স্যমন্তক: অষ্টাত্রিংশ পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

রচনা ব্রিটিশ কাউন্সিলে গেছে। সঙ্গে তার কয়েকজন বন্ধুও। আমার গাড়িটা তাকে ছেড়ে দিয়েছি। আজ তার সংবর্ধনা। সবার মনে আনন্দ। আমিও যেতাম, অনেক অনুরোধ করেছে, কিন্তু তার বন্ধুদের সঙ্গে যাওয়া ঠিক হতো না। তাই কাজের অজুহাতে যাইনি। আমি জানি, কখন কোথায় যেতে হবে না-হবে। ছফাও যাবেন না, মানে যেতে পারছেন না। তিনি ব্রিটিশ কাউন্সিল যাওয়ার জন্য কক্সবাজারের প্রোগ্রাম বাতিল করেছেন ঠিকই, কিন্তু হঠাৎ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
ডাইনিং রুমের টেবিলে আল্প-কল্পু, টুটুল আর নিনি পড়ছিল। আমি অফিস থেকে এসে টেবিলের চারদিকে ঘুরে ঘুরে পাঠ দেখিয়ে দিচ্ছিলাম। সন্ধ্যার পরপরই রচনা বাসায় ঢোকে। ড্রাইভারের হাতে বিশাল একটা ফুলের তোড়া আর পাঁচ প্যাকেট খাবার। ফুলের সঙ্গে খাবার, উত্তম সমন্বয়। রচনা আমার পায়ের নিচে ফুলের তোড়াটা রেখে পা ছুঁয়ে বলল, স্যার, আমার সব সাফল্য, সম্মান আর অর্জন আপনার চরণে বিসর্জন দিলাম। গ্রহণ করুন।
আমি রচনাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, মেয়ে, তুমি আমার মুগ্ধতা হয়ে থাকবে চির জীবন। তোমার সবকিছু আমার স্নেহে গলেজলে একাকার। আমাকে দেওয়া তোমার কোনো কিছুই বিসর্জন নয়, দুজনের সঞ্চয়। এ সঞ্চয় মনের, মনের সঞ্চয় বেহাত হয় না কখনো। তুমি হবে আমার জীবনের জোছনা।
না স্যার, আমি জোছনা হব না, আগরবাতি হব। এজন্য কালো হয়েছি। জ্বলে জ্বলে নিঃশেষ হয়ে গন্ধ বিলিয়ে যাব আজীবন।
টেবিলে খাবার সাজাতে সাজাতে আল্পনা বলল, আমি কী হব?
কী হবে?
আমি টয়লেট পেপার হব।
কেন?
এটি লম্বা, অনেকদিন যায়। উপকার করে, কিন্তু অহংকার করে না। আমার কথা নয়, অনেক বিদ্বান লোকের কথা।
কল্পনাকে বললাম, তুমি কী হবে?
কল্পনা বলল, ভাইয়া, আমি পরে বলব কী হব। এখন একটা কবিতা বলি?
বলো।
এটা কিন্তু বস্তির কবিতা।
আরে পিচ্চি, কবিতার আবার বস্তি-ফ্ল্যাট আছে না কি?
কল্পনা বলল, মানুষের মধ্যে যদি বস্তি-ফ্ল্যাট তফাত হয়, ধনী-গরিব হয় কবিতাতে হবে না কেন বাবা? বস্তির কবিতা আমাদের মতো বস্তিতে জন্মায়। বড়োও হয় বস্তিতে। এদের ঘরবাড়ি নেই। কবিতার ঘরবাড়ি মানে আমাদের ঘরবাড়ি নয়, বই।
আমি বাম হাতে আল্পনার কানের লতিতে কুতকুতো দিয়ে বললাম, তাহলে বলো।
“যত টাকা জমাইছিলাম
শুঁটকি মাছ খাইয়া
সকল টাকা লইয়া গেল
গুলবদনির মাইয়া।”
দারুণ তো! কার কবিতা?
কল্পনা বলল, বাবা মাঝে মাঝে এটি গাইতেন।
টুটুল থালার শেষ ভাতটুকু মুখে দিয়ে বলল, তাহলে আমিও একটা বলব। এটিও বস্তির কবিতা। আমাদের মতো বস্তিতে জন্মগ্রহণ করেছে।
রচনা অনেকক্ষণ কথা বলার সুযোগ খুঁজছিল। টুটুলকে থামিয়ে দিয়ে বলল, অনেক গল্প হয়েছে, আর না। তাড়াতাড়ি খেয়ে পড়তে যাও। স্যার, শুধু তোমাদের কবিতা শোনেন— আমি কি পচে গেছি? এবার আমার কবিতা শোনাব।
কথায় কথায় মজায় মজায় ফুলের মাঝে আমাদের খাওয়া শেষ হয়ে গেল। ডাইনিং টেবিল ছেড়ে বেসিনের দিকে যেতে যেতে রচনাকে বললাম, মেয়ে, তোমার ফ্রেঞ্চ ভাষার খবর কী?
রচনা তরল সাবান দিয়ে আমার হাত ধুয়ে দিতে দিতে বলল, ফরাসি কবি জাক প্রেভেয়-এর একটা কবিতা অনুবাদ করেছি। কয়েক লাইন বলি স্যার?
বলো।
রচনা তোয়ালে দিয়ে আমার হাত মুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
“লোহার বাজারে গিয়েছি আমি,
শিকল কিনেছি। কঠিন শিকল ম্যাম—
কেবল, তোমারি জন্য এমন করেছে আমার হৃদয় প্রেম।”
শুধু ফরাসি নয়, আরবি, চায়নিজ ও রুশ ভাষাতেও রচনা দক্ষ হয়ে উঠেছে। বলতে পারে অনর্গল। বোন দুটোও কম যায় না। তাদের সাফল্যে আমার স্বপ্নগুলো বৃষ্টির প্রশান্তি হয়ে লুটিয়ে পড়ছে আমার মরুময় বুকের আনাচে-কানাচে সবুজের গম্বুজ হওয়ার ভাবনায়। নিনিটাও ভালো করছে।
মেয়ে, তুমি বেশ ভাগ্যবান। কী চমৎকার অনুবাদ।

The sun doesn’t just hang on one family’s tree.

কী বোঝাতে চাইছ?
স্যার, অনেকে ভাগ্য বিশ্বাস করেন, আমি করি না। ঈর্ষাপরায়ণ লোক কীর্তিমানদের অযোগ্য প্রমাণ করার জন্য ভাগ্যে বিশ্বাস করে। তবে আমার চেয়ে বেশি ভাগ্যবতী কেউ নেই। আপনিই আমার সে ভাগ্য।
এটা এক ধরনের সাংঘর্ষিকতা।
আপনাকে পাওয়ার পর থেকে আমি সাংঘর্ষিক। আপনিই আমাকে ভাগ্যবতী করেছেন, সাংঘর্ষিক করেছেন, উদার করেছেন, অনুদার করেছেন, সাহসী করেছেন, ভীরু করেছেন, প্রত্যাশায় দীপ্ত করেছেন এবং একমুখী করে দিয়েছেন। আমি সবকিছুতে ভাগ দিতে পারি, কিন্তু আপনার ভাগ কাউকে না। কেউ যদি নিয়েও নেন, তাহলে আমি আমার ভাগ কাউকে দেব না। আমি কেবল আমার থেকে যাব। 
দেখো মেয়ে, তুমি কিন্তু এরকম কথা আর বলবে না।

টুটুল বলল,  লজ্জাকথা, লজ্জার মতো কষ্ট আর কিছু নেই।
রচনা বিষাদ গলায় বলল, আসলেই স্যার, লজ্জা আর কষ্ট একই জিনিস। জনদরদি নেতা মাসুদ সাহেব আমার অসুস্থ বাবার সামনে আমাকে লজ্জা দিয়েছিলেন, সেই কষ্ট মনে পড়লে এখনো শিউরে উঠি।
তোমার প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছে করে না?
প্রতিশোধ আমি নেবই। মেয়েরা প্রতিশোধ নিতে ছাড়ে না। আমাদের স্মরণ শক্তি হাতির চেয়ে প্রখর, কিছুই ভুলি না। প্রতিশোধ লওয়া বলতে আমরা যা বুঝি সেটি স্যার, পাশব। দুটি কবর খননের মতো, যার একটি আমার অন্যটি আমার প্রতিপক্ষের। কামড়ে দেওয়া কুকুরকে কামড় দেওয়ার মতো লজ্জাকর। আমার প্রতিশোধ হবে অন্য রকম।
কী রকম?
যে আমার ক্ষতি করেছে, অপমানিত করেছে তার মতো না-হওয়া, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। স্যার, গত সপ্তায় শিল্পকলায় রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আলোচনা সভা ছিল।
বলছিলে।
আমি ছিলাম মূল প্রবন্ধের লেখক-পাঠক।
কেমন হলো?
তালি পড়েছে জোরে। তবে প্রবন্ধের জন্য না প্রবন্ধের সমাপ্তির জন্য জানি না। দেশ পত্রিকার সাংবাদিক রঞ্জন আর অরুণাভ সরকার লেখাটা নিয়ে গেছেন। নিশ্চয় ভালো হয়েছে, নইলে নেবেন কেন?
থ্যাংক ইউ।
আমার ঘুম পাচ্ছে।
আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিই।
অনুমতি চেয়েছ না কি সিন্ধান্তটা জানিয়ে দিয়েছ?
রচনা আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে খুব মোলায়েম কণ্ঠে বলল, অনুমতি নিতে হবে কেন স্যার? রুটিন কাজে অনুমতি নিতে নেই, সাক্ষাৎকারের কথা মনে নেই? মাথায় হাত বুলাতে আর আঘাত দিতে কেউ অনুমতি নেয় নাকি?
ঠিকই তো।
স্যার, আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। আপনি চুপচাপ ঘুমান। শরীরটা ইদানীং দুর্বল দেখাচ্ছে। ঘুমের অভাব হলে এমন হয়। কী-জানি একটা বড়ো কষ্ট আপনার মনে নড়ে ওঠে মাঝে মঝে। আমি বুঝতে পারি, স্যার। মা যেমন বুঝতে পারে তার সন্তানের মন।
আমি বললাম, তুমি আমার মা। সব প্রেম নাড়ী হয়ে মিশে গেছে আহ!
পান বানাতে বানাতে রচনা গুনগুন করে গাইল-
শোনো গো দখিনো হাওয়া, প্রেম করেছি আমি
লেগেছে চোখেতে নেশা দিক ভুলেছি আমি…।
গানে গানে ঘুম বড়ো মধুর। ঘুম আমাকে ভরিয়ে দেয় বিস্মৃতির তলে। ঘুমের মধ্যে নতুন ঘুম আসে আমার। ঘুমের মধ্যে ঘুম এলে, ঘুমের ঘোরেও মন সচল হয়ে ওঠে। আমি হাত দিয়ে খুঁজতে থাকি মন, মন আটকে যায় মনের হাতে।
আমার হাত রচনার কোল পেয়ে সত্যিকার ঘুমে অবশ হয়ে গেল- দশ আঙুলের দশোরায়।

 
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক
স্যমন্তক: ঊনচত্বারিংশ পর্ব
স্যমন্তক: চত্বারিংশ পর্ব
স্যমন্তক: অষ্টাত্রিংশ (শুবাচ লিংক)
স্যমন্তক: ঊনচত্বারিংশ (শুবাচ লিংক)
স্যমন্তক: চত্বারিংশ (শুবাচ লিংক)
error: Content is protected !!