স্যমন্তক: ত্রিচত্বারিংশ পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

স্যমন্তক: ত্রিচত্বারিংশ পর্ব

গেট দিয়ে ঢোকার সময় আমাকে দেখে ফেলে আল্পনা। দেখামাত্র সোল্লাস আনন্দে চিৎকার, আপু, তোমার স্যার, আমাদের ভাইয়া!
আমি বাসার দিকে এগোতে থাকি নীরবে। মাঝে মাঝে এভাবে চলে আসে আকস্মিক। তাদের এমন চিৎকার বড়ো ভালো লাগে আমার। রচনার চিৎকার থামার কযেক সেকেন্ড পর ভেসে আসে রচনার আর্তচিৎকার— স্যার, স্যা-র, স্যা-আ-র—  — — ।
আমি হতভম্ব হয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড় দিলাম, কী হলো! গিয়ে দেখি, রচনা দ্বিতীয় তলায় সিঁড়ির মাঝখানের পাটাতনে আধ-শোয়া হয়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছে।
তার বাম পা মচকে গেছে।
আমার আগমনের আনন্দ উত্তেজনায় সিঁড়টাকে সমতল মনে করে দৌড়াতে গিয়ে পিছলে পড়েছে। মনে হচ্ছে— গোড়ালির হাড় ভেঙে গেছে। খুব অপরাধী মনে হলো নিজেকে। এভাবে আসা ঠিক হয়নি। নেমে এল ভবনের সবাই। তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। আফজল ভবনের সবার চোখেমুখে উৎকণ্ঠা। তাঁদের প্রিয় রচনার জন্য সবাই দোয়া করছেন।
চিকিৎসা ও ওষুধপত্র দেওয়ার পর বাসায় নিয়ে আসি।
এই প্রথম সাত দিনের ছুটি নিলাম। তাও আবার টেলিফোনে অনুমতি নিয়ে ই-মেইল।  শুনতে পাচ্ছি আমাকে আবার ঢাকায় নিয়ে আসা হবে। বদলির আদেশ যে-কোনোদিন পেয়ে যেতে পারি।
ছুটি নিয়েছি শুনে রচনা খুশিতে ডগমগ, পায়ের ব্যথা ভুলে গেছে মুহূর্তে। বিছানায় শুয়ে আদুরে গলায় বলল, স্যার, আমার সবগুলো হাড় ভেঙে গেলে কত দিনের ছুটি নেবেন?
ভীষণ ঘন চুলে আঙুলের আদর ঢালতে ঢালতে বললাম, একদিনের জন্যও না।
আমি জানি।
কী জান?
তখন আপনি আমাকে আপনার সঙ্গে নিয়ে যাবেন। তাই ছুটি নেওয়া প্রয়োজন হবে না। আচ্ছা স্যার, কেউ যদি কাউকে ভালোবাসে তাহলে কী করতে হয়?
ভালোবেসে যেতে হয়। ভালোবাসার প্রতিদান ভালোবাসা।
যদি ভালোবাসা কমে যায়?
এটি কমে না। ভালোবাসা একপ্রকার জ্ঞান। এটি জ্ঞানের মতো যত দান করা যায় তত বাড়ে। তত বিস্তৃত হয়। তত স্নিগ্ধ হয়, গাঢ় হয়।
যদি কমে যায় কখনো কোনো কারণে?
ধরে নিতে হবে ওটি ভালোবাসা ছিল না। পার্থিব কোনো হীন উদ্দেশ্য ছিল। ভালোবাসা সম্পত্তি নয়, মনোবৃত্তিক সমৃদ্ধি। এটি শুধু পাওয়ার উপর নির্ভর করে না, ত্যাগের ওপর নির্ভর করে। ত্যাগের মহিমা ভালোবার সৌন্দর্য। এটি ইচ্ছা দ্বারা তাড়িত এক অনিঃশেষ ঐশ্বর্য, এর শেষ নেই, অতৃপ্তি নেই।
রচনা বলল, আমার মনে হয় ভালোবাসাই সুখ আর সুখই ভালোবাসা।
ভালোবাসা পাওয়া ও ভালোবাসতে জানা জীবনের পরম প্রাপ্তি। একটি দেহ অন্যটি প্রাণ। একটি ছাড়া অন্যটি অর্থহীন।
রচনা বলল, রাতারাতি বস্তি হতে ফ্ল্যাট, বুয়া হতে বিশ্ববিদ্যালয়— রূপকথাকেও হার মানায় স্যার। ব্রিটিশ কাউন্সিলের গেস্ট লেকচারার, বাংলার ছাত্রী হয়ে ইংরেজি পড়াই; সব স্বপ্ন-স্বপ্ন স্বপ্নিল।
জীবন একটা রূপকথা, আমি বললাম, “জীবনকে সাজাতে হলে প্রতিটি সেকেন্ডকে রূপকথায় পরিণত করতে হয়। যে কথায় রূপ নেই সে কথা কেউ শুনতে চায় না। যে কথা উদ্দিষ্ট জন শুনতে চায় না সেটি আসলে সেটি কথা নয়।
কী?
গালি।
কল্পনা, বোনটি আমার, তুমি কোথায়? রচনার ডাক শুনে দৌড়ে আসে কল্পনা।
স্যারের জন্য নাস্তা নিয়ে এসো। নিনি কোথায়?
পড়ছে।
আমি বললাম, এখন না, আগে একটু প্রায়শ্চিত্ত করে নিই।
মাথা হতে আমার হাত সরিয়ে দিতে দিতে বলল, আদর করা যদি প্রায়শ্চিত্ত হয়, তাহলে এমন আদর আমার লাগবে না। স্যার, আপনি যান। যান-না স্যার, প্লিজ যান বলছি।
কী বলতে চেয়েছি বুঝাতে পারিনি, উলটো বুঝেছে রচনা। অবশ্য আমার বাক্যটাও ঠিক ছিল না।
নরম গলায় বললাম, ভুল হয়ে গেছে।
রচনা অভিমান তাড়িয়ে বলল, বস্তির মানুষ থাকে গাছতলায়, ফ্ল্যাট বাড়ির মানুষ থাকে সাত তলায়, কিন্তু স্যার আচরণে কোনো তফাত নেই।
যেমন?
রচনা বলল, দুজনেই সর্বদা প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত থাকে, দুজনেই শুধু খাই-খাই করে। দুজনেই অভাবি। তবে উচ্চবিত্তদের অভাবটা প্রকট। সংখ্যায় তারা কম বলে পৃথিবীটা টিকে আছে।
আর মধ্যবিত্ত? আমি জানতে চাইলাম।
ওদের কাজ মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই পক্ষের চাপে টেপা শুঁটকির মতো চ্যাপ্টা হতে থাকা আর হা-হুতাশ করা।
আমি বললাম, ওপরে আগুন নিচে জল/ মধ্যিখানে মধ্যবিত্ত হাহাকার অতল। 
তাহলে শান্তি কোথায় স্যার?
তুমি বলো, রচনাকে বললাম।
নিজের অবস্থানে তুষ্ট থাকা। অল্পে তুষ্ট থাকলে জীবন সহজ হয়ে যায়। অভাব কমে যায়, তৃপ্তি আর আনন্দ এসে খোলা আকাশে বয়ে বেড়ানো বাতাসের মতো ঝাপটা মারে শরীরে—কী মধুর সে ঝাপটা।
রচনার কথায় আমি নিজের সুর খুঁজে পাই। মাথায় আরও নিবিড় মমতায় হাত বুলাতে বুলাতে বললাম, এত অবারিত প্রকৃতি, তবু মানুষ শান্তি খোঁজে নিজের সংকীর্ণ কোনায়। এত অপরিমেয় আকাশ, মানুষ তবু আটকে থাকে মনের গলিতে।
স্যার, মানুষ লোভী। লোভের দিকটা বিবেচনা করলে মানুষকেই আমার সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রাণী মনে হয়; উহ!
ব্যাথা করছে?
না।
উহ করলে যে?
আনন্দে আটকে রাখতে পারছি না। এত কাছে এত গভীর মমতায় আপনাকে আর কোনোদিন পাইনি তো, তাই।
সত্যি ব্যথা লাগছে না তো? আমার মাথায় আপনি হাত রাখলে সব ব্যথা মমতা হয়ে যায়। এ হাত যতদিন মাথার ওপর থাকবে ততদিন মমতা ছাড়া আমার আর কোনো ব্যথা অনুভূত হবে না। স্যার, অসুখের এত সুখ কেন?
তুমি বলো?
প্রিয়জন মমতার ডালা নিয়ে কাছে থাকলে এমনই মনে হয়।


error: Content is protected !!