স্যমন্তক: ত্রয়স্ত্রিংশ পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন
চারটার দিকে বসের রুম থেকে বের হয়ে আমার রুমে এলাম। টেলিফোন সেটের পর্দায় ভাসছে বাসার নম্বর। বাসা মানে রচনাদের বাসা, যেখানে আমি আপাতত থাকি।  দেরি না-করে ফোন করি।
হ্যালো বলতে ভেসে আসে রচনার গলা।
স্যার, জানেন?
কী?
আমাদের আল্পনা বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে।
তাড়াতাড়ি আসছি, সেলিব্রেট করতে হবে। তোমরা আমার দিনগুলোকে দিনের মতো উজ্জ্বল করে দিচ্ছ প্রতিদিন।
এক তোড়া ফুল ছাড়া আর কোনো কিছু আনবেন না।
রচনাদের বাসায় সুখ আর উচ্ছ্বাসের কমতি নেই। প্রতিদিন উৎসব লেগে থাকে— প্রতিদিন থাকে সরগরম। সামান্য বিষয়কেও যারা অসামান্য করে তুলতে পারে তাদের সুখোৎসবের অভাব হয় না। একটা চড়ুই পাখির কিচিরমিচির ডাকেও তারা আনন্দ পায়। তাদের দুখ আসবে কীভাবে? একটা চকলেট পেলে যারা হাসিতে দুনিয়া ঢেকে দেয়—  আঁধারের কী সাধ্য তাদের মুখে কালিমা লেপার!
দুখ কেবল তাদেরই যারা প্রাপ্তিকে কখনো অসামান্য ভাবতে পারে না, বরং অসামান্য প্রাপ্তিকে সামান্য করে দেখে; দুখ তাদেরেই ঘিরে নৃত্য করে যারা কেবল চাই চাই করে। যা পেয়েছি কিংবা পাচ্ছি তাও না-পাওয়ার তালিকায় থাকতে পারত— এমন বোধ জাগ্রত থাকলে না-পাওয়াতেও প্রচুর আনন্দোপকরণ পাওয় যায়।
এ বাসায় প্রত্যেক বিষয়ে সবার মন সর্বক্ষণ ভারপুর থাকে কানায় কানায় উপচে পড়া আনন্দে। কখনো বিষণ্নতা এলে তা ঘটে কেবল আমার কারণে। আমিই মাঝে মাঝে অহেতুক বিঘ্ন সৃষ্টি করি নানা অজুহাতে। তারা একজনের আনন্দকে সবাই নিজের আনন্দের মতো  উপভোগ করে। ফলে সামান্য বিষয়টাও বিশাল হয়ে যায়। পারস্পরিক স্নেহ-মমতা পরিবার-পরিজনকে এমন আনন্দে মাতিয়ে রাখে। পরিবারের সদস্যগণের মধ্যে সৌহার্দ্য না থাকলে জীবনটা যন্ত্রের চেয়েও রসহীন হয়ে যায়। তাদের তখন জ্বালানি তেল ছাড়া আর কিছু না হলেও চলে। এর চেয়ে পশুজীবন অনেক ভালো।
বাসায় ঢুকে দেখি রচনা অনুবাদের কাজ করছে। গতকাল একগাদা কাগজ দিয়ে গেছেন কবীর চৌধুরী। আমি এলাম কিন্তু প্রতিদিনের মতো দৌড়ে এল না। হঠাৎ মেজাজ চড়ে গেল সপ্তমে। আকস্মিক রাগ মানসিক রোগের লক্ষণ। যা আমার আছে— অন্তত আমার তাই মনে হয়।  কাগজগুলো মেঝে ছুড়ে দিয়ে বললাম, বারবার না-সত্ত্বেও ক্লাসের লেখাপড়া বাদ দিয়ে অনুবাদ করা হচ্ছে— এত অবাধ্য হলে কখন থেকে?
রচনা বলল, স্যার, আমার প্রতি কেন এত দরদ!
কার প্রতি হবে?
আপনি আমার কে?
হঠাৎ এ প্রশ্ন? আকস্মিক কেঁপে ওঠল বুক, রাগ এখন হিংস্রতার দিকে এগিয়ে।
মনিরুজ্জামান স্যার জানতে চেয়েছিলেন, রচনা বলল।
তুমি কী বলেছ?
বলেছি— তিনি আমার ধারক। হুমায়ুন আজাদ স্যারও জানতে চেয়েছিলেন। তাঁকে বলেছি— জনক। আপনার আগের বস রঞ্জিত বাবুকে বলেছি— ভগবান। বাড়িভাড়া নেওয়ার সময় কী অপদস্থই না হতে হয়েছে। মনে নেই?
রচনার কথায় আমার রাগ চুপসে ফুটো ফানুস।
বললাম, নানা লোক নানা কথা বলবে। কুৎসায় কান দিতে নেই।
তাই করছি।
কুৎসা মানে কি জানো?
কী? রচনা প্রশ্ন করল।
কুৎসা হচ্ছে কুলাঙ্গারের উচ্ছিষ্ট, ইর্ষাকতার মানুষের বমন। এখানে তুমি দুর্গন্ধ আর রোগজীবাণু ছাড়া কিছুই পাবে না। এদের এড়িয়ে চলবে।
আমি আপনার কী হই স্যার? উলটোভাবে আবার একই প্রশ্ন করল রচনা।
কেউ বলে কন্যা, কেউ বলে বাগ্‌দত্তা, কেউ বলে বোন, অনেকের কাছে মা।
রচনা বলল, আমাদের অস্বাভাবিক সম্পর্ক আর অবস্থান নিয়ে নানাজন নানা কথা বলে। কেউ কেউ মনে করে আমি আপনার সেবাদাসী, মানে রক্ষিতা। আমি জানতে চাইছি— আপনার কাছে আমি আপনার কী?
মেয়ে-মা, সেবাদাসী, রক্ষিতা যে যাই মনে করুক— এটি বিষয় নয়, বিষয় হচ্ছে তুমি আমার রচনা, আমার অনিন্দ্য সুন্দর আবিষ্কার। একজন মেয়ের যত প্রকার বন্ধন-সম্পর্ক থাকতে পারে— তুমি আমার সব বন্ধনের সারমর্ম। ওই সারমর্মটিই আমার রচনা। ওটাই আমার তুমি। তুমি আমার রক্ষিতাই।রক্ষিতা শব্দের মুখ্যার্থ রক্ষাকর্ত্রী, ঈশ্বর।
নানাজন নানা কথা বলে উত্ত্যক্ত করতে চায়। আমি উত্ত্যক্ত হব না। তবে এখন থেকে কাউকে ছেড়েও কথা বলব না। ঢিল ছুড়লে পাটকেল।
আমি বললাম, রাস্তায় ঘেউ ঘেউ করা কুকুরদলকে ঢিল মারতে গেলে নিজের গন্তব্যেই পৌঁছাতে পারবে না। বরং কুকুরদের ঘেউ ঘেউ করতে দাও। ঢিলগুলো জমিয়ে রাখ। জমে জমে পাহাড় হবে, ভবন হবে ভুবনে, প্রাসাদ হবে নগরে। তারপর কুকুরদের মুখে ছুড়ে দাও খাদ্যকণা, ওরা প্রভুভক্ত।
স্যার আমি গর্বিত, আমি আনন্দিত।
তোমার এ আনন্দই আমার সার্থকতা।
“এতদিন পিতা তোর ছিল না এ দেহে,
আজ সে সহসা হেথা এসেছ ফিরিয়া।” রচনা মধুর কণ্ঠে বলল।
আল্পু, বোন আমার তুমি কোথায়?
ডাক শুনে দৌড়ে এল আল্পনা। ছুটে এল কল্পনা, টুটুল এবং নিনি। আমার রাগ এখন সৌহার্দ্য, স্বাভাবিক হয়ে গেছে পরিবেশ। রচনাই স্বাভাবিক করে দিয়েছে। প্রতিবারই সে এমন করে। আমার উন্মত্ততাকে কত সহজে দাবিয়ে দিতে পারে মেয়েটি।
পায়ে ধরে শ্রদ্ধা জানিয়ে আল্পনা বলল, ভাইয়া বার্ষিক পরীক্ষায় এবারও আমি প্রথম হয়েছি।
আমি তার হাতে একটা ঘড়ি তুলে দিয়ে বললাম, অভিনন্দন।
আল্পনার অনেক দিনের সখ এমন একটা ঘড়ি। রচনাকে বলেছিল কয়েকবার, কিনে দেয়নি সে। দামটা একটু বেশি তাই। আমি ভেবেছিলাম ঘড়ি পেয়ে খুশি হবে— না, আল্পনা খুশি হলো না, বরং উপহার নিয়ে মুখটা ফ্যাকাশে করে আমার দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসির উপহাসে আমাকে হতাশ করে দিল।
তুমি খুশি হওনি, বিষণ্ন গলায় বললাম।
এত সস্তা পুরস্কারে মন ভরে না।
কী চাও?
আপু শুনবে, কানে কানে বলি?
বলো।
আল্পনা আমার কানে কানে বলল, চুমো।
আমি তার কপালে আর দুই গণ্ডে চুমো খেয়ে ঘড়িটা পরিয়ে দিলাম। এবার সে  উৎফুল্ল। আবার পায়ে ধরে শ্রদ্ধা জানাল। কল্পনা এবং টুটুল তাকে অনুরসণ করল। রচনা ঠাঁই দাঁড়িয়ে। অন্য সময় সেও শ্রদ্ধা জানাত। আমার কাছে বিষয়টা অস্বাভাবিক লাগল। নিশ্চয় কোনো বিষয় নিয়ে ভীষণ রকম চিন্তিত।
রচনা কী ইচ্ছে করে এমন করল?
না কি ভুলে?
সে কি তাহলে পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? এড়িয়ে যেতে চাইছে আমাকে? নাকি লজ্জা পাচ্ছে আগের মতো পায়ে ধরে শ্রদ্ধা জানাতে?
কল্পনা দৌড়ে বের হয়ে গেল। মিনিট পুরোবার আগে গিফট পেপারে মোড়া একটা প্যাকেট নিয়ে দৌড়ে এল। সবাই মিলে আমার হাতে গিফটবক্সটি তুলে দিয়ে বলল, সন্তানদের পক্ষ হতে বাবার প্রতি উপহার।
আমি উপহারের সঙ্গে সঙ্গে কল্পনাকেও টেনে নিলাম আদরে। এটি তাদের পক্ষ থেকে আমার কত নম্বর উপহার আমার মনে নেই। তবে প্রায়শ এমন উপহার

ড. মোহাম্মদ আমীন

দিয়ে তারা আমাকে উপহার করে রাখে সারা বছর। এমন কোনো দিন নেই— আমাকে বস্তুগত উপহার দেয়নি; হতে পারে সেটি একটি চকলেট কিংবা ফুল নতুবা চুমোর সঙ্গে একটা আইসক্রিম, কিংবা একটা কলম, পেন্সিল বা খাতা।
বললাম, মেয়ে এটি তোমাদের পক্ষ থেকে আমার কততম উপহার?
রচনা হেসে বলল, স্যার, তা মনে নেই।
কেন?
কল্পনা বলল, কাউকে কিছু দিলে মনে রাখতে নেই।
কে বলেছে?
আপু। কিন্তু কেউ সামান্য কিছু দিলেও তা আজীবন মনে রাখা উচিত। এটাই নাকি কৃতজ্ঞতা। তাই, আপনি আমাদের কত বার উপহার দিয়েছেন সব মনে আছে।
কল্পনা বলল, আপু বলো তো— ভাইয়ার দেওয়া সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ উপহার কোনটি?
রচনা বলল, আমাদের বর্তমান, মানে present। আমাদের প্রেজেন্টই তার দেওয়া সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেজেন্ট।
টুটুল বলল, তাহলে এর চেয়ে বড়ো প্রেজেন্ট আর কেউ দিতে পারবে না আমাদের। ঠিক বলেছি না আপু?
ঠিক বলেছ।
উপহার কী? টুটুল প্রশ্ন করল।
রচনা বলল, অধিকাংশ মানুষ সাধারণত তুমি তাদের কী উপকার করেছ তা কখনো দেখে না, ভাবে না; কেবল কী করা হয়নি তাই দেখে। উপহার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- কী করেছে, ভুলিয়ে দেয় কী করা হয়নি। তাই উপহারকে তৃপ্তির হার বলা হয়।

—————————–
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক
স্যমন্তক: ত্রয়স্ত্রিংশ পর্ব
স্যমন্তক: চতুস্ত্রিংশ পর্ব
স্যমন্তক: পঞ্চত্রিংশ পর্ব
স্যমন্তক: ষট্‌ত্রিংশ শ পর্ব
স্যমন্তক: ত্রয়স্ত্রিংশ পর্ব (শুবাচ লিংক)
স্যমন্তক: চতুস্ত্রিংশ পর্ব (শুবাচ লিংক)
স্যমন্তক: পঞ্চত্রিংশ পর্ব (শুবাচ লিংক)
স্যমন্তক: ষট্‌ত্রিংশ শ পর্ব (শুবাচ লিংক)
=============== অন্যান্য==================

ইদানীং ও ইদানীং-এর বিপরীতার্থক শব্দ

ফলজ অর্থ পোকামাকড় ও কীটপতঙ্গ

————————————————————
error: Content is protected !!