সিরিয়া (Syria) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (এশিয়া)

ড. মোহাম্মদ আমীন

সিরিয়া (Syria)

সিরিয়া (আরবি ভাষায় আস্সূরিয়্যা) এশিয়ার মধ্যপ্রাচ্যের একটি রাষ্ট্র। এর সরকারী নাম আরব প্রজাতন্ত্রী সিরিয়া (আল্জুম্হূরিয়্যা ল্’আরাবিয়্যা স্সূরিয়্যা)। সিরিয়া শব্দের অর্থ কি তা নিয়ে গবেষকগণ কোনো স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি। বলা হয়, গ্রিক ‘সাইরিয়া’ হতে সিরিয়া নামের উদ্ভব। সম্ভবত আধুনিক ইরাকের পূর্বে অবস্থিত আস্যাইরিয়া হতে সিরিয়া নামের উৎপত্তি হয়েছে।

সিরিয়ার মোট আয়তন ১,৮৫,১৮০ বর্গকিলোমিটার বা ৭১,৪৭৯ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয়ভাগের পরিমাণ ১.১%। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের অনুমিত হিসাব অনুযায়ী এ দেশের মোট জনসংখ্যা ১,৭৯,৫১,৬৩৯ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটার জনসংখ্যা ১১৮.৩। আয়তনের দিক হতে সিরিয়া পৃথিবীর ৮৯-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু জনসংখ্যার দিক হতে ৫৪-তম। আবার জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় ১০১-তম জনবহুল দেশ। ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, সিরিয়ার জিডিপি (পিপিপি) ১০৭.৮৩১ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথপিছু আয় ৫,০৪০ ইউএস ডলার। অন্যদিকে জিডিপি নমিনাল ৫৯.৯৫৭ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ২,৮০২ ইউএস ডলার। মুদ্রার নাম সিরিয়ান পাউন্ড। সিরিয়ার একদিকে ভূমধ্যসাগর সীমান্ত সৃষ্টি করেছে। তুরস্ক, ইসরাইল, লেবানন, জর্ডান ও ইরাক আলোচ্য সিরিয়ার প্রতিবেশি রাষ্ট্র। সিরিয়া, ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়নি। কারও পাসপোর্টে ইসরাইলের ভিসা থাকলে তিনি আর সিরিয়া প্রবেশ করার অনুমতি পান না। সিরিয়ার জনগণের ৯০% মুসলিম। তন্মধ্যে সিংহভাগ সুন্নি। বাকি ১০ ভাগ খ্রিষ্টান। ভৌগোলিকভাবে সিরিয়া পর্বত দ্বারা দুটি পৃথক খন্ডে বিভক্ত।

সিরিয়ার রাজনীতি সংসদীয় প্রজাতন্ত্রের কাঠামোয় পরিচালিত। সিরিয়া সংবিধানমতে একটি সংসদীয় প্রজাতন্ত্র হলেও ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি আছে। বর্তমানে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলছে। সিরিয়ার প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হাফিয আল-আসাদ পাঁচ বার গণভোট বিজয়ের মাধ্যমে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখেন। তার ছেলে ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি বাশার আল-আসাদও ২০০০ খ্রিষ্টাব্দের এক গণভোটে সিরিয়ার রাষ্ট্রপতি পদে বহাল হন। রাষ্ট্রপতি ও তার মূল সহযোগীরাই, বিশেষত সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর লোকেরা, সিরিয়ার রাজনীতি ও অর্থনীতির মূল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।

আরবি সিরিয়ার সরকারি ভাষা। এখানকার প্রায় চার-পঞ্চমাংশ লোক আরবি ভাষায় কথা বলে। সিরিয়ায় প্রচলিত অন্যান্য ভাষার মধ্যে আদিজে, আরামীয়,আর্মেনীয়, আজারবাইজানি, দোমারি (রোমানি), কুর্দি এবং সিরীয় প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি সিরিয়ার পতাকা সরকারিভাবে গৃহীত হয়। ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ মার্চ পুনরায় পতাকাটি কিছুটা পরিবর্তন করে আবার গৃহীত হয়।

সিরিয়ার রাজধানী দামাস্কাস পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন শহর এবং এ পর্যন্ত অবচ্ছিন্নভাবে টিকে থাকা পৃথিবীর দীর্ঘস্থায়ী রাজধানী শহর। কমপক্ষে দশ হাজার বছর হতে সিরিয়া সভ্যতার দোলনা হিসাবে আখ্যায়িত হয়ে আসছিল। প্রাচীন রাজকীয় শহর ইবলা (Ebla) এখানেই অবস্থিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ অব্দ হতে ১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ইবলা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সমৃদ্ধ জনপদ হিসাবে বিবেচিত ছিল। ইবলায় বিশ হাজার কিউনিফর্ম (Cuneifrom) ট্যাবলেট পাওয়া গিয়েছিল। এ ট্যাবলেট হতে প্রাচীন মেসোপোটামিয়া সম্পর্কে অনেক কিছু জানা সম্ভব হয়েছে। সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিম দিকে অবস্থিত আলেপ্পো এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত দামাস্কাস সিরিয়ার দুটি প্রাচীনতম শহর। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে মিসরীয় ইতিহাসে দামাস্কাসের নাম উল্লেখ রয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ৬৩০০ অব্দ হতে এটি বিখ্যাত শহর। আলেপ্পো সম্ভবত নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যমান বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন শহর। এখানে খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০ অব্দে সমৃদ্ধ সভ্যতা গড়ে ওঠেছিল। সিল্করুটের অন্যতম পথ হিসাবেও এ শহর বিখ্যাত ছিল।

দেশটিতে বিগত কয়েক দশক হতে ধর্মীয় হানাহানি লেগে আছে। পোপ দ্বিতীয় জন পল ইসলাম ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের সক্রিয় চেষ্টা করেন। তিনিই প্রথম পোপ যিনি ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে সিরিয়ার রাজধানী দামাস্কাসে অবস্থিত বিখ্যাত উম্মাইদ মসজিদে যান এবং সেখানে প্রার্থনা করেন। প্রার্থনা শেষে তিনি মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনে চুমোও খান। তবু ধর্মীয় হানাহানি বন্ধ হয়নি। মুসলমানেরা ঐক্যকে কখনও শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

সিরিয়ায় মালোউলা (maaloula) নামের একটি ছোট শহর আছে। এখানকার অধিবাসীরা এখনও অ্যারামাইক ভাষার পূর্ব-আঞ্চলিক উপভাষায় কথা বলে। যিশুখ্রিস্ট এ ভাষায় কথা বলতেন। মালোউলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এক চমৎকার উপত্যাকা। এ শহরটি ছিল সেন্ট টেকেলার(St Tekla) আশ্রম। সেন্ট টেকলা ছিলেন সেন্ট পিটারের (St Peter) শিষ্য। এ শহরে সেন্ট সার্জিয়াসেরও (St sergious) আশ্রম ছিল। আশ্রম দুটোতে অবস্থিত দুটি মন্দির খ্রিষ্টানদের সবচেয়ে প্রাচীনতম মন্দির হিসাবে বিবেচিত। সিরিয়ার হামা পৃথিবীর একটি অদ্বিতীয় শহর। শহরটি পানি উত্তোলন-চাকার জন্য বিখ্যাত। এটি পানি উত্তোলনের একটি প্রাচীন কৌশল। যা সেখানে এখনও কার্যকর।

পৃথিবীর প্রথম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল সিরিয়াতেই। কথিত হয়, আদি মানব আদমের পুত্র কাবিল(Cain) তার সহোদর ভাই হাবিলকে (Abel) ইর্ষাপরায়ণ হয়ে এখানেই হত্যা করেছিল। সে হত্যার মহড়া এখনও চলছে। ইসলামিক স্টেটস নামের জঙ্গি গ্রুপের প্রধান অফিস সিরিয়াতে।

অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের মতো সিরিয়া এখনও মধ্যযুগীয় অনেক প্রথা বহাল আছে। অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ না হলে সিরিয়ায় নারী-পুরুষের প্রকাশ্য কথা বলা নিষেধ। হোটেল রেস্টুরেন্টে ছেলেমেয়েরা পৃথক বসে। বিয়ের পূর্বে নারীদের যৌনসংস্রব কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বিয়ের পূর্বে সহবাসকারী কোনো মেয়েকে কেউ বিয়ে করে না। কোনো কোনো পরিবারে নারীর বিবাহপূর্ব যৌনকর্মকে সম্মানসূচক খুন হিসাবে গণ্য করে ওই নারীকে হত্যা করতেও দ্বিধা করা হয় না।


বাংলাদেশ (Bangladesh) : ইতিহাস ও নামকরণ

ভুটান (Bhutan) : ইতিহাস ও নামকরণ

ব্রুনাই (Brunei) : ইতিহাস ও নামকরণ

চায়না (China) : ইতিহাস ও নামকরণ

কাম্বোডিয়া (Cambodia) : ইতিহাস ও নামকরণ

সাইপ্রাস (Cyprus) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!