সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম (সপ্তম পর্ব)

৭৩. সঙ্গে, সাথে

‘সাথে’ কথ্য এবং কাব্যিক বা সাহিত্যিক রূপ। প্রমিত রূপ ‘সঙ্গে’। আনুষ্ঠানিক ও দাপ্তরিক ব্যবহারে ‘সঙ্গে’ লেখাই সমীচীন।

৭৪. সব/-সব

‘সব’ যে-কোনো বিশেষণবাচক শব্দের মতোই সাধারণত সংশ্লিষ্ট শব্দের আগে স্বতন্ত্রভাবে কিংবা যুক্তভাবে বসে (বিশেষণ লেখার নিয়ম ভুক্তিটি দেখুন)। যেমন― সব লোক, সবসময় ইত্যাদি। শব্দের পরেও এটি বসতে পারে। যেমন: ভাইসব, পাখিসব করে রব  ইত্যাদি।

৭৫. সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার বানান: বলে, করে ইত্যাদি

সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার উচ্চারণ অভিন্ন হয় না, যদিও বানান অভিন্ন হতে পারে। যেমন―

শিউলি বলে গেল যে ও কাল আসতে পারবে না। (অসমাপিকা; ক্রিয়া বলিয়া―বলে)।

শিউলি বলে যে ও মিষ্টি ভালোবাসে (সমাপিকা)।

অসমাপিকা ক্রিয়ার লুপ্তধ্বনি বা ধ্বনিগুলোকে বোঝাতে লোপচিহ্ন (’) ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ, সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার লিখিত রূপ অভিন্ন হবে।

৭৬. সমাসবদ্ধ শব্দ

সমাসবদ্ধ শব্দ একটি শব্দ হিসেবে লিখতে হবে। যেমন― সমুদ্রসৈকত, সান্ত্বনাসূচক, স্বাক্ষরযুক্ত, শিশুরোগ ইত্যাদি। তবে ক্ষেত্রবিশেষে অনেক সমাসসাধিত শব্দকে; বিশেষত জোড় শব্দগুলোকে হাইফেন দিয়ে যুক্ত করে লেখা হয়। যেমন― ভালো-মন্দ, মা-বাবা, আলো-অন্ধকার, দক্ষিণ-পূর্ব ইত্যাদি। আধুনিক বাংলায় সমাসবদ্ধ পদকে ফাঁক রেখেও লেখা হয়। এগুলো অসংলগ্ন সমাস বলা হয়। অসংলগ্ন লেখা হলেও এগুলো সমাসবদ্ধ পদ। যেমন: বিজয় দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ মুসলিম যুব সাহিত্য সমিতি ইত্যাদি।

৭৭. সম্পন্ন, -সম্পন্ন

সচ্ছল বা সম্পদশালী অর্থে ‘সম্পন্ন’ একটি স্বতন্ত্র শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন― কাশেম মিয়া চিরকালই সম্পন্ন গৃহস্থ। ‘বৈশিষ্ট্যযুক্ত’ অর্থে সম্পন্ন অন্য শব্দের পরে যুক্তভাবে বসবে। যেমন―ব্যকিত্বসম্পন্ন।

৭৮. -সহ, -সমেত, -সুদ্ধ

‘সহিত’ অর্থে ‘-সহ’, ‘-সমেত’ এবং ‘–সুদ্ধ’ সবসময় সংশ্লিষ্ট শব্দের পরে যুক্তভাবে বসে। যেমন― ‘বইসহ পড়ে এসো’, ‘গ্রামসুদ্ধ লোক এসেছে’, ‘বাজারসমেত ব্যাগটা দাও’ ইত্যাদি। ‘সহ্য করা’ অর্থেও ‘সহ’ শব্দের শেষে যুক্তভাবে বসে। যেমন― দুঃসহ, সর্বংসহা ইত্যাদি।

৭৯. সহকারী, উপ-, যুগ্ম, অতিরিক্ত

উপরের চারটি বিশেষণ পদের মধ্যে কেবল ‘উপ-’ একটি উপসর্গ। উপসর্গ স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হতে পারে না, তাই এটিকে পরবর্তী শব্দের সঙ্গে যুক্তভাবে ব্যবহার করতে হবে। যেমন― উপসচিব, উপপরিচালক, ‍উপমহাপরিচালক, উপমহাহিসাবনিরীক্ষক, উপমন্ত্রী ইত্যাদি। সহযোগী অর্থে ‘যুগ্ম’ যুক্তভাবেই লেখা সংগত। যেমন― যুগ্মসচিব। ‘সহকারী’, ‘অতিরিক্ত’ এবং ‘জ্যেষ্ঠ’ স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ শব্দ, তাই এগুলোকে আলাদাভাবেই লেখাই যুক্তিযুক্ত। যেমন― সহকারী পরিচালক, অতিরিক্ত সচিব, জ্যেষ্ঠ সচিব ইত্যাদি।

৮০. সহনীয়, সহনশীল

‘সহনীয়’ শব্দের অর্থ ‘সহ্য করা যায় এমন’। অন্যদিকে ‘সহনশীল’ শব্দের অর্থ সহ্য করতে পারে এমন। সুতরাং, ‘ভূমিকম্প-সহনীয় ইমারত’ না লিখে ‘ভূমিকম্প-সহনশীল ইমারত লেখাই যথেষ্ট।।

৮১. -সহযোগে

‘সহযোগে’ অন্য শব্দের পরে যুক্তভাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন: বন্ধুসহযোগে, মাসংসহযোগে।

৮২. সাধুরূপ, চলিতরূপ: নিবে/নেবে; দিবে/দেবে

ক্রিয়াপদের সাধু ও চলিত রূপ ভিন্ন ভিন্ন হয়। ‘নিবে’ ও ‘দিবে’ একই সঙ্গে সাধু এবং আঞ্চলিক বা কথ্য রূপ। ‘নেবে’, ‘দেবে’ চলিত রূপ।তাই দাপ্তরিক লেখার কাজে সাধু রূপে ‘নিবে’, ‘দিবে’ এবং চলিত রূপে ‘নেবে’, ‘দেবে’ ব্যবহার বাঞ্ছনীয়।

৮৩. -সাপেক্ষ, সাপেক্ষে

‘শর্তে’ অর্থে ‘সাপেক্ষ’ সচরাচর অন্য শব্দের পরে যুক্তভাবে বসে। যেমন― খরচসাপেক্ষ, সময়সাপেক্ষ, বিবেচনাসাপেক্ষ। ‘সাপেক্ষে’ স্বতন্ত্র শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন― একটি বস্তুর গতি বিচার করা হয় অন্য বস্তুর সাপেক্ষে।

৮৪. স্ত,স্থ

‘স্থ’, ‘অবস্থিত’ অর্থে বিশেষ্যের পরে যুক্তভাবে বসে। যেমন― মুখস্থ, কণ্ঠস্থ, যন্ত্রস্থ ইত্যাদি। খেয়াল করলে দেখা যায়, ‘স্থ’ সাধারণত একটি পূর্ণাঙ্গ শব্দের সঙ্গে বসে। অর্থাৎ ‘স্থ’ বাদ দিলে একটি পূর্ণাঙ্গ শব্দ (বিশেষ্য) পাওয়া যায়। অন্যদিকে ‘স্ত’ ব্যবহৃত হয় শব্দে passive রূপে। যেমন― অভ্যাস> অভ্যস্থ; বিন্যাস>বিন্যস্ত ইত্যাদি। শব্দ থেকে স্ত বাদ দিলে অবশিষ্ট অংশের কোনো অর্থ থাকে না।

৮৫. হস্‌-চিহ্ন (্)

হস্‌-চিহ্নের ব্যবহার হবে অত্যন্ত সীমিত ক্ষেত্রে। নামের সঙ্গে কিংবা বিদেশি শব্দের উচ্চারণ পরিষ্কারভাবে বোঝানোর প্রয়োজনে হস্-চিহ্ন ব্যবহার করা যাবে। যেমন: আবদুল্লাহ, বাল্‌ব। তবে বাংলা একাডেমি মতে, হস্‌চিহ্ন ব্যবহার অতি আবশ্যক না হলে ব্যবহার করা সমীচীন নয়।

৮৬. হাইফেন

হাইফেন ড্যাশের চেয়ে ছোটো আকারের হয়। এটি বস্তুত কোনো যতিচিহ্ন নয়। সমাসবদ্ধ শব্দের সব সমস্যমান পদের অর্থ প্রধান হলে তাদের মধ্যে হাইফেন বসে। যেমন― বাবা-মা, পাহাড়-পর্বত। বিশেষ্যের আগে ‘যে’ বসে ঐ বিশেষ্যকে নির্দিষ্টভাবে বোঝালেও মাঝখানে হাইফেন ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন― আজ যে-অতীত তোমাকে ভোগাচ্ছে তার কথা ভুলে যাও।

হাইফেনের দুইদিকে কোনও স্পেস থাকবে না।

সূত্র: সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম; প্রথম প্রকাশ ফাল্গুন ১৪২৩, মার্চ ২০০৭; জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

উৎস: ড. মোহাম্মদ আমীন, ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম/১— ২

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম/৩

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম/৪

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম/৭—১০

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম/১৩-১৪

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম (১—১২)

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম (১৩—২৪)

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম (২৫―৩৬)

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম (৩৭৪৮)

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম (৪৯―৬০)

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম (৬১—৭২)

সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম (৭৩-৮৬)

error: Content is protected !!