স্যমন্তক: একচত্বারিংশ পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

স্যমন্তক: একচত্বারিংশ পর্ব

বিভাগীয় মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এসেছে। সচিব ফাইলে লিখেছেন, “তদন্ত প্রতিবেদন দেখিলাম। অত্র (এই) বিভাগীয় মামলার তদন্তে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনজনিত কোনো বিষয়ের প্রমান (প্রমাণ) পাওয়া যায়নি। তবে তার কার্যকলাপ দেশের ধর্মীয় অনুভূতি, সমাজিক (সামাজিক) মূল্যবোধ ও প্রশাসনের ভাবমুর্তি (ভাবমূর্তি) ক্ষুন্ন (ক্ষুণ্ন) করিতে পারে। ইহার ফলশ্রুতিতে (ফলে) অভিযুক্তকে ঢাকার বাইরে বদলী (বদলি) করা সমীচীন বলে মনে করি। তাকে অনতিবিলম্বে ঢাকার বাহিরে বদলী(বদলি) করা হোক।”
সংশ্লিষ্ট নোটাংশের ছবি তুলে নিলাম।
পাঁচ লাইনের নোটে সাতটি ভুল, গুরুচণ্ডালীও আছে। ইচ্ছে হয়েছিল গিয়ে বলি— স্যার, নোটাংশে আমার মতো এত ভুল কেন? ইচ্ছেকে ইচ্ছেতে রেখে দিলাম। সবকিছু সবক্ষেত্রে বলা শোভন নয়। যেখানে বাংলা বানানে আমারও প্রচুর ভুল হয় সেখানে অন্যকে তা নিয়ে হেয় করা ঠিক হবে না। বানানে ভুল বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে শাস্তিমূলক অপরাধ নয়। যদিও এটি ব্যাকরণবিধি ভঙ্গ করে। বিধি ভঙ্গ করলে শাস্তির ব্যবস্থা আছে, প্রমাণিত হলে শাস্তি পেতে হয়। তবে ব্যাকরণিক বিধি ভঙ্গ করলে শাস্তির কোনো ব্যবস্থা আপাতত কার্যকর নেই।
সচিবের সিদ্ধান্তকে মেনে নিলাম, না-মেনেও পারতাম। আমার পক্ষে তদবিরকারীর অভাব ছিল না। কাউকে বলিনি, কিন্তু আমার অনেক প্রভাশালী শুভাকাঙ্ক্ষী বিষয়টি জেনে যান।
মেনে নিলাম কেন? আমার এক সহকর্মী জানতে চাইলেন।
বিভাগীয় মামলাটি আমার মনের একটি বন্ধ চোখ খুলে দিয়েছে। রচনাকে নিয়ে আমার অবস্থান ও কার্যকলাপ প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করুক বা না-করুক, বাংলাদেশের মতো ধর্মপ্রবণ দেশে এমন আশঙ্কা যে রয়েছে তা অস্বীকার করা যায় না। বিভাগীয় মামলা দায়ের তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। সবচেয়ে বড়ো কথা, বিদ্যমান সামাজিক ব্যবস্থায় রচনাদের সঙ্গে আমার অবস্থান সাম্পর্কিক কারণে অসামাজিক না বলার মানুষ পাওয়া কষ্টকরই হবে। আমি কী, তাদের সঙ্গে আমার অভ্যন্তরীণ সম্পর্কই বা কেমন সেটি মানুষ জানে না। জানলেও তা তাদের ধারণাকে পরিবর্তন করবে না। কেউ বিশ্বাসও করবে না। অধিকাংশ মানুষ কাগজ আর দলিলে আস্থাশীল। সম্পর্কহীনদের মধ্যে কোনো শত্রুতা সৃষ্টি হয় না, হতে পারে না। যুদ্ধ হয় ভাইয়ে-ভাইয়ে, আত্মীয়ে-আত্মীয়ে, সম্পর্কে-সর্ম্পকে। তাই মামলার গতি নির্ধারণের জন্য আদালতে আমি অভিযোগকারীকে প্রথম প্রশ্ন করতাম— অভিযুক্ত আপনার কেমন আত্মীয়, কেমন সম্পর্ক তার সঙ্গে? সম্পর্কই শত্রুতা সৃষ্টির প্রথম এবং একমাত্র কারণ। তারপরও শত্রেুাৎপাদক শুক্রাণু-ডিম্বানুগত সম্পর্ক কিংবা ঠুনকো সামাজিক বন্ধনটাই বিবেচনা করা হবে। বিশ্বাস মানুষের ব্যক্তিগত স্বাভাবিক প্রবণতা, যা সামাজিক ব্যবস্থাকে অনুসরণ করে ধাবিত হয়। আমার ভেতরে কী, বাসায় কী হচ্ছে না হচ্ছে তার চেয়ে বড়ো বিষয় মানুষ কী ভাবছে, কেন ভাবছে তা। তাই আমি সাবধান হওয়ার তাগিদ অনুভব করি।
বুঝতে পারি সতর্ক থাকতে হবে।
আমি জানি, সতর্ক থাকা মানে বিপদমুক্ত থাকা নয়, বিপদের সম্ভাবনা ও তীব্রতা হতে কিছুটা দূরে থাকা। এটাও কম কী! তবে যাই হোক, আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ— প্রয়োজনে চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমার জন্য ভাবের মূতিহারা প্রশাসনকে ভাবমূর্তিযুক্ত করব, তবু রচনাদের ছাড়ব না। আমি অবিবাহিত,
এরা ছাড়া আমার আর কোনো পিছুটান নেই।

ধন্যবাদ জানানোর জন্য সচিবের কাছে গেলাম। দেখি তার রুমে সৈয়দ আবুল হোসেন; তিনি এমপি, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও শিক্ষানুরাগী। সচিবালায়ে তাঁর যথেষ্ট প্রভাব। দলের চেয়েও ব্যক্তি আবুল হোসেন অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশে এমন সচিব খুব কম আছেন, যিনি সৈয়দ আবুল হোসেনের

সৈয়দ আবুল হোসেন ও ড. মোহাম্মদ আমীন

দেওয়া জামা-কাপড় পরেননি, গলায় লটকাননি তাঁর দেওয়া টাই। তাঁকে দেখে আমি চমকে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম। সালাম দিলাম। সচিব সাহেব জানেন— সৈয়দ আবুল হোসেনের সঙ্গে আমার বেশ খাতির। তাই এসময় আমাকে দেখে একটু হতচকিত হয়ে গেলেন।

সৈয়দ আবুল হোসেন বললেন, সচিব মহোদয়, এ ছেলেকে আমি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ডাকি। তার প্রশাসনিক মেধা ড. কামাল হোসেনের মতো।
অনেকের কাছে হাস্যকর এবং আমার নিজের কাছে লজ্জাকর মনে হলেও তিনি প্রায়শ বিভিন্ন জনের কাছে আমার প্রসঙ্গ এলে কথাগুলো বলতেন ।লজ্জা লাগত, তবু তিনি বলতেন।
সচিব মলিনমুখে বললেন, জি স্যার, সে খুব ব্রিলিয়ান্ট, কিন্তু ওভার স্মার্ট।
“ওভার স্মার্ট নয়, এক্সেপশনাল”, সৈয়দ আবুল হোসেন বললেন, “প্রশাসনে সর্বদা অসাধারণগণ অডম্যান। তাকে ঢাকায় রেখে দিন। আমি মূলত এজন্য এসেছি। তবে সে আমাকে কিছু বলেনি। এমন অফিসার পাবেন না। তাকে কিন্তু আবার ঢাকায় নিয়ে আসতে বাধ্য হবেন— আমি বলে গেলাম।
সচিব বললেন, আপনি যখন বলছেন, তাহলে থেকেই যাক ঢাকায়।
আমি বললাম, না।
সৈয়দ আবুল হোসেন বললেন, কেন?
শত্রুর কাছাকাছি থাকা বিপজ্জনক।
দূরে থাকাও তো বিপজ্জনক?
স্যার, দূরে থাকলে শত্রুও একদিন ভুলে যায়। চোখ আর মনের মিলনই ঘটনা-অঘটনার জনক। রচনার কাছ থেকেও দূরে থাকা যাবে। অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ বয়ে বেড়াতে হবে না। ভাবমূর্তিহীন প্রশাসন ভাবমূর্তি ফিরে পাবে। তবে আমি কিন্তু যাদের মেয়ে বলেছি তাদের ছাড়ব না। প্রয়োজনে চাকরি ছেড়ে দেব।
সচিব বললেন, দেখেন স্যার কীভাবে কথাগুলো বলল। আপনার মতো লোকের সামনে আমরা পর্যন্ত মুখ খুলতে ভয় পাই। এই ছেলে নিজেকে খুব বড়ো মনে করে। এত ওভার স্মার্ট দেখানো ভালো না।
সে এমনই। আমার সঙ্গেও এমন করে।
বিপজ্জনক, ভেরি ডেঞ্জারাস, সচিব বললেন।
“সচিব সাহেব”, সৈয়দ আবুল হোসেন বললেন, “ছুরির মূল্য ধারের উপর। ধারালো ছুরি বিপজ্জনক হলেও সবাই ওটাই পছন্দ করে, ভোঁতা ছুরি নিরাপদ হলেও কাজে লাগে না।”
ঠিক আছে, স্যার; আপনি যখন বলছেন বদলি ক্যান্সেল করে দিচ্ছি।
আমার বদলি আপনাকে ক্যান্সেল করতে হবে না, আমি কারও দয়ার মুখাপেক্ষী হব না। চাকরি আমার জন্য অত্যাবশ্যক কোনো বিষয় নয়। আপনার চাকরি গেলে না খেয়ে থাকতে হবে, রাতারাতি অখ্যাত হয়ে যাবেন। আমার চাকরি গেলে আমি না খেয়ে মরব না, বরং খ্যাত হওয়ার পথ প্রশস্ত হবে।
সচিবের কক্ষ থেকে বের হয়ে খান স্যারের রুমে গেলাম।
তাকে আমার সিদ্ধান্তের কথা জানাই।
তিনি বললেন, To me, bravery is to stand up for what you believe in. Nothing else. কাছে এসো।
কাছে গেলাম। তিনি চেয়ার থেকে ওঠে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন বুকে। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, আমি খুশি হলাম, খুব খুশি হলাম।
কেন স্যার?
তুমি সাহসী এবং অকুতোভয় মানসিকতার অধিকার। তোমার সামর্থ্য আছে প্রবল। তোমাকে নৈতিকভাবে পরাজিত করা কারও পক্ষে সম্ভব হবে না, আমি নিশ্চিত।
আগামীকাল: দ্বিচত্বারিংশ অধ্যায়।

 

স্যমন্তক: একচত্বারিংশ পর্ব
=============== অন্যান্য==================

ইদানীং ও ইদানীং-এর বিপরীতার্থক শব্দ

ফলজ অর্থ পোকামাকড় ও কীটপতঙ্গ

————————————————————
———————————-অন্যান্য——————————-
দুষ্ট শব্দের শুদ্ধ বানান /৭
————————————————————–
error: Content is protected !!