সাতসকাল সাতকথা সাতকাহন সাতখুন সাতনরি সাতনলা সাতপাঁচ সাতপাক সাতপুরুষ   সাতমহলা সাতসতেরো সাতসমুদ্র, সাত কাণ্ড, সাত তাড়াতাড়ি

ড. মোহাম্মদ আমীন

এই পেজের সংযোগ: https://draminbd.com/সাতসকাল-সাতকথা-সাতকাহন-স/

সাতসকাল সাতকথা সাতকাহন সাতখুন সাতনরি সাতনলা সাতপাঁচ সাতপাক সাতপুরুষ   সাতমহলা সাতসতেরো সাতসমুদ্র, সাত কাণ্ড, সাত তাড়াতাড়ি

সাত বা সপ্ত শুধু গণিতে নয়, বিশ্বের অন্যান্য ভাষার ন্যায় বাংলা ভাষাতেও নানা অর্থদ্যোতক শব্দ সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে বহুল প্রয়োগিত একটি শব্দ।  সাত বা সপ্ত নিয়ে বাংলা ভাষায় রয়েছে বেশ কয়েকটি বাগ্‌ভঙ্গি এবং বাগ্‌ধারা। যেমন
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
— সাতকথা, সাত কাণ্ড, সাতকাহন, সাতখুন মাপ, সাতনর, সাতনরি, সাতনলা, সাতপাঁচ, সাতপাঁক, সাতপুরুষ, সাতমহলা, সাতসকাল, সাতসতেরো, সাতসমুদ্র, সাত তাড়াতাড়ি, সাতঘাটের কানাকড়ি, সপ্তচ্ছদ, সপ্ততন্ত্রী, সপ্ততল, সপ্তদর্শী, সপ্তদ্বীপ, সপ্তদ্বীপা, সপ্তধা, সপ্তধাতু, সপ্তপদী, সপ্তপর্ণ, সপ্তপাতাল, সপ্তযোজী, সপ্তরক্ত, সপ্তরথী, সপ্তর্ষি, সপ্তলোক, সপ্তশতী, সপ্তসপ্তি, সপ্তসমুদ্র, সপ্তসাগর, সপ্তসিন্ধু, সপ্তসুর, সপ্তস্বর, স্বপ্তস্বরা, সপ্তস্বর্গ, সাতসিন্ধু, সপ্তমস্বর,  সপ্তমীপূজা, সপ্তলোক, সাতগাঁ প্রভৃতি। বাগ্‌ভঙ্গিগুলো এমন অর্থবহ যে, অন্যকোনো শব্দ দিয়ে তাদের কোনোটিকে পুরোপুরি অর্থে দ্যোতিত করা সম্ভব নয়। 
কিন্তু সাত কেন? 
 
সংখ্যাতত্ত্বে  সাত একটি মৌলিক বিজোড় সংখ্যা। সাতকে ঘিরে রয়েছে সৃষ্টির নান রহস্য। ফলে এটি জড়িয়ে গেছে  বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ‍সৃষ্টি থেকে শুরু করে আমাদের প্রত্যেকটি কর্মকাণ্ডের নানা ক্ষেত্রে নানাভাবে হোক তা সাহিত্য কিংবা সংস্কৃতি, পরিবার কিংবা রাষ্ট্রীক।  পৃথিবীকে ঘিরে থাকা সাতটি রহস্যময় প্যাঁচ সাত সংখ্যার গুরুত্বকে প্রথমে স্মরণ করিয়ে দেয়। সপ্তর্ষিমণ্ডলে রয়েছে ব্রহ্মার মানসপুত্র রূপে খ্যাত সাত শ্রেষ্ঠ ঋষি মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু ও বিশিষ্ট নামের সাতটি তারকা।
 
 
ধর্মের ক্ষেত্রেও সাত অঙ্কের রয়েছে একচেটিয়া আধিপত্য। কোনো সুরা, শ্লোক বা সূত্র ৭ বার পাঠ করা উত্তম গণ্য করা হয়। ভারতীয় পুরাণ রামায়ণ সপ্তকাণ্ডে বিভক্ত। শ্রী শ্রী মদভগবত গীতা ৭০০ শ্লোকে লিপিবদ্ধ। শ্রী শ্রী দুর্গাপূজার পুঁথি  শ্রী শ্রী চণ্ডীতে রয়েছে ৭০০ মন্ত্র। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিয়েতে সাত ঘাটের জল সংগ্রহ ও অগ্নিকে সাক্ষী  রেখে সাত বার প্রদক্ষিণ করার রীতি প্রাচলিত। রয়েছে সাতটি নরক, সাতটি স্বর্গ, সাতটি মহাদেশ; ৫টি মহাসাগরের সঙ্গে আরব সাগর ভূমধ্যসাগরকে যুক্ত করে ৭টি সমুদ্র, ৭টি গ্রহ।
 
সাত হচ্ছে সপ্তাহের সাত বারের প্রতীক। যা দিয়ে ‘বার’ শুরু এবং শেষ। সময় পরিমাপক এককও সাতটি। যেমন:  বছর, মাস, সপ্তাহ, দিন, ঘন্টা, মিনিট, সেকেন্ড। রঙধনুতে রঙের সংখ্যা সাতটি।  যেমন: বেগুনি, নীল, আসমানি, সবুজ, হলদে, কমলা, লাল। এই সাতটি মৌলিক রং।
 
তাই সাত দিয়ে বিস্তৃত, আদি-অন্ত, গভীর, নিবিড়, সময়, বৃদ্ধি, হ্রাস, কম, প্রভৃতি গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করা হতো। রামায়ণের সাত কাণ্ড থেকে এসেছে সাতকথা, সাতকাহন, সাতপাক প্রভৃতি। ‘সাত আসমান’, ‘সাত স্বর্গ’, ‘সাত নরক’ প্রভৃতির আদি-অন্ত পরিধিও সপ্তাহের সাতদিনের সঙ্গে অভিন্ন অর্থ প্রকাশে বাগ্‌ভঙ্গিসমূহকে প্রভাবিত করেছে। তাই প্রাচীনকাল থেকে ‘সাত’ শব্দটি যেমন অতিরিক্ত প্রকাশে ব্যবহার করা হতো তেমনি অতি-কম প্রকাশেও ব্যবহার করা হতো। কারণ, ‘সাত’ ছিল ধর্ম ও জ্যোতির্বিজ্ঞান-সহ প্রাত্যহিক জীবনে আচরিত আদি-অন্ত বা কম-বেশির পরম ও চরম পরিধি। 
 
এখানে বর্ণিত ‘সাতপুরুষে না শোনা’ বাগাধারায় ‘সাত’ দ্বারা দীর্ঘ সময় প্রকাশ করা হয়েছে। আবার ‘সাত তাড়াতাড়ি’ বাগাধারার বর্ণিত ‘সাত’ প্রকাশ করছে ‘স্বল্পতা’। তেমনি ‘সাত সকাল’ বাগধারার ‘সাত দ্বারা অতি সকাল প্রকাশ করা হচ্ছে। এমন আরও কয়েকটি উদাহরণ : সাতসন্ধ্যা, সাতজনম, সাতযুগ ইত্যাদি। পাঁচ দ্বারা ইঙ্গিত করা হতো হাতের পাঁচ-আঙুল। যেমন: সাতপাঁচ বাগধারায় এর প্রকাশ লক্ষণীয়। এটিই ব্যাকরণের কারণ এবং বাংলাা ভাষার মজা। 
 
সাতকথা: বাংলা সাত আর সংস্কৃত কথা দিয়ে গঠিত সাতকথা অর্থ—  (বিশেষ্যে) নানা কথা। রামায়ণের সাত কাণ্ডে নানা কথা রয়েছে। সেই সূত্রে নানা কথা, অনেক কথা প্রভৃতি অর্থ প্রকাশে সাতকথা  বাগ্‌ভঙ্গিটির উদ্ভব।
 
 সাত কাণ্ড রামায়ণ: সাত কাণ্ড অর্থ সাত অধ্যায়। সাত কাণ্ড রামায়ণ বাগ্‌ভঙ্গিটির অর্থ সাত অধ্যায়ে বিভক্ত রামায়ণগ্রন্থ। এর আলংকারিক অর্থ বিরাট ব্যাপার, এলাহি কাণ্ড। রামায়ণ মহাকাব্য ৭টি কাণ্ড (পর্ব বা অধ্যায়) ও ৫০০টি সর্গে বিভক্ত এবং ২৪,০০০ শ্লোক নিয়ে গঠিত।  এখানে বর্ণিত হয়েছে  বিষ্ণুর অবতার রামের বিশাল ঘটনাময় জীবনকাহিনী।  তাই বাগ্‌ধারাটির অর্থ হয়েছে বিরাট ব্যাপার,  এলাহি কাণ্ড।
 
সাতকাহন: সাতকাহন বাংলা শব্দ। এর অর্থ (বিশেষণে) ষোলো পণসংখ্যক অর্থাৎ ৭x১২৮০=৮৯৬০টি। আলংকারিক ও প্রায়োগিক অর্থ—অসংখ্য, অন্তহীন, অশেষ, প্রচুর, বহুসংখ্যক প্রভৃতি। শব্দটি রামায়ণের সাত কাণ্ডের অসংখ্য কাহিনির সূত্রে গৃহীত।  তবে কাহন শব্দের একটি গাণিতিক হিসেব রয়েছে:
১ হালি = ৪টি
২০ হালি= ১ পণ= ২০X৪= ৮০টি
১৬ পণ= ১ কাহন- ১৬X৮০= ১২৮০টি
অতিএব সাতকাহন= ৭ কাহন= ৭X১২৮০= ৮৯৬০টি।
 
সাতখুন: সাত ও খুন মিলে সাতখুন শব্দটি গঠিত হলেও এই সাতখুন কথার অর্থ সাত খুন বা সাতটি খুন নয়। সাতখুন শব্দে আসলে  কোনো সাত নেই। তাই সাতটি খুনও নেই। সাতখুন শব্দের সাত অর্থ কল্পিত সাত নরক। সাতখুন অর্থ সাত নরকে যাওয়ার মতো জঘন্য বা গুরুতর অপরাধ। সাতখুন মাপ অর্থ—  (বিশেষ্যে) গুরুতর অপরাধ সত্ত্বেও শাস্তির পরিবর্তে অতিরিক্ত প্রশ্রয়দান।
 
সাততাড়াতাড়ি: সাততাড়াতাড়ি কথাটির অর্থ— (ক্রিয়াবিশেষণে) ব্যতিব্যস্ত হয়ে, অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে; অতি দ্রুত, খুব শীঘ্র। সপ্তাহ বা সাত দিনের দ্রুত  আগমন ও দ্রুত প্রস্থানে সময়ের বিবেচনাহীন দ্রুততার  অনিবার্য উদাহরণ থেকে গৃহী। পৃথিবীতে যাই ঘটুক এবং যার জন্যই ঘটুক কিংবা সপ্তাহের সাতদিনের দিনই ঘটুক তা থেমে থাকে না। কার কী হবে না হবে এসব বিচেনা না করে দ্রুত চলে যায়। এত সাততাড়াতাড়ি কোথায় ‍যাও?
 
সাতনর ও সতনরি:  সাতনর ও সতনরি শব্দে বর্ণিত নর ও নরি সমার্থক। সুতরাং সাতনর ও সাতনরি শব্দও সমার্থক।  সংস্কৃত লহরি থেকে উদ্ভূত নরি বা নর অর্থ পঙ্‌ক্তি, সারি, শ্রেণি; লহরি (সাতনরি)। বাংলা সাতনরি অর্থ (বিশেষণে) সাত লহর বা প্যাঁচবিশিষ্ট (সাতনরি হার); (বিশেষ্যে) সাত প্যাঁচযুক্ত কণ্ঠহার। এখানকার সাত অর্থ— সংস্কৃত সপ্তম থেকে উদ্ভূত এবং বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত ৭ সংখ্যা এবং বিশেষণে হিসেবে ব্যবহৃত ৭ সংখ্যক। প্রয়োগ: আমার গানের মালায় গাঁথা প্রাণের এ সুর, সাতনরি হার হোক নতুন বধূর।
 
সাতনলা:  বাংলা সাত ও নল বা নলা শব্দের সমন্বয়ে সাতনলা শব্দের উদ্ভব। বাংলা সাতনলা শব্দের অর্থ— (বিশেষণে) পরপর সাতটি গুলি ছোড়া যায় এমন। যেমন: সতনলা বন্দুক।
 
সাতপাঁচ: সাত ও পাঁচ মিলে সাতপাঁচ। বাংলা সাতপাঁচ কথার অর্থ (বিশেষণে)— নানাপ্রকার, বিবিধ; এলোমেলো, অসংলগ্ন এবং (বিশেষ্যে) নানা বিষয়, অগ্রপশ্চাৎ (সাতপাঁচ ভাবা)।  সপ্তাহের সাত দিনে হাতের পাঁচ আঙুল হিসেব কষেও  হিসেবে মেলাতে পারল না। বারবার এলোমেলো হয়ে যায়।  সপ্তাহে সাতদিনই মাথাই হাতের পাঁচ আঙুলের মতো নানা চিন্তা ভরপুর হয়ে থাকে।
সাতপাক: এটি বাংলা শব্দ এবং বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হিন্দু বিবাহে অগ্নিকে সাক্ষী রেখে সাতবার পাক খাওয়ার সংস্কারবিশেষ (সাতপাঁকে বাঁধা)
 
সাতপুরুষ: সাতপুরুষ বাংলা শব্দ। বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সাতপুরুষ অর্থ— বংশানুক্রমে ঊর্ধবতন সাতটি পুুরুষ।
 
সাতমহলা: বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা সাতমহলা অর্থ— সাতটি মহলবিশিষ্ট। যেমন: সাতমহলা প্রাসাদ।
সাতসকাল
 
সাতসতেরো: গণিতে সাত একটি রহস্যময় সংখ্যা হিসেবে পরিচিত। শতক্রিয়ায় ৭ সংশ্লিষ্ট অঙ্কদ্বয়ের পরস্পর স্থান বদল করলেই জোড়ার উদ্ভব ঘটে।  শতক্রিয়ায় এই বিচিত্রধর্মী ৭টি মৌলিক সংখ্যা হলো:  ৭, ১৭, ৭১, ৩৭, ৭৩, ৭৯, ৯৭। এই ৭ আর ১৭ থেকে উদ্ভব ঘটেছে সাত সতেরো বাগধারার। 
 
সাতসমুদ্র: বাংলা সাত ও সংস্কৃত সমুদ্র মিলে গঠিত সাতসমুদ্র অর্থ: রূপকথায় বর্ণিত সাত সাগর; (আলংকারিক) অত্যন্ত দূরবর্তী দেশ।
 
সাতক্ষীরা:  সাতক্ষীরা বাংলাদেশের একটি জেলা।
 
————–
সুত্র: বাংলা ভাষার মজা, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

 
 
 
শুবাচ গ্রুপ এর লিংক: www.draminbd.com
 
 
error: Content is protected !!