সাত সকাল

ড. মোহাম্মদ আমীন

সাত সকাল
‘সাত সকালে’ হয়; ছয় সকালে, নয় সকালে, বা দশ সকালে নয় কেন?
‘সাত সকাল’ কিংবা ‘সাত-পাঁচ না ভাবা’ ছাড়াও ‘সাত’ নিয়ে বাংলা ভাষায় আরও কয়েকটি বাগ্‌ধারার প্রচলন আছে। যেমন: সাত জন্মে (কখনো), সাতপাঁচ ভাবা (নানা চিন্তা), সাতঘাটের কানাকড়ি (অকিঞ্চিৎকর সংগ্রহ), সাতেও নেই পাঁচেও নেই (সংশ্রব শূন্য), সাতচড়ে রা করে না (অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির লোক), সাত পুরুষে না শোনা (বংশানুক্রমে অশ্রুত), সাতরাজার ধন মানিক (কষ্টার্জিত মহা-মূল্যবান সম্পদ), সাত ঘাটের জল খাওয়া/খাওয়ানো (বহু বিপদে পড়া বা ফেলা), সাত তাড়াতাড়ি (অতি শীঘ্র), সাত দিক (সর্বত্র) প্রভৃতি। এ সকল ‘সাত-যুক্ত’ বাগ্‌ধারায় ‘সাত’ সংখ্যাটি মূলত ‘সপ্তাহ’ বা ‘সাত দিন’ বর্ণনার মাধ্যমে সময়ের পরিধি (বেশি বা কম) প্রকাশ করেছে।
 
সাত হচ্ছে সপ্তাহের সাত বারের প্রতীক। যা দিয়ে ‘বার’ শুরু এবং শেষ। তাই সাত দিয়ে বিস্তৃত, আদি-অন্ত, গভীর, নিবিড়, সময়, বৃদ্ধি, হ্রাস, কম, প্রভৃতি গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করা হতো। শুধু তাই নয়, ‘সাত আসমান’, ‘সাত স্বর্গ’, ‘সাত-নরক’ প্রভৃতির আদি-অন্ত পরিধিও সপ্তাহের সাতদিনের সঙ্গে অভিন্ন অর্থ প্রকাশে বাগ্‌ধারাগুলোকে প্রভাবিত করেছে। তাই ‘সাত’ শব্দটি যেমন অতিরিক্তি প্রকাশে ব্যবহার করা হতো তেমনি অতি-কম প্রকাশেও ব্যবহার করা হতো। কারণ, ‘সাত’ ছিল আদি-অন্ত বা কম-বেশির পরম ও চরম পরিধি।
 
‘সাত পুরুষে না শোনা’ বাগ্‌ধারায় ‘সাত’ দ্বারা দীর্ঘ সময় প্রকাশ করা হয়েছে। আবার ‘সাত তাড়াতাড়ি’ বাগ্‌ধারার বর্ণিত ‘সাত’ প্রকাশ করছে ‘স্বল্পতা’। তেমনি ‘সাত সকাল’ বাগ্‌ধারার ‘সাত দ্বারা অতি সকাল প্রকাশ করা হচ্ছে। এমন আরও কয়েকটি উদাহরণ: সাত সন্ধ্যা, সাত জনম, সাত যুগ ইত্যাদি। পাঁচ দ্বারা ইঙ্গিত করা হতো হাতের পাঁচ-আঙুল। যেমন: সাত-পাঁচ বাগ্‌ধারায় এর প্রকাশ লক্ষণীয়।
 
চর্মনাশ বাতিক
ডার্মেসিলোম্যানিয়া বা ডার্মেতিলোম্যানিয়া (Dermatillomania)
নিজের চামড়া নিজেই নখ দাঁত বা অন্য কিছু দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তোলে ফেলার অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছাকে ডার্মেসিলোম্যানিয়া বা ডার্মেতিলোম্যানিয়া বলা হয়। বাংলায় বলা যায়: চর্মনাশ বাতিক, চর্মনাশগ্রস্ততা প্রভৃতি। যাদের এমন বাতিক তাদের বলা হয় ডার্মেসিলোম্যানিয়াক বা ডার্মেতিলোম্যানিয়াক। বাংলায় চর্মনাশগ্রস্ত, চর্মনাশক। এরা  নিজের চামড়াকে এভাবে খুঁচিয়ে আনন্দ পায়। রক্তাক্ত চামড়া দেখে কষ্ট পেলেও খোঁচানোর অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছা থামাতে পারে না।
 
 যদি নখ দিয়ে খোঁচানো না যায় তাহলে, ছুরি সুঁই বা ধারালো বস্তু দিয়ে খোঁচায়। কিংবা শরীরের যতটুকু অংশ দাঁত দিয়ে কামড়াতে পারে ততটুকু অংশ কামড়িয়ে চামড়া তুলে ফেলে। ধীরে ধীরে পুরো শরীর হয়ে যায় রক্তাক্ত। যন্ত্রণায় বিকট চিৎকারের মধ্যেও চামড়ার প্রতি আক্রোশ চালিয়ে যেতে থাকে। তাদের প্রথম লক্ষ্য থাকে মুখ, ওষ্ঠাধর, কপাল, কান। তারপর হাত, বুক, পা, যৌনাঙ্গ প্রভৃতি। শরীরের সবচেয়ে নান্দনিক ও স্পর্শকাতর প্রত্যঙ্গসমূহের চামড়া খোঁচানোর মাধ্যমে এই বাতিক আক্রান্তদের চর্মনাশ যাত্রার সূচনা ঘটে।
 
ব্রহ্মতালু: মাথার চাঁদি কে ব্রহ্মতালু বলা হয় কেন?
‘ব্রহ্ম’ শব্দটির শব্দমূল ‘বৃহ’। ‘বৃহ’ অর্থ ‘বৃধ’- বৃদ্ধিপ্রাপ্ত, বৃদ্ধি হওয়া, বাড়িয়ে চলা, বৃহৎ হওয়া। বৃহ+মন্=ব্রহ্ম।  ‘ব্রহ্ম’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি ক্লীবলিঙ্গ ‘ব্রহ্মন’ শব্দ হতে। ব্যুৎপত্তিগত অর্থ: বৃহতের চেতনা বা শক্তি।  অন্তোদাত্ত ‘ব্রাহ্মণ’ শব্দটি পুংলিঙ্গবাচক, অর্থ-‘ব্রহ্মবিৎ’ লাতিন ‘Verbum’ শব্দটির সঙ্গে শব্দমূলের বিচারে ‘ব্রহ্ম’ শব্দের সাদৃশ্য আছে। ‘Verbum’ শব্দটির ইংরেজি রূপান্তর ‘Word’, সৃজনশীল শব্দ বা Logos। যে অর্থে ‘বাক’ অথবা শব্দ হইতে সৃষ্টি সম্ভব হইয়াছে। বেদান্ত দর্শন অনুসারে মানবদেহে আটটি বিশেষ স্থান আছে।যাদের চক্র বলা হয়।মহাসাধকগণ শক্তির সাধনার মাধ্যমে এই অষ্টচক্রেই শক্তি প্রবাহ করতে পারেন।
 
রন্ধ্র অর্থ পথ আর ব্রহ্ম হচ্ছে পরম ব্রহ্মা বা সৃষ্টিকর্তা বা সাঁই। ব্রহ্মরন্ধ্র হলো ব্রহ্মার চলাচলের পথ। দেহের মস্তিষ্কের উর্ধ হলো সহস্রার পদ্ম যেটাকে অামরা তালুমূল বলি সেখানে ব্রহ্মা শিবরূপে বাস করে। অারো ব্যাপার অাছে। ফেসবুকে অার নাইবা বলি। সর্বশেষ চক্র মাথার চাঁদিতে অবস্থান করে।এবং একে শ্রেষ্ঠ চক্র বলা হয়।তাই একে ব্রহ্মতালু বলে। মাথা হল শরীরের সর্বশ্রেষ্ঠ অঙ্গ, যার উপরিভাগ হল হল চাঁদি বা তালু। ব্রহ্ম বলতে শ্রেষ্ঠ যা, তালুর নীচে শরীরের শ্রেষ্ঠ অংশটিই থাকে।
 
লুচ্চা
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, লুচ্চা হিন্দি উৎসের শব্দ। বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হিন্দি লুচ্চা অর্থ— চরিত্রহীন, লম্পট। লুচ্চার সমার্থক লোচ্চা।
প্রয়োগ: যে দেশের ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও আমলাদের অধিকাংশ লম্পট সে দেশের অধিকাংশ জনগণও লম্পট। মাথা ঘুরলে পা স্থির থাকতে পারে না।
অধুনা বাংলায় লুচ্চা শব্দটি দিয়ে মেয়েলোলুপ কিংবা  মেয়েদের প্রতি  যৌন বাসনায় লোলুপ পুরুষদের প্রকাশ করার অধিক প্রবণতা লক্ষণীয়। যেমন: শালা একটা লুচ্চা, মেয়ে দেখলে আর ঠিক থাকতে পারে না।
সংস্কৃত লোচিকা থেকে উদ্ভূত লুচি অর্থ— (বিশেষ্যে) ময়দার তৈরি তেল বা ঘিয়ে ভাজা পাতলা ও ছোটো পুরি। লুচ্চার সঙ্গে লুচির ভোজনগত  সম্পর্ক থাকলেও চরিত্রগ বা আচরণগত কোনো সম্পর্ক নেই।
 
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
লিংক: https://draminbd.com/সাত-সকাল-3/
 
error: Content is protected !!