স্যমন্তক: চতুর্বিংশ পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

স্যমন্তক: চতুর্বিংশ পর্ব

মিটিং একটার মধ্যে শেষ হয়ে গেল। ঢাকার রাস্তায় ঢাকার মতোই যানজট। শাহবাগ পার হয়ে বাংলা মটরের দিকে মোড় নিতেই ড্রাইভার চিৎকার দিলেন, স্যার আমাদের আপামণি।
আপামণি মানে রচনা। অন্যান্যদের মতো ড্রাইভারও তাকে আপামণি ডাকেন।
কোথায়? চমকে উঠে বললাম।
ঔই তো।
বামে চোখ দিলাম। সে পিজি হাসপাতালের পাশের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে হেঁটে পরীবাগের দিকে যাচ্ছে। বাইরে প্রচণ্ড রোদ। গাড়ি থেকে বোঝা যাচ্ছে— ঘেমে সে একাকার। পরুষ স্বভাবের রোদ মেয়েদের ওপর বেশি ভর করে। শ্যামলার ওপর রূপোলি রোদের কিরণ মেয়েটার মুখে সুনেহ ছায়ার কোমল আদর বিছিয়ে দিয়েছে আবডালে। চিকচিক করছে ঘামেভেজা মুখ— মাথার কালো চুল আর মিটমিটে চোখ। কৃষ্ণচূড়ার কথা মনে পড়ে গেল আমার।
রচনা জানে না আমি ঢাকায়। অফিসের জরুরি কাজে এক ঘণ্টার নোটিশে গতকাল রাত সাড়ে এগারোটার দিকে ঢাকার উদ্দেশে চট্টগ্রাম ছেড়েছিলাম। জাতিসংঘের সদর দপ্তর থেকে বিশাল এক হস্তী এসেছে। সেই হস্তীর সঙ্গে মিটিং। যানজটের জন্য ঢাকায় পৌঁছতে পৌঁছতে আটটা বেজে গেল। নয়টায় মিটিং, সংগত কারণে রচনাদের বাসায় যাওয়ার সুযোগ ছিল না।
গাড়ি থেকে নেমে ফুটপাতে উঠে ডাক দিলাম।
রচনা দৌড়ে এসে আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঘের মতো জাপটে ধরল, স্যার, কখন এসেছেন? আমাকে বলেননি কেন? বললে কী ক্ষতি হতো? আপন হলে কি এমন করতে পারতেন? আপনি শুধু শুধু না-বলে চলে আসেন কেন? এমন করলে কষ্ট লাগে না বুঝি? আপনি মনে হয় প্রতিমাসে অনেকবার এভাবে এসে আমাকে না বলে চলে যান। স্যার, এমন করেন কেন?
তার এক ঝাঁক প্রশ্নের একটাকেও পাত্তা না-দিয়ে বললাম, হেঁটে কেন?
রচনা গাড়িতে উঠতে উঠতে বলল, স্যার, হাঁটাহাঁটি স্বাস্থ্য আর পকেট দুটোর জন্যই ভালো।
কী বললে?
হাঁটা শরীরকে চিকন আর পকেটকে পুষ্ট রাখে। স্যার, আপনি শুধু না-বলে চলে আসেন। একদিনও আপনার আগমনকে উৎসব করতে পারি না, আসার পর করতে হয়। এত তাড়াহুড়ো করে কি সাজানো যায়, সাজা যায়?
রোদে-পুড়ে শরীরটা কয়লা হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে খেয়াল আছে?
আমি স্যার কয়লা, পুড়লেও আর কালো হবো না, বরং লাল হবো। মাটি খুঁড়লে খাল, কয়লা পুড়লে লাল, কাঁঠাল পাকলে মিষ্টি, জ্যৈষ্ঠ মাসে বৃষ্টি। আমি স্যার কয়লার মতো পুড়ে পুড়ে লাল হয়ে একদিন ছাই হয়ে যাব। কালো হলো সবুজের পূর্বধাপ,  বাংলা ভাষার যেমন অবহঠ্‌ট।
তোমার ছাই থেকে সৃষ্টি হবে বৃক্ষ, বৃক্ষ থেকে ফুল, ফল, সবুজ পৃথিবী আর কাকলি মুখরিত দিবস। আমাদের নতুন পৃথিবী নতুন রচনায় রচিত হবে নতুনভাবে আগামকালের উপযুক্ত হয়ে।
রচনা খুশির হাসিতে আমাকে চুমো খেয়ে বলল, তাই যেন হয়, স্যার।
কয়টা ক্লাস হয়েছে?
চারটা হওয়ার কথা ছিল, একটা করতে পেরেছি।
কেন?
কিছু ছাত্র ক্লাস বর্জনের ডাক দিয়েছে।
সাড়া দিলে কেন?
আমাদের সাড়া-অসাড়ায় ধর্মঘটের কিছু যায় আসে না। ক্লাসে গিয়েছিলাম, করতে দেয়নি। ধর্মঘটিরা ক্লাস করতে ইচ্ছুক সাধারণ শিক্ষার্থীদের জোর করে— বলা যায় ঘাড় ধরে ক্লাস রুম থেকে বের করে দিয়েছে।
 কেউ প্রতিবাদ করেনি?
এক টিচার প্রতিবাদ করায় তার গায়ে হাত পর্যন্ত তুলেছে। হাজার হাজার ছাত্র দেখল জনা-পাঁচেক ছাত্র একজন শিক্ষককে প্রহার করছে। মনে ক্ষোভ নিয়ে ছাত্ররা চোখের জলে শিক্ষককে প্রহৃত হতে দেখল, কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করল না, কুলাঙ্গারদের থামানোর জন্য এগিয়ে এল না। খুব উচ্ছৃঙ্খল হয়ে গেছে ছাত্ররা। অনেক সময় শিক্ষকগণও ক্লাস ফাঁকি দিয়ে থাকেন। কিছু কিছু শিক্ষক ছাত্রদের ইন্ধন দেন উচ্ছৃঙ্খল হতে। রাজনীতি করেন না— এমন শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। শিক্ষক, রাজনীতি করলে পড়াবেন কখন; রাজনীতিবিদদের লেজুড়বৃত্তির জন্য যথেষ্ট সময় দিতে হয়।
ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক এত নিচে নেমে গেছে?
আমাদের এক শিক্ষক এসব কাণ্ড দেখে বলেছেন— এককালের প্রাচ্যের অক্সফোর্ড এখন প্রাচ্যের ষাঁড়ফোর্ড হতে চলেছে। আনিসুজ্জামান স্যার এসব ঘটনায় মহাবিরক্ত। অনেকে তাঁকে বলে পলিটিকচুয়াল।
পলিটিকচুয়াল আবার কী?
রাজনীতিক বুদ্ধিজীবী।
আমি বললাম, এখন ছাত্ররাজনীতি বহুলাংশে পেশিনির্ভর হয়ে পড়েছে। অবৈধ আয়ের জন্য ছাত্ররা রাজনীতি করে। একসময় মেধাবীরাই ছাত্ররাজনীতি করত। আচ্ছা— মান্না ভাইয়ের সঙ্গে তো দেখা হয়েছিল, কেমন লাগছিল তাঁকে?
রচনা বলল, অসাধারণ। ইদানীং অনেক ছাত্রনেতা ছাত্রীদের প্রতিও অসৌজন্য আচরণ করে, হয়রানি করে। আমি বুঝি না— কীভাবে একজন ছাত্র এমন খারাপ কাজ করতে পারে। পরিবার ও সমাজ তাদের কি ভালো কিছুই শিক্ষা দেয়নি? অথচ এরাই হবে একদিন নেতা, মন্ত্রী। এসব দেখে দিন দিন দেশের প্রতি আমার ভালোবাসা মোহে পরিণত হচ্ছে। মোহ একবার জাগলে তা আতশবাজির মতো যে-কোনো সময় শেষ হয়ে যেতে পারে। তার পরের স্তর ঘৃণা। দেশের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে ওই দেশ কবরের চেয়ে অন্ধকার, মৃত্যুর চেয়েও শীতল দ্বেষে পরিণত হয়।
চলো, আলাউদ্দিন আল আজাদ স্যারের বাসায় যাই।
তিনি চট্টগ্রামে না?
আমরা দুজন একসঙ্গে ঢাকা এসেছি। তিনি তোমার জন্য কিছু বই রেখেছেন।ওগুলো নিয়ে আসব।
স্যার, অনেক ভালো লেখেন?
স্যারকেও তুমি পড়ে ফেলেছ, মেয়ে তুমি বারবার আমাকে অবাক করে দিচ্ছ। স্যারের বই কোথায় পড়েছ?
কলেজের লাইব্রেরিতে—
স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার?
ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনও চার কোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো!
যে ভিত কখনো কোনো রাজন্য পারেনি ভাঙতে
হীরার মুকুট নিল পরোয়ানা খোলা তলোয়ার।
আমি হাততালি দিয়ে বললাম, বিস্ময়কর! সন্দেহ নেই তাতে।
হঠাৎ মনে পড়ে গেল, পাসপোর্টের কথা। কয়েক সপ্তাহ আগে রচনা, আল্পনা-কল্পনা আর টুটুলের পাসপোর্ট করতে দিয়েছিলাম। গত পরশু সহকারী পরিচালক জানিয়েছেন— পাসপোর্ট রেডি।
রচনাকে বললাম, আগে তোমাদের পাসপোর্টগুলো তুলে নিই। তারপর যাব।
স্যার, সামনে দেখুন।
সামনে তাকালাম। একজন ট্রাফিক পুলিশ এক ট্রাক ড্রাইভারের নিকট থেকে টাকা নিচ্ছে। দেখলে মনে হবে দুবন্ধু হ্যান্ডশেক করছে।
কী দেখলেন স্যার?
উপহার বিনিময়।
উপহার নয়, স্যার, এটি ঘুসাহার; লেনদেন।
যে-কোনো লেনদেনই উপহার এবং যে-কোনো উপহারই লেনদেন। লেনদেন একাধিক হাতকে কাছে নিয়ে আসে। এমন লেনদেন সবাই করে, তবে কেউ অন্যের করাকে সহ্য করতে পারে না। এটা মানুষের একটি পাশব স্বভাব। যে লোকটা ঘুসের বিচার করছে— হয়তো তখন তার পকেটে ঘুসের টাকা। ঘুস খেয়ে ঘুসখোরকে সৎ ঘোষণার লাখ লাখ নজির আছে। মানুষ তার খারাপ দিকটা কেবল নিজের মধ্যে দেখতে চায়, অন্য কারও কাছে নয়। নিজের মল সবসময় গন্ধহীন। নিজের মধ্যে কেউ দোষ পায় না, সব দোষ অন্যে।
এরূপ লেনদেন কী স্যার অন্যায় নয়?
শুনো মেয়ে, ন্যায়-অন্যায় আপেক্ষিক বিষয়। খান স্যার বলতেন— “কল্যাণের জন্য করা সব কাজই ভালো”। এত নিয়মের মাঝে অনিয়ম না-থাকলে নিয়মই বিলীন হয়ে যাবে। যত নিয়ম তত অনিয়ম। বোয়ল মাছ শিশু মাছদের গলধঃকরণ করে মোটা-তাজা হওয়ার জন্য যে বিধি বদ্ধ করে সেগুলোই হচ্ছে নিয়ম। যেখানে শিশুমাছ খুঁজে পায় আইন আর বোয়াল মাছ পায় ছোটো মাছদের উদরগত করার অধিকার।
এজন্যই তো স্যার রবি ঠাকুর বলেন, আজ খেলা ভাঙার খেলা – – -।
আবার রবীন্দ্রনাথ?
আর কোথায় যাব স্যার? কে আছে আর আমার তিনি ছাড়া। পায়ে হাত দিলেও তিনি, মাথাতেও; আকাশেও তিনি বাতাসেও— এমনকি শূন্যেও। বাঙালির সত্তা রবীন্দ্রনাথ ছাড়া সত্তাহীন জড়, নতুবা জানোয়ার।
পাসপোর্ট অফিসে প্রচণ্ড ভিড়। পিঁপড়ের সারির মতো লম্বা লাইন দেখে ভয় পেয়ে গেল রচনা, স্যার, সারাদিন লেগে যাবে। বিকেলে শিল্পকলায় আমার একটা ক্লাস নিতে হবে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে ইংলিশ প্রশিক্ষণ। যে লম্বা লাইন, দেরি হয়ে যাবে মনে হয়।
লাইন আমার জন্য নয়।
কার জন্য. স্যার?
আমজনতার জন্য।
আপনি কি স্যার আমজনতা নন?
আমি জনতা, তবে আমজনতা নই। আমরা খাইজনতা। আমজনতা আম এনে দেয়, আমরা আরাম করে খাই। তাই আমার খাইজনতা। ঠিক ভোটার আর নেতার মতো। আমজনতার ভোট খেয়ে নেতারা খাইজনতা হয়ে যায়। আমরা নেতাদেরও খাই। এজন্য আমাদের আমলা বলে। আমলকী থেকে আমলা।
গেটে পরিচয় দিতেই পুলিশদল স্যালুট দিয়ে সোজা পরিচালকের রুমে নিয়ে গেলেন। রচনা আমার বাহু জড়িয়ে, দুজন পাশাপাশি ভিড় ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছি। সামনে পথ করে দিচ্ছে পুলিশ। কয়েক মিনিটের মধ্যে পাসপোর্ট নিয়ে বের হয়ে আসি।
হাজার হাজার লোক আমার আর রচনার যাওয়া-আসা দেখল। তাদের চোখেমুখে অপেক্ষার ক্লান্তি আমাদের দিকে অভিসম্পাত হয়ে ধেয়ে আসছে। কিন্তু কিছু করার নেই, ধেয়ে আসা অভিসম্পাত আরও দ্বিগুণ অভিশাপ হয়ে তাদের দিকেই ফিরে যাচ্ছে। আমাদের মতো কিছু কিছু মানুষ কেবল সুবিধাভোগের জন্য জন্মায়।
রচনা বলল, এটা কী হলো স্যার?
আমজনতার কাজ আমের জন্য লাইন ধরে অপেক্ষা করা। আমাদের কাজ তাদের কুড়িয়ে আনা আম খাওয়া। এসো যাই, ওসব এখন বুঝবে না। তোমার অনুষ্ঠান আছে শিল্পকলায়। কাছেই আলাউদ্দিন আল আজাদ স্যারের বাসা।

 
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
=============== অন্যান্য==================

ইদানীং ও ইদানীং-এর বিপরীতার্থক শব্দ

ফলজ অর্থ পোকামাকড় ও কীটপতঙ্গ

————————————————————
————————————————————–
error: Content is protected !!