সুখ বনাম শান্তি

সুখ বনাম শান্তি
সুখ: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত সুখ (√সুখ+অ) অর্থ— (বিশেষ্যে) আনন্দ, তৃপ্তি, আরাম, স্বাচ্ছন্দ্য এবং (বিশেষণে) আরামদায়ক, প্রীতিকর প্রভৃতি। অর্থাৎ, সুখ হচ্ছে আনন্দ, তৃপ্তি, আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্য। কোনো আকর্ষণীয় বিষয় নিজের উপভোগে বা অনুকূলে এলে বা পেলে কিংবা অনুরূপ সম্ভাবনা থাকলে মনে যে অনুভূতি সৃষ্টি হয় তা আনন্দ বা তৃপ্তি। ভালো কিছু খেলে বা ইন্দ্রিয় তুষ্ট হলে যে অনুভূতির সৃষ্টি হয় তা সাধারণভাবে তৃপ্তি— এগুলো সুখ কিংবা সুখের উপাদান। শরীর আরাম বোধ করছে এমন অবস্থাকেও সুখ বলা হয়।আপনি আপনার চাহিদা স্বাচ্ছন্দ্যভাবে পূরণ করতে পারছেন; এটি সুখ। একজন স্বাভাবিক মানুষের সুখ প্রধানত এবং বহুলাংশে আর্থিক সামর্থ্য বা ভৌতবিষয় দ্বারা শারীরিক প্রত্যয়ে নিয়ন্ত্রিত।

শান্তি: সংস্কৃত (√শম্‌+তি) অর্থ— (বিশেষ্যে) শমগুণ, প্রশান্তি, উৎকণ্ঠাশূন্যতা, চিত্তের স্থিরতা; ভিন্নমত পোষণকারী দুটি দেশের মধ্যে উত্তেজনা হ্রাস, বিষয়াদি হতে ইন্দ্রিয়ের নিবৃত্তি; উপশম; উৎপাতশূন্যতা; অপ্রত্যাশিত কিছুর অবসান, যুদ্ধের অবসান; কল্যাণ প্রভৃতি। এবং এসব মানসিক অনুভবের বিষয়াবলি শান্তির উপাদান। এখানে দেখা যাচ্ছে শমগুণ শান্তির প্রধান শর্ত। একজন মানুষের শান্তির সিংহভাগই শমগুণের উপর নির্ভর করে। আর্থিক বা শারীরিক কিংবা ভৌত বা বস্তুগত সম্পদে আপনি যতই সমৃদ্ধ হোন না কেন, মানসিকভাবে তা উপভোগ করার মতো শমগুণ বা প্রশান্তি কিংবা উৎকণ্ঠাশূন্য পরিবেশ পরিস্থিতি বা মনোভ মনোবৃত্তি না থাকলে আপনার শান্তি নেই।

সুখ ও শান্তি শব্দ দুটির অর্থ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— সুখ সাধারণভাবে বস্তুপ্রধান বিষয়, কিন্তু শান্তি হার্দিক বা মানসিক বোধ বা চৈন্তিক অথবা বিবেচনা-নির্ভর বিষয়। আপনি বিশ্বের সেরা ধনী। আপনি সুখী, কিন্তু আপনি লোভ, কাম, ক্রোধ প্রভৃতি শমগুণ এবং মানসিক উত্তেজনা নিবৃত্তি করতে পারেন না— আপনার সুখ থাকলেও শান্তি নেই। আপনার কেনার সামর্থ্য আছে, কিন্তু উপভোগ উৎকণ্ঠাশূন্য নয়, আপনি সুখী কিনতু শান্তিতে নেই।

আপনার সুখ আছে। ওই সুখের সঙ্গে ভালোবাসা, সহানুভূতি ও উদ্‌বেগহীন শমগুণ মিলিত হলে আপনার সুখ যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তাই শান্তি।

আপনি প্রচুর টাকার মালিক, বড়ো বাড়িতে থাকেন, দামি গাড়িতে চড়েন। মাসে মাসে বিদেশ ঘুরেন। সুন্দরী বউ, অষ্টাদশী প্রেমিকারাজি, অসুখ-বিসুখে দামি হাসপাতাল, ইচ্ছেমতো আকর্ষণীয় বা প্রত্যাশিত বিষয় বা বস্তু উপভোগ বা ভ্রমণ, সুস্বাদু খাবার, বিলাসী এবং আরামদায়ক জীবনযাপনের উপাদান আপনার হাতের মুঠোয়—আপনি সুখী মানুষ। আপনার জুতো চকচক করে। এসব বিষয়ের এক বা একাধিক দৃশ্যমান উপাদান সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও স্থির চিত্তে উৎকণ্ঠাশূন্য মনে শমগুণে বিদুষিত হয়ে পারিবেশিক উদ্‌বেগ শূন্যতায় উপভোগ করতে পারছেন না। এক্ষেত্রে আপনার সুখ আছে বলা গেলেও শান্তি আছে বলা যাবে না। আপনার জুতো চকচক করে ঠিক, কিন্তু পায়ের তালুতে ঘা।

খেতে বসলেন। দেশের সব নামিদামি ও সুস্বাদ খাবার আপনার সামনে হাজির করা হয়েছে। চাকর-বাকর আর দাস-দাসিতে গিজগিজ করছে চারদিক। সবাই নতমস্তকে সম্মান করছে। যা কেনার ইচ্ছে কিনতে পারছেন— আপনার সুখ আছে। কিন্তু যদি পারিবেশিক বা অন্যকোনো কারণে আপনার চৈত্তিক স্থিরতা না থাকে তাহলে আপনার শান্তি নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে দামি গাড়িটায় চড়ে মোনাকো ঘুরছেন, আপনি সুখী; কিন্তু পাশে বসে থাকা আপনার স্ত্রী-স্বজন আপনাকে দুপয়সা দাম দেয় না, অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাদের অনুগত হয়ে থাকতে হয় তিল তিল অনীহায় চিত্তে বড়ো কষ্ট নিয়ে; আপনার সুখ আছে, কিন্তু শান্তি নেই।

আপনি সুস্থ ও সবল মানুষ। প্রয়োজনীয় সবকিছু কিনতে পারেন, করতে পারেন। আপনার সুখ আছে; কিন্তু স্বামী বা স্ত্রী আপনাকে রাতদিন মন্দ বলে, উৎকণ্ঠায় অস্থির থাকতে হয় নানা কারণে— আপনার শান্তি নেই।
সুখের সম্পর্ক প্রধানত শরীরের সঙ্গে, কিন্তু শান্তির সম্পর্ক মনের সঙ্গে। অন্যদিকে স্বস্তি হচ্ছে শান্তির আশ্রয়স্থল। তাই সুখে থাকার চেয়ে, শান্তিতে থাকা ভালো। কারণ শান্তি হচ্ছে স্বস্তি ও উৎকণ্ঠীহীনতার ফল।
সুখ আর শান্তি একে অপরের পরিপূরক।তাই অনেকে মনে করেন, সুখ হচ্ছে ভোগের ফল। শান্তি হচ্ছে মনের পরিতৃপ্তি। মনের পরিতৃপ্তি সুখের নিশ্চয়তা আনে।সুখকে স্বস্তির সঙ্গে উপভোগ করতে পারাই হচ্ছে শান্তি। শান্তি হচ্ছে এমন একটা পরিস্থিতি যা সুখের মনে হাসি ফোটায়। এককথায়, আপনি কে বা কী কিংবা কি অবস্থায় আছেন, কী হয়েছে বা কী ঘটেছে তা দিয়ে সুখ নির্ভর করলেও শান্তি নির্ভর করে আপনি আপনার অবস্থানকে কীভাবে গ্রহণ করেছেন তার ওপর।

ড. মোহাম্মদ আমীনের পোস্ট: শুবাচ

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com

All Link : শুবাচে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ লেখা

All Link

All Links/1

All Links/2

শুবাচির প্রশ্ন থেকে উত্তর

All Links/3

বিছানাবাই: Clinomania

সুখ বনাম শান্তি

error: Content is protected !!