স্যমন্তক:  ঊনবিংশ পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন
আফজল চৌধুরীর ড্রয়িং রুমের সোফায় সাদা পাঞ্জাবি আর চেক লুঙি পরিহিত ধবধবে এক নজড়কাড়া বর্ষীয়ান। তাঁকে ঘিরে দুজ মাঝবয়সী লোক; এর একজন স্থানীয় কমিশনার। কর্মসূত্রে পূর্ব পরিচিত। বর্ষীয়ান লোকটাকে চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু মনে করতে পারছি না। বয়স্ক হলেও বেশ যুববন্ত এবং তুখোড় দেখাচ্ছে। চোখেমুখে বুদ্ধির উচ্ছ্বাস, কথায় ব্যক্তিত্ব। আমাদের দেখে সবাই গল্প থামিয়ে তাকালেন। কমিশনার সালাম দিলেন দাঁড়িয়ে। আফজল সাহেব সুদর্শন বর্ষীয়ানাকে দেখিয়ে বললেন, আবদুল হক চৌধুরী, বিখ্যাত ইতিহাসবিদ, আঁরার রউজানর (রাউজান উপজেলা) গৌরব; নাম উইন্নুন-না?

আমি সালাম সোৎসাহে বললাম, চট্টলবিদ আবদুল হক চৌধুরী?
জি, গর্বের গলায় বললেন আফজল চৌধুরী।

চট্টলবিদ আবদুল হক চৌধুরী

আমি আবদুল হক চৌধুরীর দিকে হাত এগিয়ে দিলাম। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন হাত এগিয়ে দিতে। বললাম, আপনার মতো নমস্য লোকের সঙ্গে হাত মেলাতে পেরে খুব খুশি লাগছে।
আবদুল হক চৌধুরী বললেন, আপনাকে কোথায় জানি দেখেছি? উহ্, মনে পড়েছে, চিটাগাং, কাজির দেউড়ি, ওয়াহিদুল হক চৌধুরীর বাসাত, মনত পইজ্জে না অনত্তে?
অবাক হয়ে গেলাম তার স্মরণশক্তির প্রখরতায়।
বললাম, মনে পড়েছে। আপনি কেমন আছেন?
: সেই ১৯২২ থেকে দুনিয়াতে আছি। এখন ১৯৯২। এক জায়গায় আর কতদিন ভালো লাগে। এবার যাবার পালা। এখন সময় কাটে হাসপাতাল আর ডাক্তারখানায়। হাসির জায়গায় কাশি। লিখতে গেলে হাত কাঁপে। চোখ, কান, স্মৃতি সবা অবাধ্য হতে শুরু করেছে। এখন কেউ মনের কথা শোনে না।
আফজল চৌধুরী বললেন, আমি মুক্তিযোদ্ধা, আমার বয়স বুড়োদের চেয়ে সবসময় এগারো বছর কম থাকে। আপনাদের ষাট আমার আটচল্লিশ।
আমি আবুদল হক চৌধুরীকে বললাম, আপনার ছেলে আহমেদ আমিন চৌধুরী আমার পরিচিত।
হেসে বললেন, আমিনরও আঁর ডইল্যা লেখালেখির অভ্যাস আছে। লেখালেখির অভ্যাস ভালা নয়। বউ-পোয়রে সময় দেউন ন-যায়। তারা দূরে সরি যায়। প্রকাশক টাকা দেয় না। অভাবে থাকতে হয়। অভাবি মানুষকে কেউ দুই পয়সার দামও দেয় না। অবশ্য আঁর আমিন পুলিশ অফিসার, প্রকাশকের ওপর নির্ভর করে থাকতে হয় না। মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত লেখকদের কেউ দাম দেয় না। বেচারা জীবনানন্দ, শিবরাম চক্রবর্তী, মধুসূদন, নজরুলÑ সামান্য অর্থের জন্য কত কষ্ট পেতে হয়েছে।
রচনা বলল, গত বছর চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গখের একটা ছবি সত্তর কোটি টাকা নিলামে উঠেছিল। অথচ তাঁকে ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে না-পেরে ৩৭ বছর বয়সে আত্মহত্যা করতে হয়েছে।
আফজল সাহেবের মুখে রচনাদের পরিচয় এবং আমার ভূমিকা জানতে পেরে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন আবদুল হক চৌধুরী।
বিশুদ্ধ বাংলায় উল্লসিত গলায় বললেন, এমন মহৎ কাজের নজির খুব বিরল। আফজল, তোমার বিল্ডিঙে খুব ভালো একজন মানুষ পেলে।
: জি, বদ্দা?
: সবসময় উনার পাশে থাকার চেষ্টা করবে। এমন বিরল সুযোগ আর নাও পেতে পার। অনেকের এমন ভালো কাজ করার সাহস নেই, আবার অনেকের থাকে না সামর্থ্য কিংবা ইচ্ছা। যাদের আছে তাদের অন্তত উৎসাহটা দিতে পারি, কী বলো?
কমিশনার বললেন, আমরাও স্যারকে দেখে রাখব। ভালো যেখানেই হোক, আমরা আছি। যতবার মন্ত্রণালয়ে গেছি ততবার তিনি ভাইয়ের মতো ভালোবেসে সহযোগিতা করেছেন।

স্যমন্তক, পুথিনিলয়।
ড. মোহাম্মদ আমীন

কথা শেষ হওয়ার আগে বস্তি হতে হট্টগোলের শব্দ ভেসে এল। কমিশনার বললেন, আমার এলাকায় কয়েকটা বস্তি আছে। বস্তিবাসীর অনেকে অপরাধে জড়িত। সবসময় গন্ডগোল লেগে থাকে। প্রতিটি বস্তি মাদক ব্যবসার ঘাঁটি।
আবদুল হক চৌধুরী বললেন, তারা অপরাধী, কিন্তু কার জন্য অপরাধ করে? তাদের দিয়ে কে অপরাধ করায়? এগুলো কখনো ভেবেছ? এত অভাবে তারা অপরাধ আর গন্ডগোল না করে কী আর করবে? তাদের অপরাধের জন্য আমরাই দায়ী। মনে রাখবে, অভাবী মানুষকে ধনীরাই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে অপরাধী করে তোলে।
রচনা বলল, বস্তিবাসীদের সবাই এড়িয়ে চলেন, ঘৃণা করেন। মানুষই ঘন্য করা হয় না।
আবদুল হক চৌধুরী বললেন, মানুষ ধনী-গরিব, উঁচু-নীচু আর জাত-বর্ণের নামে যত বিভাজন দেওয়াল তৈরি করেছে তার একহাজার ভাগের এক ভাগ মিলন সেতু তৈরি করতে পারলেও কোনো মানুষকে অন্তত মৌলিক চাহিদার জন্য হাহাকার করতে হতো না। এটি সভ্যতার ব্যর্থতা, মানব জাতির কলঙ্ক।
আমি বললাম, সীমান্তের পর সীমান্ত হয়েছে, সীমান্ত জুড়ে অস্ত্রধারীদের প্রহরা বেড়েছে, কিন্তু সীমন্তে মমতার চিরুনি ক্রমশ নেকড়-নখ; সীমন্ত সিঁদুরের নিটোল ঝরনায় রক্তের ধারা।
আফজল সাহেব অস্থির গলায় বললেন, ওবা নাতি, ওবা বদ্দাÑ হানা ঠান্ডা অই যারগুই। তাড়াতাড়ি আইয়ুন।
ডাইনিং রুমে বিরাট টেবিলে নানা রকম খাবার। একসঙ্গে এতগুলো খাবার দেখে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে আল্পনা-কল্পনা ও টুটুল, রচনার চোখেও বিস্ময়। একসঙ্গে এত খাবার তারা এর আগে কোনোদিন খাওয়ার জন্য দেখেনি। এমন সাদর আপ্যায়নও কখনো পায়নি।
টুটুল বলল, আমি সবগুলা খামু।
আফজল চৌধুরী বললেন, সব তোমার জন্য করা হয়েছে দাদু।
আবদুল হক চৌধুরী টুটুলকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, আমিই খাইয়ে দেব তোমাকে। এসো দাদু, কাছে এসো।
আফজল চৌধুরী রচনার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোয়ার হন ধর্ম নাতিন?
রচনা উত্তর দেওয়ার আগে আবদুল হক চৌধুরী বলে ওঠেন, আফজল, ধর্ম-কর্ম লই বাড়াবাড়ি ভালা নয়। মানুষ্যত্বই মানুষের ধর্ম। কাউকে এমন প্রশ্ন কখনো করবা না। অন্যের ধর্ম দিয়ে তুমি কী করবে? এমন প্রশ্ন গোঁড়ামির লক্ষণ। অ্যাট বেস্ট তুমি নাম জিজ্ঞাসা করতে পার।
: জি, বদ্দা।
আমি বললাম, ধর্মীয় গোঁড়ামি সবসময় ক্ষতিকর।
আবদুল হক চৌধুরী বললেন, যেকোনো গোঁড়ামি অসহ্য। গোঁড়ামির গোড়া, গোড়া থেকে উৎপাটন না-করে মাঝখান থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করার পরিণতি ভয়ংকর হয়। এমন করাটাও এক ধরনের গোঁড়ামি। আমরা কিন্তু তা-ই করছি বলে এত অসহনীয় পরিস্থিতি। মানুষকে শিক্ষিত করতে পারলে গোঁড়ামি চলে যাবে। আগুন দিয়ে আগুন নেভানো যায় না। মনে রাইখবা, অশিক্ষাই সব গোঁড়ামির উৎস।
কথায় কথায় খুব আনন্দের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া শেষ হলো। টুটুল, সারা ঘর ঘুরে ঘুরে দেখছে আর অবাক হয়ে কিছুক্ষণ পরপর রাকুর কানে কানে কী যেন বলছে। আফজল চৌধুরীর নাতির খেলনা নিয়ে মনের আনন্দে খেলতে শুরু করে। খেলতে খেলতে একটা কাচের পুতুল ভেঙে ফেলে হঠাৎ।
রাকু উঠে জোর করে নিয়ে আসতে চাইছে টুটুলকে। টুটুল আসবে না। আফজল চৌধুরীর পুত্রবধূ বললেন, খেলুক, ভাঙুক। টুটুলের হাসির চেয়ে খেলনা বড়ো না। আমার ছেলে কোনোদিন এসব খেলনা দেখে এত মধুর হাসি হাসেনি।
তাঁর উদার কথা আমার বুকে জমাট মায়ার শিহরন তুলে দিল। ভদ্রমহিলার প্রকাশে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। এমন মন দেখা যায় না। আফজল চৌধুরীকে বললাম, দাদু, আপনার পুত্রবধূ অনেক বড়ো মনের মানুষ।
: আমার ছেলে আরও বড়ো মনের। সে আমেরিকা থাকে। পরিচয় হলে বুঝবেন। ঠিক আপনার মতো।
কমিশনার বললেন, এবার গান হবে।
প্রথমে কে গাইবে? জানতে চাইলেন আবদুল হক চৌধুরী।
কল্পনা বলল, আমি।
: গাও।
বাংলাদেশটা আমার ঘর, সকলের আত্মীয় সবে নহি কেহ পর
সকলে একান্নভুক্ত, সকলে একান্নভুক্ত আবালবৃদ্ধা নারী-নর।
সকলের আত্মীয় সবে নহি কেহ পর।
আমরা হিন্দু মোছলমান, বৌদ্ধ আর খ্রিষ্টান
এক ঘরের বাসিন্দা সবি এক ঘরের সন্তান
এক-মায়ের দুধ করিয়া পান,
এক-মায়ের দুধ করিয়া পান বাঁচিয়া রই জীবনভর।
সকলের আত্মীয় সবে নহি কেহ পর।
আবদুল হক চৌধুরী বললেন, গানটা কার লেখা?
রচনা বললেন, বাদশা ফকিরের।

———————————————————————-

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
=============== অন্যান্য==================

ইদানীং ও ইদানীং-এর বিপরীতার্থক শব্দ

ফলজ অর্থ পোকামাকড় ও কীটপতঙ্গ

————————————————————
————————————————————–
error: Content is protected !!