশে খাওয়ার মতো কোনো রেস্টুরেন্ট নেই। রচনারও একই অভিমত।
“রেডি হয়ে নাও”, প্রমিতার খিদের কথা না শোনার ভান করে বললাম, “বের হব। শীঘ্রি জামাকাপড় পালটে এস।”
আনন্দে লাফ দিয়ে উঠল প্রমিতা। কোথাও যেতে বললে খুশি তার উদ্‌বেল হয়ে যায়। আপাদমস্তক ভ্রামণিকা। একদম কল্পনার মতো। মোবাইলে চোখ দিলাম। দশটা বাজতে এখনও দশ মিনিট বাকি।
স্যার, আমরা কি খেয়ে বের হব?
না।
আমার যে খিদে পেয়েছে।
তুমি রেডি হয়ে নাও। আবার তার খিদের কথাটি উপেক্ষা করলাম।
ম্যাম যাবেন না?
“তুমি যাও”, বচনা বলল, “আমার যাওয়া চলবে না।”
কেন ম্যাম?
গেলে বুঝতে পারবে। এলে জানতে পারবে। সবখানে সবার যাওয়া উচিত নয়।
কিন্তু, না-খেয়ে বের হলে খাব কোথায়?
“আগে রেডি হয়ে নাও”, রচনা বলল, “তারপর দেখা যাবে। সবুজ জামাটা পরো।”
কয়েক মিনিটের মধ্যে সোজগোজ করে সাজরুম থেকে বের হয়ে এলো প্রমিতা। ঊর্ধ্বাংশে ঝাউ রঙের সবুজ গাগড়াজাতীয় জামা। মনে হলো ঝাউয়ের চিকন পাতায় বানানো। সব পাতা সবুজ কবিতা হয়ে প্রমিতায় ভিড় করেছে। কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ। চুলগুলো ছুটে যেতে চাইছে বেয়াড়া মেয়ের মতো। পারছে না। শিশুদের বেঁধে রাখা চড়ুই পাখির মতো কেবল ছটফট করছে। দশটা সাত মিনিটে ফাইভ স্টার হোটেলের বিলাসবহুল কক্ষ থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠলাম। রচনা আমাদের গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিল।
ড্রাইভার জানে কোথায় যেতে হবে।
ফাল্গুন মাস। আকাশে ভরা পূর্ণিমার রুটিগোল যুবতি-চাঁদ। বাতাসের জোছনায় চারদিক ফকফক করছে। কানে ভেসে আসছে সমুদ্রের গর্জন। চাঁদ আর জোছনার অশালীন বাড়াবাড়ি। মনে হলো দুটোই নতুন প্রেমেগ্রস্ত যুবকযুবতির মতো পরস্পরে ফেটে পড়বে। প্রমিতার ঝাউশরীরের কৃষ্ণ মাথায় অমাবস্যার ঘোর। কত সুন্দর হয় কালো! কেমন লাগছে প্রশ্ন করতে গিয়েও থেমে গেলাম। এসময় চুপ থাকা ভালো। জানালার কাচ খুলে দিয়ে প্রমিতা আমার দিকে তাকাল। এক ডুব ফুরফুরে বাতাস নিবিড় পরশে আনমনা করে দিল। প্রমিতা গুনগুন গেয়ে ওঠে অবাক সুরে বিরল দরদে—
“ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান
তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান
আমার আপনহারা প্রাণ আমার আমার বাঁধন-ছেঁড়া প্রাণ
তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান- – -”
তার গান শিউরে দিল আমাকে। ঝাউয়ের বনে চাঁদের আলোর সবুজ নাচন গাড়ির গতিকে যেন প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। ড্রাইভার ছাড় দেওয়ার পাত্র নয়। তার গাড়ি ঝাউবনের পাশ দিয়ে জোছনার শরীর ভেদ করে এগিয়ে যাচ্ছে সাঁওতাল বালিকার মতো কোমল কালো মমতায়। প্রমিতার গানের সুরে প্রকৃতির পূর্ণিমা, মনের পূর্ণিমার সঙ্গে মিতালী গেড়ে নিল। ঝাউবন তার কণ্ঠে লোভাতুর হয়ে যেন গাড়ির পেছনে পেছনে ছুটে আসছে। রোমাঞ্চ আর অজানা আনন্দে প্রমিতা ফুরফুরে হয়ে উঠল। গানে গানে অনেক বারের চেষ্টায় ঝুঁকেপড়া একটা ঝাউপাতা ছিঁড়ে নিল। ছেঁড়াপাতা মুখ দিয়ে সুর দিল পাতায়:
“তোমার অশোকে কিংশুকে
অলক্ষ্য রং লাগল আমার অকারণের সুখে
তোমার ঝাউয়ের দোলে
মর্মরিয়া ওঠে আমার দুঃখ রাতের গান।
গান তার থামছে না। এত মনোহর পরিবেশে গান থামা মানে প্রাণ থামা। প্রমিতা অত বোকা নয়। প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করার বুদ্ধি আর সাহস তার আছে। রচনার প্রতিটি আচরণ রপ্ত করে নিয়েছে কল্পনার মতো অবলীলায়।
স্যার, আমার কোথায় যাচ্ছি? গানের ফাঁকে প্রমিতা বলল।
খিদে পেয়েছে?
এত সুন্দর পরিবেশে আমার পেট খাওয়ার কথা ভুলে যায়। জিহ্বা ভুলে গেছে স্বাদের কথা। দেখুন-না স্যার চারদিকে জীবনের কী উলঙ্গ আস্ফালন, মহাদেবের তাণ্ডব নৃত্য। গাড়ি চলতে থাকুক। চলতেই যেন থাকে। সারা রাত ছুটব। ড্রাইভার, গাড়ি চলবে।
কিন্তু গাড়ি ঘণ্টা-খানেকের বেশি চলল না। থেমে গেল। সামনে একটা আধপাকা ঘর। পূর্বে পুকুর, পশ্চিমে বাঁশঝাঁড় আর গাছপালা, উত্তরে টিলা, দক্ষিণ দিকটা পুরো খোলামেলা এবং খালি। যার অদূরে এক পাশ দিয়ে চলে গেছে রাস্তা। মনে পড়ে গেল বিখ্যাত সেই ডাকের বচন: পূবে হাঁস, পশ্চিমে বাঁশ/ উত্তরে কেলা, দক্ষিণে মেলা।” অদ্ভুত অবিকল। ডাক বুঝি নিজেই এসে তাঁর বচন শর্ত পুরোপুরি পালন কর গেছেন এই বাসায়। হোসেন ড্রাইভার যেন ডাকের মামাতো ভাই।
ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে মিষ্টির প্যাকেটগুলো নামিয়ে নিল। আমি ঘরের দরজায় টোকা দিলাম। বের হয়ে এল হোসেন। বয়স চল্লিশের বেশি এবং পঞ্চাশের কম। আমাকে দেখে চিৎকার দিলেন, তোঁয়ারা চাই যও হন আইস্যে। ওবা ঘর, তাড়াতাড়ি বাইর অঁও।
ঘরের সবাই বের হয়ে আমার পায়ে হাত দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে শুরু করল। প্রমিতাও ওদের অনুসরণ করল। কবি হলে বলত—“শ্রদ্ধা, শ্রদ্ধা টানে গানে টানে সুর; অহং, হীন টানে ভালো করে দূর।” ছোটোদের কয়েকজন প্রমিতাকেও পায়ে ধরে শ্রদ্ধা জানাল। অভিভূত প্রমিতা অবাক চোখে জোছনা-সবুজের দিকে তাকিয়ে বলল, আমরা কোথায় এলাম; স্যার?
“পাহাড় আর শহরের মিলনবিধুর কোরকে।”, আমি বললাম, “যেখানে দিন তোমার অহংকারকে, জোছনা তোমার লোভকে, সবুজ তোমার পছন্দকে চুষে নিয়ে তোমাকে সুখের তাবিজ বানিয়ে দেবে গলার।”
জায়গাটির নাম কী?
ফাসিয়াখালী, চকরিয়া উপজেলার ইউনিয়ন। এটা হোসেন ড্রাইভারের বাড়ি।
খুব সুন্দর বাড়ি।
“এই যে তিনি”, হোসেনকে দেখিয়ে আমি বললাম, “হোসেন ড্রাইভার। পাশের জন্য তার বউ। বাকিরা ছেলেমেয়ে। রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন হোসেন আমার গাড়ির চালক ছিলেন। খুবই সাহসী এবং বিশ্বস্ত।”
আমার চেয়ে বেশি বিশ্বস্ত্ব ? প্রমিতা খুশি মনে একটু কষ্ট নিয়ে উত্তরের প্রত্যাশা না করে প্রশ্ন করল।
প্রত্যেকে অদ্বিতীয়। উদাহরণ কেবল অব্যক্তকে কিছু ব্যক্ত করার জন্য উপমা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চাঁদ কি সত্যি সত্যি মুখের মতো হয়?
এখানে কেন এসেছি স্যার?
উত্তর দেওয়ার জন্য।
কীসের উত্তর?
তোমার প্রশ্নের উত্তর।
ম্যাম, যে এলেন না?
তুমি বর্তমান অবস্থায় মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কাকে বেশি ভয় কর?
ম্যামকে।
সে এলে তুমি কি স্বাভাবিক থাকতে পারতে?
হোসেনের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার। তিন ছেলে চার মেয়ে। বাবা নেই, মা জীবিত। ছোটো পাহাড়ের উপরে হোসেনের আধপাকা ঘর। চারটা ছোটো ছোটো রুম। রান্নাঘর বাইরে। হোসেন আমাদের হাতে-চাঁদ-পাওয়া আনন্দে ড্রয়িংরুমে নিয়ে গেল। এমনভাবে নিয়ে গেল যেন, আমাদের চেয়ে মূল্যবান ব্যক্তি পৃথিবীতে আর নেই। প্রমিতার মতো আমারও খিদে পেয়েছে। তাড়াতাড়ি খাবার দিতে বললাম। সব প্রস্তুত প্রস্তুত ছিল। শহুরে বাসার মতো ডাইনিংরুম ও ডাইনিংটেবিল নেই। মেঝেতে বিছানো পাটিতে বসে গেলাম খেতে।
ছোটো মাছ, ডাল, ভর্তা, শুঁটকি, সালাদ আর চিকন চালের গরম ভাত। যেমনটি বলেছি— তেমনই করেছে হোসেন। খাচ্ছিলাম আর প্রমিতার দিকে তাকাচ্ছিলাম। সে বেশ ক্ষুধার্ত ছিল। বুঝতে চেষ্টা করছিলাম তার মনোভাব। সহস্র কোটি টাকার মালিকের মেয়ের মনটা পরিষ্কার পড়া যাচ্ছিল। সে গোগ্রাসে গিলছে। মনে হয় জন্মাবধি খায়নি। প্রতি গ্রাসে যেন রাশি রাশি হাসি আর ভূরি ভূরি আনন্দ বঙ্গোপসাগরের বুদ্বুদের মতো উথলে উঠছে।
কেমন লাগছে? জানতে চাইলাম।
এমন স্বাদ যে পৃথিবীতে আছে, জানতাম না।
হোসেন হাসিতে পুলকিত হয়ে বলল, ফ্যান দেব দিদি?
ফ্যান আছে কিন্তু বন্ধ। ফ্যানের প্রয়োজনীয়তা আমার অনুভূত হচ্ছিল না।টিনের ছাদের নিচে বেড়া। চারদিকে ইটের দেওয়াল, তারপর জঙ্গল এবং সবুজ। এমন পরিবেশে থাকতে অভ্যস্ত নয় প্রমিতা। শিল্পপতির মেয়ে। তার গরম লাগতে পারে।
ফ্যান দিতে হবে?
না।
লজ্জা করো না।
কিছু বলল না প্রমিতা। হাসি দিয়ে জানালার দিকে তাকাল। হু হু করে বাতাস আসছে বন থেকে। বাতাস নয় যেন, জোছনা আপুর ছুড়ে দেওয়া মায়া-চুমো। আবেগ ভরা গলায় প্রমিতা বলল, স্যার, কেন ফাইভ স্টার হোটেলে উঠেছি।
কোথায় উঠতে তাহলে?
এ তো ফাইভ স্টার হোটেলের চেয়ে অনেক বিলাসবহুল আর শান্তিময়।
আমাদের কথোপকথন শুনে হোসেন আর তার বউ খুশিতে ডগমগ। এমন নির্ভেজাল হাসি কদাচিৎ দেখা যায়। হোসেন বলল, দিদি আমাদের গরিবখানা আপনার ভালো লাইগচে শুইনা খুশিতে মনটা ভইরা গেছে।
স্টিলের গ্লাসের পানি মুখের কাছে নিতে নিতে প্রমিতা বলল, যার সুযোগ যত বেশি, তার তৃপ্তি তত কঠিন হয়ে যায়। স্যার, আজ আপনার কথাটার প্রমাণ পেয়ে গেলাম। শান্তি কী জানতে চেয়েছিলাম, উত্তর পেয়ে গেছি। স্যার, এক মুঠো গরম ভাতই তো শান্তিকে মনেপ্রাণে জড়িয়ে নিতে যথেষ্ট। কেন আমরা এত পাওয়ার জন্য হাঙ্গর হয়ে উঠি?
কারণ, অধিকাংশ মানুষই অমানুষ। তার অন্তরে সবসময় হিংস্রতা বিরাজ করে। এই হিংস্রতার ব্যাপক নাম লোভ।
স্যার.
বলো।
প্রমিতা হাত ধুতে ধুতে বলল—
পূর্ণিমা সন্ধ্যায় তোমার রজনীগন্ধায়
রূপসাগরের পারের পানে উদাসী মন ধায়।
তোমার প্রজাপতির পাখা
আমার আকাশ চাওয়া মুগ্ধ চোখের রঙিন স্বপন-মাখা
তোমার চাঁদের আলোয় মিলায় আমার
দুঃখ-সুখের সকল অবসান।”

Language
error: Content is protected !!