স্যমন্তক: একত্রিংশ ও দ্বাত্রিংশ পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

স্যমন্তক: একত্রিংশ ও দ্বাত্রিংশ পর্ব

যা ভেবেছি তাই, রচনারই চিঠি।
সে ছাড়া আমাকে নিয়ে এত ভাবার কেউ জীবনে এখনো আসেনি। ভবিষ্যতের কথা ভাবীর হাতে। মা, আমার নানার প্রথম সন্তান। তিন মাস বয়সে আমার মা, তার মাকে হারায়, কোনো ভাইবোন ছিল না। বাবারও কোনো সহোদর-সহোদরা ছিল না। সত্যিকার অর্থে আত্মীয়হীন পরিবেশে আমার মা

ড. মোহাম্মদ আমীন

বেড়ে উঠেছে। তাই মা-বাবা আর ভাইবোন ছাড়া আমার আর কোনো স্বজন ছোটোবেলায় ছিল না। স্বজনহীন ভাইবোনেরাও স্বজনহীনের মতো বিচ্ছিন্ন।
মায়ের কাছে সৎমায়ের স্নেহ ছিল কষ্টের স্মৃতি। দুষ্টামি করলে মা বলতেন— আমি যেদিন মরে যাব সেদিন বুঝবি। দিন কাটবে না এক প্রহরও। তোর বাবা আর একটা বিয়ে করলে তখন বুঝতে পারবি কষ্ট কী জিনিস, মা কত আপনার।
আমি বলতাম, তোমার মাও তো মরে গিয়েছিল, দিন কী কাটেনি!
মা শ্লোক কাটত—
সতীন মায়ের কথা ছিল মধুরসের বাণী
তলা দিয়ে কাটত শিকড় ওপরে দিত পানি।
আমি আসার আগে আমার চিঠি এসে গেছে। খুশি, গর্ব আর আনন্দে মনটা আনমনা হয়ে গেল। ভ্রমণ সঙ্গীরা ঈর্ষায় পুড়ছে। চিঠি খুললাম— নিখুঁত লেখার ব্যাকুল বাক্যের মদির হাসি আমাকে জড়িয়ে ধরল। প্রতিটি অক্ষর এক একটি মহাকাব্য হয়ে মনের ভেতর আলোড়ন ছুটিয়ে দিচ্ছে। রচনা লিখেছে—
“স্যার,
গভীর শ্রদ্ধা।
কয়েকদিন যেন কয়েক যুগ। প্রতীক্ষা, সে তো প্রকৃষ্ট তিতিক্ষার অহর্নিশ কষ্ট। একটা সেকেন্ড যেন এক বছর। হিসাব কষে দেখুন, আপনার জন্য কত যুগ হলো আমার।
এমন লাগে কেন?
মনটা খচ খচ করে। আপনাকে কিছু খাওয়াতে না-পারলে, কিছু বলতে না-পারলে শরীরটা মাংসপিণ্ড হয়ে যায়। পড়ায় মন বসে না, কথা বলতে না-পারলে মুখস্থ হয় না এক লাইনও। ভালোয় ভালোয় ফিরে আসুন, স্যার। বছর আর যেন না-বাড়ে।”
আমাদের দলনেতা মেজর জেনারেল মোর্শেদ বললেন, অনেক ভাগ্যবান আপনি, আপনার আগে আপনার চিঠি চলে এসেছে। নিশ্চয় ভাবি? কিন্তু ভাবছি ভাবি  এত ভালো— না কেমন জানি মনে হচ্ছে।
আমি তো বিয়েই করিনি।
তাহলে কার চিঠি?
আমার মেয়ে, আমি বললাম, মা-ও বলতে পারেন, আবার বন্ধুও বলতে পারেন, বোনও বলতে পারেন।
তাই বলেন, বিয়ের আগে মেয়ে— প্রশ্নটা তো এখানেই। তাই তো এত প্রেম; সখি সে হরি কেমন বল- – -।
কিছুক্ষণ পর ফোন করে, রচনা। কানে রিসিভার লাগিয়ে বললাম, হ্যালো মেয়ে কেমন আছ?
স্যার, আপনি কী করছিলেন?
তোমার চিঠি পড়ছিলাম।
পড়তে হবে না।
কেন?
এমনি। আমার চিঠি না-পড়ে পাঠিয়ে দিন। 
আমি কী করলাম?
কিছু করতে হবে না।
কী বললে?
কিছু না।
রাগ করেছ?
লন্ডন থেকে প্যারিস, প্যারিস হয়ে জেনেভা, ছয় দিনে একবারও আমার কথা মনে পড়েনি? আমি না আপনার রচনা! প্রোগ্রাম-শিডিউল না থাকলে তো ফোনই করতে পারতামন না, জানতেই পারতাম না কোন হোটেলে উঠেছেন এবং উঠবেন।
মনে পড়েছে। 
ফোন দেননি যে?
আমি এইমাত্র হোটেলে ঢুকলাম। আধঘণ্টা পর ফোন করব। পোশাকটা পালটিয়ে নিই?
পালটাতে হবে না।
কেন?
কথা যা আছে এখনই বলব, নইলে ভুলে যাব। এসব কথা ভাব থাকতে থাকতে বলে ফেলতে হয়। পরে আর ভাবের ভাপ থাকে না।
একটু পরে আমি ফোন দেব।
না স্যার। আপনিই তো বলেন—
নগদ যা পাও হাত পেতে নাও
বাকির খাতা শূন্য থাক।
দূরের বাদ্য লাভ কী শুনে
মাঝখানে যে বেজায় ফাঁক।
তুমি কেমন আছ?
সূর্যহীন পৃথিবীর মতো নিরেট, ঝরে পড়ার অপেক্ষায় কাতর পাতার মতো পাণ্ডুর, বরফ শীতল নির্মম। ঘুমাতে পারি না, অস্থির অস্থির লাগে। মনে হয়, আমার বদলে আপনি অন্য কাউকে ফোন দিচ্ছেন।
আমি বললাম, তুমি তো এখন অনেক জনপ্রিয়। শুনেছি, অনেক ভক্ত তোমার। খুব গর্ব হয় তোমার জন্য মেয়ে।
স্যার, একটা কবিতা শোনাই, রবি ঠাকুর লিখেছেন।
শোনাও।
রচনা ভরাট গলায় আবৃত্তি করতে শুরু করে—
“লোকের মনে সিংহাসনে
নাইকো দাবি,
তোমার মনো-গৃহের কোণে
দাও তো চাবি।
মরার পরে চাইনি ওরে
অমর হতে।
অমর হব আঁখির তব
সুধার স্রোতে।”
দারুণ না স্যার?
এটা কি আসলেই রবীন্দ্রনাথের লেখা? বাবারে আমি তোমার মতো অত জানি না।
আর একটা বলব স্যার? আরও ভালো লাগবে। আপনাকে শোনাবার জন্য স্মৃতির পাশে পর পর সাজিয়ে রেখেছি পুস্তকের পাতার মতো; উলটাবো আর শোনাব—
থামবে, না কি ফোন রেখে দেব?
স্যার, তিন দিন টানা হরতাল চলেছে। দেশের অবস্থা ভালো না। কালও দুজন ক্রসফায়ারে মারা গেছে। সরকারি দল আর বিরোধী দল মুখোমুখি। দু-দলই নিজ নিজ দাবিতে অনড়। ধরপাকড় এবং ভাঙচুর পুরো শহরটাকে ভূতুড়ে করে দিয়েছে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ।
বাংলাদেশ প্রান্ত থেকে অস্পষ্ট কণ্ঠ ভেসে আসে।
কল্পনার গলা, আপু অনেকক্ষণ বলছ, আমাকে একটু দাও।
ভাইয়া, কেমন আছেন?
আমি বললাম, ভালো। তুমি কেমন আছ?
টেলিফোনে কথা, আমি বলি কম আপু বলে যা-তা।
বুড়ির মতো কথা বলছ কেন, কত বয়স তোমার?
কল্পনা বলল,
এক যে ছিল চাঁদের কোণায়
চরকা-কাটা বুড়ি
পুরাণে তার বয়স লেখা
সাতশ হাজার কুড়ি।
ভাইয়া টা টা টা …।
রচনার ব্যাকুল গলা ভেসে আসে, কথা শেষ করে আমাকে দেবে। আমি …
রচনার কথা শেষ হওয়ার আগেই লাইন কেটে গেল। কল্পনা কেটে দিয়েছে। মেয়েটি ভারি দুষ্ট।  কয়েক মিনিট পর আবার রিং করল।
রচনার ভেজা গলায় কষ্টের আভাস, স্যার, রবীন্দ্রনাথের প্রেমের কবিতা নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখেছি। দেশ পত্রিকায় যাবে। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু ভারী দুষ্ট ছিলেন। এটি বলতে চেয়েছিলাম আপনাকে। প্রতিভাবানরা দুষ্ট হয়। আপনি ফোনটা কেটে দিলেন।
কী বলছ এসব?
সত্যি বলছি স্যার, আনিসুজ্জামান স্যারও বলেছেন। শোনেন না রবি ঠাকুর কী লিখেছেন—
বলো।
“আমি হব না তাপস, হব না, হব না
যেমনি বলুন যিনি,
আমি হব না তাপস নিশ্চয়, যদি
না মেলে তপস্বিনী।”

৩২
বিদেশ গেলে দাপ্তরিক কাজের ফাঁকে সময় পেলে রচনার সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করি। ফোন করলে আর ছাড়তে চায় না। না-করলে আরও সমস্যা।

স্যমন্তক, পুথিনিলয়।

বারবার ফোন করে। বিরাট ঝামেলা। তবে এ ঝামেলা গ্রীষ্মের মাঝে প্রথম বৃষ্টির মতো, এ আকাঙ্ক্ষা  কত মধুর তা কেবল বৃষ্টি প্রত্যাশী রোদেজ্বলা খেতের চারারা বুঝতে পারে। সব অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, সে যে ভাষায় হোক। কিছু কিছু অনুভূতির ভাষাহীনতাটাই প্রাণময় ভঙ্গিতে বাঙ্ময়।যা চোখে দেখা যায় না, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, কেবল হৃদয়ে অনুভব করা যায় সম্ভবত এটাই ভালোবাসা।
যেদিন বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে জেনেভা ছাড়ব সেদিন সকালে আর একটা চিঠি এলো।
রচনা লিখেছে
“বিদেশ এত বিদ্বেষ আনে কেন স্যার?
দেশে থাকলে কতবার খবর নিতেন,
কতবার বলতেন,
খেয়েছ তো মেয়ে?
এখন স্যার, একবার ফোনও করেন না,
এমন হচ্ছে কেন?
ফোন দেবেন কিন্তু…
ফোন দেবেন স্যার, বিমানে উঠার আগে।
আমি কান পেতে আছি
রাগে-অনুরাগে।”

চিঠি পড়া শেষ করে ফোন দিলাম।
হ্যালো, বলার আগে রচনার কণ্ঠ ভেসে আসে।
স্যার, কেমন আছেন? আমার কথা কী আপনার মনে আছে? খেয়েছেন? ইস, গলা শুনে মনে হচ্ছে সারাদিন খাননি, খাননি কেন? আমাদের দ্বিতীয় বর্ষের রেজাল্ট দিয়েছে। এবারও আমি প্রথম বিভাগে প্রথম হয়েছি স্যার।
কনগ্র্যাচুলেশন।
সব আপনার কৃতিত্ব স্যর।
আমি কে?
আমার স্যার, আমার বিধাতা।
মেয়ে, এখন রাখি?
স্যার, বিদেশ গেলে মানুষ দেশের কথা ভুলে যায় কেন?
প্রথম কয়েকদিন এমন করে সবাই। তারপর বুঝতে পারে দেশ কী? ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট হোম ইজ দা বেস্ট। উত্তর পশ্চিম সব শেষ; শেষ ঠিকানা নিজের দেশ।
কখন পৌঁছবেন স্যার দেশে?
কাল রাত বারোটায়।
এতক্ষণ বিমানে থাকবেন?
হ্যাঁ।
বিমান এত আস্তে চলে কেন?
দ্রুতই চলে। অনেক দূর তাই দেরি হয়।
এজন্য বলা হয়, Out of sight out of mind.
আমি বললাম, অনুপস্থিতি ভালোবাসাকে ধারালো করে, উপস্থিতি ভালোবাসাকে করে শক্তিশালী। অসাধারণ ভালোবাসার জন্য ধার ও শক্তি দুটোই প্রয়োজন। নইলে ভালোবাসা জায়া-পতির খসখসে প্রেমের মতো খুব সাধারণ হয়ে যায়।
খসখসে কী স্যার?
গোরুর জিহ্বা।


শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক
error: Content is protected !!