সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম (চতুর্থ পর্ব)

৩৭. প্রায়/-প্রায়

বিশেষণবাচক ‘প্রায়’ শব্দটি সাধারণত একাধিক অর্থে স্বতন্ত্র শব্দ হিসেবে সংশ্লিষ্ট বিশেষ্য বা বিশেষণের আগে বসে। যেমন―প্রায় দশ মণ, তিনি প্রায়ই এখানে আসেন ইত্যাদি। তবে ‘মতো’ অর্থে এটি বিশেষণের পরে মুক্ত বা যুক্তভাবে  ব্যবহৃত হয়। যেমন―ভগ্নপ্রায়, পাগলপ্রায়, পাগলের প্রায় ইত্যাদি। পুস্তিকায় লিখিত মণ শব্দটির সঠিক বানান মন।

৩৮. বন্ধনীর ব্যবহার

 বাংলা লিখনরীতিতে দ্বিতীয় বন্ধনীর ({ }) ব্যবহার সাধারণত  নেই। তৃতীয় বন্ধনী ([ ]) ব্যবহৃত হয় মূল রচয়িতার রচনায় সম্পাদক বা অন্য কেউ যে-ব্যাখ্যা বা অনুমিত শব্দ (মূল পঠ অস্পষ্ট বা ভুল থাকলে, কিংবা উদ্ধৃতাংশের অর্থ স্পষ্ট করার প্রয়োজনে) যোগ করেন, সেই শব্দ বা শব্দাবলি। যেমন―

সেদিন [গত বুধবার] তো আমি [ঢাকায়] ছিলাম না।

প্রথম বন্ধনী (( )) ব্যবহৃত হয় কোনও শব্দ বা বাক্যাংশের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা কিংবা উদাহরণ দেওয়ার প্রয়োজনে (উদাহরণ এই ভুরক্তজত দ্রষ্টব্য)।

৩৯. বলো/বোলো, করো/কোরো

মধ্যম পুরুষে বর্তমান অনুজ্ঞায় ‘বলো’, ‘করো’ এবাং ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞায় ‘বোলো’, ‘কোরো’ ব্যবহৃত হয়। যেমন―‘এখন তুমি আমাকে বলো’, ‘সেদিন তুমি শপথ করো’, ‘কাল তুমি আমাকে বোলো’, ‘সেদিন তুমে শপথ কোরো’ ইত্যাদি। কোনও ক্ষেত্রেই উর্ধ্বকমা বা লোপচিহ্ন ( ’ ) ব্যবহৃত হবে না। অনুরূপভাবে ফিরো (‹‘ফেরো’), ‘ধোরো’ (‹ধরো), ‘চোলো’ (‹চলো) ইত্যাদি লেখা হবে।

৪০. বসেছিল/বসে ছিল

‘বসেছিল’ ‘বসা’ ক্রিয়ার পুরাঘটিত অতীতকালের রূপ। যেমন―একদিন এই ঘাটে সে এসে বসেছিল। অন্যদিকে, ‘বসে ছিল’ যৌগিক ক্রিয়া (একটি অসমাপিকা + একটি সমাপিকা ক্রিয়া)। যেমন―এই তো একটু আগেই লোককটা এখানে বসে ছিল (‘বসে আছে’ যৌগিক ক্রিয়ার সাধারণ অতীতকালের রূপ)।

৪১. বহু, বহুল

‘বহুল’ একটি বিশেষণবাচক শব্দ এবং অন্য শব্দের পরে বা আগে যুক্তভাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন―জনবহুল, ব্যয়বহুল, বহুলপ্রজ, বহুলপ্রচারিত। অন্যদিকে ‘বহু’ একটি বহুবচনবাচক পদ। যে-কোনও বিশেষণের মতোই এটি সাধারণত বিশেষ্যের আগে স্বতন্ত্রভাবে এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষ্যের আগে যুক্তভাবে বসে। যেমন―বহু মানুষ, বহুরূপী, বহুবার।

৪২. বহুবচন: -গুলি/-গুলো/-গুলা, -সমূহ, -বৃ্ন্দ, -গণ ইত্যাদি

বহুবচনসূচক শব্দাংশ সবসময় বিশেষ্যের পর যুক্তভাবে বসবে। যেমন―দিনগুলো, গ্রন্থসমূহ, শ্রোতৃবৃ্ন্দ, ভদ্রমহোদয়গণ ইত্যাদি। ‘-গুলি’, ‘-গুলো’, ‘-গুলা’ রূপসমূহের মধ্যে প্রমিত ও আনুষ্ঠানিক ব্যবহারে ‘-গুলো’ ব্যবহৃত হবে। ‘সমূহ’, ‘গণ’ অবশ্য বহুবচন নির্দেশ করা ছাড়াও ভিন্ন অর্থেও শব্দের আগে বসে। যেমন―‘সমূহ ক্ষতি’ (সার্বিক বা চরম অর্থে), ‘গণনাট্য’ (সাধারণ মানুষ অর্থে), ‘গণধোলাই’ (সম্মিলিত অর্থে)ইত্যাদি।

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম/৪৩-৪৫

৪৩. বাংলা লেখার মধ্যে ইংরেজি লেখার ফন্টের আকার

 একই লেখায় ইংরেজি বর্ণ বাংলা বর্ণের চেয়ে ২ পয়েন্ট ছোটো হবে।

৪৪. বাংলা হরফে বিদেশি শব্দ লিখন বা প্রতিবর্ণীকরণ(Transliteration)

বিদেশি ও বিদেশি উৎসজাত শব্দকে বাংলা বর্ণমালায় লেখার জন্য সংশ্লিষ্ট বিদেশি শব্দটির উচ্চারণ প্রধান বিবেচ্য। এ ক্ষেত্রে  বাংলা এ, ঈ, ঊ, ণ, ন, স, শ, ষ, র, ড়, ঢ় বর্ণগুলোর ব্যবহার নিয়ে কিছু দ্বিধার কারণ থাকে। যথাসম্ভব উচ্চারণ অনুযায়ী প্রতিবর্ণীকরণ করলে এ সমস্যা এড়ানো যায়। এ ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম অনুসরণ করা সমীচীন; উচ্চারণ ‘অ্যা’-এর মতো হলে ‘অ্যা’ ব্যবহৃত হবে (‘এ্যা’, ‘এ’ নয়)। যেমন― অ্যাকাডেমি, অ্যাসিড।

বিদেশি (এবং অ-তৎসম) শব্দের বানানে দীর্ঘস্বরের ব্যবহার হবে না, প্রায় সবক্ষেত্রেই হ্রস্ব ই-কার ও হ্রস্ব উ-কার ব্যবহৃত হবে। কিছু সুপরিচিত নামের বানানে ব্যতিক্রম হতে পারে। যেমন―চীন।

বিদেশি (এবং অ-তৎসম) শব্দে ড়, ঢ়, ণ-এর ব্যবহার হবে না।

বিদেশি (এবং অ-তৎসম) শব্দে স, শ, ষ-এর ব্যবহারের নিয়ম জানতে ‘স, শ, ষ’ ভুক্তিটি দেখুন।

৪৫. বিকল্পচিহ্ন( / )

‘বা’, ‘অথবা’ শব্দের পরিবর্তে কখনও কখনও বিকল্পচিহ্ন ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন―শরীরের উচ্চ তাপমাত্রা কমাতে ওষুধ এবং/অথবা পানি ব্যবহার করুন। লক্ষ করুন, এখানে বিকল্পচিহ্নের ব্যবহারের কারণে বাক্যটিকে সংক্ষিপ্ত করা সহজ হয়েছে। অন্য কোনোওভাবে এটা করা সম্ভব হতো না। তবে সাধারণ ক্ষেত্রে ‘বা’, ‘অথবা’ শব্দের স্থানে বিকল্পচিহ্ন ব্যবহার সংগত নয়। যেমন―“রহিম/করিম ওখানে যাবে” না লিখে “রহিম অথবা করিম ওখানে যাবে”  লেখাই সমীচীন। প্রসঙ্গত, তারিখ লিখতে দৃশ্যত একই চিহ্ন ব্যবহৃত হলেও সেটি বিকল্পচিহ্ন নয়। বিকল্পচিহ্নের দুইদিকে  কোনো স্পেস থাকবে না।

৪৬. বিনা ছাড়া (ব্যতীত অর্থে)

‘বিনা’ সংশ্লিষ্ট শব্দের পরে স্বতন্ত্রভাবে বসে।যেমন­―“দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে”। শব্দের আগেও স্বতন্ত্রভাবে এটি ব্যবহৃত হয়। যেমন­―“বিনা মেঘে বজ্রপাত।” ‘ছাড়া’ সংশ্লিষ্ট শব্দের পরে প্রায়শই স্বতন্ত্রভাবে ব্যবহৃত হয়।যেমন­―“কাজ ছাড়া আর কিছু যেন নেই তার জীবনে।” তবে শব্দের পরে যুক্তভাবেও এর ব্যবহার আছে। যেমন― লক্ষ্মীছাড়া, ছন্নছাড়া ইত্যাদি।

৪৭. বিশেষণ লেখার নিয়ম

বাংলা বিশেষণ ও বিশেষণবাচক শব্দ সাধারণত বিশেষ্যের আগে স্বতন্ত্র শব্দ রূপে বসে।যেমন―কালো কোকিল, লাল জামা, মন্দ লোক, এক টাকা, তিন দিন, মৃদ বাতাস, ধীরে চলো ইত্যাদি। এইসব ক্ষেত্রে বিশেষণ ব্যবহারের উদ্দেশ্য থাকে বিশেষ্যটিকে বিশেষিত করা, ফলে বিশেষণটি বিশেষ গুরুত্ব পায়।তবে বিশেষ অর্থগত ব্যঞ্জনা থাকলে কখনও কখনও বিশেষণ বিশেষ্যের সঙ্গে যুক্তভাবে বসে। যেমন―একদিন আমিও বড়ো হব। মন্দলোকে নানাকথা বলবে। এইসব ক্ষেত্রে বিশেষ্য ও বিশেষণ একটি একক ধারণা বা অর্থকে বোঝায়। সাহিত্যিক ব্যবহারে অবশ্য কখনও কখনও বিশেষ্যের পরেও বিশেষণ বসতে পারে। যেমন― যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ।যে ফুল লাল, পিতা ভয়ংকর।

৪৮. বিস্ময়চিহ্ন (!)

বিস্ময়চিহ্নের আগে একটি ‘স্পেস’ ব্যবহার করা সংগত।উল্লেখ্য, এককালে সম্বোধনসূচক শব্দের পরে বিস্ময়চিহ্ন ব্যবহৃত হলেও এখন তার পরিবর্তে কমা (,) ব্যবহৃত হয়।

সূত্র: সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম; প্রথম প্রকাশ ফাল্গুন ১৪২৩, মার্চ ২০০৭; জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

উৎস: ড. মোহাম্মদ আমীন, ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম/১— ২

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম/৩

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম/৪

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম/৭—১০

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম/১৩-১৪

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম (১১২)

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম (১৩—২৪)

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম (২৫―৩৬)

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম (৩৭-৪৮)

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com

All Link : শুবাচে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ লেখা

All Link

All Links/1

All Links/2 শুবাচির প্রশ্ন থেকে উত্তর

All Links/3

error: Content is protected !!