সমাস: সংজ্ঞার্থ প্রকার গুরুত্ব বৈশিষ্ট্য: সমাজ নির্ণয়ের সহজ কৌশল

ড. মোহাম্মদ আমীন

এই পেজের সংযোগ: https://draminbd.com/সমাস-সংজ্ঞার্থ-প্রকার-গু/

সমাস: সংজ্ঞার্থ প্রকার গুরুত্ব বৈশিষ্ট্য: সমাজ নির্ণয়ের সহজ কৌশল

সমাসের সংজ্ঞার্থ

একাধিক পদকে বিশেষ কৌশলে ব্যাকরণের রীতি অনুসারে একপদে নিয়ে আসার পদ্ধতিকে সমাস বলা হয়। সমাস করতে হলে ব্যাসবাক্যকে এমনভাবে সংক্ষেপ করতে হয়, যাতে অর্থসংগতি ও শ্রুতিমাধুর্য রক্ষিত হয়। অন্যথা সমাস না করা সমীচীন। সমাস শব্দের অর্থ সংক্ষেপণ। তবে এ সংক্ষেপণের কিছু রীতি ও কৌশল আছে। সমাস [সম্ + অস্ + অ(ঘঞ্)]  সংস্কৃত শব্দ। এর অর্থ একাধিক পদের একপদে সংকোচন, সংক্ষেপণ, মিলন,  একত্রীকরণ,  সংগ্রহ প্রভৃতি। সাধারণত পরস্পর অর্থসংগতিপূর্ণ দুই বা ততোধিক পদকে একপদে পরিণত করাকে সমাস বলে। অর্থাৎ বাক্যে ব্যবহৃত একাধিক শব্দ বা পদের বৃহৎ রূপকে সংক্ষেপ করার নামই সমাস। যেমন: 

দেবকে দত্ত = দেবদত্ত।
ইন্দ্রকে জয় করে যে = ইন্দ্রজিৎ।
কৃষি থেকে জাত = কৃষিজাত।
জেলার সদৃশ = উপজেলা।
শত অব্দের সমাহার = শতাব্দী।
সে, তুমি ও আমি = আমরা।

ভাষা পণ্ডিতগণ সমাসের ভিন্নরূপ সংজ্ঞার্থ নিরূপণ করেছেন। এর কয়েকটি নিচে দেওয়া হলো:
(ক) পরস্পর অর্থ-সঙ্গতিবিশিষ্ট দুই বা বহুপদকে লইয়া একটি পদ করার নাম সমাস।  * ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
(খ) অর্থের দিক দিয়া পরস্পরের মধ্যে সম্বন্ধ আছে, এরূপ (দুই বা তাহার অধিক) পদ মিলিত হইয়া একপদে পরিণত হইলে, ব্যাকরণে সেই মিলনকে বলা হয় সমাস। * সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়।
(গ)  পরস্পর সম্বন্ধবিশিষ্ট দুই বা ততোধিক পদের মধ্যস্থিত বিভক্তি লোপ করিয়া একপদ করাকে সমাস বলে। * ড. সুকুমার সেন।
(ঘ) পরস্পর অন্বয়যুক্ত দুই বা ততোধিক পদের মধ্যবর্তী অন্বয়াংশ লোপ করিয়া পদগুলিকে এক শব্দে পরিণত করার প্রক্রিয়ার নাম সমাস। * ড. মুহম্মদ এনামুল হক।
(ঙ)  অর্থ-সম্বন্ধ আছে এমন একাধিক শব্দের এক সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বড় শব্দ গঠনের প্রক্রিয়াকে সমাস বলে। * মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী।
(চ) সমাস অভিধানের শব্দ নির্মাণের একটি প্রক্রিয়া। যাতে দুই বা তার চেয়ে বেশি শব্দ যুক্ত হয়ে একটি অখণ্ড শব্দ তৈরি করে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি সম্মিলিত ধারণা প্রকাশ করে। 


সমাসের ভূমিকা বা গুরুত্ব
১. বাংলা শব্দ গঠনে সমাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২. সমাস বাক্যে ব্যবহৃত পদগুলো সংক্ষেপ বা একপদে পরিণত করে।
৩. সমাসবদ্ধ শব্দ বাক্যে ব্যবহৃত হয়ে বক্তব্যের বিষয়কে সংহতি দান করে।
৪. সমাস বাক্যের অর্থ সাবলীল ও সহজ করে। 
৫. সমাস বাংলা ভাষায় নতুন শব্দ তৈরি করে  শব্দে বৈচিত্র্যময় অর্থদ্যোতনার সৃষ্টি করে।
৬. সমাস বাক্যে ব্যবহৃত শব্দগুলোর শ্রুতিমাধুর্য বাড়িয়ে তোলে। যেমন চার রাস্তার সমাহার = চৌরাস্তা, সমুদ্র থেকে হিমাচল পর্যন্ত = আসমুদ্রহিমাচল, অর্থকে অতিক্রম না করে = যথার্থ ইত্যাদি। এখানে সমাসবদ্ধ শব্দ চৌরাস্তা, আসমুদ্রহিমাচল, যথার্থ ইত্যাদি শব্দ বাক্যে সংক্ষেপ রূপে ব্যবহৃত হয়েছে এবং নতুন শব্দের অর্থের পরিবর্তন, নতুন শব্দের সৃষ্টি হয়েছে।
৭. সমাস শব্দে বৈচিত্র্যময় দ্যোতনা এনে ভাষাকে সাবলীল, মাধুর্যপূর্ণ ও শব্দভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে তোলে।


 সমাসের পরিভাষাগুলোর সংজ্ঞার্থ নির্ণয়
বাংলা ব্যাকরণে সমাসের আবির্ভাব সংস্কৃত ও বৈদিক ব্যাকরণ থেকে। বাংলা ভাষার ব্যাকরণে বাংলা সমাসের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করার মতো। বৈদিক বা সংস্কৃত সমাসের মতো খাঁটি বাংলা সমাসে নিয়মনীতি খাটে না। সমাসের আলোচনা বিশ্লেষণের সুবিধার্থে সমাসের পারিভাষিক শব্দগুলোর সাথে আমাদের পরিচিতি প্রয়োজন। যেমন
১. সমস্তপদ: সমাসনিষ্পন্ন পদকে সমস্ত পদ বলে ।  সমাস তৈরি বা নিষ্পন্ন করার কাজে নিয়োজিত বাক্যের অন্তর্গত পদসমূহের মিলনে পদটি  সৃষ্টি হয় তাকে  সমস্তপদ বা সমাসবদ্ধ পদ বলে। যেমন:  চিরকাল ব্যাপীয়া সুখী = চিরসুখী। এখানে চিরসুখী সমস্তপদ বা সমাসবব্ধ পদ।
সমস্তপদ বা সমাসবদ্ধ পদের সংজ্ঞার্থ নিরূপণে পণ্ডিতজনের মত
ক.  সমাস যুক্ত পদের নাম সমস্ত পদ। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
খ. পূর্ব-পদ ও উত্তরপদ মিলিয়া সমাস হইলে যেই পদ বা শব্দ গঠিত হয় তাহাকে সমস্ত পদ বলে।  ড. মুহম্মদ এনামুল হক।

২. সমস্যমান পদ: যেসব পদ দিয়ে সমস্তপদ বা সমাসবদ্ধ পদ তৈরি হয় তাদের প্রত্যেকটি পদ সমস্যমান পদ। যেমন ঘি মাখা ভাত = ঘিভাত। এখানে ঘি, মাখা, ভাত প্রত্যেকেই সমস্যমান পদ।
সমস্যমান পদ সম্পর্কে পণ্ডিতজনের মত
ক্স যে সকল পদ লইয়া সমাস হয় তাহাদের প্রত্যেককে সমস্যমান পদ বলে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
ক্স পরস্পর অন্বিত যে কয়েক পদে সমাস প্রক্রিয়া প্রযুক্ত হয় তাহাদের প্রত্যেকটিকে সমস্যমান পদ বলে।  ড. মুহম্মদ এনামুল হক।

৩. সমাসবাক্য বা ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্য : সমস্তপদকে ভাঙলে বা বিশ্লেষণ করলে যে বাক্য বা বাক্যাংশ ব্যবহার করা হয় তাকে সমাসবাক্য বা ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্য বলে। যেমন যিনি রাজা তিনিই ঋষি = রাজর্ষি, বিলাত হইতে ফেরত = বিলাতফেরত।
এখানে রাজর্ষি, বিলাতফেরত সমস্ত বা সমাসবদ্ধ পদ আর যিনি রাজা তিনিই ঋষি, বিলাত হইতে ফেরত এগুলো ব্যাসবাক্য বা সমাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্য।
সমাসবাক্য বা ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্যের সংজ্ঞার্থ নিরূপণে পণ্ডিতজনের মতসমস্ত পদকে ভাঙ্গিয়া যে বাক্যাংশ করা হয় তাহার নাম সমাসবাক্য বা ব্যাস বাক্য। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।

৪. পূর্বপদ ও পরপদ বা উত্তরপদ: সমাসবদ্ধ পদ বা সমস্তপদের প্রথম অংশকে বলে ‘পূর্বপদ’ এবং পরবর্তী অংশকে বলে পরপদ বা উত্তরপদ। যেমন গুণমুগ্ধ একটি সমাসবদ্ধ বা সমস্তপদ, এটিকে ব্যাসবাক্যে রূপান্তর করলে হয় গুণের দ্বারা মুগ্ধ = গুণমুগ্ধ। এখানে গুণ পূর্বপদ, মুগ্ধ পরপদ বা উত্তরপদ।


 বাংলা ভাষার শব্দগঠনে সমাসের গুরুত্ব
বাংলা ভাষার শব্দ গঠনে সমাসের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ধাতু, প্রকৃতি ও প্রত্যয়ের মতো সমাস শব্দ গঠনে অন্যতম ভূমিকা পালন করে। বক্তব্যকে সংক্ষেপ করার মাধ্যমে ভাষার মাধুর্য ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে সমাস। অনাবশ্যক বেশি পদের বা বেশি শব্দের ব্যবহার বাক্যকে জটিল করে, ফলে ভাষা হয়ে পড়ে মাধুর্যহীন। বাক্যমধ্যে ব্যবহৃত অনাবশ্যক পদের ব্যবহার না করে সমাসবদ্ধ পদের ব্যবহারের মাধ্যমে বক্তব্য আর বিষয়টিকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করা হয়। ফলে ভাষা হয় সংক্ষিপ্ত, শ্র“তিমধুর। যেমন বীণা পাণিতে যার = বীণাপাণি, চার রাস্তার সমাহার = চৌরাস্তা, যিনি হেড তিনিই মৌলবি = হেডমৌলবি। এখানে বীণা পাণিতে যার বা চার রাস্তার সমাহার কিংবা যিনি হেড তিনিই মৌলবি বললে বাক্য সৌন্দর্যহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু সমাসবন্ধ পদের মাধ্যমে বীণাপাণি, চৌরাস্তা, হেডমৌলবি বললে পদের আকার ছোটো হয়, আর বাক্য হয়ে ওঠে শ্র“তিমধুর। তাই বলা যায়, সমাস বাংলা ভাষাকে সুগঠিত ও সুন্দর করে তোলে।

সমাসের গুরুত্ব
১. বাংলা ভাষায় সমাসের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ভাষা শ্র“তিমধুর, সহজ, সরল ও সংক্ষিপ্ত করাই সমাসের প্রথম ও প্রধান কাজ। ভাষা যদি শ্রুতিমধুর না হয় তবে সে ভাষার আবেদন সর্বপ্রসারী হতে পারে না। যেমন ‘গায়ে হলুদ দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে’ ‘গায়ে-হলুদ’ বললে ভাষা সংক্ষিপ্ত, সহজ ও শ্র“তিমধুর হয়।
২. অল্প কথায় অধিক ভাবকে প্রকাশের জন্যও সমাসের প্রয়োজন।
৩. নতুন শব্দ সৃষ্টির ক্ষেত্রে সমাসের অবদান অসামান্য।
৪. পরিভাষা সৃষ্টির ক্ষেত্রেও সমাস বিশেষভাবে সাহায্য করে। যেমন ‘তিনটি বাহু দ্বারা রচিত ক্ষেত্র’ না বলে ‘ত্রিভুজ’ বলা যায়। এখানে ‘ত্রিভুজ’ শব্দটি পারিভাষিক শব্দ।
৫. গুরুগম্ভীর ভাবধারাকে যথার্থভাবে প্রকাশের জন্যও সমাসবদ্ধ পদ ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
৬. সহজভাবে উচ্চারণেও সমাস সহায়তা করে এবং ভাষাকে প্রাঞ্জলতা দান করে।

 সমাসের বৈশিষ্ট্য
শব্দ গঠনের অন্যতম প্রক্রিয়ার নাম সমাস। নিম্নে শব্দ গঠনের ক্ষেত্রে সমাসের বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ করা হলো :
১. সমাসের সাহায্যে নতুন নতুন শব্দ গঠন করে বাংলা ভাষার শব্দভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে।
২. সমাসের সাহায্যে দুই বা তার বেশি পদ একপদে পরিণত হয়।
৩.  একাধিক পদ বা শব্দের সমন্বয়ে নতুন পদ বা শব্দ গঠিত হয় তাই শব্দের অর্থদ্যোতনা, অর্থের পরিবর্তন, শব্দের পরিবর্তন ও শ্র“তিমাধুর্য বেড়ে যায়।
৪.  সমাস দ্বারা পদের বা শব্দের সংক্ষেপে মনের ভাব প্রকাশ করা যায়।

 সমাস নির্ণয়ের কৌশল
১. সমাস নির্ণয় করতে হলে প্রথম প্রশ্নপত্রে দেওয়া পদ বা সমস্তপদের ব্যাসবাক্য লিখতে হবে।
২. ব্যাসবাক্য লেখার পর সে অনুসারে সমাসের নাম লিখতে হবে।
৩. ব্যাসবাক্য পদের অর্থের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং শ্রুতিমধুর হতে হবে।
৪. সমস্ত পদ নয়, ব্যাসবাক্য অনুসারে সমাসের নাম লিখতে হবে। কারণ একটি পদের একাধিক ব্যাসবাক্য হতে পারে। তাই যেভাবে ব্যাসবাক্য লেখা হবে, সে অনুসারে সমাসের নাম লিখতে হবে। যেমন ‘করকমল’ পদের ব্যাসবাক্য যদি ‘কর রূপ কমল’ লেখা হয় তাহলে সমাস হবে রূপক কর্মধারয়। কিন্তু যদি ব্যাসবাক্য লেখা হয় ‘কর কমলের মতো’, সেক্ষেত্রে সমাস হবে উপমিত কর্মধারয়।

সমাসের শ্রেণিবিভাগ
আধুনিক শব্দ বিজ্ঞানীদের মত অনুসারে সমাসকে প্রধানত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়। যথা :
১. ক্রিয়াপদ ঘটিত সমাস (Verbal compound) )
২. নামপদ ঘটিত সমাস (Nominal compound)
লৌকিক সংস্কৃতে পাণিনি সমাসকে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন। যথা :
১. পূর্বপদ প্রধান: অব্যয়ীভাব
২. উত্তরপদ প্রধান: তৎপুরুষ
৩. অন্যপদ প্রধান: বহুব্রীহি
৪. উভয়পদ প্রধান: দ্বন্দ্ব

এছাড়া দ্বিগু ও কর্মধারয় তৎপুরুষ রূপেই চিহ্নিত। কিন্তু সংস্কৃত ব্যাকরণে সমাস ছয়টি। যথা :
১. দ্বন্দ্ব (Co-ordinative)
২. তৎপুরুষ (Determinative)
৩. বহুব্রীহি (Possessive)
৪. অব্যয়ীভাব (Governing compound)
৫. অন্বয় ঘটিত (Syntactial)
৬. দ্বিরুক্তি ঘটিত (Iterative)

বাংলা ভাষায় সমাসবদ্ধ পদগুলো ব্যাসবাক্যের দ্বারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়পদগুলোতে কখনো পূর্বপদের অর্থ প্রাধান্য পায়, কখনো পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায়, কখনো উভয়পদ প্রধানরূপে প্রতীয়মান হয়, আবার কখনো বা সমস্যমান পদ দুটির কোনোটির অর্থ না বুঝিয়ে ভিন্ন অর্থ প্রকাশ পায়। অর্থপ্রাধান্য বিবেচনা করলে কর্মধারয় সমাসকে তৎপুরুষ সমাসে এবং দ্বিগু সমাসকে কর্মধারয় সমাসের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। বাংলা ভাষার বিভিন্ন পণ্ডিত লৌকিক সংস্কৃতের অন্যতম পণ্ডিত পাণিনির মতামতকেই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করেছেন এবং ড. মুহম্মদ এনামুল হক নিম্নরূপ শ্রেণিবিভাগ করেছেন :
ক. পূর্বপদের অর্থ প্রধান সমাস অব্যয়ীভাব সমাস।
খ. পরপদের অর্থ প্রধান সমাসতৎপুরুষ সমাস।
গ. উভয়পদের অর্থ প্রধান সমাস দ্বন্দ্ব সমাস।
ঘ. উভয়পদের অর্থাশ্রিত = দ্যোতক সমাস বহুব্রীহি সমাস।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে সমাস প্রধানত পাঁচ প্রকার। তিনি মনে করেন অব্যয়শব্দ পূর্বে বসে পূর্বপদের অর্থের প্রাধান্য বোঝালে অব্যয়ীভাব, দ্বিতীয়াদি বিভক্তিলোপ পেয়ে পরপদের অর্থের প্রাধান্য পেলে তৎপুরুষ, উভয়পদের অর্থ প্রাধান্য ঘটলে বহুব্রীহি এবং বিশেষণ বা বিশেষ্য পদ পূর্ব থেকে বিশেষ্য বা বিশেষণের সমাস হয়ে পরপদের অর্থপ্রধান হলে তা কর্মধারয় সমাস হবে। তিনি দ্বিগু সমাসকে কর্মধারয় সমাসের অন্তর্গত মনে করেন।
উপরিউক্ত প্রকরণের পরিপ্রেক্ষিতে সমাসকে ছয় ভাগে ভাগ করা যায়। যথা :
ক. দ্বন্দ্ব সমাস ঘ. তৎপুরুষ সমাস
খ. দ্বিগু সমাস ঙ. অব্যয়ীভাব সমাস
গ. কর্মধারয় সমাস চ. বহুব্রীহি সমাস


ক. দ্বন্দ্ব সমাস

‘দ্বন্দ্ব’ শব্দের দুটি অর্থ রয়েছে। যথা: মিলন ও সংঘাত। তবে সমাসের ক্ষেত্রে মিলন অর্থটাই প্রযোজ্য। সুতরাং, ‘দ্বন্দ্ব সমাস’ মিলনের সমাস। অর্থাৎ যে সমাসে দুই বা তার বেশি পদের মিলন হয় এবং সমস্যমান পদগুলোর প্রতিটিতেই অর্থের প্রাধান্য থাকে তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। দ্বন্দ্ব সমাসে সমস্যমান পদগুলো প্রত্যেকটি সংযোজক অব্যয়। যেগুলো ও, আর প্রভৃতি দ্বারা যুক্ত করা হয়।
দ্বন্দ্ব শব্দের অর্থ জোড়া, তবু দুইয়ের বেশি পদের দ্বন্দ্ব সমাস হয়। যেমন—
ভাই ও বোন = ভাইবোন
তাল ও তমাল = তালতমাল
ভালো ও মন্দ = ভালোমন্দ
টক, ঝাল ও মিষ্টি = টক-ঝাল-মিষ্টি ইত্যাদি।

দ্বন্দ্ব সমাস: বৈশিষ্ট্য চেনার কৌশল

১. সমান বিভক্তিযুক্ত একাধিক বিশেষ্য পদ। 
২. অল্প স্বরবিশিষ্ট শব্দ পূর্বে বসে। যেমন: ঝি-চাকর, দা-কুমড়া, চা-বিস্কুট ইত্যাদি।
৩. অপেক্ষাকৃত সম্মানসূচক পদ পূর্বে বসে। যেমন: রাজা-রানি, বামন-চাঁড়াল, কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজা-প্রজা, পিতা-পুত্র, মায়ে-ঝিয়ে, গুরু-শিষ্য ইত্যাদি।
৪. সাধারণত স্ত্রীবাচক শব্দ পূর্বে বসে। যেমন: মা-বাবা, মেয়ে-জামাই, সীতা-রাম, জায়া-পতি, গাই-বলদ, ঝি-চাকর ইত্যাদি।
৫. দুই বা তার বেশি পদে দ্বন্দ্ব সমাস হয়। যেমন: রাজা-রানি-বাদশা, সোনা-রুপা-তামা-কাঁসা, সাহেব-বিবি-গোলাম, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, হাত-পা-নাক-কান-চোখ, জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে, শহর-বন্দর-গ্রাম ইত্যাদি।
৬. ‘পতি’ শব্দ আগে থাকলে ‘জায়া’ শব্দের বিকল্পে ‘দম’ হয়। যেমন:  জায়া ও পতি = দম্পতি।
৭. দুটি সমান স্বরবিশিষ্ট শব্দের মধ্যে আ-কারান্ত শব্দ পূর্বে বসে। যেমন: রাজা-প্রজা, মশা-মাছি, আজ-কাল ইত্যাদি। দুটো আ-কারন্ত স্বর হলে সেক্ষেত্রে সেক্ষেত্রে ২, ৩ ও ৪ নম্বর বিধি প্রযোজ্য হবে। যেমন: মা-বাবা। দাদা-নানা প্রভৃতি।
৮. দুই বা তার বেশি পদের মিলন হয় এবং সমস্যমান পদগুলোর প্রতিটিতেই অর্থের প্রাধান্য থাকে

দ্বন্দ্ব সমাস নির্ণয়ের সহজ কৌশল
১. দ্বন্দ্ব সমাস জোড়া-প্রকৃতির হয়। এ জোড়াশব্দই দ্বন্দ্ব সমাসে অন্যতম পরিচায়ক।
২. এ সমাসে পূর্বপদ ও পরপদ একই বিভক্তিযুক্ত থাকে এবং সমস্তপদে উভয়পদের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়।
৩. পূর্বপদ ও পরপদ বিশেষ্য হতে পারে। যেমনআম ও জাম = আমজাম।
৪. পূর্বপদ ও পরপদ বিশেষণ হতে পারে। যেমন ভালো ও মন্দ = ভালোমন্দ।
৫. পূর্বপদ ও পরপদ উভয়ে ক্রিয়া বিশেষ্য হতে পারে। যেমনদেখা ও শুনা = দেখাশুনা।
৬. ক্রিয়াপদ হতে পারে। যেমন হারি-জিতি, উঠি-পড়ি।

দ্বন্দ্ব সমাস আয়ত্ত করার সহজ কৌশল :
১. মিলনাত্মক শব্দ বা সম্পর্কযুক্ত জোড়াশব্দ থাকলে তা দ্বন্দ্ব সমাস। যেমন চাচা-চাচি, নানা-নানি, মাতা-পিতা ইত্যাদি।
২. সমার্থক জোড়াশব্দ থাকলে তা দ্বন্দ্ব সমাস হয়। যেমন: হাট-বাজার, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত ইত্যাদি।
৩. প্রায়সমার্থক জোড়াশব্দ থাকলে তা দ্বন্দ্ব সমাস হয়। যেমন: পোকা-মাকড়, দয়া-মায়া, রাত-দিন প্রভৃতি।
৪. বিপরীতার্থক জোড়াশব্দ থাকলে তা দ্বন্দ্ব সমাস হয়। যেমন:  নারী-পুরুষ, সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ ইত্যাদি।
৫. বিরোধার্থক জোড়াশব্দ থাকলে তা দ্বন্দ্ব সমাস হয়। যেমন:  শত্রু-মিত্র, আপন-পর, অহি-নকুল প্রভৃতি।
৬. অঙ্গবাচক জোড়াশব্দ থাকলে দ্বন্দ্ব সমাস হয়। যেমন:  নাক-কান, হাত-পা, রক্ত-মাংস প্রভৃতি।
৭. দুটি জোড়া সর্বনামের মধ্যে দ্বন্দ্ব সমাস হয়। যেমন: তুমি-আমি, যে-সে, কে-কে প্রভৃতি।
৮. জোড়া ক্রিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব সমাস হয়। যেমন চলা-ফেরা, দেওয়া-নেওয়া, জানা-শুনা প্রভৃতি।
৯. জোড়া বিশেষণের মধ্যে দ্বন্দ্ব সমাস হয়। যেমন: ধীরে-সুস্থে, আকারে-ইঙ্গিতে প্রভৃতি।
১০. সংখ্যাবাচক জোড়াশব্দ থাকলে দ্বন্দ্ব সমাস হয়। যেমন: নয়-ছয়, সাত-পাঁচ, শয়ে-শয়ে প্রভৃতি।

দ্বন্দ্ব সমাসের প্রকারভেদ 

দ্বন্দ্ব সমাস নানা প্রকার হতে পারে। যেমন
১. মিলনার্থক দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসে একত্র বা মিলন বা সম্পর্ক বোঝায় তাকে মিলনার্থক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন মা-বাবা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে, নানা-দাদা, কাগজ-কলম, নদী-নালা, নাচ-গান, চা-বিস্কুট, চুন-কালি, ঝড়-বৃষ্টি, আদান-প্রদান, হাসি-ঠাট্টা, বিদ্যা-বুদ্ধি ইত্যাদি।

২. বিপরীতার্থক দ্বন্দ্ব/বিরোধার্থক দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসের পরপদটি পূর্বপদের বৈরী অর্থ প্রদান করে, তাকে বিপরীতার্থক বা বিরোধার্থক দ্বন্দ্ব বলে। যেমন ছোটো-বড়ো, উঁচু-নিচু, আয়-ব্যয়, স্বর্গ-নরক, দা-কুমড়া, লাভ-লোকসান, দেশ-বিদেশ, আকাশ-পাতাল, বাঁচা-মরা, জন্ম-মৃত্যু, আসা-যাওয়া, আজ-কাল, দিন-রাত, হাসি-কান্না, ধর্ম-অধর্ম, সত্য-মিথ্যা, ধনী-গরিব, পাপ-পুণ্য, আসল-নকল, দেনা-পাওনা, জয়-পরাজয়, অহি-নকুল ইত্যাদি।

৩. সমার্থক দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসে পূর্বপদ-পরপদ একই অর্থ বা প্রায় একই অর্থ প্রকাশ করে তাকে সমার্থক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন কাজ-কর্ম, রীতি-নীতি, সমাজ-সংস্কার, ঘর-বাড়ি, নদ-নদী, হাট-বাজার, বই-পুস্তক, চোর-ডাকাত, কুলি-মজুর, খাল-বিল, টাকা-কড়ি, ধন-দৌলত, জন-মানব, বন-জঙ্গল, বন্ধু-বান্ধব, ভাগ-বাটোয়ারা, চালাক-চতুর, লোক-জন, আপদ-বিপদ ইত্যাদি।
স্মর্তব্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ পণ্ডিত এই সমাসের স্বীকৃতি দেননি। তবে, শ্রী শ্যামপদ চক্রবর্তী, এমএ বিদ্যারত্ন, সাঙ্খ্যাভূষণএ বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট বক্তব্য রেখেছেন।

৪. অলুক দ্বন্দ্ব সমাস: যে দ্বন্দ্ব সমাসে সমস্যমান পদগুলোর বিভক্তি লোপ পায় না তাকে অলুক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন দুধেভাতে, দিনে-রাতে, হাতে-কলমে, আগে-পাছে, ঘরে-বাইরে, খেতে-খামারে, যাকে-তাকে, বনে-জঙ্গলে, তেলে-বেগুনে ইত্যাদি।

৫. একশেষ দ্বন্দ্ব সমাস: যে দ্বন্দ্ব সমাসের সমস্যমান পদগুলোর কেবল একটি পদের প্রাধান্য থাকে এবং সেই পদের সাহায্যে অন্য পদের অর্থ প্রকাশ পায় তাকে একশেষ দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমনসে, তুমি ও আমি = আমরা; সে ও তুমি = তোমরা; জায়া ও পতি = দম্পতি।

৬. ইত্যাদি অর্থক দ্বন্দ্ব সমাস: যে দ্বন্দ্ব সমাসে সহচর শব্দের সাথে কিংবা শব্দদ্বৈতের ব্যবহারে সমাস হয় তাকে ইত্যাদি অর্থক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন অদল-বদল, বই-টই, দেখা-টেখা, ভাঙা-চোরা, কোলে-টোলে, কাপড়-চোপড়, আলাপ-সালাপ ইত্যাদি।

৭. বহুপদী দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসে তিন বা তার বেশি পদ থাকে তাকে বহুপদী দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন সাহেব-বিবি-গোলাম, হাত-পা-নাক-মুখ-চোখ, ইট-কাঠ-পাথর, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, সোনা-রুপা-তামা-কাঁসা, পশু-পাখি-কীট-পতঙ্গ, নাচ-গান-বাজনা, চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্র, খাল-বিল-নদী-নালা ইত্যাদি।

৮. বিশেষ্য পদের দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসে পূর্বপদ এবং পরপদ বিশেষ্য হয়, শেষ পর্যন্ত উভয় পদই অবিকৃত থাকে তাকে বিশেষ্য পদের দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন নদ-নদী, গাছ-পালা, হাট-বাজার, কীট-পতঙ্গ, সাহেব-বিবি-গোলাম, রাজা-রানি, নগর-বন্দর, দিন-রাত, সকাল-বিকাল ইত্যাদি।

৯. বিশেষণ পদের দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসে উভয়পদে বিশেষণ অর্থাৎ পূর্বপদ ও পরপদ বিশেষণ পদ হয় এবং উভয় বিশেষণ পদের প্রাধান্য থাকে তাকে বিশেষণ পদের দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ, আসল-নকল, চেনা-অচেনা, কম-বেশি, লাভ-লোকসান, সহজ-সরল, লঘু-গুরু, মিঠে-কড়া ইত্যাদি।

১০. সর্বনাম পদের দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসের পূর্বপদ ও পরপদ উভয় পদ সর্বনাম, সাধারণত পদগুলো অবিকৃত থাকে তাকে সর্বনাম পদের দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন যে-সে, যা-তা, যথা-তথা, যত্র-তত্র ইত্যাদি।

১১. ক্রিয়াপদের দ্বন্দ্ব সমাস: যে দ্বন্দ্ব সমাসের পূর্বপদ ও পরপদ উভয়পদ সর্বনাম পদ হয় এবং সমস্ত পদে উভয় পদের প্রাধান্য থাকে তাকে ক্রিয়াপদের দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমনদেখা-শোনা, কাজ-কর্ম, চলা-ফেরা, চলন-বলন, বলে-কয়ে, হাসি-তামাশা, ছলে-বলে-কৌশলে ইত্যাদি।

১২. সংখ্যাবাচক দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসের পূর্বপদ ও পরপদে সংখ্যা নির্দেশ করে এবং উভয় পদের সংখ্যাবাচক শব্দ অবিকৃত থাকে। তাকে সংখ্যাবাচক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমননয়-ছয়, উনিশ-বিশ, দশ-বারো, শত-সহস্র, লক্ষ-কোটি, সাত-সতেরো, শত-লক্ষ ইত্যাদি।

১৩. নিপাতনে সিদ্ধ দ্বন্দ্ব: সাধারণত সমাসের নিয়মের বাইরে কিছু দ্বন্দ্ব সমাস হয় তাদের নিপাতনে সিদ্ধ দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন অহঃপতি, অহঃরাত্রি ইত্যাদি।


খ. দ্বিগু সমাস:

যে তৎপুরুষ জাতীয় সমাসের পূর্বপদ সংখ্যাবাচক বিশেষণের সঙ্গে বিশেষ্য জাতীয় উত্তরপদের সমাস হয় তাকে দ্বিগু সমাস বলে। দ্বিগু সমাসে সমস্ত পদটি বিশেষ্য হয়। পূর্বপদে সংখ্যাবাচক বিশেষণ এবং পরপদে বিশেষ্য যোগে দ্বিগু সমাস হয় বলে পদ বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে দ্বিগু সমাসকে কর্মধারয় সমাসের অন্তর্ভুক্ত মনে করা হয়। দ্বিগু সমাসের সংজ্ঞার্থ নির্ণয় করতে গিয়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন ‘সংখ্যাবাচক শব্দ পূর্বে থাকিয়া যে কর্মধারয় সমাস তদ্ধিতের অর্থ বা সমাহার বোঝায় তাহাকে দ্বিগু সমাস বলে।’ দ্বিগু সমাসে সমাহার বা যোগফল বুঝিয়ে থাকে। যেমন
দ্বি গো-র সমাহার = দ্বিগু, তিন মাথার সমাহার = তেমাথা, তিন ভুজের সমাহার = ত্রিভুজ, সপ্ত ঋষির সমাহার = সপ্তর্ষি, পঞ্চ ঋষির সমাহার = পঞ্চর্ষি, পঞ্চ বটের সমাহার = পঞ্চবটী।
এরূপ: পঞ্চনদ, তেপান্তর, চৌমুহনী, সেতার, তেতালা, ত্রিরত্ন, ত্রিবর্ণ, ত্রিলোক, সাতসমুদ্র, তেরোনদী, অষ্টধাতু, চৌপদী, চৌমাথা, সাতমাথা, দশদিগন্ত, পঞ্চভূত, শতাব্দী, শতবার্ষিকী, সহস্রাব্দ ইত্যাদি।

দ্বিগু সমাস নির্ণয়ের সহজ উপায়

দ্বিগু সমাসে সাধারণত প্রধান পদ সংখ্যাবাচক এবং পরপদটি বিশেষ্য হয়। সমস্তপদ দ্বারা সমাহার বা সমষ্টি প্রকাশ করে এবং সমস্ত পদটি বিশেষ্যরূপে আত্মপ্রকাশ করে। যেমন চৌ রাস্তার সমাহার = চৌরাস্তা। এখানে চৌ অর্থ চার; এটি সংখ্যাবাচক, পরপদ বিশেষ্য এবং সমস্তপদ সমষ্টিকৃত বিশেষ্য।


গ. কর্মধারয় সমাস:

বিশেষণ ও বিশেষণ পদে কিংবা বিশেষ্য ও বিশেষণ পদে যে সমাস হয় এবং পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায় তাকে কর্মধারয় সমাস বলা হয়। অন্যভাবে বলা যায়, যেখানে বিশেষণ বা বিশেষণ-প্রকৃতির পদের সঙ্গে বিশেষ্য বা বিশেষণভাবাপন্ন পদের সমাস হয় এবং পরপদের অর্থ প্রাধান্য লাভ করে তাকে কর্মধারয় সমাস বলা হয়। যেমন নীলাকাশ = নীল যে আকাশ, সৎ লোক = সৎ যে লোক, রক্তকমল = রক্ত যে কমল, পাণ্ডুলিপি = পাণ্ডু যে লিপি, সুন্দরলতা = সুন্দরী যে লতা, মহাকীর্তি = মহতী যে কীর্তি, মহানবি = মহান যে নবি, কদর্থ = কু যে অর্থ, কদাচার = কু যে আচার, নরাধম = অধম যে নর, আলুসিদ্ধ = সিদ্ধ যে আলু, প্রিয়সখা = প্রিয় যে সখা প্রভৃতি। এখানে প্রত্যেকটি উদাহরণে সমস্তপদে পরপদের অর্থ প্রাধান্য পেয়েছে।

কর্মধারয় সমাসের বৈশিষ্ট্য
১. কর্মধারয় সমাসে উভয়পদে কর্তৃকারকে শূন্য বিভক্তি হয়।
২. কর্মধারয় সমাসে সাধারণত বিশেষণ পদ আগে বসে।
৩. সাধারণত যে-সে, যেই-সেই, যিনি-তিনি, যা-তা ইত্যাদি কর্মধারয় সমাসের ব্যাসবাক্যে ব্যবহৃত হয়।
৪. এ সমাস হয় বিশেষ্য ও বিশেষণে বা বিশেষ্য ও বিশেষণ-ভাবাপন্ন পদের মধ্যে।
৫. সমস্ত পদে পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায়। যেমন: নীল যে আকাশ = নীলাকাশ।
৬. দুটি বিশেষ্য পদে একই ব্যক্তি, প্রাণী বা বস্তু বোঝালে তা কর্মধারয় সমাস হয়। যেমন:  যিনি রাজা তিনি সাহেব = রাজাসাহেব।                      ৭. বিশেষণ ও বিশেষণ পদে কিংবা বিশেষ্য ও বিশেষণ পদে যে সমাস হয় এবং পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায় তাকে কর্মধারয় সমাস বলা হয়।


কর্মধারয় সমাস গঠনের পদ্ধতি : কর্মধারয় সমাসের নিজস্ব ও মৌলিক কিছু গঠন পদ্ধতি আছে। এগুলো কর্মধারয় সমাসের বৈশিষ্ট্যকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।

কর্মধারয় সমাসের গঠন পদ্ধতি
১. সমাসে দুটি বিশেষণ পদ একটি বিশেষ্যকে প্রকাশ করে। যেমন মহান যে নবি = মহানবি।
২. দুটি বিশেষ্য পদে একই ব্যক্তি, প্রাণী বা বস্তু বোঝালে তা কর্মধারয় সমাস হয়। যেমন যিনি মাস্টার তিনি সাহেব = মাস্টার সাহেব, যিনি রাজা তিনিই বাহাদুর = রাজাবাহাদুর প্রভৃতি।
৩. কোনো কাজে পরম্পরা প্রকাশে দুটি কৃদন্ত বিশেষণ পদের সমাস হলে তা কর্মধারয় সমাস। যেমন আগে আসা পরে যাওয়া = আসাযাওয়া, আগে হাসি পরে কান্না = হাসিকান্না প্রভৃতি।
৪. কর্মধারয় সমাসে পূর্বপদে স্ত্রীবাচক বিশেষণ থাকলে কর্মধারয় সমাসে তা পুরুষবাচক হয়ে যায়। যেমন সুন্দরী যে লতা = সুন্দরলতা, মহতী যে কীর্তি = মহাকীর্তি প্রভৃতি।
৫. কর্মধারয় সমাসে বিশেষণবাচক শব্দ ‘মহান’ ও ‘মহা’ প্রভৃতি সাধারণত পূর্বপদে বসে। যেমন মহান যে নবি = মহানবি, মহা যে দেশ = মহাদেশ।
৬. পূর্বপদে ‘কু’ বিশেষণ থাকলে এবং পরপদের প্রথমে স্বরধ্বনি থাকলে ‘কু’-এর স্থলে ‘কদ’ হয়। যেমন কু যে আচার = কদাচার, কু যে অর্থ = কদর্য প্রভৃতি।
৭. পরপদে যদি ‘পুরুষ’ থাকে তাহলে ‘কু’-এর স্থলে ‘কা’ হয়। যেমন কু যে পুরুষ = কাপুরুষ।
৮. পরপদে ‘রাজা’ শব্দ থাকলে কর্মধারয় সমাসে তা পরিবর্তিত হয়ে ‘রাজ’ হয়ে যায়। যেমন মহান যে রাজা = মহারাজ।
৯. বিশেষণ ও বিশেষ্য পদে কর্মধারয় সমাস হলে কখনো কখনো বিশেষণ পদ, বিশেষ্যের পরে চলে যায়। যেমন সিদ্ধ যে ভাত = ভাতসিদ্ধ, সিদ্ধ যে আলু = আলুসিদ্ধ, অধম যে নর = নরাধম।

কর্মধারয় সমাস নির্ণয়ের সহজ পদ্ধতি :
১. এ সমাসে প্রথম পদটি দ্বিতীয় পদের বিশেষণরূপে বিদ্যমান থাকে। এমনকি প্রথম পদটি বিশেষণ না হলেও দ্বিতীয় পদের বিশেষণ রূপ লক্ষ করা যায়।
২. এ সমাসের সমস্তপদে দ্বিতীয় বা পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায়।
৩. এ সমাসে ব্যাসবাক্যের মধ্যে ‘যে’, ‘ন্যায়’, ‘মতো’, ‘রূপ’ প্রভৃতি থাকে। যেমন মিশির মতো কালো = মিশকালো, চাঁদের ন্যায় মুখ = চাঁদমুখ, প্রাণ রূপ পাখি = প্রাণপাখি, কালো যে জল = কালোজল, নীল যে পদ্ম = নীলপদ্ম।

কর্মধারয় সমাসের প্রকারভেদ 

কর্মধারয় সমাস পাঁচ প্রকার। যথা :
১. সাধারণ কর্মধারয় সমাস,
২. মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস,
৩. উপমান কর্মধারয় সমাস,
৪. উপমিত কর্মধারয় সমাস এবং
৫. রূপক কর্মধারয় সমাস।
১. সাধারণ কর্মধারয় সমাস: বিশেষণ ও বিশেষ্যে বা বিশেষ্যে ও বিশেষ্যে বা বিশেষণ ও বিশেষণে বা বিশেষ্যে ও বিশেষণে যে কর্মধারয় সমাস হয় তাকে সাধারণ কর্মধারয় সমাস বলে। এক কথায় বলা যায়, মধ্যপদলোপী, উপমান, উপমিত, রূপক কর্মধারয় সমাস ছাড়া অন্যান্য কর্মধারয় সমাসকে সাধারণ কর্মধারয় সমাস বলা হয়। যেমন
নব যে অন্ন = নবান্ন, উড়ো যে চিঠি = উড়োচিঠি, নীল যে কণ্ঠ = নীলকণ্ঠ, খাস যে কামরা = খাসকামরা, মিষ্ট যে কথা = মিষ্টকথা, দুর যে শাসন = দুঃশাসন, গুণী যে জন = গুণীজন। তেমনি কাঁচকলা, কাটাকাপড়, মহাত্মা, লালগোলাপ, মহারাজ, মহাজন, মহাপুরুষ, নরাধম, ঝরাপাতা, কেনাগোলাম, সেবাযত্ন, ক্ষুধিতপাষাণ, শ্বেতপাথর, খাসমহল, খাসচাকর।
সাধারণ কর্মধারয় সমাসের রূপ
ক্রম পূর্বপদ পরপদ উদাহরণ
১ বিশেষণ বিশেষ্য কালো যে হাত = কালোহাত, কানা যে কড়ি = কানাকড়ি
২ বিশেষণ বিশেষণ যিনি গণ্য তিনি মান্য = গণ্যমান্য, যিনি হৃষ্ট তিনি পুষ্ট = হৃষ্টপুষ্ট
৩ বিশেষ্য বিশেষণ রক্তের মতো লাল = রক্তলাল, ঘন যে শ্যাম = ঘনশ্যাম
৪ বিশেষ্য বিশেষ্য যিনি জজ তিনি সাহেব = জজসাহেব, যিনি রাজা তিনি বাহাদুর = রাজাবাহাদুর।

২. মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস: ব্যাসবাক্যের মধ্যের পদ লোপ পেয়ে যে সমাস হয় তাকে মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস বলা হয়। যেমন ঘরে আশ্রিত জামাই = ঘরজামাই, ঘি মিশ্রিত ভাত = ঘিভাত, সিংহ চিহ্নিত যে আসন = সিংহাসন। তেমনি চালকুমড়া, ইগলপাখি, অষ্টাদশ, উটপাখি, উল্কাপিণ্ড, খড়িমাটি, পদ্মানদী, কুশপুত্তলিকা, কাষ্ঠফলক, কলিযুগ, নাতজামাই, পলান্ন, স্বর্ণাক্ষর, পাষাণহৃদয়, একাদশ, পঞ্চদশ, আক্কেলদাঁত, জীবনবিমা, গণতন্ত্র, রাজতন্ত্র, বাষ্পযান, মোটরযান, জলভাত, ডালভাত, দুধভাত, পূর্তবিভাগ, ভূবিদ্যা, নৌবিভাগ, বিজয়োৎসব, জয়পতাকা, ঘোষণাপত্র, দানপত্র, প্রমাণপত্র, গতিবিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র, প্রবালপ্রাচীর ইত্যাদি।
মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাসের বৈশিষ্ট্য :
১. ব্যাসবাক্যের মাঝে অবস্থিত পদটি লোপ পায়। যেমন আয়ের ওপর কর = আয়কর, ডাক বহনের জন্য গাড়ি = ডাকগাড়ি, দুধ মিশ্রিত ভাত = দুধভাত। তেমনি পলান্ন, ধর্মবোধ, উর্ণাজাল, খেয়াঘাট, গণতন্ত্র, ঘিভাত, চালকুমড়া, জয়পতাকা, চৌচির, ছায়াতরু, জীবনদর্শন, জীবনবিমা, ত্রাণতৎপরতা, দুধসাগু, ধর্মকর্ম, ধ্বনিতত্ত্ব, প্রাণভয়, প্লাবন, বরযাত্রী প্রভৃতি।
২. মধ্যপদ লোপ পেলেও সমস্তপদে ব্যাসবাক্যের পুরো অর্থ বর্তমান থাকে। যেমন দুধ মিশ্রিত যে ভাত = দুধভাত। এখানে ব্যাসবাক্যের মধ্যপদ সম্পূর্ণ লোপ পেলেও সমস্তপদে ব্যাসবাক্যটির অর্থ অনুধাবনে কোনো কষ্ট হয় না।

৩. উপমান কর্মধারয় সমাস: উপমান পদের সঙ্গে সাধারণ ধর্মবাচক পদের যে সমাস হয় তাকে উপমান কর্মধারয় সমাস বলা হয়। উপমান কর্মধারয় সমাসে একটি বিশেষণ পদ থাকে এবং কোনো উপমেয় পদের উল্লেখ থাকে না। যেমন শশকের মতো ব্যস্ত = শশব্যস্ত, কাজলের মতো কালো = কাজলকালো, কুসুমের মতো কোমল = কুসুমকোমল। তেমনি গোবেচারা, তুষারধবল, রক্তলাল, হস্তিমূর্খ, বজ্রকণ্ঠ, বকধার্মিক প্রভৃতি।

উপমান কর্মধারয় সমাসের বৈশিষ্ট্য 
১. উপমান পদের সঙ্গে সাধারণ ধর্মবাচক পদের সমাস হয়। যেমন রক্তের ন্যায় লাল = রক্তলাল। এখানে ‘লাল’ সাধারণ ধর্ম।
২. উপমান কর্মধারয় সমাসে একটি বিশেষণ পদ থাকে। যেমন দুগ্ধের ন্যায় ধবল। এখানে ‘ধবল’ হচ্ছে বিশেষণ।
৩. উপমান কর্মধারয় সমাসে সাধারণ ধর্মবাচক পদের উপস্থিতি আবশ্যক। যেমন মিশির মতো কালো। এখানে ‘কালো’ হলো সাধারণ ধর্ম।

৪. উপমিত কর্মধারয় সমাস:  উপমান ও উপমেয় পদের মধ্যে যে কর্মধারয় সমাস হয় তাকে উপমিত কর্মধারয় সমাস বলে। অন্যভাবে বলা যায়, সাধারণ গুণের উল্লেখ না করে উপমান ও উপমেয় পদের মধ্যে যে সমাস হয় তাকে উপমিত কর্মধারয় সমাস বলা হয়। যেমন চাঁদের মতো মুখ = চাঁদমুখ, কর কমলের ন্যায় = করকমল, সোনার মতো মুখ = সোনামুখ। তেমনি রক্তকমল, ফুলবাবু, মুখচন্দ্র, চরণতল, চন্দ্রমুখ, পদ্মচক্ষু, হাঁড়িমুখ, চাঁদবদন প্রভৃতি।

উপমিত কর্মধারয় সমাসের বৈশিষ্ট্য
১. এ সমাসের ব্যাসবাক্যের দুটি পদই বিশেষ্য হয়।
২. সাধারণ গুণের উল্লেখ না করে উপমান ও উপমেয় পদের মধ্যে সমাস হয়।
৩. উপমেয় পদটি সাধারণত পূর্বে বসে।
৪. এ সমাসে সাধারণ ধর্মবাচক পদের উল্লেখ থাকে না।

৫. রূপক কর্মধারয় সমাস: উপমান ও উপমেয়কে অভিন্ন কল্পনা করে উপমান পদ ও উপমেয় পদের মধ্যে যে কর্মধারয় সমাস হয়, তাকে রূপক কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন কাল রূপ চক্র = কালচক্র, প্রাণ রূপ প্রিয় = প্রাণপ্রিয়, বিদ্যা রূপ ধন = বিদ্যাধন, রক্ত রূপ সমুদ্র = রক্তসমুদ্র ইত্যাদি। তেমনি কথামৃত, কালস্রোত, ক্রোধানল, বিষাদসিন্ধু, রচনামৃত, হৃদয়পত্র, মনমাঝি, জ্ঞানলোক, জীবনতরী, জ্ঞানবৃক্ষ, কালচক্র, মোহনবাঁশি প্রভৃতি।

রূপক কর্মধারয় সমাসের বৈশিষ্ট্য
১. এ সমাসে উপমেয় পদ পূর্বে বসে এবং উপমান পদ পরে বসে।
২. সমস্যমান পদে রূপ যোগ করে ব্যাসবাক্য গঠন করা হয়।


ঘ. তৎপুরুষ সমাস:

যে সমাস নিষ্পন্ন হওয়ার পর পূর্বপদে বিদ্যমান দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী প্রভৃতি বিভক্তি লোপ পায় এবং সমস্তপদে পরপদের অর্থ প্রাধান্য লাভ করে তাকে তৎপুরুষ সমাস বলা হয়। যেমন
(১) কলাকে বেচা = কলাবেচা, (২) ছায়া দ্বারা শীতল = ছায়াশীতল, (৩) ছাত্রদের জন্য আবাস = ছাত্রাবাস, (৪) জেল হতে মুক্ত = জেলমুক্ত, (৫) অন্নের জন্য চিন্তা = অন্নচিন্তা, (৬) বনে জাত = বনজাত (বনজ)।
এখানে ১ নম্বর ব্যাসবাক্যের পূর্বপদে দ্বিতীয়া বিভক্তি, ২ নম্বর ব্যাসবাক্যের পূর্বপদে তৃতীয়া বিভক্তি, ৩ নম্বর ব্যাসবাক্যের পূর্বপদে চতুর্থী বিভক্তি, ৪ নম্বর ব্যাসবাক্যের পূর্বপদে পঞ্চমী বিভক্তি, ৫ নম্বর ব্যাসবাক্যের পূর্বপদে ষষ্ঠী বিভক্তি এবং ৬ নম্বর ব্যাসবাক্যের পরপদে সপ্তমী বিভক্তি লোপ পেয়ে সমস্তপদগুলো গঠন করেছে। সমস্তপদসমূহে পরপদের অর্থ প্রাধান্য পেয়েছে।

তৎপুরুষ সমাসের বৈশিষ্ট্য
১. পূর্বপদে কর্ম কারকের বিভক্তিবাচক অনুসর্গযুক্ত পদের সঙ্গে অথবা সম্বন্ধপদের সঙ্গে সমাস হয়।
২. পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায়।
৩. পূর্বপদে দ্বিতীয়া থেকে সপ্তমী পর্যন্ত বিভিন্ন বিভক্তি থাকে।
৪. সমাস গঠনে পূর্বপদের বিভক্তিসমূহ লোপ পায়।

তৎপুরুষ সমাস নির্ণয়ের সহজ পদ্ধতি
১. অলুক তৎপুরুষ সমাস ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের বিভক্তির লোপ পায়।
২. সমস্তপদে পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায়।
৩. তৎপুরুষ সমাসে দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী, ষষ্ঠী ও সপ্তমী বিভক্তি লোপ পায়।


তৎপুরুষ সমাসের প্রকারভেদ:

বিভক্তি, বিভক্তি লোপ, বিভক্তি-অলোপ ও প্রকৃতি অনুসারে তৎপুরুষ সমাস নয় প্রকার। যথা :
১. দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস ৬. সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস
২. তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস ৭. নঞ্ তৎপুরুষ সমাস
৩. চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস ৮. উপপদ তৎপুরুষ সমাস এবং
৪. পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস ৯. অলুক তৎপুরুষ সমাস।
৫. ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস


১. দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস: পূর্বপদে দ্বিতীয়া বিভক্তি অর্থাৎ ‘কে, রে’ প্রভৃতি বিভক্তিচিহ্ন লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন জ্ঞানকে অর্জন = জ্ঞানার্জন, দেশকে রক্ষা = দেশরক্ষা প্রভৃতি। তেমনি সংখ্যাতীত, রথদেখা, বঙ্গভঙ্গ, দেশত্যাগ, জাতিগত, চিরসুখী, আত্মরক্ষা, ভুঁইফোঁড়, চরণাশ্রিত, শরনিক্ষেপ, মাল্যদান, মাতৃহত্যা, দেশবিভাগ, নদীশাসন প্রভৃতি।

২. তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস: পূর্বপদে তৃতীয়া বিভক্তি অর্থাৎ ‘দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক’ প্রভৃতি বিভক্তিচিহ্ন লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন জন দ্বারা আকীর্ণ = জনাকীর্ণ, ঈশ্বর কর্তৃক দত্ত = ঈশ্বরদত্ত প্রভৃতি। তেমনি বিদ্যাহীন, বাদুড়চোষা, পাঁচকম, পদদলিত, নদীবাহিত, দেশবরেণ্য, তুষারাবৃত, তাসখেলা, জ্ঞানশূন্য, জবানবন্দি, ক্ষুধার্ত, পুষ্পাঞ্জলি প্রভৃতি।

৩. চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস: পূর্বপদে চতুর্থী বিভক্তি অর্থাৎ ‘কে, রে’ প্রভৃতি বিভক্তিচিহ্ন লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন অন্নের জন্য চিন্তা = অন্নচিন্তা, মুক্তির জন্য যুদ্ধ = মুক্তিযুদ্ধ প্রভৃতি। তেমনি রান্নাঘর, সংগীতাসর, রণসজ্জা, দেবদত্ত, ডাকঘর, চিড়িয়াখানা, বসতবাড়ি, বিয়েপাগলা, মৈত্রীসম্বন্ধ প্রভৃতি।

৪. পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস: পূর্বপদে পঞ্চমী বিভক্তি অর্থাৎ ‘হইতে/হতে, থেকে, চেয়ে’ প্রভৃতি বিভক্তিচিহ্ন লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন আগা থেকে গোড়া = আগাগোড়া, জন্ম হতে অন্ধ = জন্মান্ধ। তেমনি স্বর্গভ্রষ্ট, লোকভয়, রোগমুক্ত, মেঘমুক্ত, মুখভ্রষ্ট, পদচ্যুত, নীতিভ্রষ্ট, ধর্মভীরু, দুগ্ধজাত, দলছাড়া, ঋণমুক্ত প্রভৃতি।

৫. ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস: পূর্বপদে বিদ্যমান ষষ্ঠী বিভক্তি অর্থাৎ ‘র, এর’ প্রভৃতি বিভক্তিচিহ্ন লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন অশ্বের পদ = অশ্বপদ, গৃহের কর্তা = গৃহকর্তা, ছাগীর দুগ্ধ = ছাগদুগ্ধ প্রভৃতি। তেমনি তিলার্ধ, অর্ধপথ, অম্লবৃষ্টি, ঝরনাধারা, জীবনমান, জনগণ, জনপথ, গণপতি, কার্যপদ্ধতি, কর্মকর্তা, কবিগুরু, ধর্মজ্ঞা, নদীভাঙন, প্রাণহানি, বনস্পতি, বিধিলিপি, মতভেদ, মাঝরাত্রি, মানবধর্ম প্রভৃতি।

৬. সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস: পূর্বপদে সপ্তমী বিভক্তি অর্থাৎ ‘এ, য়, তে, এতে’ প্রভৃতি বিভক্তিচিহ্ন লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন অকালে পক্ব = অকালপক্ব, রাতে কানা = রাতকানা, বনে ভোজন = বনভোজন প্রভৃতি। তেমনি সর্বশ্রেষ্ঠ, ভূতপূর্ব, পাপমতি, নরাধম, দৃষ্টিগোচর, জলমগ্ন, কবিশ্রেষ্ঠ, অকালমৃত্যু, রথারোহণ, বস্তাবন্দি প্রভৃতি।

৭. নঞ্ তৎপুরুষ সমাস: পূর্বপদে নঞর্্্থক বা না-বাচক অব্যয় অর্থাৎ না, নেই, নাই, নয় প্রভৃতি ব্যবহৃত হয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে নঞ্্ তৎপুরুষ সমাস বলা হয়। বাংলায় ব্যবহৃত নঞর্্্থক অব্যয়গুলোর মধ্যে ‘নয়, না, নেই, অ, অন, অনা, আ, গর, ন, নি, বি, বে’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। নঞ্্ স্বরবর্ণের পূর্বে বসলে ‘অন’ এবং ব্যঞ্জনবর্ণের পূর্বে বসলে ‘অ’ হয়। যেমন নয় কাতর = অকাতর, ন অশন = অনশন, নয় বুঝ = অবুঝ, নয় সরকারি = বেসরকারি প্রভৃতি। তেমনি নাতিদীর্ঘ, নাস্তিক, নামঞ্জুর, নীরব, বেআইনি, নির্জন, নাস্তিক প্রভৃতি।

৮. উপপদ তৎপুরুষ: কৃদন্ত পদের সঙ্গে উপপদের যে সমাস হয় তাকে উপপদ তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন দ্রুত গমন করে যে = দ্রুতগামী, গায়ে পড়া যে = গায়েপড়া, জাদু করে যে = জাদুকর, শিরো ধার্য যা = শিরোধার্য, বর্ণ চুরি করে যে = বর্ণচোরা, যে আকাশে চড়ে = খেচর প্রভৃতি। তেমনি কল্পনাবিলাসী, কাঠফাটা, ক্ষীণজীবী, গৃহস্থ, জলদ, ধামাধরা, ধীরগতি, পকেটমার, অগ্রজ, আত্মজ, মাছিমারা, ইন্দ্রজিৎ, কুম্ভকার, নিশাচর, নভশ্চর, স্বর্ণকার, মুখস্থ, পাত্রস্থ, ছন্নছাড়া, বাস্তুহারা, দিশাহারা, চিত্রকর, বুদ্ধিজীবী, শ্রমজীবী, পথহারা, গৃহহারা, ভেকধারী, জটাধারী, পারদর্শী প্রভৃতি।

৯. অলুক তৎপুরুষ সমাস: অলুক শব্দের অর্থ অলোপ বা লোপ না হওয়া বা লোপ না পাওয়া। পূর্বপদের বিভক্তি লোপ না পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে অলুক তৎপুরুষ সমাস বলা হয়। যেমন খেলার মাঠ = খেলারমাঠ, ঘোড়ার ডিম = ঘোড়ার-ডিম, সোনার প্রতীমা = সোনার-প্রতীমা, চোখের বালি = চোখের-বালি। তেমনি তেলেভাজা, পেটের-ভাত, সোনার-বাংলা, গানের-আসর প্রভৃতি।

ঙ. অব্যয়ীভাব সমাস

অব্যয় ও ভাব শব্দ দুটি যুক্ত হয়ে অব্যয়ীভাব শব্দ গঠিত হয়। সুতরাং শব্দটির আভিধানিক অর্থ অব্যয়ের ভাব। যে সমাসে অব্যয়ের ভাব বিদ্যমান সেটিই অব্যয়ীভাব সমাস। এটি আসলে অব্যয় নয় কিন্তু অব্যয়ের একটি অনুভব এখানে পাওয়া যায়। অব্যয়পদযোগে নিষ্পন্ন সমাসের পূর্বপদে যদি অব্যয়ের অর্থের প্রাধান্য বিদ্যমান থাকে তাহলে তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলা হয়।

অব্যয়ীভাব সমাসের সংজ্ঞার্থ: অব্যয় পদ পূর্বে বসে যে সমাস হয় এবং যাতে অব্যয় পদের বা পূর্বপদের অর্থের প্রাধান্য থাকে তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে। যেমন মরণ পর্যন্ত = আমরণ, জানু পর্যন্ত লম্বিত = আজানুলম্বিত ইত্যাদি। অব্যয়ীভাব সমাসে কেবল অব্যয়ের অর্থযোগে ব্যাসবাক্য রচিত হয়। উপসর্গ একপ্রকার অব্যয়। তাই উপসর্গযোগে গঠিত সব শব্দই অব্যয়ীভাব সমাস। এ সমাসের ব্যাসবাক্যে অব্যয়ের নাম বা প্রকৃতির উল্লেখ করা হয় না। কেবল অব্যয়ের অর্থ সহযোগে ব্যাসবাক্য গঠিত হয়।
নানা অর্থে সাধিত অব্যয়ীভাব সমাসের কতিপয় উদাহরণ :

১. সমীপ্য (নৈকট্য) উপ : কূলের সমীপে = উপকূল, কণ্ঠের সমীপে = উপকণ্ঠ, নদীর সমীপে = উপনদী।
২. বিপসা ( পৌনঃপুনিকতা) (প্রতি, অনু) : দিন দিন = প্রতিদিন, রাত রাত = প্রতিরাত।
৩. অভাব (নিঃ = নির) : ভাবনার অভাব = নির্ভাবনা।
৪. সাদৃশ্য (উপ) : শহরের সদৃশ = উপশহর, বনের সদৃশ = উপবন, জেলার সদৃশ = উপজেলা।
৫. অতিক্রান্ত (উৎ) : বেলাকে অতিক্রান্ত = উদ্বেল, শৃঙ্খলাকে অতিক্রান্ত = উচ্ছৃঙ্খল, বাহুকে অতিক্রান্ত = উদ্বাহু।
৬. ক্ষুদ্র অর্থে (উপ) : গ্রহের ক্ষুদ্র = উপগ্রহ, নদীর ক্ষুদ্র = উপনদী, জেলার ক্ষুদ্র = উপজেলা প্রভৃতি।
৭. পশ্চাৎ (অনু) : পশ্চাৎ গমন = অনুগমন, পশ্চাৎ ধাবন = অনুধাবন ইত্যাদি।
৮. বিরোধ (প্রতি) : বিরুদ্ধ হিংসা = প্রতিহিংসা, বিরুদ্ধ বাদ = প্রতিবাদ, বিরুদ্ধ ক্রিয়া = প্রতিক্রিয়া।
৯. পর্যন্ত (আ) : পা থেকে মাথা পর্যন্ত = আপাদমস্তক, সমুদ্র থেকে হিমাচল পর্যন্ত = আসমুদ্রহিমাচল।
১০. প্রতিনিধি অর্থে (প্রতি) : প্রতিচ্ছবি, প্রতিমুখ, প্রতিধ্বনি, প্রতিবিম্ব, প্রতিচ্ছায়া।
১১. ঈষৎ (আ) : ঈষৎ নত = আনত, ইষৎ উষ্ণ = ঈষদুষ্ণ, ঈষৎ রক্তিম = আরক্তিম।
১২. অভাব (নিঃ = নির) : নুনের অভাব = আলুনি, আমিষের অভাব = নিরামিষ।
১৩. অনতিক্রম্যতা (যথা) : যোগ্যতাকে অতিক্রম না করে = যথাযোগ্য, রীতিকে অতিক্রম না করে = যথারীতি।
১৪. পূর্ণ বা সমগ্র অর্থে (পরি বা সম) : পরিপূর্ণ, পরিব্যাপ্তি, সম্পূর্ণ ইত্যাদি।
১৫. দূরবর্তী অর্থে (প্র, পর) : অক্ষির অগোচর = পরোক্ষ, জয় থেকে দূরে = পরাজয়।


চ. বহুব্রীহি সমাস

পাণিনির ব্যাকরণ থেকে বহুব্রীহি সমাস বাংলায় গৃহীত হয়েছে। বিদ্যাসাগর রচিত ব্যাকরণ কৌমুদীতে এর ইংরেজি সমার্থক শব্দ হিসেবে বলা হয়েছে Attributive Compound। ব্যাকরণ কৌমুদীর ব্যাখ্যামতে বলা যায়, একাধিক প্রথমান্ত পদ অন্য বিশেষ্যের কিছুর অর্থ প্রকাশ করলে বহুব্রীহি সমাস হয়। ‘ব্রীহি’ শব্দের অর্থ ধান। সে হিসেবে বহুব্রীহি শব্দের অর্থ হয় ‘বহুধান’। প্রকৃতপক্ষে বহুব্রীহি অর্থ বহুধান না বুঝিয়ে এমন একজন ব্যক্তিকে বুঝিয়ে থাকে যিনি অবস্থাসম্পন্ন। বহুব্রীহি শব্দের অর্থ দিয়ে অনুধাবন করা যায় যে, এ সমাসের পূর্বপদ বা পরপদ কোনোটির অর্থ সমস্তপদে প্রধানরূপে প্রকাশ পায় না। বরং, অন্য একটি বিশেষ অর্থ নির্দেশ করে।


বহুব্রীহি সমাসের সংজ্ঞার্থ:  যে সমাসে সমস্যমান পদগুলোর কোনোটির অর্থ প্রধানভাবে না বুঝিয়ে অন্য কোনো কিছুর অর্থ বুঝিয়ে থাকে তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন: দশ আনন যার = দশানন (রাবণ), পঙ্কে জন্মে যে = পঙ্কজ (পদ্মফুল)।
দশ মুখ যার আছে এমন কোনো সত্তাকে দশানন শব্দ দ্বারা নির্দেশিত হলেও, দশানন বলতে ভারতীয় পৌরাণিক চরিত্র রাবণকে বোঝায়। পঙ্কজ শব্দ বিশ্লেষণ করলে আমরা পাই এমন একটি জিনিস, যা পঙ্কে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু ‘পঙ্কজ’ বলতে কেবল পদ্মফুলকে প্রকাশ করা হয়।

বহুব্রীহি সমাস নির্ণয়ের সহজ উপায় :
১. বহুব্রীহি সমাসে সমস্যমান পদসমূহের কোনোটির অর্থ প্রাধান্য পায় না। বরং, সমস্তপদ অন্য একটি বিশেষ অর্থ প্রকাশ করে। দশ হাত যার = দশহাতি; এখানে দশহাতি বলতে দশ হাত বিশিষ্ট কাউকে বোঝায় না। বরং, ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত একজন দেবীকে বোঝায়।
২. ব্যাসবাক্যে ‘যে’ বা ‘যিনি’ বা ‘যার’ প্রভৃতি শব্দ থাকে। চাঁদের মতো মুখ যার = চাঁদমুখ।
৩. বহুব্রীহি সমাসের সমস্তপদ বিচিত্র রকমের শব্দ সহযোগে গঠিত হতে পারে। যেমন হত হয়েছে যার শ্রী = হতশ্রী, মেঘের মতো বরন যার = মেঘবরন প্রভৃতি।


বহুব্রীহি সমাসের শ্রেণিবিভাগ

পদের বিন্যাস, বৈশিষ্ট্য, ধরন এবং সমস্তপদ ও ব্যাসবাক্যের প্রকৃতি অনুসারে বহুব্রীহি সমাসকে ১২ ভাগে ভাগ করা হয়। ভাগগুলোর সংজ্ঞা উদাহরণসহ নিচে প্রদান করা হলো :
১. সমানাধিকরণ বহুব্রীহি: পূর্বপদ বিশেষণ ও পরপদ বিশেষ্য হলে তাকে সমানাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন সুন্দর হৃদয় যার = সুহৃদ; সু বুদ্ধি যার = সুবুদ্ধি ইত্যাদি। এখানে সুন্দর ও সুবুদ্ধি পূর্বপদ এবং বিশেষ্য। উভয়ে মিলে এই সমাস গঠিত হয়েছে বলেই একে সমানাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস বলা হয়।

২. ব্যধিকরণ বহুব্রীহি: বহুব্রীহি সমাসের পূর্বপদ ও পরপদ বিশেষ্য-বিশেষ্য সংগঠিত হলে এবং এর যেকোনো একটি পদ ব্যাসবাক্যে অধিকরণ সম্পর্ক প্রকাশ করলে তাকে ব্যধিকরণ বহুব্রীহি সমাস বলা হয়। সংক্ষেপে বলা যায়, পূর্বপদ বিশেষণ না হয়ে অন্যপদ হলে তাকে ব্যধিকরণ বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন বীণা পাণিতে যার/বীণাপাণি। এখানে বীণা (বাদ্যযন্ত্র) বা পাণি (হাত) উভয়ই বিশেষ্যপদ।

৩. ব্যতিহার বহুব্রীহি: একই জাতীয় বিশেষ্যপদ পরপর বসে একই কাজের একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া বোঝালে তাকে ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন হাতে হাতে যে যুদ্ধ = হাতাহাতি; হাত শব্দের পুনঃ ব্যবহার করে একটি কর্মপ্রক্রিয়াকে উপস্থাপন করা হয়েছে। তেমনি কোলাকুলি, চোখাচোখি, ফাটাফাটি, টানাটানি, বকাবকি, হাসাহাসি, লাঠালাঠি, গালাগালি, চুলাচুলি, কানাকানি ইত্যাদি।

৪. মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি: ব্যাসবাক্যের মধ্যবর্তী পদ লোপ পেয়ে যে বহুব্রীহি সমাস হয় তাকে মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন সোনার মতো উজ্জ্বল মুখ যার = সোনামুখী। এখানে ব্যাসবাক্যের মধ্যপদটি লুপ্ত হয়ে বহুব্রীহি সমাস সৃষ্টি হয়েছে। আরও কিছু উদাহরণ : একদিকে চোখ যার = একচোখা, গজের মতো আনন = গজানন। তেমনি মীনাক্ষী, স্বর্ণাভ, পদ্মমুখী, মেঘবরন, শ্বাপদ, হুতোমচোখি প্রভৃতি।

৫. সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি: সংখ্যাবাচক পূর্বপদ ও পরপদ বিশেষ্যের মধ্যে অনুষ্ঠিত সমাসে সমস্তপদ বিশেষণ হলে সে বহুব্রীহি সমাসকে সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন তিন মাথার সমাহার = তেমাথা, সে (তিন) তার যার = সেতার; ত্রি (তিন) পদ যার = ত্রিপদ ইত্যাদি। এখানে সংখ্যাবাচক পূর্বপদের সঙ্গে পরপদ বিশেষ্যের সমাসের ফলে যে সমস্ত পদ পাওয়া গিয়েছে তা বিশেষণ। তেমনি তেপায়া, পঞ্চানন, দুমুখো, চতুর্ভুজ, পাঁচহাতি, দ্বিচক্র, একতারা, দ্বিমাত্রিক, দশানন, দ্বীপ, একরোখা, ত্রিলোচনা, ত্রিশূল, পঞ্চনদ, বহুমুখী, ষড়ভুজ প্রভৃতি।

৬. নঞ্ বহুব্রীহি: না-বোধক অব্যয় পদের সঙ্গে বিশেষ্য পদের বহুব্রীহি সমাস হলে তাকে নঞ্ বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন বে (নেই) তার যার = বেতার, নি (নেই) দোষ যার = নির্দোষ, নেই যার হায়া = বেহায়া, নেই যার আক্কেল = বেআক্কেল, নেই যার জ্ঞান = অজ্ঞান, নেই যার বুঝ = অবুঝ ইত্যাদি। তেমনি নির্লজ্জ, বেপরোয়া, নিখুঁত, অনাচার, অহিংস, অনীহা, অপুত্রক, আনাড়ি, নির্বিঘ্ন, নিষ্প্রাণ, নির্বোধ, অরাজক, অথই, অসীম, অনাচার, অতন্দ্র, বেইমান, বেকার, নিখোঁজ, নিরন্তর, নিরক্ষর, নির্মোহ, নির্দয়, নিদাঘ, নিঃসন্তান প্রভৃতি।

৭. প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি: বহুব্রীহি সমাসের পরে আ, এ, ও ইত্যাদি প্রত্যয় যুক্ত হয়ে যে সমাস তৈরি হয় তাকে প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন এক দিকে চোখ যার = একচোখ + আ = একচোখা, ঘরের দিকে মুখ যার = ঘরমুখ + ও = ঘরমুখো, দুই দিকে যার মন = দো + মন + আ = দোমনা, দুই যার তল = দো + তল + আ = দোতলা, নাই (নি) খরচ যার = নিখরচ + আ = নিখরচা প্রভৃতি। তেমনি একমুখা, দোটানা, একঘরে, উনপাঁজুরে, দোনলা, অকেজো, দশভুজা ইত্যাদি।

৮. উপমান বহুব্রীহি: যে বহুব্রীহি সমাসে একটি উপমান পদ থেকে তুলনা বোঝায়, তার নাম উপমান বহুব্রীহি সমাস। যেমন কমলের ন্যায় অক্ষি যার = কমলাক্ষি। এখানে কমল (পদ্মফুল)-এর সঙ্গে অক্ষি (চক্ষু)-এর তুলনা করে বহুব্রীহি সমাস গঠিত হয়েছে।

৯. সহার্থক বহুব্রীহি: যে বহুব্রীহি সমাসের সঙ্গে অর্থের ‘স’ প্রভৃতি শব্দ পূর্বে যুক্ত থাকে তাকে সহার্থক বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন জলের সঙ্গে বর্তমান = সজল, বিনয়ের সাথে বর্তমান = সবিনয়। এখানে বাক্যদ্বয়ে বর্তমানে যুক্ত আছে অর্থে ‘স’ ধ্বনি ব্যবহৃত হয়েছে। তেমনি সহোদর, সমেত, সপ্রাণ, সজাগ প্রভৃতি।

১০. অলুক বহুব্রীহি: যে বহুব্রীহি সমাসে পূর্বপদের বিভক্তির লোপ হয় না তাকে অলুক বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন হাতে খড়ি দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = হাতেখড়ি। এখানে হাত শব্দের সাথে যুক্ত এ-প্রত্যয় লোপ পায় নাই। তাই, একে অলুক বহুব্রীহি বলা হয়েছে। তেমনি মাথায় পাগড়ি যার = মাথায় পাগড়ি, মাথায় ছাতা, মুখে-মধু, পায়ে-বেড়ি, কথায় পটু, গানে মুগ্ধ, লেজে-গোবরে প্রভৃতি।

১১. অন্ত্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস: যে বহুব্রীহি সমাসের ব্যাসবাক্যের শেষপদ লোপ পেয়ে যায় তাকে অন্ত্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস বলা হয়। যেমন:  সত্তর বছর বয়স যার = সত্তরবছুরে, দশ মণ পরিমাণ যা = দশমণি ইত্যাদি।

১২. নিপাতনে সিদ্ধ বহুব্রীহি সমাস: যে বহুব্রীহি সমাস কোনো নিয়মের অধীনে নয় সে বহুব্রীহি সমাসকে নিপাতনে সিদ্ধ বহুব্রীহি সমাস বলা হয়। যেমন দুই দিকে অপ যার = দ্বীপ।


 অন্যান্য সমাস

উপরে বর্ণিত ছয়টি সমাস ছাড়াও আরও কয়েকটি সমাস বাংলা ভাষায় দেখা যায়। সেগুলো হলো: ১. প্রাদি সমাস; ২. নিত্য সমাস; ৩. উপপদ সমাস; ৪. বাক্যাশ্রয়ী সমাস এবং ৫. সুপসুপা সমাস।

১. প্রাদি সমাস: প্র, পরা উপসর্গের সঙ্গে তৎপুরুষ সমাস হলে তাকে প্রাদি সমাস বলে। যেমন:  সম্ (সম্যক্) যে আদর = সমাদর।
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, এটি তৎপুরুষের রূপান্তর। সুকুমার সেন মনে করেন, প্রাদি সমাস মূলত নিত্য সমাসের একটি শাখা। আবার ড. মুহম্মদ এনামুল হকের মতে, এটি অব্যয়ীভাব সমাসের একটি বিশেষ রূপ।

২. নিত্য সমাস: যে সমাসে সমস্যমান পদ দ্বারা সমাস-বাক্য হয় না, অন্য পদের দ্বারা সমস্ত পদের অর্থ প্রকাশ করতে হয় তাকে নিত্য সমাস বলে। অর্থাৎ যে সমাসে সমস্যমান পদগুলো সর্বদা সমাসবদ্ধ থাকে এবং ব্যাসবাক্যের প্রয়োজন হয় না, সে সমাসকে নিত্য সমাস বলা হয়। এ সমাসের ব্যাসবাক্যের প্রারম্ভে ‘অন্য’ বা ‘কেবল’ প্রভৃতি শব্দ বসে। যেমন অন্য গ্রাম = গ্রামান্তর, অন্য দেশ = দেশান্তর, কেবল দর্শন = দর্শনমাত্র, কেবল যাওয়া = যাওয়ামাত্র, কেবল বলা = বলামাত্র।

৩. উপপদ সমাস: কৃদন্ত-পদের পূর্বে যে পদ থাকে তাকে উপপদ বলে এবং উপপদের সঙ্গে কৃদন্ত-পদের যে সমাস হয় তাকে উপপদ সমাস বলে। যেমন কুম্ভ করে যে = কুম্ভকার।

৪. বাক্যাশ্রয়ী সমাস: এ সমাস অনেকটা বাক্যের রূপ নিয়ে বাক্যের আশ্রয়ে থাকে। যে সমাসে সমাসবদ্ধ পদগুলো একমাত্রায় লেখা হয় না, এমনকি সবসময় পদসংযোজক চিহ্ন দ্বারাও যুক্ত করে লেখা হয় না বরং বিচ্ছিন্নভাবে লেখা হয়, সে সমাসকে বলা হয় বাক্যাশ্রয়ী সমাস। যেমন বসে আঁকো প্রতিযোগিতা, সব পেয়েছির দেশ, ইন্দ্র রাজার কন্যা ইত্যাদি।

৫. সুপসুপা সমাস: বিভক্তিযুক্ত এক পদের সঙ্গে বিভক্তিযুক্ত অন্য পদের যে সমাস হয় তাকে সুপসুপা সমাস বলা হয়। যেমন: রাত্রির মধ্য = মধ্যরাত, পূর্বে ভূত = ভূতপূর্ব, মধ্যের অহ্ন = মধ্যাহ্ন।

——————————————-

বাংলায় সমাসের স্বাধীনতা

সংস্কৃত ব্যাকরণ হতে আগত বাংলা ব্যাকরণের যেসব বিষয় বাংলায় তেমন সুবিধা করতে পারেনি সেগুলোর মধ্যে সমাস হচ্ছে অন্যতম। বাংলায় ব্যক্তিবিশেষের বাক্যরীতি গঠনের বৈশিষ্ট্য, প্রকাশভঙ্গি, শ্রুতিমাধুর্য এবং বাক্যের নান্দনিকতা রক্ষায় প্রাজ্ঞিক অনুভূতির উপর সমাসের প্রযোগ নির্ভরশীল। বাংলায় সংস্কৃতের সমাসবিধির প্রভাব খুবই নগণ্য এবং শব্দচয়নে তা উপেক্ষা করলেও ক্ষেত্রেবিশেষে বাংলা শব্দের মর্যাদা বা প্রমিতরূপের কেনো বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা থাকে না। শব্দ উচ্চারণের সঙ্গে যেহেতু ধ্বনির সৃষ্টি হয়, তাই সেই ধ্বনি শ্রুতিমধুর হয়ে ওঠে কি না সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই সমাস নয়, এখানে শ্রুতিমাধুর্যই মূল বিবেচ্য বিষয়। দ্বিতীয়ত, কোনো একটি পদ সমাসবদ্ধ হওয়া সঙ্গে সঙ্গে ওই সমাসবদ্ধ পদের ওপর পাঠকের দৃষ্টি পড়ে।  তাই এমন কোনো সমাসবদ্ধ পদ সৃষ্টি করা সমীচীন নয়, যা দৃষ্টিকটু হয়।

সমাসের পুংলিঙ্গায়ন
সমাসের কাজ শ্রুতিমাধুর্য রক্ষা করা। বাংলায় এর একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে। বাংলাভাষীর কাছে সাধারণত ছোটো ছোট সহজ-উচ্চার্য শব্দই শ্রুতিমধুর হিসেবে প্রতিভাত। তাই অযথা বড়ো শব্দ কিংবা সমাসবদ্ধ পদ দৃষ্টিনন্দন, সহজোচ্চারণ, শ্রুতিমাধুর্যের হানিকর বলে বিবেচিত হয়। তাই যে বিষয়টি সমাসবদ্ধ না করেও  সহজে প্রকাশ করা যায় তা সমাসবদ্ধ করে বড়ো পদে পরিণত করা বাংলায় অহেতুক গণ্য করা হয়।
 
সমাসের রীতি প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃতেই পুরোপুরি অনুসৃত হয়। বাংলায় তা সুবিধাবাদের মতো সুবিধাজনক ক্ষেত্রে এবং সুবিধাবাদীর মতো বক্তা বা লেখকের ইচ্ছানুসারে শ্রুতিমাধুর্য বিবেচনায় প্রয়োগ করা হলেও প্রয়োগ-বর্জনকে দূষণীয় মনে করা হয় না। বাংলা সমাস-এ বৈশিষ্ট্যকে সিদ্ধ করার জন্য অসংলগ্ন সমাসের সৃষ্টি। যার কল্যাণে নির্ভুলভাবে কিন্তু ফাঁক রেখে সমাসবদ্ধ পদ লেখা যায়।
 
যেমন : বিজয় উদ্‌যাাপনের নিমিত্ত যে দিবস= বিজয় দিবস। তেমনি শহিদ দিবস, পরিকল্পনা কমিশন, সোনার বাংলা, গোরুর গাড়ি, কলুর বলদ, চন্দনাইশ যুব সমাজ, হাতে তৈরি, গাছে পাকা, বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সেতু, স্বাধীনতা দিবস, বাংলা বানান সংস্কার কমিটি, বিশ্ব কবি সম্মেলন, জেলা প্রশাসক, ঘোড়ার ডিম, যোগাযোগ মন্ত্রী প্রভৃতি।
 
উপর্যুক্ত শব্দরাশিগুলো বিচ্ছিন্নভাবে লেখা হলেও প্রকৃতপক্ষে এগুলো প্রত্যেকটি সমাস এবং সংলগ্ন নয় বলে অসংলগ্ন সমাস বলা হয়। সংস্কৃতে এগুলো অসংলগ্নভাবে লেখার কোনো সুযোগ নেই। তবে বাংলায় চলে। এবার সমাস-এ পুংলিঙ্গায়ন কী তা দেখা যাক।
 
প্রথমে একটা উদাহারণ দিয়ে আলোচনা শুরু করা যায়। ‘হংসডিম্ব’ একটি সমাসবদ্ধ পদ। যাকে ব্যাকরণের ভাষায় সমস্তপদ বলা হয়। ‘হংসডিম্ব’ শব্দের শাব্দিক অর্থ: ‘হংসের ডিম’ বা ‘হাঁসের ডিম’। হাঁস ডিম পাড়ে না। তাহলে হাঁসের ডিম হয় কীভাবে? প্রকৃতিগতভাবে হয় না, কিন্তু ব্যাকরণে সমাসের ফাঁদে পড়লে হাঁসও ডিম পাড়ে না।
 
আসলে ‘হংসডিম্ব’ শব্দটির ব্যাসবাক্য হচ্ছে “হংসীর ডিম” এবং “হংসডিম্ব” হচ্ছে ‘হংসীর ডিম্ব’ শব্দের সমস্তপদ। কিন্তু কেন? কোন নিয়মে হংসীটা চোখের পলকে হংসী হয়ে গেল? শুধু হংসী নয়, এভাবে সমাসের ফাঁদে পড়লে সব স্ত্রীবাচক প্রাণীই পুংলিঙ্গবাচক হয়ে যায়। সমাসে এর একটি নিয়ম আছে। ওই নিয়মটিকে আমি বলছি সমাসের পুংলিঙ্গায়ন। বিধিটা নিম্নে দেওয়া হলো।
 
শিশু, শাবক, বাচ্চা, অণ্ড, ডিম্ব, দুগ্ধ ইত্যাদি শব্দ পরপদ হলে ব্যাসবাক্যে তার আগে স্ত্রীলিঙ্গবাচক শব্দ থাকে।
 
যেমন: ছাগীর দুগ্ধ, গোরুর দুগ্ধ, সিংহীর শাবক প্রভৃতি। তবে সমাস সম্পাদিত হওয়ার পর সমস্তপদে এসে ব্যসবাক্যের স্ত্রীবাচক শব্দগুলোর স্ত্রী-প্রত্যয় লুপ্ত হয়ে পুংলিঙ্গবাচক হয়ে যায়। যেমন:
ছাগীর দুগ্ধ= ছাগদুগ্ধ
গরুর দুগ্ধ = গোদুগ্ধ
মৃগীর শিশু=মৃগশিশু
হংসীর ডিম্ব=হংসডিম্ব
সিংহীর শাবক=সিংহশাবক।
হস্তিনীর শাবক = হস্তীশাবক।
গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ
 
error: Content is protected !!