সন্মিত্রা: সন্মিত্রাবাণীর সুনির্বাচিত সম্ভার

 মৌটুসকি

সন্মিত্রা: ন্মিত্রাবাণীর সুনির্বাচিত সম্ভার

সংযোগ: https://draminbd.com/সন্মিত্রা-সন্মিত্রাবাণী/

 মৌটুসকি
‘সন্মিত্রা’ ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা স্যমন্তক সিরিজের তৃতীয় উপন্যাস। প্রথাগত বিচারে সন্মিত্রা একটি বৈশ্বিক উপন্যাস হলেও এ উপন্যাসে সব ধরনের উপন্যাসের স্বাদ একত্রে পাওয়া যাবে। এই উপন্যাসের দৃশ্যপট হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা এবং নানান প্রসিদ্ধ স্থান। স্টিফেন হকিং, জামাল নজরুল ইসলাম, চিকুচি, মাসাহিতু, সুসানা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বৎশিবা, রচনাদের মতো একঝাঁক সুনির্বাচিত ব্যক্তিবর্গ এ উপন্যাসের কথক। লেখক ড. মোহাম্মদ আমীন ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, দেশ, কাল, জাতি ও বিশ্বের গভীরে প্রবেশ করে নিজের অসামান্য প্রজ্ঞা ও দক্ষতায় এসকল চরিত্রের মুখ দিয়ে যে বৌদ্ধিক সংলাপের পসরা সাজিয়েছেন, তাতে এই উপন্যাসের প্রতিটি পৃষ্ঠার এক-একটি শব্দ যেন প্রাণের আধারে পরিণত হয়েছে; প্রতিটি সংলাপ হয়ে উঠেছে ভাবনার উপজীব্য। এসব সংলাপের কোনো কোনোটা আমাকে বিনা তর্কে একমত হয়ে অভিভূত হতে বাধ্য করেছে, আবার কোনো কোনোটা বানিয়েছে নিখাদ তার্কিক; কিন্তু নিরপেক্ষ পাঠক হিসেবে প্রতিটি মন্তব্য হয়েছে অপার মুগ্ধতার কারণ। সে মুগ্ধতার কিছু বাণী প্রিয় শুবাচিদের সঙ্গে ভাগাভাগি করার উদ্দেশ্যেই আমার এই লেখা। তবে আর দেরি কীসে? চলুন তবে, মন্তব্যে মন্তব্যে সন্মিত্রায় ডুব দেওয়া যাক—
  • ‘অনুভূতির পরমার্থতা সর্বদা কথায় বোঝানো যায় না বলে চুমো আর শিহরনের মতো শব্দ ব্যবহার করতে হয়।’
  • ‘শুধু নিজের কথা ভাবলে হবে না। যে শুধু নিজের চিন্তায় ব্যস্ত থাকে, সে কখনো নিজের কল্যাণ করতে পারে না। যে আঙুল একা থাকতে চায় প্রকৃত অর্থে সেটি অকেজো অঙ্গে পরিণত হয়।’
মাদার্স পাবলিকেশন্স
  • ‘কিছু কিছু কথা কিছু কিছু লোককে বলার জন্য ভেতরে বমির মতো প্রবল ঊর্ধ্ব চাপ সৃষ্টি হয়। যতক্ষণ না জানানো যায় ততক্ষণ অস্বস্তি ক্রমশ বাড়তে থাকে। বমি যেমন আটকে রাখা যায় না, তেমনি আটকে রাখা যায় না এমন কথা। অনেকটা প্রকৃতির ডাকের মতো।’
  • ‘দায়িত্ব বিবেচনাহীন সত্য প্রকাশ নিজের পায়ে কুড়োল মারার মতো বোকামি। দায়িত্ব কেবল দায়কে ঘিরে আবর্তিত হয়। তার আবেগ বা ভালোবাসা বলে কিছু থাকে না।’
  • ‘সম্পর্ক রাখা মানে শুধু কথা বলা নয়, মনে রাখাও নয়; মনের গভীরে স্থান দিয়ে তাকে মনের মধ্যে নিবিড় আলেখ্যে লালন করা। বিপদে-আপদে পরস্পরের কাছে যাওয়া।’
  • ‘ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করা মানে ভালোবাসাকে জীবন্ত আগুনে আজীবন দগ্ধ করা, দগ্ধ হতে থাকবে কিন্তু মরবে না– কী নৃশংস!’
  • ‘নারী মাত্রই নারী। দুর্বল বলে শঙ্কায় ভোগে বেশি।’
  • ‘ভালোবাসা মানুষকে শুধু অমায়িক করে না, হিংস্রও করে দেয়। এক্ষেত্রে মেয়েদের প্রতিক্রিয়া সকল হিংস্রতাকে অতিক্রম করে যায়। কারণ মেয়েরা দুর্বল। তাই দুর্বলের আশ্রয়ের প্রতি কারও দৃষ্টি তারা সহ্য করতে পারে না।’
  • ‘স্ত্রী হবে স্ত্রী এবং স্বামী হবে তার মালিকানাধীন সংসার নামের খেত কর্ষণের জন্য রাতদিন বিরামহীন ধেয়ে চলা হালের বলদ।’
  • ‘সংসারে স্বামী-স্ত্রী দুজনের একজন নিত্য শোষক আর একজন নিত্য শোষিত। যেটাই ঘটুক, প্রকৃতপক্ষে দুজনের প্রত্যেকে নিজেকে বঞ্চিত ও শোষিত মনে করে। একজন মনে করে– শোষিত হচ্ছি আর একজন মনে করে শোষণ করে সুবিধা করতে পারছি না। এটি দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে কঠিন, কিন্তু অনিবার্য বিষয়।’
  • ‘আমার প্রচুর সম্পদ আছে। ভোগ করার ইচ্ছে এবং আর্থিক সামর্থ্য দুটোই অফুরন্ত, কিন্তু পারছি না। আমার ইচ্ছে, শারীরিক সামর্থ্যকে অতিক্রম করতে দিচ্ছে না। সামর্থ্য এবং ইচ্ছে থাকার পরও ভোগের যে সীমাবদ্ধতা আমার লাগাম টেনে ধরে– সেটাই মানুষের পাশব উগ্রতার প্রতিবন্ধক। এটি না থাকলে মনুষ্য জাতি বহু আগে ধ্বংস হয়ে যেত।’
  • ‘বই না পড়ে থাকা যায়, কিন্তু কাপড় না পরে থাকা যায় না। জ্ঞানোলঙ্গতা মনের বিষয়, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ জ্ঞানোলঙ্গ। তাই পরস্পরকে মেনে নেয়। জ্ঞানোলঙ্গতা বাইরের চোখে দেখা যায় না। কিন্তু বস্ত্রোলঙ্গতা দেখা যায়।’
  • ‘পড়ার চেয়ে পরা অনেক জরুরি। আগে পরা তারপর পড়া। সভ্যতার প্রথম নিদর্শন কাপড়, বই নয়। সভ্যতার প্রথম চাহিদা কাপড়, বই নয়। ইকরা এসেছে পোশাকের অনেক সহস্র বছর পর।’
  • ‘দান করলে শত্রু হয়। দান করার যোগ্যতা অর্জিত হলে শত্রুতা সৃষ্টির কারণ ঘটে। পৃথিবীর কয়েকটি জননিন্দিত কাজের একটি হচ্ছে দান।’
  • ‘দান সবসময় সীমিত। তাই দান করতে গেলে অধিকাংশই বঞ্চিত থেকে যায়। বঞ্চনা থেকে শুরু হয় নিন্দা আর শত্রুতা। এজন্য ক্ষমতাসীন দল পরবর্তী নির্বাচনে সাধারণত জনপ্রিয়তা বিবেচনায় বিরোধী দলের চেয়ে পিছিয়ে থাকে।’
  • ‘বাঙালিদের চিত্তবৈকল্য মারাত্মক। তাদের দেশপ্রেম খুব কম। কিন্তু ষড়যন্ত্রে ওস্তাদ, পরশ্রীকাতরতায় অন্ধ। আপন ভাই মহাশয়, এ জ্বালা কী প্রাণে সয়!’
  • ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। তবে ইচ্ছেটা হতে হবে অধ্যবসায়প্রসূত চেষ্টায় গড়া পরিষ্কার পাথরস্থির প্রত্যয়।’
  • ‘ভারতবর্ষ কখনো কাউকে লুণ্ঠন করার জন্য সমুদ্র পাড়ি দেয়নি। যদি করত তাহলে পুরো ইউরোপ ভারতবর্ষের অধীনে থাকত।’
  • ‘কম সাজলে মেয়েদের কত অনিন্দ্য সুন্দর লাগে তা যারা বোঝে তারা কখনো বেশি সাজুগুজু করে না।’
  • ‘সাধারণভাবে আমরা বলি জ্ঞান এবং দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। আমি মনে করি শিক্ষা হচ্ছে অজ্ঞতার আবিষ্কার।’
  • ‘শিক্ষা আমাকে বিকশিত করবে, ধ্বংস নয়। শিক্ষা, আমার মৌলিকত্বকে অক্ষুণ্ন রেখে আমার ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাকে প্রোজ্জ্বল করবে; নিশ্চিহ্ন নয়।’
  • ‘দ্রুত উপলব্ধি করতে পারার বোধই হচ্ছে সক্ষমতা। পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতি না করে শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত বিষয়কে উপযুক্ত সময়ে
    ড. মোহাম্মদ আমীন

    উপযুক্ত ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর সক্ষমতাই হচ্ছে দক্ষতা। মেধার প্রয়োগকালে সৃষ্ট ভুলের শঙ্কাকে প্রতিহত করে প্রতিভা। যে বিষয়ে শিক্ষা নেওয়া হয়েছে তাকে কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করার আকাঙ্ক্ষা বা সক্ষমতাই হচ্ছে যোগ্যতা।’

  • ‘চোখ খোলা রেখে কান প্রসারিত করো। জীবন তোমার ইতিহাস হয়ে তোমাদের সংকীর্ণ জগৎ থেকে বের হয়ে সবার অন্তরে ছড়িয়ে পড়বে। তখন যে ঘটনাটি রটবে সেটিই কাহিনি।’
  • ‘বিতরণ শব্দটির সঙ্গে বিস্ফোরণ কথাটির অদ্ভুত মিল। বিতরণে বিস্ফোরণ; বিস্ফোরণের মতো হট্টগোল আর হইচই।’
  • ‘নষ্ট প্রত্যঙ্গই মনে বেশি নাড়া দেয়। ভালোর কথা কেউ মনে রাখে না গো। দুষ্টদের প্রতি সবার নজর থাকে, দিতে হয়, না-দিয়ে উপায় থাকে না। ভালোদের সবাই ভুলে যায়। ভালোরা আমাদের ভালো রাখে বলে ভালোদের কেউ মনে রাখে না।’
  • ‘চুমোতে মমতা বেশি, কামড়তে স্মরণ
  • নৈকট্য বিরক্তি আনে, বিচ্ছেদ চায় বরণ।’
  • ‘বিনয় দিয়ে সব অর্জন করা যায়। পশুও পোষ মানে। বিনয়কে অনেকে মনে করে দুর্বলতা। অনেকে মনে করে ব্যক্তিত্বহীনতা; আবার অনেকের কাছে আত্মবিসর্জন।’
  • ‘ধারালো দা সাবধানে রাখতে হয়। নইলে রক্তাক্ত হওয়ার শঙ্কা থেকেই যায়। কিন্তু প্রয়োজনে ওটাই কাজে লাগে। ভোঁতা দা যতই নিরাপদ হোক, কাজের না। মরিচার বাসা, ধ্বংসের অপেক্ষায় থাকে।’
  • চাওয়া ব্যক্তির ইচ্ছা, কিন্তু পাওয়া তার নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়। তাই মানুষ যা চায় সর্বদা তা পায় না।’
  • ‘জীবন একটা উপহার। জীবনের তুলনায় কষ্ট সমুদ্রের তুলনায় একবিন্দু জলের চেয়েও নগণ্য। কেন আমাদের আকুতি থাকবে, কেন থাকবে অপ্রাপ্তির কান্না?’
  • ‘ভদ্রলোক, কারও সম্মান পান না। কেউ যদি পেয়ে থাকেন, ধরে নেবেন তিনি ভদ্রলোক নন।’
  • ‘নিজের দুর্বলতা যত কম প্রকাশ করা যায় তত ভালো। তাহলে আঘাতে আঘাত আর মননে উপহাস পাওয়ার আশঙ্কা কিছু কম থাকে।’
  • ‘বয়স যত বাড়ে স্বার্থপরতার গতিও তত বাড়ে। মৃত্যু মানুষকে শুধু কবরের দিকে নিয়ে যায় না, লোভের দিকেও নিয়ে যায়। লোভ মানে পাপ। এজন্য বলা হয়– লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।’
  • আকর্ষণ প্রাপ্তির বিপরীত অনুষঙ্গ। প্রাপ্তি আকর্ষণের শিহরনকে ভোঁতা করে দেয়। প্রিয় মানুষ যত কাছে আসে, যত সহজলভ্য হয়ে ওঠে, তার প্রতি আসক্তি তত কমে যায়। এজন্য বউয়ের চেয়ে প্রেমিকা এবং প্রেমিকার চেয়ে অপরিচিতদের প্রতি মানুষের আকর্ষণ অধিক দেখা যায়।’
  • ‘কোনো কিছু দিয়ে সম্পর্ককে সীমিত করে দিলে ভালোবাসাও সীমিত হয়ে যায়। বিবাহে নানা নামের নানা বন্ধন দিয়ে ভালোবাসাকে সংসারের ছোটো গণ্ডিতে বেঁধে রাখা হয়। তাই জায়া-পতির দাম্পত্য জীবনকে অনেকে কারাগার বলে। আমি কারাগার বলি না, বলি– গরম জলে ফেলে দেওয়া জীবন্ত কচ্ছপের কষ্ট।’
  • ‘সংসার কষ্টের রশি দিয়ে বানানো একটি রক্তাক্ত নকশিকাঁথা। উষ্ণতার চেয়ে উগ্রতা প্রবল।’
  • ‘সত্য-মিথ্যার চেয়ে ন্যায়-অন্যায়; ন্যায়-অন্যায়ের চেয়ে শান্তি-অশান্তি এবং শান্তি-অশান্তির চেয়ে নিরাপত্তা অনেক বেশি অপরিহার্য, অনেক মানবিক। যে সত্য সবাইকে কষ্ট দেয়, অশান্তির সৃষ্টি করে সেটি পরিত্যাগ করাই মানবতা। যে মিথ্যা, শান্তি ও নিরাপত্তা দেয় সেটাই গ্রাহ্য।’

সংকলন: মৌটুসকি

সন্মিত্রা
লেখক: ড মোহাম্মদ আমীন
প্রকাশক: নিরূপ সাহা (মাদার্স পাবিলেশন্স)
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
মুদ্রিত মূল্য: ৪৫০ টাকা
সন্মিত্রা নিয়ে এবি ছিদ্দিকের আলোচনা: https://www.facebook.com/…/permalink/4352148338139907/
error: Content is protected !!