সিঙ্গাপুর (Singapore) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (এশিয়া)

ড. মোহাম্মদ আমীন

সিঙ্গাপুর (Singapore)

সিঙ্গাপুর এশিয়া মহাদেশের একটি দ্বীপ ও নগর রাষ্ট্র। তটরেখার দৈর্ঘ্য ১৯৩ কিলোমিটার। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর পরস্পর থেকে জোহর প্রণালী দ্বারা এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে সিঙ্গাপুর প্রণালী দ্বারা বিচ্ছিন্ন। সিঙ্গাপুরের মূল ভূখণ্ডটি হীরকাকৃতি একটি দ্বীপ, তবে এর প্রশাসনিক সীমানার মধ্যে আরও কয়েকটি ছোট ছোট দ্বীপ রয়েছে। এর মধ্যে পেদ্রা ব্রাংকা নামের দ্বীপটি মূল দ্বীপ থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থিত। সিঙ্গাপুরের সীমানার অন্তর্গত কয়েক ডজন ছোট ছোট দ্বীপের মধ্যে জুরং দ্বীপ, পুলাউ তেকোং, পুলাউ উবিন ও সেন্তোসা উল্লেখযোগ্য।

সংস্কৃত সিম্পুরা বা সিঙ্গাহপুরা শব্দ হতে মালায়া সিঙ্গাপুরা শব্দের উৎপত্তি। যার অর্থ সিংহ নগর। এটি একটি দ্বীপ। এর প্রাচীন নাম টেমাসেক। শব্দটি মালয় বা জাভানিস টাসিক শব্দ হতে এসেছে। যার অর্থ লেক বা হ্রদ। সিঙ্গাপুর হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। দেশটি মালয় উপদ্বীপের নিকটে অবস্থিত। এর আনুষ্ঠানিক নাম প্রজাতন্ত্রী সিঙ্গাপুর।

প্রবাদমতে, সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা তার রাজ্যের নাম দিয়েছিলেন সিংহ শহর। কারণ তিনি নাকি দ্বীপে একটি সিংহ দেখেছিলেন এবং সৌভাগ্যের প্রতীক হিসাবে তিনি এটি দেখেছিলেন। তবে প্রাণীবিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, সিঙ্গাপুরের সিংহ কখনও ছিল না। ওই রাজা হয়তো বাঘ দেখতে পারেন। তবে বাঘ থাকার সম্ভাবনা ছিল। কারণ সিঙ্গাপুরের প্রতিবেশি ভূখণ্ড মালয়েশিয়ায় তখন প্রচুর বাঘ ছিল। সুতরাং রাজা যা দেখেছিলেন তা হতে পারে, বাঘ বা বড় আকৃতির কোন বন্য বিড়াল।

মারলিন বা সিংহ-মৎস্য হচ্ছে সিঙ্গাপুরিদের গর্বের প্রতীক, বীরত্বের প্রতীক। কথিত হয়, বহু পুর্বে সিঙ্গাপুর যখন তেমাসেক বা সমূদ্রনগরী নামে পরিচিত ছিলো তখন প্রচণ্ড এক সামূদ্রিক ঝড় ওঠে। অধিবাসীরা নিজেদের ঈশ্বরের হাতে সপে দেয়। ঠিক তখনই সমুদ্র থেকে অর্ধেক সিংহ ও অর্ধেক মৎস্য আকৃতির এক জন্তু এসে ঝড়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে দ্বীপবাসীদের বাঁচিয়ে দেয়। সে থেকে মারলিন তথা সিংহ-মৎস্য সিঙ্গাপুরীদের গর্ব আর বীরত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে। মারলিনের মুর্তি সিঙ্গাপুরের ম্যারিনা বে-এর মারলাওন পার্কে অবস্থিত।

সিঙ্গাপুরের মোট আয়তন ৭১৯ বর্গ কিলোমিটার বা ২৭৮ বর্গমাইল। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, মোট জনসংখ্যা ৫৫,৩৫,০০০ এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৭,৬৯৭ জন। সিঙ্গাপুর কেবল একটি প্রধান দ্বীপ এবং ৬৩ টি ক্ষুদ্র দ্বীপ নিয়ে গঠিত। তবে অধিকাংশ দ্বীপে কোনো জনবসতি নেই। সিঙ্গাপুর একটি ছোট রাষ্ট্র। সিঙ্গাপুর প্রশাসন সমুদ্রতলের মাটি, পর্বত ও অন্যান্য দেশ থেকে মাটি সংগ্রহ করে দশটির স্থলভাগের আয়তন বৃদ্ধি করে চলেছে। ১৯৬০-এর দশকে দেশটির আয়তন ছিল ৫৮২ বর্গকিলোমিটার, বর্তমান এটি ৭১৯ বর্গকিলোমিটার এবং ২০৩৩ সাল নাগাদ এর পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে আরও ১০০ বর্গকিলোমিটার
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আয়তন সিঙ্গাপুরের ১৫ হাজার গুণ। আয়তনে সিঙ্গাপুর পৃথিবীর ১৯০-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু জনসংখ্যা বিবেচনায় ১১৩-তম। জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় সিঙ্গাপুর পৃথিবীর ৩য় জনবহুল দেশ। আয়তনের দিক হতে সিঙ্গাপুর পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম দেশের মধ্যে অন্যতম। এটি পৃথিবীর কয়েকটি সার্বভৌম শহরের একটি। ১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দে সিঙ্গাপুরের প্রথম আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হয়। সে আদম শুমারি অনুযায়ী সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যা ছিল ১০,৬৮৩। জিডিপি (পিপিপি) ৪৫২.৬৮৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ৮২,৭৬২ টাকা। অন্যদিকে জিডিপি নমিনাল ৩০৮.০৫১ বিলিয়ন ইউএস ডলার (৩৬-তম) এবং মাথাপিছু আয় ৫৬,৩১৯ ইউএস ডলার। এর এইচডিআই ০.৯১(৯ম)। সিঙ্গাপুরের মুদ্রার নাম সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩ ডিসেম্বর সিঙ্গপুরের প্রথম পতাকা গৃহীত হয়। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ৯ আগস্ট কিছুটা পরিবর্তন করে তা পুনরায় গ্রহণ করা হয়।

সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী হলেন সরকারের প্রধান। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান হলেও তার ভূমিকা মূলত আলংকারিক। তবে ইদানিং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার পরিসর কিছু বাড়ান হয়েছে। ১৯৫৯ সালের নির্বাচন থেকে সিঙ্গাপুরের রাজনীতিকে পিপল্স অ্যাকশন পার্টি নামের রাজনৈতিক দল নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। একাধিক বিরোধী দল উপস্থিত থাকলেও ক্ষমতায় তাদের প্রতিনিধিত্ব নেই বললেই চলে। তাই অনেক বিদেশী পর্যবেক্ষক সিঙ্গাপুরকে কার্যত একটি এক-দলীয় শাসনব্যবস্থা হিসাবে গণ্য করে থাকেন। তবে সিঙ্গাপুরের সরকার সবসময়েই একটি স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত সরকার হিসাবে বহির্বিশ্বে পরিচিত।

সিঙ্গাপুর দ্বীপের বেশিরভাগ এলাকা সমুদ্র সমতল থেকে ১৫ মিটারের চেয়ে বেশি উঁচুতে অবস্থিত নয়। এর সর্বোচ্চ বিন্দুটির নাম বুকিত তিমাহ। যা সমুদ্র সমতল থেকে ১৬৪ মিটার উঁচু গ্র্যানাইট পাথরে নির্মিত একটি শিলা। সিঙ্গাপুরে কোন প্রাকৃতিক হ্রদ নেই, তবে সুপেয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য কৃত্রিম জলাধার নির্মাণ করা হয়েছে।

১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতা লাভের পূর্বে সিঙ্গাপুর ব্রিটিশদের অধীনে একটি ‘ক্রাউন কলোনি’ ছিল। এই দ্বীপটি পূর্ব এশিয়াতে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হতো। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি থাকার কারণে সিঙ্গাপুরকে তখন ‘জিব্রালটার অব দা ইস্ট’ বলা হতো। ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে সুয়েজ খাল খোলার পর ইউরোপ এবং এশিয়ার মধ্যে সমুদ্র বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। তখন বন্দর হিসাবে সিঙ্গাপুরের মর্যাদা ও গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে অর্থাৎ স্বাধীনতা লাভের বছরে এই দেশের মাথাপিছু আয় ছিল ৫১১ মার্কিন ডলার। এটি তখন পূর্ব এশিয়ার মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ ছিল। আশির দশকের মাঝখান দিকে সিঙ্গাপুর উন্নত রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করে ।

সিঙ্গাপুরের সংস্কৃতি পশ্চিমা-প্রকৃতির হলেও এখানে গোঁড়া হিন্দুবাদ, গোঁড়া খ্রিস্টানবাদ, গোঁড়া ইসলামবাদ (মালয় সংস্কৃতি) এবং গোড়া বৌদ্ধবাদ (চাইনিজ সংস্কৃতি) এর প্রচলন দেখা যায়। মালয় ভাষা, চীনা ভাষার বিভিন্ন উপভাষা, ইংরেজি ভাষা, বাংলা ভাষা এবং তামিল ভাষা যৌথভাবে সিঙ্গাপুরের সরকারি ভাষা। এছাড়াও এখানে প্রায় আরও ২০টি ভাষা প্রচলিত। তন্মধ্যে জাপানি ভাষা, কোরীয় ভাষা, মালয়ালম ভাষা, পাঞ্জাবি ভাষা এবং থাই ভাষা উল্লেখযোগ্য। ইংরেজি ভাষা সর্বজনীন ভাষার ভূমিকা পালন করে।

সিঙ্গাপুরের পতাকার লাল চিহ্ন বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও মানুষের সাম্যতা ও সম অধিকারের প্রতীক, সাদা বিশুদ্ধতা ও পূণ্যের প্রতীক। চাঁদ নবসৃষ্ট জাতির উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রতীক এবং ৫টি তারকা যথাক্রমে গণতন্ত্র, শান্তি, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও সাম্যতা নির্দেশ করে। সিঙ্গাপুরের অধিকাংশ লোক ইংরেজিতে কথা বললেও সিঙ্গাপুরের জাতীয় সঙ্গীত মাজুলা সিঙ্গাপুরা মালয় ভাষায় রচিত। ইংরেজি, চায়নিজ, মালয় ও তামিল সিঙ্গাপুরের সরকারি ভাষা। সিঙ্গাপুরের চায়নিজদের প্রায় সবার সার নেইম তান, লিম বা লি।

সিঙ্গাপুরের সড়কের দৈর্ঘ্য ৩,০০০ কিলোমিটার। যা সিঙ্গাপুর হতে হংকের দূরত্বের সমান। বিশ্বের প্রথম নাইট জু ও নাইট সাফারি সিঙ্গাপুরে অবস্থিত। সিঙ্গাপুরের জুরঙ বার্ড পার্কে পৃথিবীর সর্বোচ্চ মনুষ্য-নির্মিত কৃত্রিম জলপ্রপাত অবস্থিত। এটির উচ্চতা ৩০ মিটার। ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে ৬ মিলিয়ন ইউএস ডলার ব্যয়ে ব্রোঞ্জের ঢালাই দিয়ে নির্মিত বৃহত্তম ঝর্ণা পৃথিবীর বৃহত্তম ঝর্ণা। বুকিত তিমা প্রাকৃতি রিজার্ভে যত প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে পুরো উত্তর আমেরিকা মহাদেশেও তত প্রজাতির বৃক্ষ নেই। বুকিত তিমা হচ্ছে সিঙ্গাপুরের সর্বোচ্চস্থান। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে এর উচ্চতা মাত্র ১৬৪ মিটার।

হাঁস-দৌড় প্রতিযোগিতা সিঙ্গাপুরের একটি জনপ্রিয় বিনোদন। ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে ১,২৩,০০০ খেলনা হাঁস দিয়ে একটি হাঁস-দৌড় প্রতিয়োগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। দাতব্য কাজের জন্য অর্থ সঞ্চলের লক্ষ্যে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। অধিকাংশ সিঙ্গাপুরিয়ান অন্যান্যা মাসের চেয়ে অক্টোবর মাসে অধিক জন্মগ্রহণ করে। এর কারণ অবশ্য এখনও অজানা। ব্রিটিশ কাউন্সিলের হিসাবমতে সিঙ্গাপুরের জনগণ সবচেয়ে দ্রুত হাঁটে। তাদের হাঁটার গড় গতি প্রতি ১০.৫৫ সেকেন্ডে ১৮ মিটার। যা প্রতি ঘণ্টায় ৬.১৫ কিলোমিটারের সমান।

নাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের সামনে হাগ মি’ নামের একটি কোকাকোলা প্রদান যন্ত্র রয়েছে। কোনো ব্যক্তি কোক পান করতে চাইলে যন্ত্রটিকে জড়িয়ে ধরলে কোক এসে যাবে। ভালবাসার কোনো দাম নেই, তাই খরচ করতে হয় না। কিন্তু ভালবাসার যন্ত্র আপনাকে ঠাণ্ডা কোক পান করাতে দ্বিধা করে না। তবে এজন্য তাকে একটু আদর করতেই হবে। সিঙ্গাপুর আসলেই আদরের দেশ।


ফিলিপিনস (Philippines) : ইতিহাস ও নামকরণ

কাতার (Qatar) : ইতিহাস ও নামকরণ

রাশিয়া (Russia) : ইতিহাস ও নামকরণ

সৌদি আরব (Saudi Arabia) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!