স্যমন্তকবাণী: সততা, সাহস ও সৌহার্দের অনুপমতা

সংগ্রহে: তাহসিন ঐশী (জোহিরা)
সংযোগ: https://draminbd.com/স্যমন্তকবাণী-সততা-সাহস-ও/
ড. মোহাম্মদ আমীনে লেখা ‘স্যমন্তক’ উপন্যাসের কয়েকটি বাণী নিচে দেওয়া হলো:
‘চলার পথে আকস্মিক দেখা হয়ে যাওয়া কোনো পরিচিত জনের সঙ্গে কুশল বিনিময় ‘মনে-রাখা’ নয়, মনরাখা; তেমনি যে ‘মনে-রাখা’ শুধু নিজের মনে আবদ্ধ থেকে যায় সেটাকে ‘মনে-রাখা’ বলা যায় না।’
‘আলোর কিরণ বাড়ানোর জন্য অন্ধকার অনিবার্য।’
‘বর্তমান পার করতে পারলে ভবিষ্যৎ। আগামীকাল কাউকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বর্তমানের কাউকে মেরে ফেলা পাগলামি, অপরাধ তো বটেই।’
‘পরিচর্যা না-পেলে মূল্যবান ধাতুও মূল্যহীন থেকে যায়। পাথরের উপর পড়লে অনেক ভালো বীজও নষ্ট হয়ে যায়।’
‘মৃতের দেহাবশেষ থেকে বেরিয়ে আসে নতুন জীবন। পুরাতনের লাশের উপর গড়ে ওঠে নতুন সভ্যতা।’
‘উপকারী গাছটা সবার সহজ নিষ্ঠুরতার শিকার হয়।’
‘সহমর্মিতার হাত এগিয়ে এলে কি না করা যায়! হাতই সৃষ্টি, হাতই নাশ, হাতই সুন্দর, হাতই অভিলাষ। এই হাত দিয়েই পৃথিবীর মহৎ কাজগুলো হয়েছে, অবশ্য খারাপ কাজগুলোও হয়েছে হাতে। এজন্য হাত দায়ী নয়, দায়ী মানুষের ইচ্ছে আর মন।’
‘ঈশ্বর তিনি, যিনি তাঁর সৃষ্টির কল্যাণ-পুজোয় আনত থাকেন সারাক্ষণ, ঈশ্বর তিনি, যিনি তাঁর সৃষ্টির মঙ্গলের জন্য সৃষ্ট। এসব আমি আপনাতেই পেয়েছি। হৃদয়ের শুদ্ধতা, সহিষ্ণুতা, করুণা ও দয়ার মাধ্যমে জীবনকে দেখতে হবে।’
‘ধাবমান রথের গতিবেগ সংবরণের ন্যায় যিনি উৎপন্ন ক্রোধ দমন করতে সমর্থ, তাঁহাকেই প্রকৃত সারথি বলে, অপর ব্যক্তিরা বল্গাধারী মাত্র।’
‘মৃত্যু আর জীবনের মধ্যে একদিন আলাপ হচ্ছিল। জীবন মৃত্যুকে বলল, “লোকে আমাকে ভালোবাসে কিন্তু তোমাকে এত ঘৃণা করে কেন? জবাবে মৃত্যু বলল, ”কারণ তুমি আকর্ষণীয় মিথু্্যক, কিন্তু আমি নিষ্ঠুর সত্য।”
‘ক্ষুধার মতো লাজহীন স্বাদ পৃথিবীর আর কিছু নেই।’
‘পোশাক এক প্রকার অহংকার আর অহংকার সুখের মল। অহংকার ত্যাগ করাই সুখের ধর্ম। এজন্য অহংকার আর সুখ একসঙ্গে থাকতে পারে না। একসময় মানুষের কোনো অহংকার ছিল না। পোশাকের প্রচলনই মানুষকে অহংকারী করে তোলে। এই অহংকারই মানুষের বিবেদ-রেখার বিস্তার।’
‘একসময় বাবা-মায়ের চাহিদাও শেষ হয়ে যায়। তাঁরা বুড়ো হয়ে যায়— মরে যায়। কিন্তু বইয়ের চাহিদা কখনো শেষ হয় না।’
‘ইংরেজির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এটা বিশ্বভাষা। কিন্তু শিক্ষার ভিত মাতৃভাষা। মাতৃভাষা আয়ত্তের পর বিশ্বভাষা। মায়ের দুগ্ধে পুষ্ট হয়ে সন্তান অন্য খাদ্যে যায়।’
‘ধার্মিকেরা মনে করে, অন্য ধর্মকে ঘৃণা করাই বড়ো পূর্ণ্য। এজন্য ধর্ম নিয়ে এত হানাহানি। ধার্মিকেরাই ধার্মিকের শত্রু।’
‘ধরো প্রাণীর খাদ্যগ্রহণ একটি প্রকল্প। খাদ্য থেকে শরীর পুষ্টি হিসেবে যা টেনে নেয় তা উৎপাদন, মলমূত্র হিসেবে যা ত্যাগ করে সেটি দুর্নীতি।’
‘কষ্ট তোমাকে ধারালো করবে। ওই ধার তোমার জীবনপথে চিহ্নের পর চিহ্ন রেখে যাবে অবলীলায়। যেমন পেনসিল রাখে। সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা হচ্ছে, তোমার ভিতরে যা আছে সেটিই উপকারী, বাইরে কী আছে তা নয়। পেনসিলের আগে যদি ইরেজার শেষ হয়ে যায় তাহলে বুঝতে হবে, তোমার চলার পথে ভুলের পরিমাণ শুদ্ধের চেয়ে বেশি ছিল।’
‘যাওয়া বলে কিচ্ছু নেই, সবই ঘুরে-ফিরে আসা। ভিন্ন আঙ্গিকে ভিন্ন অবয়বে।’
‘শরীরের রং কৃষ্ণ বলে, যে মেয়েটির বিয়ে দিতে তার সচ্ছল পিতা অসচ্ছল হয়ে পড়েছিল, মেয়ের শ্বশুরবাড়ির কালি-গালিতে যে কৃষ্ণ মেয়ের পিতা-মাতা বছরের পর বছর ঘুমাতে পারেনি শান্তিতে, সে কৃষ্ণবর্ণের মেয়েটি তার শ্বেতরোগে আক্রান্ত ফরসা ছেলেটির জন্য ধবধবে সাদা আর একজন শ্বেতরোগী খুঁজছেন। মানুষের এমন সাংঘর্ষিক ব্যবহার সত্যি বিস্ময়কর। আসলে, মানুষের চেয়ে অমানুষ কেউ নেই।’
‘কাছে পাওয়া আর ধরে রাখার নিরন্তর যন্ত্রণা। যত যন্ত্রণা তত ভালোবাসা।’
‘নির্ভরতা মাঝে মাঝে সতর্কতাকে অবহেলা করার ইন্ধন দেয়।’
‘অনুপস্থিতি ভালোবাসাকে ধারালো করে, উপস্থিতি ভালোবাসাকে করে শক্তিশালী। ধার ও শক্তি দুটোই প্রয়োজন। নইলে ভালোবাসা খুব সাধারণ হয়ে যায়।’
‘সারা পৃথিবীতে নিয়মের এত বেশি ছড়াছড়ি যে, নিয়মের মতো পানশে ও সস্তা আর কিছু আছে বলে মনে হয় না।’
‘শ্রদ্ধা পদগামী কিন্তু ভালোবাসা অন্তর্গামী, আপাদমস্তক সমানভাবে ছড়িয়ে। এজন্য মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা জানাতে হয় অন্তরে অন্তরে নিবিড় মমতায়।’
‘শ্রদ্ধায় কিছু ভয়, কিছু লজ্জা, কিছু দূরত্ব আর কিছু সংশয় ও কিছু পার্থিব প্রাপ্তির লোভ থাকে। ভালোবাসা হচ্ছে ভয়, লজ্জা, দূরত্ব ও সংশয়মুক্ত এবং নির্লোভ মাল্যের অধিকারী।’
‘অন্ধকার হৃদ্যতার প্রদীপ।’
‘দায়িত্বের সফল বিস্তৃতি মানুষের স্মৃতিকে জোরালো করে তোলে।’
‘অধিকার বন্যপাখির মতো অবাধ্য। একবার ছেড়ে দিলে সহজে পাওয়া যায় না।’
‘কর্তব্য যেখানে প্রবল, ভালোবাসা সেখানে রাঁধুনির বঁটির তলায় ধড়ফড় করা পুঁটি মাছের মতো অসহায়।’
‘আর্থিক দীনতা গভীর সম্পর্ক পর্যন্ত ভেঙে দেয়। আর্থিক লালিত্যে আত্মিক হৃদ্যতা কঠিন ও সর্বজনীন হয়ে ওঠে।’
‘অভিমান ভালোবাসার হাসি। হাসলে যেমন মানুষকে সুন্দর দেখায় তেমনি অভিমানে ভালোবাসা আরও অম্লান হয়ে ওঠে।’
‘উদার হৃদয় সততার নিবাস। লোভ সততার অন্তরায়।’
‘জীবন এত মধুর তার অবদান কিন্তু আনন্দ নয়, প্রত্যাশা। প্রত্যাশা আছে বলে জীবন এত মধুর, এত স্বপ্নীল, উচ্ছল ও বাঙময়।’
‘জীবনবোধ সম্পর্কে অজ্ঞ অতি সাধারণ মানের একদল বাংলা-আমলা বাংলাটাকে ডুবিয়ে ছেড়েছেন।’
‘আসা-যাওয়ার মাঝখানে কাছাকাছি থাকার সময়টুকুই প্রাপ্তি। বাকিটুকু ওই প্রাপ্তির ক্ষেত্রকে প্রশস্ত করে।’
‘নিয়ন্ত্রণহীন জিহ্বা পাগলের হাতে তুলে দেওয়া ধারালো তরবারির চেয়েও ভয়ংকর।’
‘ভালোবাসাকে কারও সঙ্গে তুলনা করতে নেই। তাহলে সে মরে যায়।’
‘চাওয়া-পাওয়ার মাঝে দেওয়ার যে অধীরতা সেটাই ভালোবাসা, সেটাই সংসারের প্রাণ, জীবনের অর্থ।’
‘শ্রদ্ধা পাওয়ার আর ভালোবাসা দেওয়ার। দুটো একসঙ্গে থাকলে ভালোবাসা আরও সজীব হয়ে ওঠে।’
‘সময় জমা রাখা যায় না কিন্তু স্যার ব্যবহার করা যায়। সময়কে ব্যবহার করতে হলে এমন কষ্ট থাকা আবশ্যক।’
‘সাগরে কেউ ঠাঁই পায় না, বড়োজোর বালুচরে বালির উপর বসে ঢেউয়ের উদ্দামতা দেখতে পারে।’
‘কিছু কিছু থেমে থাকা,কেবল থেমে থাকা নয়, মহাগতিবেগ পাওয়া গতিহীন অনুভূতি। এমন অনুভূতি জীবনের মতো তুলনাহীন।’
‘ভালোবাসা যাকে স্পর্শ করে সে পাথর হলেও নির্ঝর বৃষ্টির মতো সরব হয়ে ওঠে।’
‘যুদ্ধ ও প্রেম কোনো পরিকল্পনা মেনে চলে না। মৃত্যুর মতো হঠাৎ চলে আসে।’
‘আনন্দকে ভাগ করলে দুটো জিনিস পাওয়া যায়— একটি জ্ঞান আর একটি প্রেম। জ্ঞানকে ভাগ করলে তিনটি জিনিস পাওয়া যায় : প্রথমত জানা, দ্বিতীয়ত জানার বাইরের কোনো জিনিস জানার আগ্রহ এবং তৃতীয়ত এই দুটোর পরিপ্রেক্ষিতে অবাস্তব কোনো বিষয় বিশ্বাস করার আগে ভালোভাবে পূর্বাপর আনুপূর্বিক বিচার-বিশ্লেষণ।’
‘সুখ এমন একটা জিনিস, যা নিজের না-থাকলেও অন্যকে দেওয়া যায়।’
‘মেয়েদের অনুমান পুরুষদের বাস্তবতার চেয়ে শক্তিশালী।’
‘ভালোবাসা সম্পত্তি নয়, মনোবৃত্তিক সমৃদ্ধি। এটি মনের উপর নির্ভর করে। ইচ্ছা দ্বারা তাড়িত, এর শেষ নেই, অতৃপ্তি নেই।’
‘শরীরের উপর অত্যাচার ব্যক্তির আয়ু কমায় আর প্রকৃতির উপর অত্যাচার মানব জাতির আয়ু কমিয়ে দেয়।’
‘অভাব প্রত্যাশাকে আকুল আর প্রাপ্তিকে সতেজ রাখে।’
‘দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরস্পরের অবয়ব ছোটো হতে থাকে। তারপর ছোটো হতে হতে একসময় মিলিয়ে যায়।’
‘চোখ আর মনের মিলনই ঘটনা-অঘটনার সৃষ্টি করে।’
‘রক্ত মহামূল্যবান, জীবনের নিদান কিন্তু যে রক্ত শরীর থেকে বের হয়ে যায় সেই রক্ত সম্পদ নয়, আপদ।’
‘আলো যখন ভালোবেসে অন্ধকারের গলায় মালা পরিয়ে দেয়, হাত যখন ডাস্টবিন হতে মুমূর্ষু পাখির ছানাটা বাচিঁয়ে আনে— তখন যা ঘটে সেটিই সৃজনশীল ঘটনা।’
‘প্রশংসা পেতে পেতে প্রশংসার আকাঙ্ক্ষা এত বেড়ে যায় যে, তা ঈশ্বরত্বের দাবিতে গিয়ে ঠেকে। তবু প্রশংসার নেশা কাটে না এবং তা পূরণের জন্য একদিন মানুষ সত্যি সত্যি ঈশ্বরত্ব দাবি করে বসে। তখনই শুরু হয় অহংবোধের কান্না।’
বাণী সংকলনে: মৌটুসকি
গ্রন্থ: স্যমন্তক
লেখক: ড. মোহাম্মদ আমীন ;
প্রকাশনী: পুথিনিলয়;
মুদ্রিত মূল্য: ২৫০ টাকা।
error: Content is protected !!