স্যমন্তক: অষ্টপঞ্চাশত্তম পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

স্যমন্তক: অষ্টপঞ্চাশত্তম পর্ব

টবিলে ফাইলের স্তূপ।
ঘড়ি দেখলাম, সাড়ে চারটা। ছয় ঘণ্টার মধ্যেও এতগুলো কাজ শেষ করা যাবে না। ছয়টা হতে সাড়ে ছয়টার মধ্যে বাসায় ফিরতে হয়। দেরি হলে আগেই জানিয়ে দিতে হয় কোথায় গিয়েছি এবং না গেলে কী ক্ষতি হতো। নইলে রচনা ফোনে ফোনে অতিষ্ঠ করে তোলে, স্যার, আপনি কোথায়?
কাজ করতে করতে কখন সাতটা বেজে গেল টেরই পেলাম না। পিয়ন এসে জানাল, রচনা আপার জন্য পাশ লাগবে। এখন সচিবালয়ে ঢোকা আগের চেয়ে কড়াকড়ি করা হয়েছে। পাশ পাঠানোর আগে রচনা রুমে ঢুকে সোজা প্রশ্ন করে বসে, সারাদিন ফোন করেননি; কেন স্যার?
পাশ ছাড়া কীভাবে ঢুকলে?
মেয়েরাই মেয়েদের পাশ। তাই তাদের কাগুজে পাশ লাগে না। গেইটের লোকজন আমাকে চেনেন, জানেন আমি কার কাছে যাচ্ছি।
এভাবে হুট করে চলে আসা উচিত হয়নি।
ভয়ে বুকটা কাঁপছিল। কোথায় গেলেন? অফিসে থাকলে তো ফোন ধরতেনই।
ফোন ধরিনি মানে? তুমি কি ফোন করেছ?
টেবিলের নিচে তাকাই। ফোনের তার খুলে গেছে। কাণ্ড দেখে রচনা হেসে খুন, আর কোনোদিন এমন হলে আমি হার্টফেল করব।
একটু অপেক্ষা করলেই হতো।
অপেক্ষার যন্ত্রণা মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ। আমার কথা নয়, অনেক বড়ো মনীষীর কথা। ড্রাইভারকে চলে যেতে বলেন।
কেন?
রিকশায় যাব, আকাশটা আজ বড়ো সুন্দর। মনটা রিকশা রিকশা করছে। গাড়িতে বসলে পুরো আকাশ গাড়ির ছোটো ছাদ হয়ে যায়। আমার মনে হয় কী স্যার, মানুষ ছোটো ছাদওয়লা ঘরে থাকতে থাকতে আকাশটাকেও ছাদ ভাবে। তাই মানুষের মন ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। নইলে মন কীভাবে ছোটো হয়? তার তো আকাশের চেয়ে বড়ো হওয়ার কথা।
তুমি তো বলো পা থাকলে রিকশা কেন? হেঁটেই যাব আজ।
না স্যার, আপনার সঙ্গে কতদিন রিকশায় চড়িনি!
সচিবালয় হতে বের হয়ে রিকশা নিলাম।
অগ্রহায়ণের শেষ প্রান্ত। সামান্য শীত তবে মধুর। রচনা তার গায়ের চাদর আমার কাঁধে জড়িয়ে উষ্ণতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। হঠাৎ রচনার হাত ঠেকে যায় আমার পকেটে মানে সিগারেটের প্যাকেটে।
পকেটে হাত দিয়ে প্যাকেটটা বের করে রিকশাওয়ালাকে বলল, চাচা আপনি সিগারেট টানেন?
হ আপা।
এই নিন।
আমি কষ্টচোখে চেয়ে দেখলাম আমার বড়ো সাধের সিগারেটের প্যাকেটটা কীভাবে লুট হয়ে গেল। অভিমানে থম ধরে থাকি। রচনা বুঝতে পারে। আমার অভিমান ভাঙানোর জন্য বলল, স্যার সিগারেট ফুসফুস নষ্ট করে দেয়।
আমি চুপ, রিকশা চলছে। দেখি কতক্ষণ চুপ করে থাকতে পারি।
রচনা বলল, কিছু বলুন স্যার?
তুমি বলো।
আপনি বলুন স্যার।
আমি কথা বলব না, রাগ করেছি।
স্যার, একজন আর একজনকে ভালোবাসে, এ নিয়ে কত গল্প হয়, কাহিনি হয়, কবিতা হয়। এগুলোর অর্থ কী স্যার? ভাবতে গেলে সব এলেমেলো হয়ে যায়।
এগুলোর অর্থ জীবন। এগুলোই জীবনের সবকিছু। এজন্য এলোমেলা মনে হয়।
রিকশাওয়ালা বললেন, কই নিমু স্যার?
রচনা বলল, আপনার যেখানে ইচ্ছে। দেখুন স্যার, চাঁদটা কেমন হাসছে?
তোমাকে দেখে।
রিকশাওয়ালা আবার জানতে চাইল, যাইবান কই স্যার?
যেখানে খুশি।
আমি বললাম, আর কতক্ষণ ঘুরবে।
সারা রাত।
রিকশার গতি-হাওয়ায় ঠান্ডা লাগতে শুরু করেছে। রচনা আমাকে আরও উষ্ণতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তার গায়ের চাদরটা দিয়ে আমাকে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে নিল।
শীত লাগছে না? আমি জানতে চাইলাম।
আপনার সঙ্গে ঘুরতে আমার শীত লাগে না, গরমও লাগে না। ভালো লাগে।
আমার কিন্তু শীত করছে।
শীতের মতো এত আরামদায়ক উষ্ণতা আর কোনো ঋতু দিতে পারে না। এই যে স্যার, চাদর-আদর দিয়ে আপনাকে জড়িয়ে ধরলাম, অন্য ঋতুতে এমন পারতাম না। প্রিয়জনের উষ্ণতা শীতের মতো, অন্য কোনো ঋতুতে তাকে নিবিড় সখ্যতায় উপভোগ করা যায় না। অনেক দিন পর রিকশায় অনেকদূর ঘোরা হলো স্যার।
আমি বললাম, বৈচিত্র্য জীবনের ক্লান্তি নাশ করে।
আমি স্যার অত চিন্তা করতে পারি না।
কী চিন্তা করোা?
আপনি কাছে থাকলে আমার অন্য কিছু ভাবতে ভালো লাগে না। আপনিই আমার আনন্দ। আপনিই আমার অসীম জগৎ। আপনি আছেন বলেই আমার জীবন এত তাৎপর্যময়।
তোমার কৃৃতার্থবোধই আমার পরম প্রাপ্তি। এমন কয়জনই বা পায়? তুমি আমার ভাগ্য। আমার আর চাওয়ার কিছু নেই। এখন কেবল তুমিই আমার প্রত্যাশা।
স্যার, জীবন এত মধুর তার অবদান কিন্তু আনন্দ নয়, প্রত্যাশা। প্রত্যাশা আছে বলে জীবন এত মধুর, এত স্বপ্নীল, উচ্ছল ও বাক্সময়। আপনিই আমার সব। কে জানি গানটা গেয়েছেন স্যার?
কোনটা?
তুমি আছ সবই আছে, তুমি নাই কিছু নাই।


শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
error: Content is protected !!