স্যমন্তক: ঊনষষ্টিতম পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

স্যমন্তক: ঊনষষ্টিতম পর্ব 

কলিংবেলের শব্দ শুনলে সবাই বুঝতে পারে আমি। ঘড়িতে চোখ দিলাম, রাত দশটা বেজে চল্লিশ। একটু দেরি হয়ে গেল, অবশ্য রচনা জানে— আজ আমার দেরি হবে। ঢাকার বােইরে একটা পরিদর্শনে গিয়েছিলাম।  কণ্ঠের মতো কলিংবেলের আওয়াজও নানা

ড. মোহাম্মদ আমীন

রকম হয়। চাপের ওপর তার আওয়াজের ধরন নির্ভর করে। একদম বাদ্য যন্ত্রের মতো। একই বাদ্যযন্ত্র কারও চাপে আনে সুরের অনবদ্য ঝংকার আবার কারও চাপে অসহনীয় চিৎকার। রচনা ছাড়া আর কারও দরজা খোলার অনুমতি নেই। সে না-থাকলে অন্য কথা। গত পাঁচ বছরে একবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।
রচনা দরজা খুলে আমাকে জড়িয়ে ধরে ভেতের টেনে নিয়ে গেল। উচ্ছ্বাসটা অন্যদিনের চেয়ে একটু ভিন্ন মনে হচ্ছে। বিষয় কী বোঝার আগে তিন বোন আর এক ভাই আমাকে মাথার উপর তুলে নাচতে শুরু করে। নিনি তালি দিয়ে তাদের উৎসাহিত করে যাচ্ছে। হঠাৎ আমার বাম হাতের তালু  ওপরে উঠে ঘূর্ণয়মান পাখায় লেগে যায়। আমি উহ্ শব্দে আর্তনাদ করে উঠি। আমার আর্তনাদ তীব্র হলেও তাদের উল্লাস-বিলাসে হারিয়ে যায়। আমি আর চিৎকার দিলাম না। জগতের নিয়ম জগতের ইচ্ছে অনুসারে চলুক। হাসি-কান্নার সহাবস্থানই পৃথিবী। 
আমাকে নামানোর পর রক্ত দেখে চিৎকার দিয়ে ওঠে সবাই। বাম হাতের তালুর বৃদ্ধাঙ্গুলির নিচের অংশ বেশ খানিকটা কেটে গেছে। মুহূর্তে সব আনন্দ মাটি হয়ে গেল। আসলেই আমি অপয়া।
ব্যান্ডেজ করে দিল রচনা। আল্পনা প্যারাসিটামল এনে খাইয়ে দিল একটা। সবাই অনুতপ্ত, সবাই মনটা ভারি করে রেখেছে। আমি অন্য দিনের চেয়ে বেশি হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করছি। তবু সবাই মুখ গোমড়া করে বসে থাকল। রচনাকে দেখা যাচ্ছে না।
রচনা কোথায়?
আল্পনা বলল,  আপু তার রুমে চলে গেছে।
আমি গেলাম রচনার রুমে। সে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে শুয়ে কাঁদছে। এ কান্না রাগের নয়, মমতার। কালো চুলের অন্ধকার যেন পুরো রুম গভীর শোক-আঁধারে ঢেকে দিয়েছে।
চোখের জল মুছে দিয়ে বললাম, মেয়ে কী হয়েছে?
কিছু না।
বলো-না কী হয়েছে?
কিছু না তো!
কিছু না-হলে কাঁদছ কেন?
শিশুর মতো জড়িয়ে ধরে এক সেট কাগজ এগিয়ে দিয়ে বলল, দেখুন।

কী?

অক্সফোর্ডে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক লেটার। সম্মতিপত্র স্বাক্ষর করে পাঠাতে বলেছে। এটি পেয়ে  আনন্দে হইচই করছিলাম।
এখন কাঁদছ কেন? আমার হাত কেটে গেছে—তাই বুঝি?
না, স্যার।
তাহলে?
আমি চলে গেলে আপনি কীভাবে থাকবেন? আপনার হাতে ব্যথা লেগেছে, এটি আমার প্রতি একটি বার্তা, কানে কানে কে জানি বলে যাচ্ছে অহরহ— রচনা, তুমি যেও না। যেও না গো লোকটাকে ছেড়ে। সে তোমাকে ছাড়া থাকবে কীভাবে?
মেয়ে শান্ত হও, মানব জীবন বড়ো দুর্লভ।
আমি খুশি হয়েছিলাম তখন।
এখন?
আমার অনুপস্থিতি আপনাকে কষ্ট দেবে— সেটি ভেবে কষ্ট হচ্ছে। আমি স্যার স্বার্থপর, শুধু নিজেরটাই দেখেছি।
তুমি দূরে চলে যাবে— এটি ভেবে আমারও কষ্ট হয়েছিল। এখন আনন্দ হচ্ছে, খুব আনন্দ। আমিও স্বার্থপর, শুধু নিজেরটা দেখেছিলাম। আসলে  পৃথিবীর সবাই স্বার্থপর, স্বার্থহীনতাও একপ্রকার স্বার্থপরতা। শুধু মাত্রার পার্থক্য। আনন্দ করো।
এমন আনন্দ আমার লাগবে না।
“এসো, ফরমটা ফিলআপ করে ফেলি”, কাগজগুলো উলটাতে উলটাতে বললাম, “বেশিক্ষণ লাগবে না।”
কাল করব। আগে খাইয়ে দিই, আপনি ক্ষুধার্ত।
আমার বাম হাতে ব্যান্ডেজ। খাওয়া চলে ডান হাতে। তবু না-করলাম না। তার খাইয়ে দেওয়া আমার স্বাদ আর ইচ্ছাকে নতুন মাত্রা দেয়। খাইয়ে দিতে দিতে রচনা বলল, আমার বাবাকেও এভাবে খাইয়ে দিতাম।
তিনি তোমাকে খুব ভালোবাসতেন, তাই না?
 তিনি খুব সহজ-সরল এবং মেধাবী ছিলেন। বাবা-মায়ের জীবনে পরস্পরের গমনাগমনই দুজনের কাল ছিল। আমার পড়ার চাহিদা মেটানোর জন্য বিড়ি পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছিলেন। সারাদিন বস্তা টেনে সন্ধ্যায় ভিক্ষা করতেন।
বারবার কথাগুলো টেনে আন কেন?
আনি না তো স্যার, এসে যায়। যত ভুলে যেতে চাই তত বেশি মনে পড়ে। কিছু কিছু অতীত কখনো অতীত হয় না, শুধু বর্তমান হয়ে থাকে।
খাওয়ার পর ড্রয়িং রুমে যাচ্ছি। এসময় বিদ্যুৎ চলে গেল। রচনা আমাকে হাত ধরে সোফায় বসিয়ে দিতে দিতে বলল, স্যার আমি কিন্তু অক্সফোর্ড যাচ্ছি না। অক্সফোর্ডে অন্ধকার নেই, তাই আলোর দাম কম। অধিক প্রাপ্তি অতি মূল্যবান বিষয়কেও সস্তা করে দেয়। এজন্য ধনীদের সুখ-শান্তি ক্রমশ আবর্জনার মতো অসহনীয় হয়ে যায়। একটু সুখের জন্য হিল্লি ছুটে, দিল্লি ছুটে। আমি যাব না, যাব না বলছি যাব না— আপনাকে ছেড়ে কোথাও।
Just hold your tongue.
রচনা আমার ধমককে পাত্তা না-দিয়ে বলল, স্যার, For God’s sake hold your tongue, and let me love. জন ডন-এর লাইনটা অনুবাদ করেছি। আনিসুজ্জামান স্যার পর্যন্ত প্রশংসা করেছেন। কবীর চৌধুরী অবাক হয়ে গিয়েছিলেন।
রবিঠাকুরও অনুবাদ করেছেন।
আমারটা অন্যরকম। কবীর চৌধুরী স্যার বলেছেন, এমন সুন্দর অনুবাদ হয় না।
বলো, শুনি।
“চুপ  সোনা চুপ,
বাসবো ভালো খুব।
কেমন হলো স্যার অনুবাদটা?
 বেশ ভালো হয়েছে। তবে ধমক দিয়ে চুপ রাখা যায়, ভালোবাসা যায় না। এ তো ধর্ষণ হয়ে যায় গো।
স্যার, ধমক না-দিলে ভালোবাসা কীভাবে আসবে? ভালোবাসা তারই সাজে, শাসন করে যে। আপনি আমাকে ভালোবসেন বলেই এত শাসন করেন। তাই না?
কল্পনা মোমবাতি নিয়ে আমাদের সামনে রাখতেই, রচনা ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল।
আমি বললাম, নিভিয়ে দিলে যে?
স্যার, কাছের মানুষকে অন্ধকারে যত গভীরভাবে অনুভব করা যায়, আলোয় তত গভীরভাবে অনুভব করা যায় না। অন্ধকার হৃদ্যতার প্রদীপ। নৈকট্যের অনুঘটক। দিনে কী স্যার জ্যোৎস্না দেখা যায়? দুপুরে কি দেখা যায় তারা? রাত সৌন্দর্যকে বিকশিত করে। ঠিক না, স্যার?

ঠিক।
একটু থেমে রচনা আমার বিছানা গোছাতে গোছাতে সুর করে গাইতে থাকে গুনগুন —
“চরণ ধরিতে দিও গো আমারে
নিও না নিও না সরায়ে,
জীবন মরণ সুখ দুঃখ দিয়ে
বক্ষে ধরিব জড়ায়ে।”
তার গুনগুন শেষ হওয়ার আগে বিদ্যুৎ চলে এল। আমি অক্সফোর্ডের ফরমটা পূরণ করতে বললাম। বলল,আগামীকাল। আরও দুবার বললাম, গলা জড়িয়ে ধরে বলল, আগামীকাল। ধমক দিলাম না। নিজে পূরণকরে এগিয়ে দিলাম স্বাক্ষরের জন্য। বলল, আগামীকাল।

পরদিন অফিসে যাওয়ার সময় বললাম, স্বাক্ষর করে দাও। সচিবালয় পোস্ট অফিস থেকে পোস্ট করে দেব। বলল, আগামীকাল। তারপরদিনও স্বাক্ষর দিল না। বলল, আগামীকাল। এদিকে ধার্য তারিখ শেষ হয়ে আসছে। চতুর্থ দিন একপ্রকার জোর করে  রচনার  সম্মতিস্বাক্ষর নেওয়া গেল। স্বাক্ষর দিয়ে বলল, আমিই পোস্ট অফিসে দিয়ে আসব। আপনার কষ্ট করতে হবে না।
মেয়েরা আবেগপ্রবণ। আবেগের বশে নিজেকে খুন করতেও দ্বিধা করে না। যেটা করার ইচ্ছে সেটা করার জন্য যা খুশি করতে পারে। যার একটা স্বাক্ষর নিতে চার দিন লাগল, তার বিশ্বাস নেই।
বললাম, কষ্ট করে আমি পূরণ করেছি, আমিই কষ্ট করে পোস্ট করব। আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।
রচনা মুখটা মলিন করে মায়াভরা চোখে খেলনা হারিয়ে ফেলা শিশুর ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি কিন্তু অক্সফোর্ডে যাচ্ছি না।
কেন?
আপনাকে স্মরণ করা আমার শ্বাস-প্রশ্বাস, আপনার সঙ্গে কথা বলা আমার সখ, আপনার সঙ্গে ভ্রমণ করা আমার স্বপ্ন, আপনার দেখভাল করা আমার কর্তব্য, আপনাকে শ্রদ্ধা করা আমার শক্তি, আপনাকে খুশি করা আমার কাজ এবং আপনাকে ভালোবাসা আমার জীবন। আমি চলে গেলে এগুলোর কী হবে?
কথাগুলো আমার হৃদয়ে দাগ কাটল, কিন্তু মগজ বেশ সচেতন হয়ে আবেগের গতি টেনে দিল। হৃদয়ের গতি মগজের কাছে পরাস্ত হলো। বললাম,  মেয়ে, সমস্যা কোনো সমস্যা নয়, তুমি কীভাবে তাকে নিচ্ছ সেটাই আসল সমস্যা। সমস্যা তোমাকে কখনো জয় দেবে কখনো দেবে শিক্ষা। সে কখনো কাউকে খালি হাতে ফেরায় না, ভালো কিছু দিয়ে যায়। কোনো সমস্যাই তাই অবহেলার নয়।
আমি অতসব বুঝি না, স্যার।
কী বোঝো?
আমার জীবন আমার। আপনি আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই আপনার বিষয়ে আমিই সিদ্ধান্ত নেব। বাকি সব সিদ্ধান্ত আপনিই দেবেন, আপনিই নেবেন। নিজের চিকিৎসা নিজে করা যায় না। এজন্য বড়ো বড়ো ডাক্তারগণও অন্য ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হয়।
আমি কোনো প্রতিবাদ করলাম না। অক্সফোর্ডের কাগজগুলো ব্রিফকেসে ভরে বের হয়ে গেলাম। ড্রাইভার এসে গেছে; ভেপু দিয়েছে। 

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক
error: Content is protected !!