স্যমন্তক: চতুস্ত্রিংশ পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

রচনার চঞ্চলতা ইদানীং কেন জানি অনেকটা কমে গেছে। মাঝে মাঝে সে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে অকারণে। হয়তো বড়ো হচ্ছে তাই, হতে পারে স্বনির্ভর হতে চলেছে বলে স্বকীয়তা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠছে। আরও অনেক কিছু হতে পারে— কিন্তু বুঝতে পারছি না আসলে কী।
কী হয়েছে তোমার?
কিছু না।
নিশ্চয় কিছু হয়েছে। স্বাভাবিক আচরণে বিঘ্ন ঘটলে  ছোটোরা কী বলবে? মানুষের মুখ ভেতরের আয়না। ইদানীং মুখটা কেমন বিষণ্ন হয়ে থাকে। গতকাল আফজল চৌধুরী জানতে চেয়েছিলেন— তুমি অসুস্থ কি না। যারা সর্বদা হাসিমুখে থাকে তাদের সামান্য বিষণ্নতাও বিকট হয়ে ধরা পড়ে। পরিচ্ছন্ন পোশাকের দাগটাই সবার আগে নজর কাড়ে।
তাঁকে বলবেন আমি অসুস্থ। 

কী?

আমি শুচি আসন টেনে টেনে, বেড়াব না বিধান মেনে— অনেকদিন টেনেছি। সারা পৃথিবীতে নিয়মের এত বেশি ছড়াছড়ি যে, নিয়মের মতো পানসা ও সস্তা আর কিছু আছে বলে মনে হয় না। স্যার, আমি কি ভুল বলেছি?
না।
বিধান ভাঙার বিধান আমাকে উতলা করে দিচ্ছে।
আমি তোমার পরিবর্তন লক্ষ করছি। কোনো কারণে টেনশনে আছ?
টেনশন নয়, জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহ।
একটু মজা করে বললাম, আদব-কায়দাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। ঠিক না?
জানি না।
আমি জানি, Familiarity breeds contempt, while rarity wins admiration.
স্যার, এটা ঠিক না, রচনার কণ্ঠে ব্যথার আকুতি। কিছুটা রাগ এবং বেশির ভাগ বিরক্তিমাখা অস্বস্তি।
তাহলে কী হয়েছে তোমার?
আমার পরিবর্তন হচ্ছে, টের পাচ্ছি একটু একটু। প্রকৃতিকে মানুষ থামাতে পারে না। আমিও পারব না। কেউ কি পেরেছে?
তুমি কি কারও প্রেমে পড়েছ?
রচনা ম্লান হেসে বলল, আমার শ্রদ্ধাগুলো ভালোবাসা হয়ে যাচ্ছে।
কীভাবে?
শ্রদ্ধা পদগামী, কিন্তু ভালোবাসা অন্তর্গামী। ভালোবাসা আপাদমস্তক সমানভাবে ছড়িয়ে। এজন্য মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জানাতে হয়। ভালোবাসা জানাতে হয় অন্তরে অন্তরে নিবিড় মমতায়। সমান্তরালভাবে পরস্পর সেঁটে। এজন্য ভালোবাসা পেলে প্রতিটি কোষ  অনুরূপ অনুরণনে চঞ্চল হয়ে ওঠে।
মেয়ে, তুমি কি কাউকে ভালোবাস?
আচ্ছা স্যার, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার মধ্যে কোনটি শ্রেষ্ঠ?
দুটোই ।
আপনি কোনটাকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন?
ভালোবাসা।
কেন স্যার?
শ্রদ্ধায় কিছু ভয়, কিছু লজ্জা, কিছু দূরত্ব আর কিছু সংশয় এবং বেশি কিছু পাশব পার্থিব প্রাপ্তির লোভ থাকে। ভালোবাসা হচ্ছে ভয়, লজ্জা, দূরত্ব ও সংশয়মুক্ত, এটাকে বলা যায় নির্লোভমাল্যের অধিকারী হার্দিক বিমূর্ততায় গঠিত ইচ্ছা পূরণের নান্দনিক কৌশল। দুটোতেই স্বার্থ আছে।
কলঙ্ক?
কেরোসিনের বাতিতে সলতের কালি দেখেছ?
স্যার।
আলোর আগায় এবং গোড়ায় কালো রশ্মি দেখেছ?
দেখেছি।
এটাই কলঙ্ক। মাঝখানের আলোটা প্রেম, ভালোবাসা। যত আলো তত কালি, তত কালো; যত ভালোবাসা তত কলঙ্ক, তত কষ্ট।
স্যার, এজন্য রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- – -।
রচনা সুর দিল কথায়:
“আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্ক ভাগী
আমি সকল দাগে হব দাগি কলঙ্কভাগী।
 গান না শুনেই বিদ্যুৎ চলে গেল। ইদানীং খুব ঘনঘন লোডশেডিং হচ্ছে। রচনা গান না-থামিয়ে দৌড়ে গেল হাতপাখা আনতে। হাতপাখাটি সে হাতের কাছেই রাখে। আমি গরম সহ্য করতে পারি না, এটি খুব মনে রাখে সে।
রচনা বাতাস করছে। মাঝে মাঝে টুটুল রচনার হাত থেকে হাতপাখা কেড়ে নিয়ে আমাকে বাতাস করার চেষ্টা করছে, রচনা দিচ্ছে না। কল্পনা আমার জুতোয় কালি লাগাচ্ছে। তার সামনে মোমবাতি। আল্পনা চার্জ লাইটের আলোয় আতশি কাচ দিয়ে দেখছে আমার মাথায় চুলের ঘুর কয়টি। ঘুর-সন্ধানের সঙ্গে সঙ্গে ফিসফিস করে বলে যাচ্ছে,—যত ঘুরনি তত ঘরনি। আমি চোখ বন্ধ করে তার চুলাদর উপভোগ করে যাচ্ছি। চুল টানলে ভারি লাগে।
কিছুক্ষণ পর চিৎকার দিয়ে ওঠে আল্পনা, আপু পাইছি।
কী?
ভাইয়ার মাথায় তিন ঘুর।
কল্পনা বলল, ভাইয়া ইংরেজিতে ‘বাটা’ বানান করেন তো?
আমি বললাম, বিএ টিএ।
সবাই হেসে উঠল আমার বানান শুনে।
আমি বোকার মতো সবার দিকে চেয়ে বললাম, হাসার কী হলো?
আল্পনা বলল, বিয়েটিয়ে বললে হাসব না? এটা বস্তির ধাঁধা।
টটুল আমার বুক হতে মাথা তুলে বলল, ভাইয়া, কখনো ইংরেজিতে বাটা বানান করবেন না— লজ্জা। বস্তিতে আমরা এটা করতাম না।
রচনা বলল, এই বয়সে এত বিয়ে বিয়ে কীরে!
কল্পনা বলল, আপুর মাথায় কোনো ঘুর নেই। আপুর বিয়ে হবে না, হবে না।
আমি বললাম, অত চুলে তুমি ঘুর পাবে কীভাবে?
বিদ্যুৎ এল। সবাই তালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানাল হেসে। রচনা তালি দিল না। গল্পের সময় তার প্রিয় হচ্ছে মোমবাতির আলো। আমি একটা বই উলটিয়ে যাচ্ছিলাম। রচনা বইটা সরিয়ে নিয়ে বলল, স্যার আপনি বই ছাড়া কিচ্ছু বুঝেন না। গল্পের মাঝে বই, দুধে কাসুন্দি ঢালার মতো বিরক্তিকর।
আমি হেসে বললাম, এজন্যই তো বিয়ে করছি না।
কেন?
 Wife and books go ill together. বই আর বউ দুই ব পরস্পর সতিন।
রচনা বলল, আর একটা আছে।
কী?
কী নয়, কে।
কে?
বস। বই বস আর বউ, তিন সতিনে ঝগড়া থামাতে পারে না কেউ।
আবার নিজের অজান্তে আমার চোখ বইয়ে  চলে গেল। কল্পনা বইটা নিয়ে বলল, গল্গ হবে, বই নয়। শতিন চাই, সতিন নয়।
রচনা বলল, রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি, তিনি এমন গল্পকালে শ্রীমদ্ভগবদ্ পর্যন্ত পড়তে নিষেধ করেছেন। 
তোমাকে কে বলেছেন?
রবীন্দ্রনাথ।
কী বলেছেন?
রচনা সুর দিয়ে আবৃত্তি করল—
“ঠাকুর, তবে পায়ে নমোনমঃ,
পাপিষ্ঠ এই অক্ষমেরে ক্ষম,
আজ বসন্তে বিনয় রাখ মম
বন্ধ কর শ্রীমদ্ভগবদ্।”
ডি এল রায় কী বলেছেন জানো?

কী?

স্ত্রীর চেয়ে কুমির ভালো বলেন সর্বশাস্ত্রী/ ধরলে কুমির ছাড়ে বরং, ধরলে ছাড়ে না স্ত্রী। অন্নদাশঙ্কর রায় ঘরোয়া ছড়ায় কী লিখেছেন শুনবে? “ বিয়ে যদি করো তবে তুমিই হবে ভর্তা, কিন্তু তুমি দেখবে তোমার গিন্নী হবেন কর্তা। কোথায় তোমার স্বাধীনতা কোথায় তোমর ফুর্তি? বাড়ি ফিরে দেখবে তোমার সতীর অগ্নিমূর্তি।
কল্পনা বলল, কিন্তু – – – এরপর বলেছেন—
কথাটা ঠিক, তাহলেও শোনো, ও ভাই টোগো/ বিয়ে যদি না করি তো কে বলবে, “ওগো।” আমারও তো প্রাণ চাইছে, “ওগো” ডাকি কাকে? খোকা যদি আসে তবে ডাকব খোকার মাকে।  বই নিয়ে পড়ে থাকেন কেন? 
বললাম, আমার ঘরে নাই গিন্নি, কীসের পির কীসের শিরনি। তাই বই নিয়ে পড়ে থাকি আসা অবধি  গিন্নি। বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত বইই আবার বউ। “মালয় দ্বীপে এক যে বোকা শেয়ালে/ লাগলে খিদে মুরগি এঁকে দেয়ালে/ চাটতে থাকে আপন মনে খেয়ালে।” আমি  হচ্ছি আপাতত মালয় দ্বীপের শেয়াল।

আল্পনা বলল, আমি একটি কবিতা লিখেছি, দিতে পারি এক শর্তে?
আমি বললাম, শর্তটা কী?
আপু আর আপনাকে অভিনয়সহ আবৃত্তি করতে হবে।
শর্তে রাজি হয়ে গেলাম, আবৃত্তি শুরু হলো—
“স্যার, আমার দাঁতগুলো না কি চমৎকার?
তাই তো তোমার নাকের ডগায় এত  অহংকার।
স্যার, আমার হাসি না কি নিপুণ?
কীভাবে তা বাঁচিয়ে রাখি ভেবেই আমি খুন।
স্যার, আমার চুল না কি খুব কালো?
তাই, ওই সূর্য লাজে; কিরণ হারালো।”
তালি দিয়ে বললাম, অসাধারণ। আল্পনা খুশির চোটে রচনা ও আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, অর্ধেক বাকি আছে।
আমি বললাম, শোনাও?
উত্তর দেওয়ার আগে রচনার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, আজ নয়, পড়ার সময় বয়ে যাচ্ছে। অন্যদিন শোনাব।
রচনাকে বললাম, চোখ দিয়েই থামিয়ে দিলে? এতক্ষণ আমাকে তো খুব শাসিয়ে যাচ্ছিলে, বই পড়ছি বলে।
পড়ার সময় হয়েছে না, স্যার?
তুমি যাবে না পড়তে?
আমাকে তাড়াতে পারলেই আপনার শান্তি, আমি সব বুঝি স্যার।
কী বোঝো?
এরা এতক্ষণ মাছের বাজার করল, কিছুই না। আমার পান থেকে চুন খসলেই দোষ, কালোদের আর কে পছন্দ করে। আমি মা কালি; ওরা তো আর আমার মতো কালো নয়! এক একটা ক্লিওপেট্রা; বুঝি না বুঝেন, তাই না?
রচনা থমথমে গলায় কথাগুলো বলে দ্রুত পড়ার রুমে চলে গেল। আমি দেখলাম, তার চলার পথ অভিমানের জলে ভিজে গেছে।
গুনগুন করে ওঠে মন:
“তোমার পথের কাঁটা করব চয়ন,
যেথা তোমার ধুলার শয়ন
সেথা আঁচল পাতব আমার—
তোমার রাগে অনুরাগী
কলঙ্কভাগী।”

শুবাচ স্যমন্ত সমগ্র পর্ব লিংক

error: Content is protected !!