Warning: Constant DISALLOW_FILE_MODS already defined in /home/draminb1/public_html/wp-config.php on line 102

Warning: Constant DISALLOW_FILE_EDIT already defined in /home/draminb1/public_html/wp-config.php on line 103
স্যমন্তক: দ্বাষষ্টিতম পর্ব  – Dr. Mohammed Amin

স্যমন্তক: দ্বাষষ্টিতম পর্ব 

ড. মোহাম্মদ আমীন

স্যমন্তক: দ্বাষষ্টিতম পর্ব 

কলিংবেলে আমি আলতোভাবে আদর করে একটা টিপই দিই। কলিংবেলকে আদর-টিপ না-দিলে বাজে চিৎকার দেয়। যন্ত্রও আদর বোঝে। কলিংবেল বাজছে কিন্তু কেউ দরজা খুলছে না। তিন-চার মিনিট পর দরজা খোলার শব্দ পাই। দুই বোনের কাঁধে ভর দিয়ে রচনা দরজা খুলল।
কী হয়েছে? আমি ভয়ের সঙ্গে বললাম।
আল্পনা আমার হাত থেকে খাবারের প্যাকেটগুলো নিতে নিতে বলল, আপনি চলে যাচ্ছেন দেখে ডাকার জন্য দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে।
কোথায়?
কোমরে।
ভাগ্যিস বাম পায়ে নয়। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ডাক্তার তানিয়াকে খবর দিলাম। তার বাসা রচনাদের কাছাকাছি। কয়েক মাস আগে এ বাসায় উঠেছে। তানিয়া আমার বন্ধু, অনেকদিন একসঙ্গে পড়েছি। খবর পেয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে চলে এল।
রচনাকে দেখে বলল, কেবল রগ মচকে গেছে, হাড় ভাঙেনি। হাঁটলে ভালো হয়ে যাবে। তুমি মা এত চঞ্চল কেন?
রচনা বলল, এখন যে প্রচণ্ড ব্যথা?
তানিয়া বলল, এমন আঘাত পেলে ঘণ্টা কয়েক প্রচণ্ড ব্যথা করে। হাঁটলে চলে যাবে। যাও, তুমি হাঁটতে চেষ্টা করো।
তানিয়ার কথা শেষ হওয়ার পর রচনা, আল্পনা-কল্পনার কাঁধে ভর দিয়ে বারান্দার দিকে হাঁটতে শুরু করে। পেছনে টুটুল আর নিনি।
তোমার সাহেবের খবর কী?
ওই অসভ্যটার কথা না আনাই ভালো”,তানিয়া বলল, “সে একটা জানোয়ার। আচ্ছা, স্বামী মাত্রই কি জানোয়ার? নইলে সব বিবাহিতা মেয়েরা এমন বলে কেন?”
আমি বিয়ে করিনি তাই বলতে পারছি না। তোমার স্বামী এখন কোথায় থাকেন?
কে জানে, হারামিটা কোন মাগির ঘরে সোল্টা টেনে পড়ে আছে। একদম দেখতে ইচ্ছে করে না। তিন বছর কথা হয় না।
সোল্টা কী?
গাঁজা-ভরা সিগারেট।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বলা হতো বুইল্যা। তোমাদের ছেলেমেয়ে?
তোমাদের মানে?
তোমার আর তোমার স্বামীর- এমনই তো বলা হয়।
ছেলেমেয়ে কার সেটা একমাত্র মা-ই জানেন। স্বামী কীভাবে জানবে? হারামির বাচ্চারা সবসময় মেয়েদের ওপর গাদ্দারি করার চেষ্টা করে।
একদম খাঁটি কথা, অনিচ্ছাসত্ত্বেও সমর্থন দিলাম।
তানিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ডাক্তারের ডাক্তার বিয়ে করা উচিত নয়। সমমেরুতে বিকর্ষণ। তুমি যদি আমাকে বিয়েটা করতে বা আমিও একটু আগ্রহী হতাম, যাক- যা গেছে তা কি আর ফিরে আসে?
তানিয়া চলে যাওয়ার পর আমি বারান্দায় যাই। রচনা একা একা হাঁটার চেষ্টা করছে কিন্তু কষ্ট হচ্ছে।
আমি বললাম, আমার কাঁধে হাত দিয়ে হাঁটার চেষ্টা কর।
রচনা আমার হাতটা ধরে শিশুর মতো ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে উঠল।
আমি হতভম্ব হয়ে বললাম, মেয়ে কী হলো, কাদছ কেন?
একজন অসুস্থ মানুষকে রেখে তানিয়ার সঙ্গে সারাদিন গল্প করতে হয় বুঝি? উনি আপনার কে?
আমার কাঁধে-রাখা রচনার হাতে ছোটো একটা ঝাঁকি দিয়ে বললাম, মেয়ে আমার কাঁদে না, এই তো আমি এসে গেলাম।
আমি রচনার অভিমানের ভাষা বুঝতে পারি। তাই শিশুবেলা থেকে বঞ্চিত রচনায় আমার ভালোবাসাটাও বেশি। এটি বুঝতে পারে বলে আমার ওপর তার অভিমানও বেশি।
তুমি অভিমান করলে আমার ভালো লাগে।
কেন স্যার?
অভিমান ভালোবাসার হাসি। হাসলে যেমন মানুষকে সুন্দর দেখায় তেমনি অভিমানে ভালোবাসা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কালো রাতের ছোছনা যেমন।
আমার কথায় রচনা খুশি হয়ে গেল। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করার পর বলল, গান শুনবেন স্যার?
আগে খেয়ে নিই। খাবারগুলো ঠান্ডা হয়ে যাবে। চলো।
আল্পনা বলল, অলরেডি ঠান্ডা হয়ে গেছে, ওভেনে দিচ্ছি।
আমি বললাম, ব্যথা নিয়ে গাইতে পারবে?
আপনাকে দেখে ব্যথা কমে গেছে।
আমি কী ব্যথার ওষুধ?
কেউ কেউ কারও জীবনের মহৌষধ।
খুব মজা করে খাওয়া শেষ করলাম পাঁচ জন। নিনি এখন ফুটফুটে। খাওয়ার পর গান। রচনা শুরু করল আমার সবচেয়ে কষ্টের গানটি দিয়ে
আমার পূজার ফুল ভালোবাসা হয়ে গেছে
তুমি যেন ভুল বুঝ না।
বন্ধ কর। গানটা এত বার শোনাতে চাও কেন?
আমার প্রিয় গান স্যার। এটাতে আমার একটা ম্যাসেজ আছে।
তোমার কী হয়েছে রচনা? এত খুশি খুশি লাগছে যে?
আমার আর অক্সফোর্ড যেতে হবে না। দেহ ছেড়ে জীবন কি সহজে যেতে চায়?
“কিন্তু যেতে তো হয়”, আমি বললাম, “মরতে চায় না কেউ, তবু মরতে হয়। অক্সফোর্ডের এই বৃত্তি কোটিতেও জোটে না, নোবেল পুরস্কারের চেয়েও সম্মানের।”
আমি যাব না। ওখানে কেউ নেই।
অনেকেই আছে।
আমার অনেক মানুষের দরকার নেই, একজনই যথেষ্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। অযথা ইউরোপের অক্সফোর্ড কেন?
‘মা’ আর ‘মায়ের মতন’ এক বিষয় নয়।
এখানে বসেও আমি অক্সফোর্ডের কাজ করতে পারব।
রচনা ভুল বলেনি। বাংলাদেশে থেকে সে আরবি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান, ইংরেজি, কোরিয়ান ও রুশ রপ্ত করে ফেলেছে।
আমার কাঁধে ভর করে রচনা তার রুমে গেল। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে চলে আসতে চাইলে হাতে ধরে বলল, স্যার, আমার পাশে একটু বসবেন?
আমি বসলাম। রচনা আমার দুই হাত দিয়ে তার চোখ দুটো ঢেকে রাখল। বাবার কথা মনে পড়ে গেল আমার। এভাবে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার ভানে তিনি আমাদের আনন্দ দিতেন। যাবার সময় চোখে চুমো খেয়ে যেতেন আদরে।
অনেকক্ষণ পর হাত তুললাম চোখ হতে। মনে হলো রচনা ঘুমিয়ে পড়েছে। আমিও বাবার মতো খুব সাবধানে রচনার দুই চোখে দুটো চুমো দিয়ে উঠে পড়লাম। আমি উঠতেই রচনা নড়ে ওঠল, তার ঠোঁট দুটো নড়ছে, স্যার, চলে যাচ্ছেন?
সত্যি সত্যি রচনা জেগে উঠেছে, স্যার আর একটু বসুন।
ঠিক আছে।
স্যার মানুষের সবচেয়ে প্রিয় কী?
জীবন।
“কিছুই দেব না সখা, নেই কোনো ধন,
এনেছি বুকে করে আমার এজীবন।
আঁখি মুদে মন খুলে বলি বারবার
জীবনটা নাও সখা, এটাই তোমার।”
মেয়ে?
স্যার।
কবিতাটা কখন লিখেছ?
কোমর ভাঙার পর, আপনি যখন বাইরে ছিলেন।
কল্পনা দুধ নিয়ে রুমে ঢুকছে। তার পেছনে টুটুল, তার হাতে পিরিচ। কল্পনা টেবিলে কাপ রাখতে রাখতে বলল, কোমর ভাঙলে যদি এত সুন্দর কবিতা লেখা যায়, আমি কেন অক্ষত রাখব আমার কোমর; কী বলেন ভাইয়া?
আল্পনা ভারিক্কি, বুদ্ধিমতী, রচনার মতো মেধাবী। বস্তির পঞ্চম শ্রেণির আল্পনা এবার দশম শ্রেণিতে। কল্পনা নবম শ্রেণিতে আর টুটুল থ্রিতে।
আমি বললাম, নিনি কোথায়?
পড়ছে।
তাকে দিয়ে তো পাঠাতে পারতে?
স্যার, নিনিকে দিয়ে আপনাকে কোনোদিন কোনোকিছু দিয়েছি?
লজ্জা পেয়ে টুটুলের দিকে তাকাই। অনেক বড়ো হয়েছে সে। কী ছোটো ছিল টুটুল! নিজের হাতে কত বার খাইয়েছি। নিজের সন্তানের মতো বুকে নিয়ে ঘুমিয়েছি, কত বার পেশ্রাব করে দিয়েছে গায়ে। সোহাগ করে ডাকতাম, তুলতুল। সে ভাঙা গলায় বলত, টুলটুল। এখন অনেক খেলনা তার।
বালিশের নিচ থেকে ছোটো একটা খাতা বের করে রচনা বলল, স্যার, আর একটা কবিতা লিখেছি, পড়ব?
আমি হেসে বললাম, তোমার প্রশ্নের উত্তর তো তোমার কাছেই, পড়ো।
“কুসুম কোমল জোছনা দিয়ে সাজাব তোমায় আজ,
এই দেখ না আমার চোখে,
তোমার নদীর গভীর বুকে
নীরব গভীর ভালোবাসার ঘুমিয়ে মধুর লাজ।”
লাজ মানে কী স্যার?
নিজের এবং অন্যের মধ্যে পার্থক্যের সীমারেখা।
এজন্যই বুঝি ভালোবাসার নিবিড়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাজের পরিমাণও কমে যায়, ঠিক বলেছি না স্যার?
শুধু লাজ নয়, শ্রদ্ধার পরিমাণও কমে যায়। তবে তোমার কথার মাথামুন্ডু এখন বুঝতে কষ্ট হয় আমার।
আপনি স্যার আমার যত কাছে বসেছেন অচেনা হলে কী তত কাছে বসতেন? কাঁধে হাত দিয়ে হাঁটতে দিতেন? আদর করে কপালে-চোখে চুমো খেতেন?
মেয়ে চুপ করে ঘুমাও।
চুপ না-করেও স্যার ঘুমানো যায়।
কীভাবে?
জেগে জেগে।
————————————–