সন্মিত্রা : এক মলাটে সন্মিত্রা: সন্মিত্রা সম্পূর্ণ উপন্যাস : প্রথম থেকে শেষ পর্ব

সন্মিত্রা: পঞ্চপঞ্চাশত্তম (৫৫) পর্ব / ড. মোহাম্মদ আমীন

সর্দিটা লেগেই গেল। গরম থেকে হঠাৎ ঠান্ডায় এলে আমার এমন সর্দি হয়। জ্বরও উঠছে। রচনা আমাকে লেপ দিয়ে ঢেকে শরীর দিয়ে উষ্ণ রাখার চেষ্টা করছে। এটি তার পুরানো কৌশল। বৎশিবাকে খবর দেওয়া হলো। সে এলো ওষুধ নিয়ে। সঙ্গে এক বোতল ওয়াইন। নাম দেখলাম তেজ।
এখন তেজ খাওয়া কি ঠিক হবে? রচনা প্রশ্ন করল।
বৎসিবা বললেন, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ওয়াইন। একবার এক মহাভোজ সভায় অতিথিদের মদ ফুরিয়ে যায়। সেই ভোজসভায় ঈশ^রপুত্র যিশুও উপস্থিত ছিলেন। আমন্ত্রক ভীষণ লজ্জায় পড়ে যিশুর শরণাপন্ন হলেন। তখন যিশু তাঁর পিতার স্বর্গ হতে বিশ ড্রাম ওয়াইন এনে দিয়েছিলেন। অতিথিগণ ইচ্ছেমতো পান করেছিলেন। এটি সেই ওয়াইন। খুব ভালো। মধু এবং শ্রাব গুল্ম দিয়ে তৈরি।
আমি বললাম, সচিব সাহেব আসার কথা। তার কোনো খবর পাওয়া গেল?
না।
তিনি তো পরশু রওনা দিয়েছেন। গতকাল ল্যান্ড করার কথা। কী হলো তাহলে?
বৎসিবা বললেন, হয়তো অন্য কাজে অন্য দেশে গেছেন।
পরদিন ভোরে খবর পাওয়া গেল তিনি যথাসময়ে এসেছেন। এখন হাসপাতালে। বৎশিবাকে নিয়ে হাসপাতাল গেলাম। সচিব সাহেব হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন। জ্বর ওঠেছে ভীষণ। ঠান্ডায় শরীর কালো হয়ে গেছে সচিব সাহেবের।
তিনি আমাকে দেখে বললেন, এতক্ষণ পরে এলে?
কী হয়েছে আপনার?
বিমানবন্দর থেকে বের হলাম। কেউ আমার অপেক্ষায় ছিল না।
আপনি তো অসময়ে চলে এসেছেন। আসার কথা গতকাল, এসে গেছেন পরশু।
বৃষ্টি হচ্ছিল টিপটিপ। লোকজনও তেমন নেই। আমাকে কেউ নিতেও আসছে না। অপেক্ষা করতে করতে রাত হয়ে গেল। বাইরে এসে দেখি রাস্তা ফাঁকা। আমি হাঁটতে হাঁটতে এমন এক জায়গায় গিয়ে পৌঁছলাম, যেখানে বিদ্যুতের আলোও ভালোভাবে পড়ছিল না। কী করব ভাবতে পারছিলাম না। এসময় এক লোক দেখলাম। আমি তার সাহায্য চাইলাম। তিনি বললেন, একজন বড়ো অফিসারের জন্য অপেক্ষা করছেন।
আমি বললাম, আমিই সেই বড়ো অফিসার। আমার নাম বলাতেই লোকটি উদ্গ্রীব হয়ে বললেন, আপনাকে নেওয়ার জন্যই আমাকে পাঠানো হয়েছে।
এরপর কী হলো? আমি জানতে চাইলাম।
কয়েক মিনিট পর একটি গাড়ি এল। গাড়িতে উঠলাম, লাগেজ তুললাম। আরও তিন জন লোক ছিল গাড়িতে। কিছুদূর যাওয়ার পর লোকগুলো আমার সব জিনিস এমনকি জামা-প্যান্ট পর্যন্ত খুলে আমাকে বৃষ্টির মধ্যে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। ঠান্ডায় আমি রাস্তার মাঝে গুটিশুটি হয়ে বসে পড়ি। কিছুক্ষণ পর নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন এসে আমাকে হাসপাতাল নিয়ে এলো।
পাসপোর্ট কোথায়?
নিয়ে গেছে।
ইথিওপিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাস নেই। সাউথ আফ্রিকা থেকে অস্থায়ী পাসপোর্টের ব্যবস্থা করতে হবে।
আমি বললাম, এভাবে আসা উচিত হয়নি।
আমি যদি ওইদিন না আসতাম তাহলে মন্ত্রী মহোদয় আসতে দিতেন না। এজন্য আগেভাগে চলে এসেছি। এখন দেখছি না এলেই ভালো হতো। এখন কী হবে? মন্ত্রী মহোদয় জানলে লজ্জার সীমা থাকবে না।
কিচ্ছু হবে না। আপনি রেস্ট করুন। যা প্রয়োজন আমি করব। অনি আছে। তিনি ক্যাপটাউন থাকেন। আপনার ছবি এবং পাসপোর্ট নম্বরটা দিন।
কিছুই নেই, ওরা সব নিয়ে গেছে। ই-মেইল থেকে নিতে হবে। কিন্তু দস্যুরা আমার ল্যাপটপও নিয়ে গেছে।
আমার ল্যাপটপটা দিয়ে বললাম, এখান থেকে বের করে দিন।
সচিব সাহেব ল্যাপটপ থেকে তার আইডি বের করতে করতে বললেন, তুমি এই হোটেলে চলে এসো।
আমি তো আসতে পারব না।
কেন?
আমার সঙ্গে আমার মেয়ে আছে। তারা আর এক হোটেলে উঠেছে।
তোমার মেয়ে কী করে?
অক্সফোর্ডের অধ্যাপক।
যা শুনেছি, তা তো ঠিক ।
কী শুনেছেনে?
ও তোমার কী ধরনের মেয়ে?
এত প্রশ্ন করছেন কেন? আমার মেয়ে, মানে ডটার। কারও ব্যক্তিগত বিষয়ে এত প্রশ্ন করা উচিত নয়, বলে আমি চলে এলাম।
সন্ধ্যায় সচিব সাহেব রিং করলেন।
রচনা রিসিভার তুলল, কে?
ওই প্রান্তে কী কথা হলো শুনতে পেলাম না। রচনা আমাকে রিসিভার দিয়ে বললেন, সচিব সাহেব।
তিনি আমাকে বললেন, সরি আমার ভুল হয়ে গেছে। তুমি রাগ করোনি তো?
আপনি হলে কী করতেন?
রাগ করতাম। তুমি আমার পাসপোর্টের কী করেছ?
কাল চলে আসবে। টাকাপয়সা লাগবে?
আমার পকেট শূন্য।
কত লাগবে?
এক হাজার ডলার দিলে হবে।
আমার নেই। তবে আমার মেয়ের আছে। তার টাকা নেবেন তো?
তুমি আমার ওপর রেগে আছ।
আমি একহাজার ডলার পাঠিয়ে দিচ্ছি, বলেই রিসিভিার রেখে দিলাম।
রচনা বলল, বাংলাদেশের অধিকাংশ অফিসার নীচ মনের।
তোমাকে কী বলেছে?
আমার বাবার নাম জানতে চাইলেন, আপনার নাম বলেছি। যদি জন্মদাতার নাম জানতে চাইতেন, তাহলেও আপনার নাম বলতাম। বাঙালি মুসলিমরা এমন কেন স্যার? তারা এত হীনম্মন্যতায় ভোগে কেন?
বৎশিবা বললেন, আমাদের দেশের মুসলিমরাও এমন। এদের ধারণ ক্ষমতা খুব কম, অত্যন্ত সংকীর্ণ। সবকিছুতে ধর্ম টেনে আনে। এবং তাদের ধর্ম এত দুর্বল যে, সহজে আহত হয়। খুব সামান্য কারণে বিপন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ভোগে।
রচনা বলল, কিছু কিছু মানুষ চিংড়ির মতো, এরা মাছ নয় পোকা। এদের মেরুদণ্ড নেই। মাথা মগজ থাকে না, থাকে মল। এদেও মগজ থাকে লেজে। সচিবের মতো দাম সবসময় বেশি। কারণ কেনা গেলে এদের খুব সহজে কোনরূপ কসরৎ ছাড়া চিংড়ির মতো খেয়ে ফেলা যায়। যে-কোনো কাজে লাগিয়ে দেওয়া যায়। এরা জিহ্বার মতো নরম, কিন্তু অসভ্য। আদর্শ রূপ না-থাকলেও চুমো, চর্ব্য লেহ্য সবকাজে পারদর্শী।

Language
error: Content is protected !!