স্যমন্তক: পঞ্চপঞ্চাশত্তম পর্ব 

ঢাকার ভোর মানে পরিবারের তাড়াহুড়ো। কারও অফিস, কারও স্কুল। রচনার বিশ্ববিদ্যালয়, উপরন্তু সভা-সেমিনার, পড়া আর পড়ানো- একটার পর একটা লেগেই থাকে। সব পরিবারের একই অবস্থা। এত ব্যস্ততা, তবু কারও ঠোঁট এক সেকেন্ডের জন্যও বন্ধ থাকে না। সারা রাতের নীরবতা সকালের সূর্য পেয়ে চড়ুই পাখির মতো সরব হয়ে ওঠে যথা-অযথা।
প্রাতঃরাশ সাজিয়ে ডাক দিল রচনা, আসুন স্যার।
টুটুল খেয়েছে?
খেয়েছে।
আল্পু-কল্পু?
ইচ্ছে হলে খাবে। তেনারা তো আর শিশু নয় যে খাইয়ে দিতে হবে।
ডাইনিং টেবিলে আল্পনা-কল্পনা থম ধরে বসে আছে। নিশ্চয় বকা দিয়েছে রচনা। রচনার বকা খেলেই কেবল এমন থম ধরে তারা। আমি বকা দিতে পারি না শিশুদের, বড়োদেরও। কখনো দিইন, দিলে হাসে। কেবল রচনাকে মাঝে মাঝে বকা দিই। তাও কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তারপর আবার পূর্ববৎ। আমার রাগাচরণ একদম ব্যক্তিত্বহীনের মতো।
আল্পু-কল্পুর প্লেটে মিশেল-সবজি আর ডিম-ভাজা তুলে দিতে দিতে বললাম শুরু করো।
রচনা তোয়ালে দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বলল, আমাকে কেউ বসতেও বলে না, খেতেও বলে না। আমি কিচ্ছু খাব না। আমি কালি, পাতিলের মসি, আমাকে খেতে বলবেন কে, যদি কালি লেগে যায় কারও গায়ে; ফরসারা খাক।
বসো, রচনার হাত ধরে টান দিলাম।
না।
আরে বাবা বসো-না?
কোনোদিন ওদের মতো করে প্লেটে কিছু তুলে দিয়েছেন? আমি কালো, তাই সবাই ঘৃণা করেন। আমি বুঝি না? সব বুঝি। আমি ইউনিভার্সিটির হলে চলে যাব।
বললাম,  তুমি কালো?
হ্যাঁ।
“কালো? তা সে যতই কালো হোক
দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ।” বসো মেয়ে। রাগ করে না, আজ না তোমার সেমিনার? রাগ স্মৃতিকে ভীতির কারখানা বানিয়ে দেয়। 
খাব না, কোত্থাও যাব না। ওই চেয়ারেও বসব না।
তোমার ওই চেয়ারে বসতে হবে না, আমার চেয়ারে বসো।
এক টুকরো রুটিতে মাখন মেখে রচনার মুখে এগিয়ে দিই। সে অন্ধকার মুখটাকে হাসিতে সাজিয়ে রুটির টুকরোটি মুখে ভরে আমার চেয়ারের কিয়দংশ দখল করে নিয়ে বলল, স্যার, আমি খাইয়ে দিই আপনাকে?
কল্পনা বলল, ভাইয়া, রচনা আপু আমাদের বকা দিয়েছে।
কেন?
আপনার জন্য ডিমের রেসিপি করতে গিয়ে রান্নাঘর ময়লা করে ফেলেছি তাই। এখন থেকে আমাদেরও আপুর মতো করে ভালোবসাতে হবে। ও শুধু বকা দেয়। সে যদি আপনার চেয়ারে বসে আপনি পড়ে যাবেন না? আমিও বসব। তখন আপনার কী হবে? আপনি শুধু তাকেই ভালোবাসেন, তাকেই ভালোবাসেন।
ভালোবাসা নিয়ে রচনা আর কল্পনার ঈর্ষা বেশ উপভোগ্য। দুজনকে যত বোঝাতে যাই ততই বেঁকে যায়। মাঝে মাঝে কল্পনার চেয়ে ছোটো হয়ে যায় রচনা।
আমি রচনার মুখে আর এক টুকরো রুটি তুলে দিতে দিতে কল্পনাকে বললাম, পাগলি মেয়ে, ভালোবাসাকে কারও সঙ্গে তুলনা করতে নেই। তাহলে সে মরে যায়।
আপনি আল্পনা আপুকে কার মতো ভালোবাসেন?
আল্পনাকে আল্পনার মতোই ভালোবাসি, রচনাকে রচনার মতো।
আমাকে?
তোমাকে তোমার মতো ভালোবাসি। পৃথিবীতে কত ফল-ফুল, স্বাদ-রূপ, গন্ধ-সৌরভ— এক একটা এক এক রকম। মিল আছে কোনো?
প্রাতঃরাশ শেষ। রচনা সাজঘরে। সে সেমিনারে যাবে। টুটুল ডাক দিল দরজার গোড়া থেকে, আপু আমি রেডি, তাড়াতাড়ি এসো। স্কুল দেরি হয়ে যাবে যে।
কল্পনাকে বললাম, তুমি দিয়ে আসতে পারবে?
রচনা সাজঘর থেকে বের হয়ে ডাইনিং রুমের দিকে আসছিল। এসময় কল্পনা আমার গালে একটা চুমো দিয়ে বলল, ভাইয়া, আপু যাক না। আমি আপনার সঙ্গে গল্প করি?
রচনা শ্লেষ গলায় বলল, আদিখ্যেতা দেখে বাঁচি না। একটু সাহায্য যদি করতে, বলে কি না আপু যাক না। আমি কি তোমাদের দাসী?
কথাগুলো শেষ করে রচনা আমার রুমে ঢুকে পড়ে।
টুটুল আবার ডাক দেয়, আপু তাড়াতাড়ি করো।
রচনা বলল, এক মিনিট, স্যারের রুমটা সাজিয়ে আসছি।
টুটুল বলল, আমার টেবিলটা কেউ একবারও সাজায় না। সবকিছু তার স্যারের জন্য। আমাকে কেউ একটুও ভালোবাসে না।
রচনা রুম থেকে বের হয়ে টুটুলের গালে একটা চড় বসিয়ে দিয়ে বলল, নিমকহারাম হসনে ভাই! তিনি আমাদের বাবা, বস্তির কথা মনে পড়ে না? এখন ভিক্ষা করতে রাস্তায়, আজ স্যারের দয়ায় এখানে।
আমি রচনাকে ডাক দিলাম, এমন আচরণ তোমার! তুমি না বল, তোমার রাগ নেই?
স্যার, এটি রাগ নয়, শিক্ষা। জবাই করে দিলে রাগ বলতে পারতেন।
আমি লম্বা একটা শ্বাস টেনে বললাম, বুঝেছি।
কী বুঝেছেন, স্যার?
বিচার মানি তবে তালগাছ আমার। ঠিক মানবাধিকারের মতো।
আল্পনা বলল, মানবাধিকার কী?
আমি বললাম, মানুষ যখন বাঘ শিকার করে তখন সেটি মানবাধিকার। বাঘ যখন আত্মরক্ষার জন্য মানুষ মারে, সেটি মানবাধকিার লংঘন।
টুটুল এসে আমার পায়ে হাত দিয়ে বলল, ভাইয়া, ভুল হয়ে গেছে ক্ষমা করে দিন।
আমি টুটুলকে কোলে নিয়ে দুগালে দুটো চুমো দিয়ে বললাম, আজ আমিই তোমাকে দিয়ে যাব।
খুশি হয়ে টুটুল আমাকে জড়িয়ে ধরে।
রচনা ভিতর হতে গড়গড় করে বলে যেতে থাকে, যান, নিয়ে যান, স্যার। আমাকে তো কোনোদিন নিয়ে যাননি। নিয়েছেন? মনের ওপর তো আর জোর চলে না! অফিস দেরি হয়ে গেলে বুঝবেন!
টুটুল বলল, ভাইয়া গাড়িতে চড়ে যেতে পারব না।
কেন?
রাস্তায় জ্যাম, হেঁটে যেতে লাগে পাঁচ মিনিট। গাড়িতে গেলে আধ ঘণ্টা।
তাহলে রিকশায় যাই?
রিকশায় কখনো উঠবেন না ভাইয়া, রিকশাওয়ালারা বাজে কথা বলে। পচা গান গায়।
এ সময় ফোন আসে।
পোস্ট মাস্টার নাজমুল।
কী খবর নাজমুল?
স্যার অনেক অনেক ধন্যবাদ।বহুদিন পর শান্তিকে নিঃশ্বাস নিলাম। অনেক ধন্যবাদ।
কী ব্যাপার, হঠাৎ ধন্যবাদ?
মাস্তান তিনটাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।
গুড।
আমার মেয়ে আবার স্কুলে যাচ্ছে।
তোমার আপামণির সেভিংসটা তুলে নেব। আমার পিয়ন যাবে। তাকে কী কী করতে হবে এবং কী কী কাগজপত্র লাগে দিয়ে দিও।
আচ্ছা।
কয়দিন লাগতে পারে?
টাকা কী স্যার ক্যাশ নেবেন?
না। ব্যাংক চেক দিলে হবে। সরকারের টাকা সরকারের কাছে চলে যাবে।
তাহলে দেরি লাগবে না।
আমাকে কী করতে হবে?
আপামণির একটি স্বাক্ষর লাগবে কাগজে। এটি পাঠিয়ে দিলে আমি বাকি ব্যবস্থা করব। এরপর একদিন এসে চেকটা নিয়ে যাবেন। যদি আসতে না পারেন আমি নিয়ে যাব। আপনি স্যার যে উপকার আপনি করেছেন তা কখনো ভুলব না। এতদিন বউয়ের কাছে অথর্ব বলদ ছিলাম। এখন স্যার, বৃষ। মর্যাদা বেড়ে গেছে সংসারে, মহল্লাতেও সবাই সমীহ করতে শুরু করেছে। কমিশনার বাসায় এসে সান্ত্বনা দিয়ে গেছে। বলেছেন- মাস্তানগুলোকে ধরিয়ে দিয়ে উচিত কাজ করেছেন। আমি পারছিলাম না। কেন জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন,  নির্বাচনে দাঁড়ান, ভোট পেয়ে কমিশনার হোন, তারপর বুঝবেন। কমিশনার হওয়ার আগে যারা কাছে আসতে ভয় পেত, এখন মাথায় উঠে নাচে।
——————————————————————————
স্যমন্তক: পঞ্চপঞ্চাশত্তম পর্ব 
error: Content is protected !!