স্যমন্তক: ঊনত্রিংশ ও ত্রিংশ পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

স্যমন্তক: ঊনত্রিংশ ও ত্রিংশ পর্ব

আমার বিদেশ ভ্রমণ রচনার জন্য কষ্টের। আল্পনা-কল্পনার জন্য বেদনার। টুটুলও মেনে নিতে পারে না— ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে, বাবা আপনি যাবেন না। কল্পনা চিৎকার দিয়ে সারা ভবন জানান দিয়ে দেয়, দৌড়ে আসে সবাই। অবাক হয়ে যায় তার মমতা দেখে। নিনিও শরিক হয়ে তাদের সঙ্গে একই কাজে।
আমি কয়েক বছরের মধ্যে তাদের জন্য অনিবার্য হয়ে ওঠেছি। রচনা প্রথম থেকে ডাকে স্যার। বাকি তিন জনের সম্বোধন তাদের চেয়ে চঞ্চল। অধিকাংশ সময় ভাইয়া, মাঝে মাঝে বাবা। রচনাও বাবা ডাকেন হঠাৎ হঠাৎ। আমি সম্বোধন নিয়ে ভাবি না। কারণ আমার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কই প্রচলিত প্রথা বিবেচনায় স্বাভাবিক— এমন কেউ বলবে না। এই যে অস্বাভাবিকতা— এটাই আমার কীর্তি, আমার গৌরব, আমার সমগ্র জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ। যা অনেকের কাছে অসামাজিক, কারও কারও ভাষায় লুচ্চামি। কেউ যদি অপকীর্তি বলে তাতে আমার কর্ম থেমে থাকবে না। বরং আরও গৌরবান্বিত হবে। কেউ যখন আমার বদনাম করে তখন আমি নিশ্চিত হই— অন্তত তার চেয়ে কোনো না কোনোদিক থেকে আমি ভালো এবং আমার কাজ খারাপ নয়।
দেশের বাইরে যাব শুনলে ভীষণ বিষণ্ন হয়ে পড়ে রচনা। এবার কষ্ট আরও বেশি গাঢ়। তার ধারণা আমি আর দেশে ফিরব না। প্রিয়জনকে হারানোর হেতু-অহেতুর শঙ্কা মানুষের মজ্জাগত চাঞ্চল্য। এটি অনেক অমানুষকে মানুষ আবার অনেক মানুষকে অমানুষ করে দেয়।
কাঁদো কাঁদো গলায় রচনা বলল, স্যার, না গেলে হয় না?
আমার যে চাকুরি।
আপনি আর ফিরবেন বলে মনে হয় না।
এমন ধারণা কেন হলো?
আমার মন বলছে। অনেকে এভাবে বিদেশ গিয়ে আর ফেরেন না। বিদেশ গিয়ে দেশের কথা ভুলে যান। স্যার, আমাকে ভুলে যাবেন না তো?
আমাকে ভুলতে দিও না। আমি আসব, বাংলাদেশ ছাড়া আমার আর কোনো জায়গা নেই। সবচেয়ে বড়ো কথা— কারও অনুমতি ছাড়া কাউকে ভোলা যায় না। যায়?
স্যার, আমার মন বলছে আপনি আমাকে ভুলে যাবেন।
তোমাকে ভোলা আর না-ভোলার বিষয়টা তোমার হাতে। তুমি যদি অনুমতি না-দাও আমি তোমাকে ভুলবে কীভাবে?
তবু যাবেন না। অনেক কথা জমা পড়ে আছে। অনেক কথা। বলব-বলব করে বলা হয় না।
বলো?
বলতে বললে কী স্যার বলা যায়? করতে বললে কি করা যায়? মারতে বললে কি মারা যায়? পরিবেশ প্রয়োজন, প্রয়োজন সময়, কারণ এবং মনের আনুকূল্য।
না বলে থাকা সম্ভব হলে না-বলা-কথা না বলাই উত্তম।
কেন, স্যার?
না-বলা-কথা কারও ক্ষতি করে না। অপ্রকাশিত কথা তোমার দাস, বলে ফেলা মাত্র তা প্রভু হয়ে যায়। শ্রোতৃবৃন্দের দাস হয়ে তোমার বলা কথা তোমার ওপর ছড়ি ঘুরাতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হবে না।
আপনি কয়েকদিন পর দেশে ফিরবেন, আমি জানি। তবু এত কষ্ট হচ্ছে কেন? স্যার, বলেন-না।
এটাই কী তোমার না-বলা কথা?
স্যার।
এটি মমতা, এটি ভালোবাসা, এটি প্রেম, এটি আদর।
মায়া-মমতা, প্রেম আর ভালোবাসা— সব কী স্যার একই জিনিস?
আমার রাখাল মন গান গেয়ে যায়— হে আমার দেশ, হে আমার প্রেম; কত আনন্দ বেদনায় মিলন বিরহে সংকটে। কী বুঝলে?
তাহলে স্যার ভালোবাসা কী?
আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি – – -। কাছে পাওয়া আর ধরে রাখার নিরন্তর যন্ত্রণাই হচ্ছে ভালোবাসা। যত যন্ত্রণা তত ভালোবাসা। যত ভালোবাসা তত যন্ত্রণা।
অঙ্কের খাতা থেকে মুখ তুলে কল্পনা বলল, বাবা, আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন?
তোমার কী মনে হয়?
ভালোবাসেন, নইলে আমাদের জন্য এত কিছু কি করতেন?
আচ্ছা, স্যার, ভালোবাসা আর বিনিময়ের তফাত কী?
মানুষ গবাদি পশুর জন্য অনেক কিছু করে, তা ভালোবাসা নয়, জবাই করে খাওয়ার লালসা। এটা বিনিয়োগ। আমার এক সিনিয়র বন্ধু নামটা বলছি না, অনেক ধনী। তিনি বহুবছর থেকে প্রতিবছর বেশ কয়েকজন গরিব পিতামাতার মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ দিয়ে আসছেন; বিনিময়ে তার সঙ্গে ঘুরতে হয়, হোটেলে যেতে হয়। এটি বিনিয়োগ।
আপনি আমার জন্য যা করছেন সেটি কী?
লোভ, ভালোবাসা, বিনিয়োগ। তবে আমার চাহিদা আমার বন্ধুর মতো নয়, অন্য রকম। তাতে মনস্তাত্ত্বিক মোহ আছে, শারীরিক লালসা নেই।
লোভ কেন? রচনা বলল।
তুমি যত বড়ো হবে আমি ততো গর্বিত হব, তোমার বয়স যত বাড়বে আমি তত বড়ো হব, বুড়ো বয়সে তুমি আমাকে তোমার বাসায় থাকতে দেবে, অথর্ব বলে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে না— অনেক লোকের সন্তান-সন্ততির মতো, স্ত্রীর মতো। আমি কাশলে তুমি বলব না— বুড়ো কাশে আমার ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার ব্যাঘাত হচ্ছে, বের হয়ে যা বুড়ো। বলতে বলতে আমি কেঁদে দিলাম, জানি না কেন কেঁদে দিলাম।
সান্ত্বনায় চোখ মুছে দিতে আমার মুখের ওপর উপুড় হলো রচনা। জল কমল না, বরং তার চোখের জল আমার চোখে পতিত হতে থাকল, সে মেঘ আমি সাগর। ভীষণ হয়ে গেল আমার চোখের জল। কল্পনাও কেঁদে দিল।
যাও, এবার আমি ঘুমাব। কাল ভোরে মালপত্র গোছাতে হবে। কান্না চাপা দিতে গিয়ে আরও স্পষ্ট হয়ে গেল।
মালপত্র সব গুছিয়ে রেখেছি।
রচনার ব্যাগেজ গোছানো রচনার চেয়ে আন্তরিক। আমার কী কী লাগবে সব জানে সে, ঠিক ওভাবে গুছিয়ে দেয়। তারপর একটা তালিকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে— স্যার, দেখুন কোনো কিছু বাদ গেছে কি না? সব লেখা আছে, কোন জিনিস কোথায় রাখা হয়েছে এবং কয়টি।
ভ্রমণ-ব্যাগ গুছানো জটিল কাজ। রচনা আসার পূর্বে আমি সাতদিন পূর্ব থেকে কত যত্ন-আত্তি দিয়ে ভ্রমণ-ব্যাগ ভরতাম। তবু অনেক প্রয়োজনীয় টুকিটাকি ফেলে যেতাম।সে আসার পর আমাকে আর ভ্রমণ-ব্যাগ গোছাতে হয়নি। সেই গুছিয়ে দিয়েছে— আশ্চর্য, কোনো বার আমার দরকারি কোনো জিনিস বাদ পড়েনি।
স্যার, আমার আরও কথা বলতে ইচ্ছে করছে।
বলো?
বলতে পারব না।
কেন?
সব কথা বলা যায় না।
যে কথা বলা যায় না সেগুলো কথা না।
কী স্যার?
অনুভূতি, সব কথা বলতে নেই। কিছু কথা নিজের জন্য রেখে দিতে হয়। এগুলো কেবল নিজেকে শোনানোর জন্য।
চুলগুলো টেনে দেই?
কিন্তু কোনো কথা বলতে পারবে না।
স্যার?
এই মেয়ে, কথা বলতে নিষেধ করেছি না।
তোমারেই করিয়াছি জীবনেরই ধ্রুবতারা- – -।
আবার কথা?
এটা কথা নয় স্যার, গান।
আমার ঘুম পাচ্ছে। ঘুম পেলে কিছু ভালো লাগে না ঘুম ছাড়া।
স্যার, রবীন্দ্রনাথকে আপনার ভালো লাগে না?
এমন প্রশ্নের কারণ?
আপনি গান গাইতে দিচ্ছেন না, তাই।
একটু বিরক্ত প্রকাশ করে বললাম, যত ইচ্ছে গাও, গলা ফাটিয়ে গাও; সকাল পাঁচটায় ডেকে দিও।
রচনা গাইতে শুরু করে,
তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুব তারা
এ সমুদ্রে আর কভু হব নাকো পথ হারা।
যেথা আমি যাই নাকো তুমি প্রকাশিত থাক
আকুল নয়ন জলে ঢালো গো কিরণধারা।
ঘুম ঠিকই এসে গেছে। চোখে আধো তন্দ্রা। হঠাৎ মনে হলো একটা নরম চুমো দুটো পুষ্ট ঠোঁটের চাপে আমার কপাল ছুঁইয়ে চলে গেল কেউ।
আপু, আমি একটা চুমো দিই? কল্পনার গলা।
দাও।
এরপর আর কিছু মনে নেই।
অগাধ ভালোবাসা নিয়ে আমি অগাধ ঘুমে হারিয়ে গেলাম।

৩০

ঘুম ভাঙার পর ঘড়ি দেখে চমকে উঠি, হাতে সময় কম। কেউ ডাকার না-থাকলে এমন হতো না। নিজে নিজেই উঠে যেতে পারতাম। নির্ভরশীলতা মাঝে মাঝে সতর্কতাকে অবহেলা করার ইন্ধন দেয়।
গলায় একটু রাগ মিশিয়ে রচনাকে বললাম, ডেকে দাওনি যে?
রচনা থমথমে মুখে দুনিয়ার সব অভিমান জড়ো করে বলল, সকালের ঘুমটা আপনার খুব প্রিয়। তাই তাড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করেনি। সব গোছানো আছে, বাবা। দেরি হবে না।
রচনার কথা শুনে মনটা স্নেহে ঢলে পড়তে চাইছে। সম্বোধনের কোনো হিসেবে নেই তাদের। তাড়াতাড়ি বের হয়ে যেতে পারলে বাঁচি। স্নেহ-আঠার মতো মারাত্মক আঠা আর নেই। মুখে দুটো রুটি ঢুকিয়ে দিয়ে এক গ্লাস জল ঢাললাম গলায়। রচনা এক দৃষ্টিতে আমার কাণ্ডকারখানা দেখছে। আল্পনা-কল্পনা ও টুটুল এবং নিনি মন খারাপ করে মেঝেতে এক জায়গায় গোল হয়ে বসে আছে। মুখে মেঘের অভিমান, বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ার অপেক্ষায়।
রচনা বলল, স্যার, আস্তে আস্তে চিবিয়ে খান। গিলে খাওয়া স্বাস্ব্যের জন্য ক্ষতিকর। আমি রেডি, শুধু চিরুনি দিয়ে চুলে কয়েকটা টান দিয়ে দেব। টাই বাঁধা আছে, জাস্ট গলিয়ে দেব গলায়। জুতোও রেডি; জামার বোতাম খুলে রেখেছি সাত সকালে।
আমি বললাম, চিবিয়ে খাওয়ার সময় নেই। গিলেই খেতে হবে। নইলে দেরি হয়ে যাবে। বিমান ফেল করলে আমার চাকরিও ফেল মারবে। চাকুরেদের দাঁত থাকতে নেই। তারা অজগর। যত বড়ো অফিসার তত বড়ো অজগর।
স্যার, একটু মাখন নেন?
না।
আর একটা পরোটা?
যথেষ্ট হয়েছে। উড়োজাহাজে ছেড়ে যাবে আমাকে।
এত কম খেলে স্বাস্থ্য ভেঙে যাবে।
ততক্ষণে আল্পনা-কল্পনা আর টুটুলের চোখ জলে ভরে গেছে। রচনারও একই অবস্থা। আমি পরিবেশটাকে আনন্দময় করে তোলার জন্য মজা করে বললাম,
“ভরা পেটে ছুটতে মানা
চিবিয়ে খাওয়া স্বাস্থ্যকর,
চাকরি আগে বাঁচাই মেয়ে,
প্রাণ বাঁচানো সে তার পর।”
রচনা অভিমান-ঢাকা আদুরে গলায় বলল, স্যার, চাকরির জন্য এত দূরে যেতে হবে কেন?
মেয়ে, তুমি দিন দিন শিশু হয়ে যাচ্ছ।
আপনার কিন্তু কষ্ট হবে আমাকে ছাড়া।
জানি।
তবু যাচ্ছেন কেন?
আসার জন্য যাচ্ছি। না-গেলে যে আসা যায় না।
স্যার, বিদেশ কি দেশের মতো?
না, ওখানে একটা ‘বি’ আছে।
‘বি’ কী স্যার?
উপসর্গ।
বুঝেছি, বিদেশ মানে বিমাতার দ্বেষ। এমন একটি দেশ যেটি আমার দেশ নয়।
ঠিক বলেছ মেয়ে।
রচনা নিচু গলায় বলল, স্যার, আমাদের আপনি ছাড়া আর কেউ নেই। আপনিই আমাদের অভিভাবক। পেছনে যখন তাকাই বিস্ময়ে আঁতকে উঠি, কীভাবে এতদূর এলাম, তারপর দেখি আপনাকে, আপনার হাত ধরে উঠে আসার স্মৃতিই আমার ঐশ্বর্য। এখানে কোনো ত্রুটি নেই।
নিনি গাড়িতে লাগেজ উঠাতে উঠতে বলল, মামা, হগাল হগাল আইয়্যা পইড়েন।
আমি তার মাথার চুলে পাঁচ আঙুলের সুড়সুড়ি দিয়ে বললাম, আইচ্ছা।
আমার মনের জল চোখে আসার উপক্রম করছে। কোনোরকমে চেপে রেখেছি। আমি কখনো বিদায় বলতে পারি না, বিদায় বলতে কষ্টে বুক ভেঙে যায়। আল্পনা-কল্পনা, টুটুল আর নিনিকে বললাম, ভালো থেকো, যত পার।
রচনা গাড়িতে উঠে বলল, আপনি স্যার বিদায় বেলায় কী বলতে হয় জানেন না।
আমি বললাম, পুরুষেরা জানে না কখন বিদায় বলতে হয়, মেয়েরা জানে না কোথায় বলতে হয়।
রচনা বলল,  বিদায়বেলা পুরুষ আর নারী দুজনের আবেগ কপোতমিথুনের মতো কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে যায়।
এমন বে-আক্কেলের মতো কথা কে বলেছে?
হুমায়ুন আজাদ স্যার।
গাড়িতে ওঠলাম। ওঠামাত্র শুনলাম— ভয়ংকর কান্নার আওয়াজ। ওরা পাঁচ জন ঐকতান কান্না সুরে করে দিয়েছে। প্রিয়জনের লাশ কবরে নেওয়ার সময় এমন কান্না শোনা যায়। দৌঁড়ে নেমে এলেন মিসেস আফজল চৌধুরীর পরিবারের সব সদস্যগণ। অন্যান্য আরও কয়েকটি ফ্লাটের বাসিন্দারাও নেমে এলেন— কী হলো দেখতে।
দ্রুত চালাও, ড্রাইভারকে বললাম।
চোখের বন্যা আমাকে আঘাত করতে আসছে,
দ্রুত চালাও, বাঁচতে হবে, 
দ্রুত।
স্যার, নেমে একটু সান্ত্বনা দিয়ে আসেন।
নামতে হলো, আমি তো লাশ নই। নামতে পাঁচ জনই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল। পাঁচ জনকে পাঁচটি চুমো দিয়ে নৈঃশব্দ্য মমতায় আবার উঠে পড়লাম গাড়িতে। গাড়ি ছেড়ে দিল ড্রাইভার। আবার নামলে উঠা যাবে না আর। সময় আমার ক্রীতদাস নয়।


শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
error: Content is protected !!