সমর দাস: পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল রক্ত লাল

ড. মোহাম্মদ আমীন

সমর দাস: পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল রক্ত লাল রক্ত লাল

খ্যাতিমান সুরকার ও সংগীত পরিচালক সমর দাস ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই ডিসেম্বর  ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের

সমর দাস

নবদ্বীপ বসাক লেনে এক সংগীতপ্রেমী হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা-মাতা হলেন যথাক্রমে  জিতেন্দ্রনাথ দাস এবং কমলিনী দাস।  ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে ১৬ বছর বয়সে অল ইন্ডিয়া রেডিও’-এর ঢাকা কেন্দ্রে বাঁশি বাজানোর মধ্য দিয়ে তাঁর সংগীত জীবনের সূচনা।। তরুণ বয়সে তিনি গিটার ও পিয়ানো বাদক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করতে সক্ষম হন।

সমর দাস ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বেতারে এবং ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে  রেডিও পাকিস্তান, ঢাকা কেন্দ্রে রেডিওর নিজস্ব শিল্পী হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে কিছুকাল করাচিতে পিআইএ সাংস্কৃতিক দলের সংগীত বিভাগের প্রধান হিসেবেও কাজ করেছেন। পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে উঠলে তিনি সংগীত পরিচালক হিসেবে  যুক্ত হন। তিনি  বাংলাদেশের প্রথম ছায়াছবি মুখ ও মুখোশ-এর  সংগীত পরিচালক ছিলেন।

সমর দাস  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়  মুজিবনগর খেকে পরিচালিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক ও প্রধান পরিচালক ছিলেন। এ সময় তিনি যেসব দেশের গানে সুর দিয়েছেন তন্মধ্যে:  ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’, ‘নোঙর তোল তোল’, ‘ওরা আমাদের সবুজ ধানের শীষে, চিরদিন আছে মিশে’, ‘ভেবো না গো মা তোমার ছেলেরা’ ইত্যাদি অন্যতম। তাঁর সুরারোপিত অসংখ্য গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:  ‘তন্দ্রাহারা নয়ন আমার’ (হাসিনা মমতাজ), ‘পুরোনো আমাকে খুঁজে’ (শাহনাজ রহমতউল্লাহ), ‘লাজুক লাজুক চোখ মেলে ওই’ (ফেরদৌসী রহমান), ‘কাঁকন কার বাজে রুমঝুম’ (বশির আহমেদ), ‘কত যে ধীরে বহে মেঘনা’সহ (হেমন্ত মুখোপাধ্যায়) প্রভৃতি। তিনি বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের দুই হাজারেরও বেশি গানের সুরকার। 

সমর দাস মুখ ও মুখোশ, লটারী, মাটির পাহাড়, আসিয়া, গৌরী, ধীরে বহে মেঘনা, রাজা এলো শহরে প্রভৃতি ছবির সংগীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। নদীর সন্তান, নবারুণ, বীরাঙ্গনা সখিনা, সোনার সবুজ গাঁয়ে ছবির নৃত্যনাট্যের সংগীত পরিচালক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন।তিনি লাহোরে অনুষ্ঠিত আফ্রোএশীয় সংগীত

ড. মোহাম্মদ আমীন, প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, শুবাচ।

সম্মেলনে (১৯৬৪) উপস্থাপিত সোনার সবুজ গাঁয়ে নৃত্যনাট্যের প্রযোজনা ও সংগীত পরিচালনা এবং লন্ডনে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ উৎসবে (১৯৬৬) পরিবেশিত  সানস অব রিভার নৃত্যনাট্যের পরিচালক ছিলেন। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গোপসাগরের ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস হলে দুর্গত মানুষকে সহায়তা করার লক্ষ্যে সমর দাসের উদ্যোগে পল্টন ময়দানে কাঁদো বাঙালি কাঁদো শিরোনামের একটি সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। 

কলকাতার এইচ.এম.ভি কোম্পানি  বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ২৬টি গান নিয়ে ‘বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ (১৯৭২) শিরোনামের একটি লংপ্লে রেকর্ড প্রকাশ করে। সমর দাস ছিলেন এ রেকর্ডের সংগীত পরিচালক। তিনি ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে বিবিসিতে গিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের অক্রেস্ট্রেশন রেকর্ড করিয়ে আনেন। নবপ্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বেতারের সূচনা সংগীতের কম্পোজ করেছেন সমর দাস।মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ শিরোনামের দুটি এলপি ডিস্ক প্রকাশ করে। সমর দাস ছিলেন এর সংগীত পরিচালক। তিনি ১৯৮৫ ও ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফ গেমস সূচনা সংগীতেরও সুরকার ছিলেন। তিনি ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত সৃষ্টি  বাংলাদেশ সংগীত পরিষদের  আমৃত্যু সভাপতি ছিলেন।

১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে   “স্বাধীনতা পুরস্কার” প্রদান করা হয়।  এছাড়া তিনি আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন। ২০০১ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকায় মারা যান।

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
error: Content is protected !!