সন্মিত্রা : এক মলাটে সন্মিত্রা: সন্মিত্রা সম্পূর্ণ উপন্যাস : প্রথম থেকে শেষ পর্ব

সন্মিত্রা:  ষষ্ঠ পর্ব / ড. মোহাম্মদ আমীন

 
পুলিশ কমিশনার চেয়ার ছেড়ে রচনার দিকে তাকিয়ে খাস বাঙালি কায়দায় আমাদের অভিবাদন জানিয়ে বললেন, নমস্কার। আপনাদের প্রতীক্ষায় ছিলাম।
লম্বা-চওড়া এবং চ্যাপ্টা চেহারার লোকটার মুখে ব্যক্তিত্বের ছড়াছড়ি। তবে চোখ থেকে বিচ্ছুরিত পৌলিশিক অহংকার ব্যক্তিত্বকে কলঙ্কের মতো বিরক্তিকর কিছু আবর্জনায় ঢেকে রেখেছে। উপমহাদেশের অধিকাংশ পুলিশ অফিসারের মধ্যে এমন ভাব দেখা যায়। মনে হয়, পুলিশ হওয়া মানে সবার মনিব হওয়ার অধিকার অর্জন। তাই এখানকার পুলিশকে মানুষ এখনো বন্ধু বলে মেনে নিতে পারেনি, যতই তারা দাবি করুক— পুলিশ জনগণের বন্ধু। তোমরা যদি বন্ধুই হও জনগণই বলবে— “পুলিশ আমাদের বন্ধু।” একতরফা প্রেমিকের মতো আগ বাড়িয়ে তোমাদের কেন বলতে হবে?
কমিশনার সাহেবের নমস্কারের প্রত্যুত্তর দিয়ে রচনা বলল, কেমন আছেন?
প্লিজ, ম্যাম; বসুন।
প্রবোধ চন্দ্র রায় সংক্ষেপে পিসি রায় বেঙ্গল কেমিক্যালস-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং মার্কারি ও নাইট্রেটের আবিষ্কারক আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের আত্মীয়। কাঁধে ক্যামেরা, মাথায় বাবরি চুলের ঢেউ। পূর্বপুরুষের জন্মভূমি বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বেশ টান। হাসি তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। প্রতিটি শব্দ সতেজ কমলার মতো নির্বিবাদে গুনে গুনে নেওয়া যায়।
কলকাতায় আপনাকে স্বাগত, কমিশনার বললেন।
“ধন্যবাদ। আমরা আগামীকাল বস্তিতে যাব”, রচনা বলল,“সঙ্গে ব্রিটিশ কাউন্সিল এবং ভারতের লন্ডন হাইকমিশনের কয়েকজন কমকর্তাও যাবেন।”
“জানি, ম্যাম’’ কমিশনার বললেন, “দিল্লি থেকে আপনার বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। আপনাকে কাঙ্ক্ষিত সকল সহায়তা প্রদানের নির্দেশ আছে।”
আর কী জানেন? প্রবোধ উপহাস মেখে বললেন।
বস্তির সর্দার অমল আপনাদের জন্য তিনটা রুম ঠিক করে রেখেছে। অমল সাংঘাতিক লোক, ভয়ংকর সন্ত্রাসী। ছয়টা খুনের আসামি, শতাধিক লোককে পঙ্গু করে দিয়েছে। জানেন তো?
“জানি”, প্রবোধ বললেন, “আমাদের কাজে অমন সাংঘাতিক লোকই প্রয়োজন। সুঁই ছাড়া কি কাঁটা তোলা যায়? আপনারাও তার সাহায্যে বস্তি নিয়ন্ত্রণ করেন। আবার কাজ ফুরিয়ে গেলে ক্রসফায়ারের নামে খুন করেন। পুলিশ তাদের আশি ভাগ কাজ সন্ত্রাসীদের দিয়ে করিয়ে নেয়, অথচ সুবিধা নেয় একা।”
তা অবশ্য ঠিক, কমিশনার অনিচ্ছাসত্ত্বেও সায় দিলেন সাংবাদিক প্রবোধের কথায়।
আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কী হাল?
রচনা ম্যামের চিঠি সেন্ট্রাল হোম মিনিস্ট্রি হয়ে বিদ্যুৎ গতিতে রাজ্যে চলে এসেছে। দুদিনও লাগেনি। এটাকেই বলে ক্ষমতা। আমাদের হোম মিনিস্ট্রি কখন যে এত তৎপর হয়ে উঠল জানি না। প্রত্যেক কাজ যদি এমন তৎপরতার সঙ্গে হতো, তাহলে ভারত আসলেই রামরাজ্য হয়ে যেত।
“ভাবার কিছু নেই।”, প্রবোধ বললেন, “আমাদের প্রাক্তন প্রভু ব্রিটিশ নাগরিকের চিঠি। গুরুত্ব না দিয়ে উপায় নেই।”
“আগামীকাল সকাল দশটায় বস্তিতে যাব”, রচনা বলল, “তিন দিন থাকব। অমলও থাকবেন। তিনিই আমাদের অস্থায়ী নিবাস ঠিক করে দিয়েছেন। ছয় খুনের মামলার আসামির যোগ্যতা আছে বটে।”
আপনার নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ বরাদ্দ করা হয়েছে। সকাল নয়টায় তারা বস্তিতে চলে যাবে। আপনার অস্থায়ী গৃহটি একদল পুলিশ অফিসার দেখে এসেছে। বেশ নিরাপদ বলে রিপোর্ট দিয়েছে। পোশাকি ছাড়াও আপনার কাজের সময় ছদ্মবেশে আশেপাশে থাকবে। দুজন মহিলা কন্সটেবল আপনি যতদিন আছেন ততদিন বডিগার্ড হিসেবে রাখতে পারবেন।
“বডিগার্ড লাগবে না”, রচনা বলল, “আমি রাজনীতিবিদ নই। ধনীও নই। বস্তির বাইরে কাউকে দানও করব না। দান করলে শত্রু হয়। দান করার যোগ্যতা অর্জিত হলে শত্রুতা সৃষ্টির কারণ ঘটে। পৃথিবীর কয়েকটি জননিন্দিত কাজের একটি হচ্ছে দান।
মানে? পুলিশ কমিশনার বললেন।
দান সবসময় সীমিত। তাই দান করতে গেলে অধিকাংশই বঞ্চিত থেকে যায়। বঞ্চনা থেকে শুরু হয় নিন্দা আর শত্রুতা। এজন্য ক্ষমতাসীন দল পরবর্তী নির্বাচনে সাধারণত জনপ্রিয়তা বিবেচনায় বিরোধী দলের চেয়ে পিছিয়ে থাকে। আপনি এখন দশ জনকে দান করার ঘোষণা দিয়ে রাস্তায় যান দশ হাজার লোক মুহূর্তে জমা হয়ে আপনাকে ঘিরে ধরবে। যে দশ জনকে দেবেন তারা খুশি হবে, বাকি নয় হাজার নয়শ নব্বই জন থেকে যাবে বঞ্চিত। এরাই হয়ে যাবে শত্রু। বন্ধু পাচ্ছেন কেবল দশ জন।
পুলিশ কমিশনারের কার্যালয় থেকে বের হয়ে ব্রিটিশ কাউন্সিলের গাড়ি চড়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওয়ানা দিলাম। এগারো সিটের মাইক্রোবাস। প্রবোধ রায়ও তার গাড়ি ছেড়ে আমাদের গাড়িতে উঠলেন। অল্পপথ, রাস্তা পরিষ্কার থাকলে দশ-এগারো মিনিটই যথেষ্ট।
ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ঢোকার একটু আগে প্রবোধ ফোন করে উপাচার্য এবং রেজিস্ট্রারকে রচনার আগমন সংবাদ জানিয়ে দিলেন। গিয়ে দেখি— উভয়ে বারান্দায় রচনাকে স্বাগত জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে।
উপাচার্য ও রেজিস্ট্রার ফুলের তোড়া তুলে দিয়ে আমাদের স্বাগত জানালেন। রচনা তাদের হাতে তুলে দিলেন অক্সফোর্ড স্মারক।
রচনা ও প্রবোধ দুজনেই উপাচার্য আর রেজিস্ট্রারের পূর্বপরিচিত। প্রবোধ ইন্ডিয়ান টাইমস পত্রিকার সাংবাদিক। অক্সফোর্ডে রচনার ছাত্র ছিলেন। কলকাতায় বেশ প্রভাবশালী। আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল রচনা।
“হয়তো জানেন”, উপাচার্য আমাদের তাঁর রুমের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যেতে বললেন, “বাংলাদেশ আমার পূর্বপুরুষের জন্মভূমি। ঢাকার বিক্রমপুরের স্মৃতি এখনও মনে পড়ে।”
আমি বললাম, ভারতের বিখ্যাত বাঙালিদের অধিকাংশই বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। মেঘনাদ সাহা, জগদীশ চন্দ্র বসু, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, অমর্ত্য সেন, জ্যোতিবসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুচিত্রা সেন— এমন অসংখ্য খ্যাতিমানের নাম বলা যায়।
“আমাদের পশ্চিমবঙ্গের কিছু বাঙালি মুসলিমও আপনাদের দেশে খ্যাত”, উপাচার্য বললেন, “যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হায়াৎ মামুদ আমার একজন প্রিয় মানুষ।”
“তিনি আমার বন্ধু, যদিও বয়সের তফাত বিস্তর”, উপাচার্যের কথা শেষ হওয়ার পর বললাম, “একজন পরিপূর্ণ মানুষ। যাঁর মধ্যে তিলমাত্র ত্রুটি নেই। তাঁকে নিয়ে আমি একটা উপন্যাস লিখেছি, ‘প্রিয়সখা প্রিয়জন’। ড. আনিসুজ্জামানও পশ্চিমবঙ্গের।”
“রচনা ম্যাম প্রতিবছর সুবিধাজনক সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বস্তিতে কয়েকটা দিন থাকেন”, প্রবোধ বললেন, “বস্তির নারীশিশু এবং তাদের পিতামাতার সঙ্গে নানা অনুষ্ঠান আর উৎসব উপভোগ করেন। মেধাবী শিক্ষার্থী পেলে বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। খুব মেধাবী হলে স্লাম ডেভেলাপমেন্ট অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে লন্ডনও নিয়ে যান। তিনি আমার শিক্ষক, অক্সফোর্ডে তাঁর কাছেই পড়েছি। এবার তিনি কলকতার বস্তিতে এসেছেন। প্রথম দিন রচনা ম্যামের বস্তি উৎসবে প্রধান অতিথি থাকবেন মহানাগরিক।”
উপাচার্য বললেন, কলকাতা আসছেন খবর পেয়ে ইউনিভার্সিটির একটা সেমিনারে তাঁকে প্রধান বক্তা করেছি। এমন লোভনীয় সুযোগ ছাড়তে ইচ্ছে করেনি। দিনটি আমাদের জন্য স্মারক হয়ে থাকবে।
রচনা লন্ডন থেকে বার্তা দিয়ে উপাচার্যকে বিস্তারিত জানিয়েছিল। সে তিন দিন বস্তিতে থাকবে এবং নিরাপত্তার জন্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রী লাগবে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও নিতে পারত। তবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রচনার পূর্বপরিচিত এবং বেশ কিছুদিন উভয়ে সতীর্থ ছিলেন। অধিকন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম বেশি। আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিতে রচনা এর আগে আরও দুবার এখানে এসেছে।
“আপনার বার্তা পাওয়ার পর আমরা কয়েকজন মেয়ে সিলেক্ট করে রেখেছি”, রেজিস্ট্রার বললেন, তারা শুধু চৌকশ নয়, দূরদর্শী এবং সাহসীও। ম্যাম, আশা করি আপনার পছন্দ হবে।”
পুলিশকে বলেননি? উপাচার্য জানতে চাইলেন।
প্রবোধ বললেন, ভারতীয় পুলিশে আমাদের আস্থা নেই। আপনার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঁচজন ছাত্রী দেবেন। ভারতীয় হিন্দি-বাংলা সিনেমায় পুলিশের কাজকারবার দেখে বিশ্ববাসী ভারতীয় পুলিশের প্রতি আস্থাহীনতায় ভুগছে। পুলিশ আর ব্যাংক একই। সুসময়ে কাছে থাকে, দুঃসময়ে সরে যায়। আমাদের সুসময়ের বন্ধু লাগবে না, দুঃসময়ের বন্ধু চাই।
রেজিস্ট্রারের নির্দেশ পেয়ে আধ ঘণ্টার মধ্যে পাঁচজন মেয়ে চলে এল। তাদের প্রবেশভঙ্গিটা ছিল অসাধারণ। প্রথম দেখায় ভালো লেগে গেল।
মেয়েদের লক্ষ করে রেজিস্ট্রার বললেন, এরা জিমন্যাস্টিক, বডি বিল্ডারও বলতে পারেন। দুর্দান্ত সাহসী, কিন্তু অত্যন্ত অনুগত এবং অমায়িক আর হাসিখুশি।
উপাচার্য পাঁচ মেয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে বললেন, দেখুন, চলবে কি না?
মেয়েদের দিকে তাকালাম। সবার উচ্চতা প্রায় সমান— ছয় ফুটের কাছাকাছি। প্রত্যেকে পেশল, কিন্তু ছিমছাম; বেতের মতো মেদহীন। অধিকন্তু আকর্ষণীয় এবং সুতনু। চোখ দিলে চোখ ফেরানো কষ্টের হয়ে যায়।
পাঁচজনের একজন প্রমিতা দাস লাবণী, তার ডাগর চোখে বিশাল মুগ্ধতা— এককথায় অসচেনক। তাকে দেখে মনে হলো, কবিতা কেবল এমন মেয়ের জন্য সৃষ্টি হয়েছে। পরে যার কিছু কিছু অংশ গড়িয়ে গড়িয়ে অন্যত্র নানা রমণীতে প্রবিষ্ট হয়েছে।
প্রমিতার পাশে মিশু, পুরো নাম রাশিদা আকতার মিশু। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ভারতীয়। মেয়েটি শ্যামলা, কিন্তু চোখের কোনায় রচনার তৃপ্তি। আমি একবার রচনার দিকে এবং আর একবার মিশুর দিকে তাকালাম, মনে হলো যমজ দু-বোন। তার সুঠাম চেহারায় স্নিগ্ধতার বান।
পঞ্চকন্যা, আমি বললাম।
সবাই পছন্দ করে নিল আমার পঞ্চকন্যা নাম।
উপাচার্য প্রমিতাকে দেখিয়ে বললেন, এই মেয়ে একাই দশজন পুরুষকে কাবু করতে পারে। যেমন মেধাবী তেমন সাহসী। রিভলভার তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। পুরুষ মাস্তানকে যখন পুরুষ দিয়ে প্রতিহত করা যায় না, তখন প্রমিতাকেই ডাকা হয়। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিলা বডি বিল্ডার টিমের উপদেষ্টা। তবে মনটা খুব নরম, কিন্তু অহংকারী। শিল্পপতির মেয়ে তো, তাই। মিশু আমাদের স্বপ্নকন্যা। যা বলবেন তাই করে দিতে পারে। সেও প্রমিতার মতো ভারি অহংকারী।
প্রমিতা ছোটো প্রতিবাদ করে সবিনয়ে বলল, স্যার, আমি অহংকারী নই, বর্বর সংহারী। আত্মরক্ষার জন্য মেয়েদের অ্যাটিচিউটকে একটু উগ্র রাখতে হয়। এটাকে অনেকে অহংকার বলে। অহংকার হলেও এটি মেয়েদের সম্মান আর ব্যক্তিত্ব রক্ষার হাতিয়ার। আমি মনে করি তা প্রত্যেক মেয়ের থাকা উচিত।
রচনা বলল, দারুণ বলেছ।
এরা কখন যাবে? রেজিস্ট্রার জানতে চাইলেন।
আমাদের সঙ্গে যাবে।
পছন্দ হয়েছে তো? উপাচার্য বললেন।
“এরা স্যারের মহাভারতের পঞ্চকন্যা। পছন্দ না হয়ে যায় কীভাবে?” রচনা পঞ্চকন্যার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তিন দিন থাকতে হবে কলকাতায়।”
দারুণ হবে, পঞ্চকন্যা সমস্বরে বলল।
না খেয়ে আসতে দিলেন না উপাচার্য। অনিচ্ছাসত্ত্বেও খেতে হলো। আসার সময় উপাচার্য রচনার হাতে বিশ্ববিদ্যালয় স্মারক তুলে দিলেন।
আমাকেও একটা দেওয়া হলো। মেয়ে পেলে বাপ বাদ যাবে কেন? সঙ্গী হিসেবে পিসি রায়ও পেয়ে গেলেন। এজন্য বলা হয়, সৎসঙ্গে স্বর্গবাস।

Language
error: Content is protected !!