সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম (দ্বিতীয় পর্ব)

১৩. একবিন্দু ( . ), ত্রিবিন্দু (…)

বাংলায় শব্দ সংক্ষেপণের জন্য একবিন্দু ব্যবহার করা যায়। যেমন―‘ড.’ বা ‘ডা.’। অসম্পূর্ণ বাক্য বা উদ্ধৃতি বোঝাতে ত্রিবিন্দু ব্যবহৃত হয়। যেমন ―

“হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,

সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে…”

অসম্পূণ পদ্য-অনুচ্ছেদ তথা অনুল্লিখিত পঙ্‌ক্তি বোঝাতে ত্রিবিন্দু বাক্যের শেষে না লিখে একটি পঙ্‌ক্তি হিসেবে লেখা হয়। যেমন―

“গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।

কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।

কাটিতে কাটিতে ধান এলো বরষা।”

১৪. একারে,  )

শব্দের শুরুর এ-কার মাত্রাহীন (ে) হয়।  যেমন―বেলা, লেখা, খেলা ইত্যাদি। কিন্তু শব্দের মধ্যকার এ-কার মাত্রাযুক্ত (ে) হয়। যেমন―শেষবেলা, স্মৃতিলেখা, ধূলিখেলা ইত্যাদি।

১৫. এর, –য়ের, –

‘-এর’ এবং ‘-র’ সাধারণভাবে বিশেষ্যের সঙ্গে যুক্তভাবে ব্যবহৃত হবে। যেমন―বনের রাজা, ঢাকার ইতিহাস, জামাইয়ের বাড়ি, ইন্সটিটিউটের কর্মপদ্ধতি, ঢাকার ছেলে ইত্যাদি। তবে কোনও নামবিশেষকে আলাদা করে দেখানোর প্রয়োজনে ‘-এর’ রূপটি ব্যবহার করা হয়। যেমন―‘বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর প্রতিষ্ঠাদিবস’, ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা  “হারানের নাতজামাই”-এর কাহিনি’, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট-এর আয়োজন’ ইত্যাদি। অনেকে ‘শামসুর রাহমান-র’ লিখে থাকেন। এটি শ্রুতিকটু এবং অস্বাভাবিক।

১৬. ঐ/ওই

আনুষ্ঠানিক প্রমিত ব্যবহারে কেবল ‘ঐ’ লেখা হবে। যেমন― ১৯৭১ সাল আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে  গুরুত্বপূর্ণ বৎসর। ঐ বৎসর আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম। তবে বাংলা একাডেমিমতে, ঐ নয়, বরং ওই লেখা প্রমিত। ইদানীং ঐ-এর পরিবর্তে ওই ব্যবহার করা হয়।

১৭. ওকার

লিখনরীতির ক্ষেত্রে মিত্যব্যয়িতা বজায় রাখার তাগিদে ও-কার যথাসম্ভব ব্যবহার বর্জন করা হবে। যেমন―ছিল, গেল, রইল, এত (তবে ‘তো’, ‘এ তো’ ও-কার দিয়ে লেখা হবে), ভীত ইত্যাদি। তবে যেসব শব্দের ক্ষেত্রে অর্থগত বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে সেসব শব্দের শেষে ও-কার ব্যবহার করা হবে। যেমন―কালো (রং অর্থে), ভালো (গুণ অর্থে), রসালো (গুণ অর্থে), মতে (তুলনা অর্থে)।

সংখ্যাবাচক শব্দের বানান প্রযোজ্য ক্ষেত্রে  ও-কার দিয়ে লেখা হবে।  যেমন―এগারো, বারো, তেরো ইত্যাদি।

১৮. –কালীন

‘কালীন’ (কাল + ঈন) সবসময়ই ঈ-কার সহযোগে লিখতে হবে। যেমন―সন্ধ্যাকালীন, তৎকালীন ইত্যাদি।

১৯. কী, কি, কি না, কিনা, নাকি

  বিস্ময়, প্রশ্ন ইত্যাদি অর্থে বিশেষণ এবং সর্বনাম রূপে স্বতন্ত্র পদ হিসেবে ‘কী’ ব্যবহৃত হয়। অন্য কথায় ‘কী’ কথাটির ওপর যখন  জোর পড়ে তখন তা তা ঈ-কার দিয়ে লেখা হয়। যেমন―‘কী সু্র!’ ‘এখানে কী কাজে এসেছ?’ অন্যদিকে, সংশয় কিংবা প্রশ্ন  বোঝাতে অব্যয় হিসেবে ‘কি’ ব্যবহৃত হয়। এ ক্ষেত্রে ‘কি’-এর ওপর জোর পড়ে না। যেমন―‘সে কি আসবে?’ অন্য একটি উদাহরণে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে: তুরি কি খাবে? এখানে শ্রোতা খাবেন কিনা জানতে চাওয়া হচ্ছে।

তুমি কী খাবে? এখানে শ্রোতা কোন খাবারটি খাবেন তা জানতে চাওয়া হচ্ছে।

 ‘কি না’ সংশয়, বিতর্ক, প্রশ্ন ইত্যাদি অর্থে অব্যয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন―আপরি খাবেন কি না মা জানতে চাইল।

অর্থহীন বাগ্‌ভঙ্গি হিসেবে কিংবা কোনও কিছুর কারণ বোঝাতে ‘কিনা’ যুক্তভাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন―এত্তটুকু ছেলে কিনা আমার কথার ভুল ধরে! ঘটে ‍বুদ্ধি কম কিনা, তাই আমার কথার  মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছ না।

অন্যদিকে, ‘নাকি’ সংশয়, সন্দেহ, বিতর্ক, প্রশ্ন ইত্যাদি অর্থে অব্যয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন― আমার সঙ্গে যাবেন নাকি? এ ব্যাটা নাকি আবার বিদ্যার জাহাজ! তবে এক্ষেত্রে পুস্তিকায় ভুল নির্দেশ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে প্রশ্ন বা কিছু জানতে চাওয়ার ইঙ্গিত থাকলে ফাঁক রেখে ‘কি না’ হবে। যেমন: আমারে সঙ্গে যাবেন না কি? বিষয়টি সংশোধন করা আবশ্যক।

২০. ‘-কে’

ব্যাকরণগতভাবে অপরিহার্য না হলেও অর্থ স্পষ্ট করার প্রয়োজনে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে  ‘-কে’ ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন―আমাদেরকে একটু বিবেচনা করুন। এখানে ‘-কে’ ব্যবহারের যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে তা হাস্যকর এবং অপ্রয়োজনীয়। অর্থ স্পষ্ট করার যৌক্তিকতা দেখিয়ে যে উদাহরণ দেওয়া হয়েছে তা দেখলে বোঝা যায়, এক্ষেত্রে ‘-কে’-এর ব্যবহার দৃষ্টিকটু; স্মৃতিকটুও। অধিকন্তু ব্যাকরণগতভাবেও অপ্রাসঙ্গিক।

২১. কোলন/কোলন-ড্যাশ/বিসর্গ (:/:―/ঃ)

বাক্যের পূর্ববর্তী অংশের ব্যাখ্যা কিংবা উদাহরণ উপস্থাপনের আগে কোলন ব্যবহার করা হয়। যেমন― নিম্নলিখিত গাছগুলো কাঠের ভালো উৎস:

 সেগুন, মেহগিনি, কাঁঠাল।

 কোলন-ড্যাশের ব্যবহার বর্তমানে নেই। কোলন ( : ) হিসেবে বিসর্গ চিহ্ন ( ঃ ) ব্যবহার করা সমীচীন নয়। কোলন-এর আগে ১টি ‘স্পেস’ ব্যবহৃত হবে। কোলনের পরেও একই লাইনে আরও টেক্সট থাকলে কোলনটির পরে একটি স্পেস দিতে হবে।  অন্যদিকে, বিসর্গ বস্তুত একটি বর্ণ; এটি কোনও যতিচিহ্ন নয়। সাধারণত শব্দের মাঝখানে বিসর্গ বসে। যেমন―দুঃখ, দঃশাসন, পুনঃপুন ইত্যাদি। শব্দের শেষে বিসর্গের ব্যবহার নেই।যেমন―প্রধানত (‘প্রধানতঃ’ নয়), অংশত (‘অংশতঃ’ নয়)।

স্মর্তব্য: বাংলা একাডেমির বিভিন্ন গ্রন্থে কোলনের আগে স্পেস হবে কি না সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। তবে বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান-সহ অনেক গ্রন্থে কোলনের আগে স্পেস দেওয়া হয়নি। সার্বিক বিবেচনায় কোলনের আগে স্পেস দেওয়া সমীচীন নয়।সেক্ষেত্রে এক লাইনে শব্দ এবং অন্য লাইনে চলে যেতে পারে কোলন। অতএব,কোলনের পূর্বে স্পেস না দেওয়া সমীচীন।

২২. ঙ ং

সন্ধিসাধিত তৎসম শব্দে পূর্বপদের ম্‌ স্থানে ‘ং’ হবে। যেমন― সংগীত (সম্‌+গীত), ভয়ংকর (ভয়ম্‌+কর), সংগত (সম্‌+গত)। সন্ধি না হলে ঙ-এর সঙ্গে পরবর্তী বর্ণ যুক্তভাবে বসবে। যেমন: অঙ্ক (অংক নয়), প্রত্যঙ্গ, সঙ্গ ইত্যাদি।

অ-তৎসম শব্দে উচ্চারণ হলন্ত হলে শব্দের শেষে ও মধ্যে ং ব্যবহৃত হবে। যেমন― রং, জং, ঢং, গাং, বাংলা ইত্যাদি। তবে উচ্চারণে ং-এর সঙ্গে স্বর থাকলে ঙ ব্যবহৃত হবে। যেমন― রঙের, ঢঙের, গাঙের, বাঙালি ।

২৩. ঙ ঙ্গ

 অ-তৎসম বা সংস্কৃতজাত শব্দে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ‘ঙ্গ’ এর পরিবর্তে ‘ঙ’ লেখা হয়, তবে তৎসম শব্দে ‘ঙ্গ’-ই  লেখা হয়। যেমন―অঙ্গুলি (‘অঙুলি’ নয়), আঙুল (‘আঙ্গুল’ নয়য়)। আবার ‘রঙ্গমঞ্চ’ (‘রঙমঞ্চ’ নয়), ‘রঙ্গন’ (‘রঙন’নয়), ‘অঙ্গন’ (কিন্তু ‘আঙিনা’, ‘আঙ্গিনা’ নয়), ‘রঙ্গ’ (কৌতুক, আনন্দ ইত্যাদি অর্থে) ইত্যাদি যে-কোনও রীতিতেই অভিন্ন। পুরানো ‘ঙ্গ’ রূপও এখন আর না লেখাই সমীচীন। আরও কিছু উদাহরণ: লাঙল, কাঙাল, ধাঙর, মাছরাঙা, বাঙালি, চাঙর, রঙিলা, রঙিন, রাঙা ইত্যাদি। তবে স্থাননামের ও অন্য যে-কোনও নামের বানান অপরিবর্তি থাকবে। যেমন―রাঙ্গামাটি।

২৪. চন্দ্রবিন্দু (ঁ)

যে-বর্ণের সঙ্গে  চন্দ্রবিন্দু উচ্চারিত হবে, সেই বর্ণের সঙ্গে যুক্ত স্বরচিহ্নের উপরে চন্দ্রবিন্দু বসবে। যেমন―চাঁদ, হাঁস।

সূত্র: সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম; প্রথম প্রকাশ ফাল্গুন ১৪২৩, মার্চ ২০০৭।

সৌজনে: ড. মোহাম্মদ আমীন, ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.——–

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম/১— ২

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম/৩

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম/৪

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম/৭—১০

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম (১১২)

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম/১৩-১৪

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম (১৩—২৪)

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com

All Link : শুবাচে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ লেখা

All Link

All Links/1

All Links/2 শুবাচির প্রশ্ন থেকে উত্তর

All Links/3

 

error: Content is protected !!